বিঝু -উৎসব: চিন্তনে -মননে ও ঐতিহ্যে || নিরঞ্জন চাকমা

বিঝু -উৎসব: চিন্তনে -মননে ও ঐতিহ্যে

নিরঞ্জন চাকমা

উৎসব মানেই হলো মনের বাঁধভাঙা আনন্দ ও উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। অগণিত মানুষের একত্র সমাবেশ পারস্পরিক মিলন ও হৃদয়ের সেতুবন্ধন চাকমাদের বিজু উৎসবের মানেও তাই। বহুত্বের মাঝে আনন্দের স্রোতধারায় অবগাহন করে নতুন ভাবে নিজেকে খুঁজে পাওয়া।কর্ম ক্লান্ত একটি বছরের শেষে বসন্তের প্রায় বিদায় লগ্নে এক নির্মল আনন্দ যজ্ঞে আচরণ সমর্পিত হয়ে প্রথাগত কিছু আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালনের মধ্য দিয়ে পুরাতন বছরকে সহাস্যে বিদায় জানিয়ে এবং নতুন বছরকে সানন্দে ব্রণ করে নেওয়াই হলো বিজু উৎসব। চাকমা ভাষায় বিজুযাত্রা। চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী বিজু উৎসব আসলে একটি আদিম কৃষি উৎসব।এই উৎসব বছরের এমন এক সময় পালিত হয়,তখন জুম ক্ষেতে বীজ বপনের মোক্ষম সময়। কালবৈশাখীর বর্ষণসিক্ত মৃত্তিকার সঙ্গে মিশে গিয়ে জুমের চাষভূমি হয়ে উঠে বীজ বপনের উপযোগী স্নিগ্ধ ও কোমল। ঠিক এ সময়েই ধরিত্রী মাতার উদ্দেশ্যে সুপ্রাচীন কিছু আচার অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে সাড়ম্বরে এই উৎসব উৎযাপিত হয়। কিন্তু কালের স্রোত ধারায় ধরণধারণের পরিবর্তনের ফলে বর্তমান যুগে তার বিমল আনন্দ যাপনের এক বর্ণময় বসন্ত উৎসব অথবা বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণের এক ঐতিহ্য নির্ভর উৎসবের রূপ ধারণ করেছে।।

মূলত,বিষুব ও কর্কটবৃত্তের মধ্যবর্তী পৃথিবীর বিস্তৃত ভূখণ্ড জোরে বসবাসকারী প্রায় প্রত্যেক আদিম জনসমাজ ,যারা আদিকাল থেকে প্রকৃত গত কারণে ।প্রধানতঃ বৃষ্টি নির্ভর চাষ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল যাদের মধ্যে বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে কৃষি উৎসব পালনের রেওয়াজ লক্ষ্য করা যায়। প্রকৃতপক্ষে উৎসবের এই সময়টি হল ইংরাজি বর্ষের এপ্রিল মাস। লক্ষনীয় যে, আসলে সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, অষ্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপের সুইডেন, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে ও মহাদেশে বসবাসকারী আদিম অধিবাসীদের মধ্যে একদা জুমচাষ (অবশ্যই ভিন্ন নামে)বা অনুরূপ বৃষ্টি নির্ভর চাষের প্রচলন ছিল। বলাবাহুল্য এদের অধিকাংশের মধ্যে এই নির্দিষ্ট মাসে জুমচাষ ভিত্তিক অন্যতম লৌকিক উৎসব সমূহ পালনের রীতি প্রচলিত ছিল।তবে অনেক ক্ষেত্রে তাদের এসব প্রাচীন কৃষি কেন্দ্রিক উৎসব সমূহ পরবর্তী কালে কোথাও কোথাও বসন্ত উৎসব বা বিশুদ্ধ ধর্মীয় উৎসবে রূপান্তরিত হতে দেখা যায়।যেমন হোলি ও দূর্গোৎসব দুটি মৌলিক চরিত্র গত ভাবে আদিম কৃষি বা শস্য উৎপাদন কেন্দ্রিক উৎসব রূপে চিহ্নিত করা গেলেও তার বর্তমানে যথাক্রমে বসন্ত উৎসব ও শক্তিদেবীর আরাধনার উৎসব রূপে পরিচিতি লাভ করেছে। অনুরূপ ঘটনা অন্যত্রও লক্ষ্য করা যায়।যেমন ইউরোপের আদি কৃষি উৎসব 'ইস্টার'-এর চরিত্র গত রূপান্তর ঘটিয়ে তার বর্তমানে কোথাও বসন্ত উৎসব বা কোথাও খাঁটি খ্রীষ্টায় উৎসব রূপে প্রতিপালিত হচ্ছে। আসলে প্রকৃতিগত কারণে এপ্রিল হলো উৎসবের মাস।এ সুযোগে প্রকৃতি তার অঢ়েল বর্ণময় রূপ লাবণ্য ও উচ্ছ্বলতা নিয়ে নিজেকে উন্মোচিত করতে থাকে। তখন গাছে গাছে ঝোপেঝাড়ে গজিয়ে উঠে নব কিশলয়। অরণ্য প্রান্তরে ফোটে অজস্র বর্ণালী পুষ্পরাজি।শীতক্লীষ্ট পাখিরা পুনরায় সতেজ হয়ে ওঠে। আনন্দে তারা কূজন করতে থাকে।এ সময়টা ইউরোপে বসন্ত কালে।এসময়ই সেখানে পালিত হয় বিভিন্ন নামের বসন্ত উৎসব সমূহ যা আদিকালে ছিল কৃষি বা শস্য মাতৃকার আরাধনা কেন্দ্রিক উৎসব।

একদিকে তখন সমগ্র দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিস্তৃত ভূখণ্ড জোরে এসময়টি হলো বসন্তের পূর্ণ যৌবন কাল।ঋতুরাজের যৌবন মদমত্ত এই সময়ে এখানকার অধিকাংশ দেশে বিপুল আনন্দ বৈভবে পালিত হয় জনগোষ্টি সমূহের নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী প্রধান উৎবাদি।ভারতবর্ষ সহ মায়ানমার থাইল্যান্ড লাওস কম্বোডিয়া ইন্দোনেশিয়া নেপাল শ্রীলংকা ইত্যাদি দেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এই সময়েই তাদের নববর্ষের উৎসব গুলো সাড়ম্বরে পালন করে থাকে। সাধারণত এসব উৎসবাদি বর্ষবিদায় বা বর্ষবরণের উৎসব রূপে পালিত হলেও তা মূলতঃ উর্বরাকেন্দ্রিক উৎসব হিসেবেই চিহ্নিত করা যায়।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে সাযুজ্য রেখে আমাদের ত্রিপুরা রাজ্যেও বসন্তের এই মধুমাসটিকে বছরের অন্যতম মাস হিসেবে আক্ষায়িত  করা যায়।এমাসেই ত্রিপুরায় উদযাপিত হয় হিন্দু বাঙালি দের গাজন বা চরক,চৈত্র সংক্রান্তি ও বাসন্তী পূজা,ত্রিপুরীদের গড়িয়া ও বুইসু, চাকমাদের বিজু,মগ বা মাইয়াদের সাংক্রাইন ইত্যাদি লৌকিক উৎসব।এসব উৎসবের বর্তমান বৈশিষ্ট্য তাই হোক না কেন, তাদের অধিকাংশই আদিম উৎসধারা হচ্ছে কৃষি।এসব সঙ্গে মৃত্তিকাদির উর্বরতা শস্যের ফলন,পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের ও সুখৈশ্বর্যের কামনার বিষয়টি জড়িয়ে আছে।

উল্লেখিত পটভূমির আলোকে এখন চাকমাদের সর্বশ্রেষ্ট জাতীয় উৎসব বিজুর সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। চৈত্রের প্রায় মাঝামাঝি সময় ভরদুপুরে যখন দক্ষিনের দমকা হাওয়ায় প্রকৃতি আন্দোলিত হয়ে উঠে, তখনই বসন্তের নব কিশলয়ে সজ্জিত বৃক্ষরাজির আড়াল থেকে হঠাৎ ভেসে আসে বিজুপেখ অর্থাৎ বিজু পাখির পরিচিত সুমধুর কলতান-'বিজুএযোক','বিজুএযোক' 
(বিজু আসুক,বিজু আসুক)এ যেন প্রকৃতির বুকে বিজু উৎসবের আবাহনী। বলাবাহুল্য এই বিজু আবাহনীর পরই চাকমাদের প্রতি ঘরে ঘরে শুরু হয়ে যায় বিজু উৎসবের প্রস্তুতি।

বিজু পাখির এই ক্রমাগত আবাহনীতে সাড়া দিয়ে একসময় সত্যি যেন চলে আসে বিজু উৎসবের পরম আনন্দঘন দিন। চৈত্রের শেষ দুদিন এবং পয়লা বৈশাখ-এই তিন দিন বিজু উৎসবের সময়কাল। চাকমা ভাষায় এই দিনগুলোর নাম যথাক্রমে ফুল বিজু,মূলবিজু,গয্যাপয্যা বিজু। চাকমাদের প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই তিনদিনের মধ্যে ফুল বিজু অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিনটিই বছরের পবিত্রতম দিন।বলাহয় এইদিন নাকি যমের দুয়ার নাকি বন্ধ থাকে।তাই সেদিন কারো মৃত্যু হলে তাকে যমের ঘরে যেতে
 হয়না।সে সরাসরি স্বর্গবাসী হয়।

চাকমা সমাজে ঠিক কবে থেকে এবং কেন এই উৎসবের প্রচলন ঘটেছে তা বলা যায়না। তবে অনুমিত হয় স্মরণাতীত কালে চাকমা সমাজের আদিম জুম কৃষিভিত্তিক জীবন ধারাকে কেন্দ্র করেই এই উৎসবের প্রচলন ঘটেছে। তবে এই উৎসবের সঙ্গে সুপ্রাচীন শিকার জীবী সমাজের চিন্তাধারা বা সংস্কারের অবশেষ কিছুটা জড়িয়ে আছে বলে ধারণা করা যায়। কারণ খোঁজখবর নিয়ে জানা যায় যে, প্রাচীন কালে নাকি বিজু উৎসবের প্রথম দিনে অর্থাৎ ফুল বিজুর দিনে গ্রামের বয়স্ক ও সক্ষম ব্যক্তিরা দলবেঁধে শিকারে যেতো যাতে মূল বিজুর দিনে পর্যাপ্ত পরিমাণে মাংসাদি আহার করা যায়। অপরদিকে গ্রামের যুবকযুবতীরা দলবদ্ধ হয়ে 'রান্যা' অর্থাৎ পরিত্যক্ত জুমক্ষেতে যেত শাক সবজি আহরনে। অথবা তারা গভীর অরণ্যে চলে যেত বন্য ফুল ও ফল তুলে আনতে।যুথবদ্ধ যুবক যুবতীদের এই অরণ্য চারণার বিষয় নিয়ে চাকমাদের এক অন্যতম লৌকিক জনপ্রিয় পালাগান 'ব্যালেড'_ 'রাধামনধনাপুদি পালায়' দীর্ঘ একটি রোমান্টিক অধ্যায় লক্ষ্য করা যায়। এ থেকে মনে হয় এই উৎসবের সূচনা পর্বে চাকমা লোকসমাজের হয়তো আদিম আদিবাসী সুলভ উর্বরতা কেন্দ্রিক সংস্কার অর্থাৎ "ফার্টিলিটি কাল্ট"এর ধারণা যুক্ত ছিল।

ফুলবিঝুর দিন থেকে পরবর্তী দু'দিন যাবৎ প্রতি সন্ধ্যায় প্রত্যেক গৃহস্থের ঘরে ঘরে মঙ্গলপ্রদীপ জ্বালানোর নিয়ম প্রচলিত ছিল। এখনও কোন কোন ঘরে তা লক্ষ্য করা যায়। প্রথানুযায়ী এই মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো হয় গৃহস্থেট নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে।যেমন -পরিবারের সবার মঙ্গলের জন্য ঘরের দাওয়ায়,সম্পদ বৃদ্ধির জন্য ঢেঁকিশালে,পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের জন্য উন্মুক্ত উঠোনে এবং রোগ-শোকের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য নদর বা পুকুরের ঘাটে।

★বিঝু উপলক্ষ্যে পালনীয় বিভিন্ন কৃত্য ও প্রথা

 প্রচলিত প্রথানুযায়ী ফুলবিঝুর দিনে গৃহস্থের প্রতিটি গৃহ ফুল দিয়ে সাজানো হয়।এ ছাড়া ঐ দিনে।প্রত্যেক গৃহস্থ নিজ নিজ বাড়ি-ঘর, কাপড় -চোপড়, বাসন-কোসন,আসবাবপত্র ইত্যাদি ধোয়ামোছা করেন উদ্দেশ্য বছরের যাবতীয় মলিনতা ও আবর্জনা দূর করা। সেদিন ঘরে ঘরে তৈরি করা হয় সুস্বাদু খাদ্য দ্রব্য, পিঠে পায়েস, মদ্ পানীয় ইত্যাদি,যাতে পরের দিন অর্থাৎ মূল বিজুর দিনে অতিথি ও অভ্যাগতদের তা দিয়ে আপ্যায়ন করা যায়। তাছাড়া সেদিনের রাতে একাধিক সব্জির সমাহারে 'পাজন' নামের এক বিশেষ তরকারি অতি যত্নসহকারে তৈরি করা হয়। প্রচলিত বিধি অনুযায়ী মুশফিকুর দিনে প্রত্যেককে এই পাজন তরকারি পরিবেশ করতে হয়।
      মূলবিজুর দিনে প্রত্যেক আবাল বৃদ্ধ বণিতা প্রত্যূষে শষ্যা ত্যাগ করে নদীতে স্নান করতে যায়।শূচিতার প্রয়োজনে এই মাঙ্গলিক প্রাতঃস্নান ।কম বয়সী ছেলে মেয়েরা সাধারণত শীতের কারণে প্রাতঃস্নান করতে চায়না।তাই তাদের উৎসাহিত করার জন্য 'বিজু গুলো' অর্থাৎ বিজু ফল খাওয়ার লোভ দেখানো হয়।বলা হয়,প্রত্যেক নদীর উৎসস্থলে থাকে একটি বিজু ফলের গাছ। বিজুর দিনে ঐ গাছ থেকে বিজু ফল ঝরে পড়ে এবং তা নদীর স্রোত বেয়ে ভেসে আসে অদৃশ্য ভাবে।তাই যারা নদীতে ডুব দেয়, কেবল তারাই ঐ ফল খেতে পায়।তখন বিঝুফলের লোভে কম-বয়সী ছেলে-মেয়েরা নদীতে ডুব দিয়ে স্নান করতে উৎসাহিত হয়।অবশ্য বুদ্ধিমান ছেলে-মেয়েরা নদীতে ডুব দিয়েই এই বিঝুফলটি খেতে পায়,বোকা বা সহজ-সরলরা পায় বা।এটা যেন সেই এক রাজা ও তার নতুন পোষাকের গল্পটির মতো।যে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী, সে-ই কেবল রাজার নতুন পোষাক দেখতে পায়,বোকারা পায় না।

প্রাতঃস্নান সম্পন্ন হলে গৃহকর্তা পাশ্ববর্তী জঙ্গলে গিয়ে 'বিঝুফল'নামের এক প্রকার ঔষধী গুল্মের ফুল (বন্য কেতকী?)সংগ্রহ করে আনেন।তবে এই ফুল সংগ্রহের জন্য প্রচলিত একটি বিধি মেনে চলতে হয়। যেমন, ফুলবিঝুর দিনে সন্ধ্যেবেলায় গৃহকর্তা পান ও সুপারির উপাচারসহ পাশ্ববর্তী জঙ্গলে  স্বয়ং গিয়ে বিঝুফুল গাছের গোড়ায় তা স্থাপন করে এই  দৈব -ঔষধিকে প্রণাম করে আমন্ত্রণ জানিয়ে আসেন এবং তা সংগ্রহ করে আনেন। এই বিশেষ উপায়ে আমন্ত্রণ জানানোকে বলা গয়'পান-ব্যত্যানা'।প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই পান-ব্যত্যানার মাধ্যমে সংগ্রহ করার ফলে নাকি ফুলটির ঔষধীগুণ বেড়ে যায়। 
যাহোক, প্রাথমিক সংগৃহীত এই বিঝুফুলগুলো একটি জল একটি জলপূর্ণ পাত্রে রেখে গৃহকর্তা বা কোন ওঝা কর্তৃক মন্ত্রপড়ে তা পরিশুদ্ধ করে নেন এবং মন্ত্রপূত জল পরিবারের সকল সদস্যদের পান করতে দেন।তাতে নাকি সম্বৎসরের জন্য রোগ-শোক ও আপদ- বিপদ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এটাই প্রচলিত বিশ্বাস। 

এদিকে এই মূলবিঝুর দিনে গ্রামের প্রতিটি ঘরের ছেলে -মেয়েরা নতুন নতুন সাজ - পোষাকে।সজ্জিত হয়ে সাত-সকালে পরম সোৎসাহে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে দলবেঁধে বিঝু-পরিক্রমণের উদ্দেশ্যে। ইতোমধ্যে কিশোর -ছেলেরা কাঁধে ঝোলানো ঝুড়িতে ধানের'আধার'(হাঁস-মোরগের খাদ্য) নিয়ে গ্রামের বাড়ি বাড়ি যায়।তারা প্রত্যেক গৃহস্থের উঠোনে গিয়ে গৃহপালিত হাঁস ও মোরগদের উদ্দেশ্যে তা ছড়িয়ে দেয়।এ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা এই যে,বিঝুর দিনে ইতর-প্রাণীদের খাদ্য যোগান দিলে পূর্ণ্য অর্জন করা যায়। সেদিন প্রত্যেক গৃহস্থ গৃহপালিত সকল পশুদের বন্ধনমুক্ত করে উদোম ছেড়ে দেওয়া হয়।

এই মূল বিঝুর দিনটি যুবক-যুবতীদের পক্ষে পরম আনন্দময় দিন। সেদিন তারা বর্ণাঢ্য পোষাকে সজ্জিত হয়ে দলবেঁধে বাদ্য-বাজনা সহযোগে বিঝুনৃত্য নেচে নেচে গ্রাম-গ্রামান্তর পরিক্রমা করে।এই বিঝু পরিক্রমার সময় যুবক-যুবতীরা গ্রামের অথর্ব বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের স্নান আশীর্বাদ প্রার্থনা করে।অপরদিকে বয়স্ক তথা প্রৌঢ় ব্যাক্তিরাও বুদ্ধ -সংজীর্তনের দল নিয়ে বাদ্য-বাজনাসহ বুদ্ধের জীবনীমূলক কীর্তনের গান করে গ্রাম থেকে গ্রামে পরিভ্রমন করে।এই সংকীর্তন দলের সঙ্গে থাকে বাঁশ -বেত ও রঙিন কাগজ দিয়ে তৈরি এক'কল্পতরু'বৃক্ষ।তারা গৃহস্থদের প্রতিটি ঘরের উঠোনে গিয়ে চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে বুদ্ধসংকীর্তনের গান করে।তখন গৃহস্থদের পক্ষ থেকে পরম ভক্তিভরে কিছু পরিমাণ তুলো বা কার্পাস ও চাল বুদ্ধের উদ্দেশ্যে নৈবেদ্য স্বরূপ অর্পন করা হয় এবং সুসজ্জিত কল্পবৃক্ষের ডালে সুতোয় গেঁথে টাঙিয়ে দেওয়া হয় টাকার নোট।উল্লেখ্য যে,বুদ্ধসংকীর্তন দলের দ্বারা সংগৃহীত মাধুকরী তুল্য এই দ্রব্য ও অর্থাদি দিয়ে পরের দিন গয্যাপোষ্যা বা নববর্ষের দিনে গ্রামের বুদ্ধবিহারে বুদ্ধপূজা সম্পন্ন হয়।

এই মূলবিঝুর দিনে ধর্মপ্রাণ বয়স্ক ব্যক্তিরা বুদ্ধবিহারে একত্রিত হয়ে ধর্মচর্চা করেন।তাঁদের কেউ কেউ বৌদ্ধ ত্রিপিটক শাস্ত্র, আগরতারা(চাকমাদের প্রাচীন বৌদ্ধ তন্ত্রযানের পুঁথি), রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি পাঠ করেন।প্রচলিত ধারণা, এই পূর্ণ্যময় দিনে ধর্মগ্রন্থ পাঠ করলে অথবা কাউকে পাঠ করে শোনালে পূর্ণ্যার্জন করা যায়। সেদিন পূর্ণ্যালোভাতুর বৃদ্ধ ও বৃদ্ধাদের কেউ কেউ উপবাস পালন করেন অথবা কেউ বুদ্ধবিহারে গিয়ে ভগবান বুদ্ধের নির্দেশিত 'অষ্টশীল'ধারন করেন।
এই দিনে মধ্যবয়সী ব্যক্তিদের অনেকেই অপর্যাপ্তভাবে মদ্যপান করে হৈ-হুল্লোড় করতে দেখা যায়। যুবকদেরও সেদিন নিজেদের মহলে মদ্যপান করলে তেমন দোষণীয় নয়।অন্যদিকে সেদিন কিশোর-কিশোরী বা যুবক-যুবতীরা কোন গৃহস্থের প্রশস্ত উঠোনে সমবেত হয়ে বিভিন্ন প্রকার গ্রামীণ খেলাধুলায় মত্ত থাকে।সেখানে নারী-পুরুষের প্রচণ্ড ভিড় জমে ওঠে। 

মূলবিঝুর এই পূর্ণ্যম দিনে কোন কোন  গ্রামে লক্ষ্য করা যায় -গ্রামের মোড়ল কিংবা কোন সম্পন্ন গৃহস্থের দ্বারা আয়োজিত হয়ে থাকে প্রজন্মবাহিত লৌকিক পালাগান অর্থাৎ 'গেৎখুলি গীত'এর আসর।তা হতে পারে রাধামন-নরপুদি পালা,লরবুঅ-মিদুঙী পালা,নরধন-,নরপুদি পালা,সাধেৎগিরু পালা,বুদ্ধলামা ইত্যাদির যে কোন একটি পালা।তবে,অবশ্যই পরেরদিন অর্থাৎ গোচ্যাপোচ্যার দিনে লোকখি মাতার পূজা করতে হবে। এই হচ্ছে প্রচলিত বিধি। রাতভর এই লৌকিক পালাগান চলতে পারে। পালাগানের গায়ক গেৎখুলি এই গান চলাকালীন সময়ে উৎসাহী শ্রোতাদের ভূত-ভবিষ্যতের কথা বলে দেন।এই ভূত-ভবিষ্যৎ বলে দেওয়ার পদ্ধতিকে চাকমাভাষায় বলা হয় 'নিধিং'।
এইভাবে বিভিন্ন প্রকার পারিবারিক কৃত্য ও সামাজিক অনুষ্ঠানের দ্বারা বিপুল আনন্দোৎসব উপভোগের মধ্য দিয়ে বৎসরের পবিত্রতম দিন মীলবিঝু প্রতিপালনের পরের দিন উদযাপিত হয় গয্যাপোষ্যা বিঝু। নববর্ষের এই দিনে গৃহস্থদের অনেকের ঘরে ঘরে আয়োজিত হয় "বুরপারা'অনুষ্ঠান (স্বস্তিমূলক গঙ্গাপূজা) ,চুমুলৎপূজা(গৃহ-দেবতার পূজা)অথবা লোকখিপূজা(লক্ষ্মী মাডার পূজা)ইত্যাদি পারিবারিক পূজানুষ্ঠান উপলক্ষে ঐসব গৃহস্থের বাড়িতে ভূরিভোজনের ব্যবস্থা করা হয়। এ ছাড়া সেদিন গ্রামের বুদ্ধবিহারে আয়োজিত হয় সম্মিলিত বুদ্ধপূজা।এই পূজায় গ্রামের প্রায় সকল পরিবার থেকে নিবেদিত হয় 'সিয়োং'(অর্থাৎ আহার)।এই অনুষ্ঠানে  সমবেত ভক্তমণ্ডলী বিধিসম্মতভাবে গ্রহণ করেন ভগবান বুূদ্ধের 'পঞ্চশীল' বা পঞ্চশিক্ষাপদ। সন্ধ্যেবেলায় সকল ধর্মপ্রাণ গ্রামবাসীদের উপস্থিতিতে গ্রামের কোন কোন বুদ্ধবিহারে সাড়ম্বরে ও ভক্তিভরে ভগবান বুদ্ধের উদ্দেশ্যে " হাজার বাতি'বা সহস্রপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন করা হয়।এভাবে পরম আনন্দে-হরষে-ভক্তিবরষে উদযাপিত হয় বৎসরের মহামঙ্গলময় ও পবিত্রতম বিঝুর তিনটি দিন -ফুলবিঝু-মহাবিঝু-গোয্যাপোষ্যা বিঝু।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ