৬ অপর্ণা সিনহা
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
কবি অপর্ণা সিনহার জন্ম 19/11/1974 ইং ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের ছোট্ট রাজ্য ত্রিপুরায়।কবির পিতার নাম স্বর্গীয় অনিল সিনহা মাতার নাম স্বর্গীয়া মনোরমা সিনহা।আজ পর্যন্ত কবির দুটো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।তার মধ্যে একটি বাংলা ভাষার "নিঃশব্দ চিরাগ", অপরটি কবির মাতৃভাষা বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় "হপনর মেরাক সেরাকে"। এছাড়াও আত্মজীবনী মুলক একটি গ্রন্থ "চিত্রশিল্পী নলিনীকান্ত মজুমদারের জীবনী" প্রকাশিত হয় । তার লেখা নাটক, ছোট গল্প ইত্যাদি দেশে বিদেশে বিভিন্ন ম্যাগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। কলিকাতার "বর্ণপরিচয়" নামক প্রকাশনা থেকে দুটি কবিতা সংকলন এবং দুটি গল্প সংকলন ও প্রকাশিত হয়।কবির কবিতা ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের শিক্ষাদপ্তরে সপ্তম শ্রেণীর পাঠ্য বই এর অন্তর্ভুক্ত। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি একজন বিজ্ঞানের শিক্ষিকা । একমাত্র পুত্র রত্নদিপ সিনহা (ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে) ও স্বামী প্রতাপ সিনহা কে নিয়ে সুখে সংসার করছেন।
প্রশ্ন :১
যে কোন শিল্পেরই শুরু আছে।শেষ হয় কি না জানি না।তো শুনবো হাতেখড়ি কখন কি রকম হলো?
অপর্ণা:১
উঃ আসলে ঠিক কখন লিখতে শুরু করি বলা মুশকিল! আমি যখন ক্লাস নাইনের ছাত্রী তখনই একটা ডাইরি ছিল।সেটাতেই লিখে রাখতাম।আশির দাঙ্গার সময় আমি খুব ছোট ছিলাম। বাবার কাছে এবং বড়োদের কাছে গল্প শুনি সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। আমার প্রথম কবিতা ছিল "বর্তমান ত্রিপুরা" সম্ভবত নবম শ্রেণীতে পড়ার সময় লিখা।
কি করে লিখতাম তাও জানি না। তখনও এবং এখনও খুব কম লেখায় আমার ছাপানোর জন্য কোথাও দিতাম।কেবল ফেসবুকেই স্বতন্ত্র ভাবে লিখতে শুরু করি।যদি কোন গুণীজন লেখা চাইতেন অত্যন্ত সংকোচের সহিত আমি দিতাম। পরিবারের কেউ কোনদিন এই লেখালেখি নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। সত্যি বলতে কি জানতেনও না।তবে এক দুজনের কথা বলতেই হয়,যারা আমার এই অকবিতাগুলো মন দিয়ে শুনতেন। আমি তখন কৈলাশহরে। সুভাষ জ্যাঠু বলে বাবার একজন কলিক ছিলেন। এমনিতে তিনি একজন ফার্মাসিস্ট।ঐ জ্যাঠু এতো প্রশংসা করতেন আমি উনাকে দেখানোর জন্যই পরের কবিতা লিখতাম।এখন উনি নেই তবু প্রেরণার উৎস এই কাজে উনিই ছিলেন প্রথম। তারপর কলেজে ভর্তি হলাম। আমি পিওর সাইন্সের ছাত্রী পড়াশোনার চাপ ছিল বেশি। পরিবারের বড়ো সন্তান হিসেবে সবার অনেক আশাও ছিল।যদিও আমি এখনও একজন ব্যর্থ মানুষ। তবে লুকিয়ে চলত এই লেখার কাজটি।প্রথম ছাপা হলো কলেজ ম্যাগাজিনে আমার কবিতা। এরপর কৈলাশহরের অনেক বড়ো দাদারা আমাকে খুঁজে আমার ভাড়া বাড়িতে আসেন। তাদের কেউ শিক্ষক কেউবা অন্য পেশায় ছিলেন। কিন্তু লেখালেখি করতেন বা পছন্দ করতেন। আমাকে কিছু বইও উপহার দিলেন। আমার মনে আছে এখনও,উনাদের বক্তব্য হলো কবিগুরুর প্রভাব স্পষ্ট আমার লেখার উপর প্রভাব পড়তো, এবং তার থেকে মুক্তি পেতে আমাকে ঐ সব বই পড়ার কথা বলেছিলেন। বিশেষ করে প্রভাত দা ( উনি কৈলাশহর গার্লস স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন) এবং রঘুপতি দা আমাকে লেখালেখি বন্ধ না করতে বলেন।এই জন্যই আমি চিরজীবন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।
প্রশ্ন :২
একজন কবিও তো নিজেকে তৈরী করেন ক্রমাগত।সে অর্থে আমরা সবাই চিরকালই শিক্ষার্থী।যদিও আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত কবি।আপনার কবিতা সপ্তমশ্রণির পাঠ্য তালিকায়।এ গৌরব ত্রিপুরারও।আমাদেরও।কেমন লাগে?
অপর্ণা:২
উঃ-আমি ভীষণ বানান ভুল করি এখনও!কাজেই আমার কোন লিখা ফেসবুকে দেওয়ার আগে আমি একাধিক গুণীজন যারা একাজে দক্ষ উনাদের সাহায্য নিতাম বা এখনও নেই। ফেসবুকের দৌলতেই আমার এই সৌভাগ্য হয়েছে।প্রথমে কলকাতার একজন দাদা স্বেচ্ছায় একাজে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। এরপর যখন মাতৃভাষায় লেখা শুরু করি তখন বাংলাদেশের একজন গুণীজন পেশায় ডাক্তার উনিও নিজে থেকেই বানান কোথায় ভুল,ছন্দ কেমন হলে ভালো হবে এসব বলে দিতেন। এরপর আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায় "হপনর মেরাক সেরাকে" প্রকাশিত হয় তখন সম্পূর্ণ কাজটি বাংলাদেশের ঐ দাদা ও একজন নামকরা এডিটর যিনি একটা স্বনামধন্য সম্পাদক করে দিয়েছিলেন।না হলে হয়তো আমার কোন বইও হতো না। আমি চির ঋণী উনাদের কাছে। এখনও আমাকে অকাতরে অনেকেই সাহায্য করেন।কাজেই আমি বিশ্বাস করি মন থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি একজন শিক্ষার্থীই । এখনও খুব সাধারণ ফেসবুক পোস্ট পর্যন্ত কেউ না কেউ আমার অলেখক বন্ধুও আমার ভুল শুধরে দেন।
পাঠ্যবইয়ে লেখা ছাপানোর বিষয়টি সত্যি অভাবনীয় প্রাপ্তি আমার জীবনে। লেখা পাঠানোর জন্য বলা হলেও আমি বরাবরের মতই পাঠাইনি সময় মতো। এরপর আগরতলায় যখন মিটিং বসে পাঠ্যবই ছাপানোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন সেখান থেকে ফোন করেন। আমি ছোট দুটি কবিতা দেই ।যিনি আমার কাছ থেকে নেন লিখাটি নিঃসন্দেহে পন্ডিত ব্যক্তি ছিলেন। আমি ভয়ে লজ্জায় মরে মরেই উনার হাতে দিই।যা হোক পরে রাখা হয়েছে জানলাম। আমি উনাদের সকলের কাছেও কৃতজ্ঞ এর জন্য।
প্রশ্ন :৩
ত্রিপুরায় বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী সাহিত্যের ক্রমবিকাশ শুনবো?
অপর্ণা:৩
উঃ-ত্রিপুরাতে যে সব লেখক কবিরা লেখালেখি করতেন উনারা সর্বোকালের জন্য আমার শ্রদ্ধেয় ও পথপ্রদর্শক।যাঁদের নিয়ে আজও আমার গর্ব ও অহংকারের কমতি নেই। বিশেষ দুই জন মহান ব্যক্তি শুধু ত্রিপুরা কেন সারা দেশে এবং বিদেশেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁদের মধ্যে একজন হলেন গোকুলানন্দ গীতিস্বামী।যিনি গোকুল কির্তণী নামে খ্যাত। আজকে পর্যন্ত উনার মতো চিন্তা ভাবনা নিয়ে সমাজ সচেতনতা নিয়ে দ্বীতিয় কোন কবি সাহিত্যিক ত্রিপুরাতে জন্ম গ্রহণ করেছেন বলে আমি মনে করি না। উনার একটা পুঙতি উল্লেখ করছি এখানে,
"কালে কালে কালর কথা
নাহুনানি নাকরের
জ্বিগৈ বনহান পুড়ে আনলে
কাচামজাই নাধরের।"
"ইমা ইমা তর মহিমা
কিতা মাততু সৌগ মি"
অনেক অনেক বড়ো মাপের কবি ছিলেন উনি। ত্রিপুরায় তখনও রাজার শাসন চলছে।উমাকান্ত স্কুলে পড়ার সময় একবার রাজার ছেলের উপর হাত তুলেছিলেন উনি।কুমারঘাটের কাছেই ফটিকরায়ে উনার বাড়ি ছিল। ত্রিপুরাতে যখন প্রথম টেরিটোরিয়েল গঠিত হয় উনিও সদস্য ছিলেন। যা হোক আমাদের সমাজে এখনও উনাকে "বিয়ানর কৌয়াগ" অর্থাৎ "ভোরের কাক" নামে জানেন সকলে।উনিই প্রথম বাড়ি বাড়ি ঘুরে জাগরণী গান গেয়ে বেড়াতেন।আর একজন হলেন আমাদের সকলের প্রাণপ্রিয় প্রয়াত মন্ত্রী বিমল সিংহ। উনার কথা আজ নতুন করে বলার কিছু নেই আশাকরি।যার লেখা আজ কলকাতা,আসাম ও ত্রিপুরায় পাঠ্যবইয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে।লংতরায় পড়লে এক ধরনের মানুষ হবেন আর যারা পড়েননি তারা একধরনের!
তবে আধুনিক লেখালেখি অনেকেই আমরা করে থাকি তবুও সেই যুগ আর ফিরবে কিনা জানিনা সাহিত্য জগতে।এই ক্ষেত্রে ক্রম বিকাশ কথাটা কতটুকু প্রযোজ্য সেইটাই বিচার্যের বিষয়।তবে বর্তমানে যারা লিখেন তাদের অনেকের লেখায় ভালো লাগে আমার।তাই নির্দিষ্ট কারোর নাম নিলাম না।
প্রশ্ন :৪
আপনি বাংলা ও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী দুটো ভাষায়ই চর্চা করেন।একটু বলবেন?
অপর্ণা:৪
উঃ- হ্যাঁ এটাই সত্য আমার লেখার হাতেখড়ি বাংলা নিয়েই। তবে আমি আজকাল মনের বিরুদ্ধেই গিয়ে নিজের মাতৃভাষায় লেখার চেষ্টা করি। কারণ আমার লাইনগুলো বাংলাতে আসে বেশি।পরে আমি তাকেই নিজের ভাষাতে নেওয়ার চেষ্টা করি। এখনও অপটু আমি এতে !
প্রশ্ন:৫
আপনি কবি চিত্রশিল্পী এবং একজন শিক্ষকও।যদিও সময়ের নিকট শিক্ষকতাকে একটি প্রশ্নবোধকে দাঁড় করিয়েছে আজ।তাও আপনি আমাদের নিকট সফল শিক্ষক হিসেবেই শ্রদ্ধাশীল। আপনি এই সময়ের শিক্ষকদের জন্য কিছু বলুন যা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে প্রয়োজন হবে বলে মনে করেন?
অপর্ণা:৫
উঃ- ২০১৬ এর সেপ্টেম্বর মাসে দিল্লিতে একমাস যাবৎ CCRT তে প্রশিক্ষণের সময় উনার কাছেও মধুবনী আর্ট শিখেছিলাম। তৎকালীন ত্রিপুরা সরকারের বিদ্যালয় শিক্ষা দফতরের উদ্যোগেই এই ট্রেনিং করানো হয়েছিল ।যাতে করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই চিত্রশৈলী সম্পর্কে জানতে পারি। ২০১৬-২০১৭ সালে সারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সর্বমোট ৫০ জন শিক্ষক শিক্ষিকাদের এই ট্রেনিং করানো হয়, CCRT তথা Center for Cultural Resources and Training, (Ministry of cultura, Govt of India.) New Delhi, Dwarika. এর তরফ থেকে।
শুধু আর্ট নয় এছাড়াও বিভিন্ন skills developed করানো হয় আমাদের।যেমন drama, story writing, acting, art's ইত্যাদি। এদের সাথে education কে related করে class এর শিক্ষার্থীদের skills development করার পদ্ধতিও শেখানো হয়।প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কিছু না কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকে। এবং তাদের ভালো লাগা খারাপ লাগা বিষয় বা subject থাকে। সেই ভালো লাগা subject টিকে চিহ্নিত করে তাকে ঐ নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে।এমন তো কথা নেই,সব শিক্ষার্থীর অংকের হিসেব নিকেষ ভালো লাগবে,বা ইতিহাসের গল্প!কারো হয়তো গান গাইতে ভালো লাগে এবং ভালোও গায়। তাকে জোরপূর্বক ত্রিকোণমিতির sin cos এর মান মাথায় চাপিয়ে কি লাভ! কেউ আছে ভালো হাতের কাজ জানে, তাকে কেন বিদ্যালয় সে সুযোগ দেবে না,সেই কাজে দক্ষতা অর্জনের? আমাদের সেই সব কথাগুলোই বুঝিয়েছিলেন শিক্ষাবিদেরা। বলেছিলেন, নিজেদের এলাকার শিল্পীদের সম্মান জানাতে। কেউ যদি পেশায় কুমোড় হন, মাটির পাত্র বানাতে পারেন তবে উনাকেই প্রশিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয় বিবেচিত করবেন।উনার কাজকে সম্মান দিয়েই বিদ্যালয় তাকে আমন্ত্রণ জানাবেন। সে হোক একমাস বা তিন মাসের জন্য।এই সময়ে ঐ শিল্পীকে সম্মানিক ভাটা প্রদান করা হবে। বিনিময়ে উনি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে কলমে সেই কাজে দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করবেন।এতে করে সমাজের প্রত্যেক স্তরের শিল্পীর পদ মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দের কাজে দক্ষতা অর্জন করবে এবং ভবিষ্যতে বেকারত্বের জ্বালা থেকে মুক্তি পাবে। শুধু মাটির পাত্র তৈরি নয়, হতে পারে কোনো ধামাইল শিল্পী, মৃদঙ্গ বাদক, হতে পারে বাঁশ বেতের কারুকার্যে দক্ষ কোনো উপজাতি বৃদ্ধ বা বাঁশী বাদক! এভাবেই আমরা বিদ্যালয়ের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি সমাজের অবক্ষয় হতে থাকা শিল্প এবং চির অবহেলিত বিলুপ্ত শিল্পীদের ও মর্যাদা বাড়াতে সক্ষম হবো। আমাদের সেই ট্রেনিং এ এও বলা হয়েছিল, বর্তমানে যে যে শিক্ষাব্রতীরা বি আর সি অথবা সি আর পি পদে নিযুক্ত হয়ে শ্রদ্ধেয় শিক্ষক শিক্ষিকাদের ট্রেনিং এ সাহায্য করছেন আমরা যেন উনাদের কাছেও এই বার্তা পাঠাই। প্রয়োজনে উনাদের কে নিয়ে সপ্তাহ ব্যাপী সেমিনারের ব্যবস্থা করা হয়। শিক্ষা দফতর তাতে সর্বোতভাবে সহায়তা করবে। আমি শুরুও করেছিলাম আমার বিদ্যালয়ে। আমার প্রধান শিক্ষক আন্তরিক ভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন। আমি কৃতজ্ঞ আমার সহকর্মীদের কাছেও। সকলে মিলে প্রাথমিক ভাবে কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু হঠাৎই আমি শিক্ষকতার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছি!তাই আজ শিক্ষক দিবসে আমার সহকর্মীদের এই ভাবনার কথা জানালাম।এই ভাবনা আমার নই , আমার দেশের সর্বোচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আধিকারিকদের।তাই সম্মানিত শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছে এই ভাবনা তুলে ধরলাম। ভালো নাও লাগতে পারে সকলের তবু...
প্রশ্ন :৫
বিজ্ঞানের সাথে কবিতার কি দ্বন্দ্ব?
অপর্ণা:৫
উঃ- না।এমন কখনো মনে হয়নি আমার।
প্রশ্ন :৬
ঘর সংসার ছাত্র ছাত্রী সব মিলে কেমন কাটে সময় সংসার?
অপর্ণা:৬
উঃ-বড়োই অলস প্রকৃতির আমি।রুটিন মাফিক না চলাই আমার ধর্ম সেই ছোট বেলা থেকেই।নেহাৎ প্রয়োজন ছাড়া কাজে হাত কমই দিই। পড়ালেখা সব কিছুতেই এমন খামখেয়ালি ছিলাম আছি হয়তো থাকবো। হ্যাঁ এক সময় প্রচুর ছাত্র পড়াতাম । ইদানিং নিজে পড়ি।সব প্রয়োজনেই। এমনকি বাড়ি ঘরেও ততটুকুই কাজ করি যতটুকু না হলে নয়। এরজন্য অনেক বচসা শুনতে হয়, শুনি।কেবল লেখা এবং আঁকার কাজটা প্রয়োজন ছাড়া করি তাও মাঝে মাঝে।যখন ইচ্ছে হই বা যখন না লিখে থাকা যায়না তখনই। সংসারে ভালোই আছি । ছেলে থাকলে তার সাথেই বিভিন্ন গল্পে কাটে সময়।এখন সে বাইরে পড়াশোনা করছে আমি আমার জগৎ নিয়ে ভালই আছি। রান্না বান্না করি ব্যস্ত স্বামীকে নিয়ে সংসার এখন।
প্রশ্ন :৭
একজন মানুষের সাথে কবিমানুষের কোন সংঘাত আছে?
অপর্ণা:৭
উঃ-মনে হই না আমার এমন সংঘাত আছে।তবে একজন লেখিয়ের সাথে অন্য সাধারণ মানুষের একটু তফাৎ আছে। আমি আমার পরিবার থেকে বুঝি। পরিবারের মধ্যে অন্য কোনও কবি থাকলে হয়তো এমন ভাবনা আসতো না আমার। আমি মনে করি সমাজসেবা, লেখালেখি, কবি, চিত্রশিল্পী, অভিনয় স্বেচ্ছাসেবক এদের প্রতিকূলতার মধ্যেই তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হয়।যদি পরিবারের মধ্যে ঐ কাজের পৃষ্টপোষক বা সমর্থক না থাকে।
প্রশ্ন :৮
আপনি ত্রিপুরার একজন কৃতিচিত্রকরের জীবনী লিখে আমাদের নিকট আরো শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। এ কাজ আপনার কেমন লাগে?
অপর্ণা:৮
উঃ- ছোট্ট বেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালো লাগতো।যদিও কোনদিন সেই ভালো লাগার বিষয়টি নিয়ে চর্চা করার সুযোগ হয়নি।যখন প্রস্তাবটা পাই খুব উৎসাহিত হই । বইটা লেখার জন্যে নই। শুধু একজন চিত্রশিল্পীর জীবনের গল্পটা শুনবো, জানবো বলেই।পরে যখন শুনলাম খুব ভালো লাগে।এমন একজন প্রচার বিমুখ গুণী শিল্পীর সারা জীবনের উতাল চড়াওয়ের মধ্যে কাটিয়েছেন উনার জীবন। এইটা সকলের জানা উচিত। বিশেষ করে যেসব ছাত্র-ছাত্রী,গবেষক চিত্রশিল্প নিয়ে পড়ছে বা গবেষণা করছে তাদের যদি এটা একটু হলেও কাজে লাগে। সেই আমার প্রাপ্তি,তাই লিখেছি। সাতমাস ধরে এই কাজটি করেছি।তবে অনেকেই উদার ভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এই কাজেও।যাদের ঋণ কখনো শোধ করতে পারবোনা।
প্রশ্ন :৯
কমলপুরের বিষ্ণুপ্রিয়াদের রাসলীলা শতবছর উত্তীর্ণ। আমি রাসপূর্ণিমায় কমলপুর থেকেও তা দেখার সুযোগ হয়নি।একটু বলবেন?
অপর্ণা:৯
উঃ- হ্যাঁ,এটা অনেক পুরোনো উৎসব ও মেলা।যদিও প্রথমদিকে শুধু মণিপুরীদের জন্যেই এটার আয়োজন শুরু। তবে বর্তমানে এর প্রসার বহুদূর।এটা শুধু নর্থ ইস্টের নয়,সারা ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে সাথে সারা ভারতের সর্ব বৃহৎ সার্বোজনীন রাস উৎসব ও মেলা।বেশ কয়েকবছর যাবৎ করোনার জন্য একটু বহর কমে গেছে আজকাল।ছোট বেলায় দেখেছি এই মেলায় বিদেশি পর্যটকদের আসতে।সম্ভবত ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছিল। দিল্লি দূরদর্শণ থেকে প্রচার করা হতো, আগরতলা তো আছেই। প্রতিদিন লাখ খানেক জন সমাগম দেখি এই উৎসবে। এছাড়া ম্যাগাজিনও প্রকাশিত হয় প্রতিবছর এই উৎসবকে কেন্দ্র করে।
প্রশ্ন :১০
পাঙাল জাতির বাস কমলপুর। তাদের ভাষা সংস্কৃতি বলবেন?
অপর্ণা:১০
উঃ- আমি জানি না তাদের ভাষা।তবে মেতেই ভাষায় কথা বলেন। আসলে মেতেই ভাষাটাও আমি জানি না।এই তো ভাষা।
এবার সংস্কৃতির কথা বলতে আমি খুব সামান্যই জানি।ধর্মে এরা মুসলিম। তাদেরও আমাদের মতোই দুটো প্রজাতি।এক- মণিপুরী মুসলিম
দুই- বাঙালি মুসলিম।তবে পোশাক আমাদের মতোই অনেকটা।চাকছাবি আর ইনাফি পড়েন।তবে মাথায় কাপড় রাখেন সব সময়।যে পাছড়াটা পড়েন তার উপরে আরও একটা সবুজ কাপড় পড়েন। কারণটা সঠিক জানা নেই। খাওয়া খাদ্য প্রায় মুসলমানদের মতোই।এদের কাছ থেকেই আমরা আমাদের পোশাক কিনি। আমার সাথে ব্যক্তিগত ভাবে যাদের পরিচয় আছে তাদের দেখে বুঝেছি বড়ো আন্তরিক ও ভালো মনের লোক এরা।ছাত্র পড়িয়ে বুঝেছি অংকে খুব দক্ষ থাকে। এছাড়া আর কিছু বলার নেই।
প্রশ্ন :১১
কমলপুরের মিশ্র সংস্কৃতি আপনার কেমন লাগে?কিংবা ত্রিপুরার মিশ্র সংস্কৃতি?
অপর্ণা:১১
উঃ- দেখুন শুধু কমলপুর বা ত্রিপুরাই কেন, আমার তো সারা ভারতের মিশ্র সংস্কৃতিকেই খুব ভালো লাগে।কবির ভাষায়,আমাদের দেশ-
"নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান
বিবিধের মাঝে দেখো মিলন মহান!"
কাজেই আমার ভালো লাগে এই মিশ্র জনবসতি। তবে আজকাল খুব চিন্তা হয়,ভয়ও কবি গুরুর সেই মহামানবের সাগর দূষিত হয়ে পড়ছে না তো!এত অসহিষ্ণুতা, স্বৈরাচারীতা স্বার্থপরতার বেড়াজালে আমরা আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছি জানি না ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছে এর কপালে!
প্রশ্ন :১২
প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রতিবাদ আছে?
অপর্ণা:১২
উঃ- আমি অতি সাধারণ এক নারী, মানুষ মাত্রই প্রক্ষোভ পরিচালিত এক জীবন্ত অস্তিত্ব। অন্তত যতদিন বেঁচে আছি! আমিও তার ব্যাতিক্রম নই। কাজেই প্রত্যাশিত অপ্রত্যাশিত ভালো কিছুর প্রাপ্তিতে আনন্দ পাই তেমনই মন্দ কিছু , ক্ষতিকর কিছু ঘটলে কষ্ট পাই।আর প্রতিবাদ? মনে মনে বিক্ষোভ যদি প্রতিবাদ হয় তাহলে করি।আর সামনে নীরবই থাকি আজকাল প্রায়ই।যদিও অন্যায় যে করে তার থেকেও বেশি অপরাধী নীরবতা পালনকারীরা তবু নীরবই থাকি।তবে লেখালেখি নিয়ে আমার তেমন কোন চাহিদা বা প্রত্যাশা নেই অন্যের কাছে।যেচে কখনোই কারো কাছে চাইনি,"আমার লেখাটা ছাপানো হোক", অথবা "দয়াকরে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানান প্লিজ"! ইত্যাদি! তারপরও কেউ কেউ ভুল বুঝে, মনে করে আমি হয়তো …..যাক এসব থাক বরং!তাই এই দিকটায় আমি অনেক সুখী বলতেই পারেন।
প্রশ্ন :১৩
পরবর্তী পদক্ষেপ?
অপর্ণা:১৩
উঃ- আগে থেকে কিছুই বলতে পারছি না। আসলে প্ল্যান জিনিসটাই জীবনে কখনও করতে পারিনি।আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না জানি। তবু একটা গল্পের বই করার ইচ্ছে অনেক দিন থেকেই।সেটা কি ভাষায় করবো ঠিক করিনি এখনো। অনেক গুলো লেখা আছে । দুঃখের বিষয় হলো কী জানেন, একজন শ্রদ্ধেয় দিদি ফোন নম্বর দিয়ে বলেছিলেন একটা গল্প পাঠানোর কথা। আমি আজ পর্যন্ত নির্বাচনই করতে পারলাম না কোনটা দিই!দিদির কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী!নাম উল্লেখ করলাম না কারণ উনাকে ত্রিপুরায় সবাই চিনেন।ভাবা যায়, কতটুকু অজ্ঞ আমি!
প্রশ্ন :১৪
কবিতা মনের দুঃখ দূর করে?
অপর্ণা:১৪
উঃ- দূর করে না পোষে রাখে তা জানি না।তবে বাঁচতে হলে এর দরকার!
প্রশ্ন :১৫
সফলতার আনন্দ কেমন কাটান?
অপর্ণা:১৫
উঃ- আজ পর্যন্ত এমন কোনো মূহুর্ত লেখালেখির জন্য কাটাই নি।তবে প্রতিদিনই সুযোগ পেলে আনন্দে কাটাই। আমার বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দিন গুলি আমার কাছে স্মরণীয়।
প্রশ্ন :১৬
বিশেষ কোন স্মৃতি?
অপর্ণা:১৬
উঃ- কেমন স্মৃতি?তার যদি সাহিত্যের জন্য হয় তবে নিঃসন্দেহে আমার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ অনুষ্ঠানের পর ঘরোয়া ভাবে যে পার্টি হয় বেশ ছিল! তাছাড়া জীবনের বিশেষ মুহূর্ত হলে আমার মা হওয়ার দিনটি! আমার বাবাকে চিরতরে হারানোর দিন কখনোই ভুলবোনা!
প্রশ্ন :১৭
আপনি তো শিল্পীও।চিত্র ধরা দেয় আপনার তুলিতে।কবিতা ও চিত্র দুটি একজনের সাথে বসবাস করলে শিল্পেরই লাভ।কিন্তু কিভাবে সময় দেন?
অপর্ণা:১৭
উঃ-অফুরন্ত সময় এখন আমার হাতে! তবে কাজে লাগাই না আমি। অথবা আসেনা লেখা অপেক্ষায় কাটাই তাই। ছবি তো যখন খুশি বসে পরি। আঁকিবুঁকিতে মন ভালো থাকে।
প্রশ্ন :১৮
তরুণ প্রজন্মের জন্য কিছু বলবেন?
অপর্ণা:১৮
উঃ- উপদেশ দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই। তবে এটুকু বলবো জাহির করা বা নিজের ঢোল পেটানো বন্ধ করে নিজের কাজে মনোনিবেশ করাই ভালো।অবশ্য আমি নিজেও মন দিয়ে কোনো কাজ করিনা।অকাজেই জীবনের অধিকাংশ সময় গেছে, যায় যাবেও জানি! সকলের জন্য অনেক শুভকামনা রইলো ।
০১:০৯:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ