কবি নূরুন্নাহার শিরীন মুখোমুখি কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর

কবি নূরুন্নাহার শিরীন
মুখোমুখি 
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর 

পরিচিতি
 বাংলা কবিতার আঙিনায় নুরুন্নাহার শিরীন এর আবির্ভাব '৭০ দশকের শেষার্ধে। 
পিত্রালয় কুমিল্লা শহরের দারোগাবাড়ি তে। 
শ্বশুরালয় বন্দরনগরী চট্টগ্রামের  পটিয়া তে। 
বর্তমানে ঢাকাবাসী। 

 " এখন মানুষ কতটা মানুষ আর
 কতটা কুকুর জানিনা তো!  
 শুধু ছিন্নভিন্ন লোনায় শেকলে
 শ্যাওলায় রেখেছি পা ...
 অবিরাম টের পাচ্ছি পিছলে
 যাওয়ার অনুভূতি ... " 

দশকের এমনই অনিশ্চয়তা-অস্থিরতার চিত্রকল্পের উপস্থাপনার মধ্যে প্রথম কাব্যগ্রন্থ " শ্যাওলায় রেখেছি পা "  প্রকাশিত হবার পর ক্রমান্নয়ে নিজেকে সংহত করেছেন সৃষ্টির গভীর মৌন চেতনায়। মিতভাষী ঋজুবাক নুরুন্নাহার শিরীন এর কবিতায় বহুমাত্রিক উপমার চিত্রকল্পময় বোধ তৈরী করেছে তার একান্ত নিজস্ব পাঠ শৈলী যা পাঠকের মন ছুঁয়ে দেয়। 

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ১৩টি। 
প্রকাশিত গদ্যের বই ২ টি। 
প্রকাশিত ছড়ার বই ২ টি। 
সম্পাদনা করেছেন ৪ টি গদ্য-পদ্য বইয়ের। 

এ যাবত সম্মাননা পেয়েছেন কুমিল্লা আবৃত্তি সংসদ, চট্টগ্রাম বোধন আবৃত্তি পরিষদ, আম্বেদকর জন্মজয়ন্তী উৎসব ত্রিপুরা, 'বঙ্গাড্ডা' পশ্চিমবঙ্গ ভারত থেকে। 
পুরস্কার : ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ শিক্ষা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আয়োজিত দেশব্যাপী 'উদীয়মান সাহিত্য প্রতিযোগীতা'-য় জাতীয় পর্যায়ে শীর্ষ পুরস্কার।


প্রশ্ন :১
শুরু কখন কিরকম?

উত্তর :১
তখন স্কুলের বাংলা পাঠ্য বইয়ে বড়বড় কবিদের কবিতাগুলো পড়ে বিষম প্রাণিত হয়ে হুবহু তাঁদের অনুকরণে নিজের একটা দাঁড় করানোর চেষ্টা থেকেই আজকের আমি। 

প্রশ্ন :২
ছোটবেলার স্মৃতি?

উত্তর :২
তো খেরোখাতায় লুকিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা চালাতাম। একদিন ধরা পড়ে গেলাম। পড়ার টেবিলে ঝুঁকে লিখছিলাম কবিতা ..  হঠাৎ বড়চাচার ( প্রয়াত কবি বেলাল চৌধুরী) কণ্ঠ - ' আরে শিরীন তুমি কী কবিতা লিখছো ..  দেখি ..  
খেরোখাতাটি তাঁর হাতে নিয়ে পাঠ শুরু করলেন - 

 " আগাছার ঝোপে ছোট্ট নীলফুল!
সে ফুটেছে অযত্নে কী করে ..  কী করে ভেবে পাইনে কুল!
আমাদের বাগানের ঝোপে জন্মেছে সে কারুরই কৃতিত্ব নেই তাতে ..  
ভালোবেসে শুধোই তারে - 
কী গো তুমি তো ফুটেছো বেশ
আমার বাগানে - 
ভুলেও কোনওদিন জল দিইনি তো তোমার শিকড়ে - 
তথাপি ফুটেছো আজ!
বলো, বলো তুমি কী আমার!" 

পাঠশেষে বড়চাচা হেসে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন - " আমাদের মা শিরীন খুব বড় কবি হবে একদিন"।
আমি তো সেদিন কোনও জবাব না দিয়েই অপ্রস্তুত হেসেছি লজ্জিত।

প্রশ্ন :৩
কবিতাই তো লেখেন?

উত্তর :৩
প্রধানতঃ কবিতা। অল্পস্বল্প ছড়াও লিখেছি। আর গদ্য লিখেছি বিভিন্ন বিষয়ে।

প্রশ্ন :৪
আর কিছু লেখেন?

উত্তর :৪
না আর তেমন কিছু লিখিনি। সম্পাদনার কাজ করেছি কিছু।

প্রশ্ন :৫
কী লেখেন?কেন লেখেন?

উত্তর :৫
সেই স্কুলবেলা থেকে কবিতা কে ভালোবেসে লেখার চেষ্টা। 
আজও চেষ্টা ছাড়তে পারিনি স্বভাবদোষেই মনে হয়। 
কেন লিখি-র জবাবটাও ওই স্বভাবদোষেই মনে হয়। আর বয়স বাড়ার সাথে স্বদেশটাকে ভালোবাসাও কবিতা লেখার বড় একটা কারণ মনে হয়। উপরন্তু তাৎক্ষণিক লেখার তাড়না থেকেও কবিতা লেখা হয়ে যায়। সাহিত্যের সবচে' সহজ বিষয়টাও কবিতা মনে হয়। 

প্রশ্ন :৬
আগামী পরিকল্পনা আছে?

উত্তর :৬
৬। সুদিন ফিরলে কোলকাতায় ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা, একটা ছড়ার বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরীর পরিকল্পনা, একটা গদ্য বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরীর পরিকল্পনা ....  
আপাততঃ কেবল পরিকল্পনা, বেঁচে থাকলে হয়তো হবে, হয়তো বা পরিকল্পনা থেকে পরী যাবে উড়ে আর কল্পনা পড়ে রবে কল্পনার ভুবনে। 

প্রশ্ন :৭
আগরতলা আসা হয়েছিল? বিশেষ স্মৃতি আগরতলা বইমেলা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের?

উত্তর :৭
জী আগরতলা ২ বার গেছি।
তৎকালীন শিক্ষা সংস্কৃতি মন্ত্রী ও কবি প্রয়াত অনিল সরকার এর আমন্ত্রণে আম্বেদকর জন্মশতবার্ষিকী তে অতিথি হবার সৌভাগ্য ঘটেছিলো, খুব ভালো লেগেছিলো তাঁর হাতে সংবর্ধিত হওয়া ও তাঁর আতিথেয়তা, এক জীবনে ভোলার নয় সেই কয়েকদিনের স্মৃতি। 

আর অনিলদা'র স্ত্রী সন্ধান দিতে পেরেছিলেন আমার হারিয়ে যাওয়া স্কুলবেলার সীমা ভৌমিক এর। এটা জীবনের বড় একটা পাওয়া। 

সেইসময় আগরতলার বইমেলা ঘুরে দেখেছি, বইপত্র কিনেছিলাম কিছু।

প্রশ্ন :৮
ত্রিপুরায় এসছেন?

উত্তর :৮
জী, ২ বার আসার সৌভাগ্য হয়েছিলো। খুব ভালো লেগেছে আমার ত্রিপুরা আর তার দর্শনীয় মন্দির ও বাজার আর ত্রিপুরার মানুষ।

প্রশ্ন :৯
মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু কি বাঙালি হিন্দুরাই ক্ষতিগ্রস্ত ?

উত্তর :৯
না, তা কেন হবে? গোটা বাংলাদেশ তখনকার পূর্ববাংলার মানুষ, জনপদ ভস্মিভূত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো। 
এটাও সত্য হিন্দুরা জান্তা সৈন্যদের বিশেষ টার্গেট হয়েছিলো। 

প্রশ্ন :১০
কাঁটাতারের বেড়া কবিদের ভাবনায় সীমান্ত এঁকে দেয়?

উত্তর :১০
কাঁটাতার কবি আর কবিতার ভাবনায় বাঁধা নয় মনে করি, তো সীমান্তও নয়। কারণ ভাবনা অবারিত, নিষেধ না মানা। 
কিন্তু যখন প্রত্যক্ষ যাতায়াত এর বিষয়টি আসে তখন তা মানে কাঁটাতারঅলা সীমান্ত বাঁধা বটে। কত নিয়মনীতির পালা মানতেই হয় দুই দেশের নাগরিকদেরকে।

প্রশ্ন :১১
পাখিদের নেই কোন গানের স্কুল।কবিদেরও তো তাই?

উত্তর :১১
জী একদম সত্য।
আদতে সাধনা বিষয়টি তত ভালো বুঝতে পারি না। 
তো, কবিতা যারা লেখে, তাদের তো ধ্যানজ্ঞান কবিতা হতেই পারে। 
 কিন্তু আমার বিশ্বাস - 
কবিতা যখন আসে আপনা হতেই আসে ..  
তখন সাধ্য-সাধনার দরকার হয়ই না আর। 

প্রশ্ন :১২
সাধনায় উত্তীর্ণ হতে কি করতে হয় তরুণদের জন্য বলবেন?

উত্তর :১২
আদতে সাধনা বিষয়টি তত ভালো বুঝতে পারি না। 
তো, কবিতা যারা লেখে, তাদের তো ধ্যানজ্ঞান কবিতা হতেই পারে। 
 কিন্তু আমার বিশ্বাস - 
কবিতা যখন আসে আপনা হতেই আসে ..  
তখন সাধ্য-সাধনার দরকার হয়ই না আর। 

প্রশ্ন :১৩
কবিতার জন্য কোন ত্যাগ বা ক্ষতি?

উত্তর :১৩
না, তেমন ত্যাগ বা ক্ষতির মুখোমুখি হইনি আজও।

প্রশ্ন :১৪
আপনার কবিতায় নারী স্বাধীনতা মানবীবিদ্যা বিষয়গুলো পাঠকদের জন্য এসছে?

উত্তর :১৪
মনে হয় এসেছে অনেকবার। 
আজকেও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি প্রকাশিতব্য "শব্দহীন শব্দগুলো" কবিতার বই থেকে, বইটির প্রকাশক - 
শিবু ওঝা সপ্তর্ষি প্রকাশন।

প্রশ্ন :১৫
আপনার কবিতায় বিশেষ কোন বাঁক?

উত্তর :১৫
নিজের কবিতা নিয়ে খুব একটা ভাবিত নই। 
তবু মনে হয় অনেক বছর ধরে আমার একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়েছে প্রায় বলা যায় সিরিজধর্মী কবিতা লেখার চেষ্টা ..  একটাই শিরোনামে পুরো একটা কবিতা বই হোক ..  এরকম একটা চেষ্টা .. ।
আদতে আমরা যারা লিখি আমি মনে করি সকলেই ওই  একটা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি যার-যার মতো করে একটাই কবিতা লেখার কাজ।

প্রশ্ন :১৬
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিষয়ে নারীদের কবিতাচর্চা কেমন?

উত্তর :১৬
মনে হয় সংখ্যায় খুব কম সংখ্যক নারী কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয় কে তুলে ধরেছেন। গদ্যে তবুও উল্লেখযোগ্য নারী-লেখক আছেন।

প্রশ্ন :১৭
আপনার ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রতিবাদ আছে?

উত্তর :১৭
নিশ্চয় আছে। 
আমাদের যাপিত জীবন আর দেশে ঘটমান অনাকাঙ্ক্ষিত অন্যায় যদি লেখক-কবিদের মনে ক্ষোভ না জাগায় তবে তো তাদের না লেখাই ভালো মনে করি।

প্রশ্ন :১৮
জীবন সায়াহ্নে এসে কি মনে হয় কবি জন্ম সার্থক?

উত্তর :১৮
তো জীবনের বেশিটাই কাটিয়ে এলাম ..  জীবনটা এত ছোট কেন মনে করে মনখারাপ যেমন হয় তেমনই স্বদেশের মাটি-নদী-আলো-হাওয়ার সাথে উঠে আসা তুমুল সবুজ গন্ধে মনকেমন করে ওঠে যখন তখন মনেমনে গাই - 
"সার্থক জনম মা গো জন্মেছি এই দেশে"।

প্রশ্ন :১৯
কিছু রেখে যেতে চান?

উত্তর :১৯
কী-ই বা রাখার আছে ..  
জীবন ফুরালে চলে যেতে হবে তো সকল ফেলে ..  সংসারধর্ম ..  কবিতা ও ছবি আর গান সকলই রেখে .. সকলই ফেলে একদম একা দোসরবিহীন।
প্রশ্ন :২০
মুক্তিযুদ্ধে আপনার পরিবারের জড়িয়ে থাকার ইতিহাস আছে নিশ্চয়ই?

উত্তর :২০
জী আছে নয়মাসের কতশত স্মৃতি ....  তা নিয়ে লিখেছি আমার "জনমনোকালকাহিনী" শিরোনামের কবিতার বই তে - 

' তবুও ভয়ঙ্কর কালরাত হামলে পড়লো অতর্কিতে।
ইয়াহিয়ার নির্দশে পশ্চিমা সশস্ত্র পিশাচরা ঝাঁপিয়ে পড়লো ...  
যুদ্ধট্যাংক কামানের গোলা নিয়ে ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষের 'পরে ...  
পঁচিশ মার্চ উনিশশো একাত্তুরে। 
তবু মানুষ বাঁচুক ভেবে বঙ্গবন্ধু
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র লিখে
আত্মসমর্পণ করলেন স্বেচ্ছায়  শত্রুর কাছে। 
তবু মানুষ বাঁচেনি। 
সে রাতে ট্যাংকে পিষে কামানের গোলার আগুনে পুড়িয়ে ঘুমন্ত লক্ষ মানুষকে
পৈশাচিক উল্লাসে মেরেছে হায়েনারা ...  রাজপথে ঘরে অলিতে-গলিতে হাটবাজারের মধ্যে এমন কী মসজিদেও রেহাই পায়নি বাংলার মানুষ। 
মানুষকে সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে মেরেছে পশুর মতো ...  এই হত্যাযজ্ঞ নাৎসি বিভৎসতার চে' ভয়াবহ। 
শিশুনারীবুড়ো নির্বিশেষে হত্যা ধর্ষকামের হিংস্রতায়
পৃথিবী স্তম্ভিত। 
এ কাহিনী লিখে ফুরোবার নয় .. বাংলা বাঙালি নিধনের
সে এক বর্বরযজ্ঞ .. সে এক তাণ্ডবপিষ্ট নগ্ন মাতৃভূমি ..  
তাণ্ডবের যে ছবিতে 
আজও হৃদয় দাউদাউ তার কথা বলি : 
নেহাত গাঁয়ের লোক বাংলাদেশের লোক বাংলা ব্যতীত অন্য ভাষা জানে না সে। এ কী তার অপরাধ? 
এ কী পাপ? মানবধর্ম বলে - 
এ অপরাধ না। পাপও না। 
অথচ ধর্মজালে ঝুলন্ত ভাতৃত্ব নামের কলঙ্ক পাকিজান্তা বেয়নেটে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে মারে
লোকটারে ..  যেহেতু সে
বাংলায় কথা বলে। 
এইসব দুঃখচিত্র রক্তাক্ত স্মৃতির অশ্রুকাব্য লিখলে হয়তো মহাকাব্যের অধিক হবে।'


প্রশ্ন :২১
শেষ প্রশ্ন, আপনাদের পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি। তরুণদের জন্য কি বলবেন?

উত্তর :২১
আজকের তরুণদের মধ্যে এপারওপার দুই বাংলার অনেকেই উল্লেখযোগ্য ভালো লিখছে .. তবুও তার মাঝে সংগঠনভুক্ত সঙ্ঘপ্রিয় দলবাজিও কিছু কম নেই বলে অকবিতা প্রচুর হচ্ছে ..  
তাদের জন্য বলার এই যে - 
নিষ্ঠা থাকতে হবে ..  ভালোবাসা থাকতে হবে ..  তাহলেই কবিতা আপনা হতে আসবে ..  হৃদয়জাত কবিতা ..  পাঠকপ্রিয় না হয়ে যায় না সেই তরতাজা একনিষ্ঠ কবিতা।

০৫:০৯:২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. কবি নুরুন্নাহার শিরীন খুব নিভৃতে বাংলা কবিতায় তাঁর নিজের প্রকাশভঙ্গি তৈরি করে ফেলেছেন। শুভকামনা ও ভালবাসা।

    উত্তরমুছুন