কবি ও সম্পাদক সংগীতা দেওয়ানজি
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
ডায়েরী লেখার অভ্যাস বহু আগে থেকে। সেগুলো ই অনেক টা না-কবিতা হয়ে গেছে সংগীতা দেওয়ানজি'র।
প্রকাশিত বই -'বৃষ্টি ভেজা রোদ,' 'জীবন খুঁজে নাও',একশ কবির একশ কবিতা'সম্পাদিত।
বার্ষিককবিতা র পত্রিকা 'কবিতার খেয়া ' নিয়মিত ।
১)প্রতিটি শুরুরও শুরু থাকে সেই শুরুর দিনগুলো শুনবো?
-->শুরুরও শুরু!তার কি শেষ আছে, সেই দিন তো নিরন্তর আসছে।সেই নিয়ে আর কি বলবো।
২)পারিবারিক কোন চাপিয়ে দেওয়া ছিলো না নিজস্ব নির্বাচন এই শিল্পকে আপন করে নেওয়ার সময় ছিলো?
--> সাহিত্য,সংস্কৃতি ও শিল্প এই তিনটি জিনিষ একটি বন্ধনীতে আবদ্ধ। সংস্কৃতি হচ্ছে যেকোনো সময়ের ধারক ও বাহক। আর সাহিত্য মানেই স্বতন্ত্র সত্ত্বা নিয়ে দেশ,কাল,সময়কে তুলে ধরে নিয়ে উঠে আসা। চাপ বা চাপিয়ে দেওয়া কথাটা আসলে সাহিত্যকে ব্যাখ্যা করে না। ছোট বেলা থেকেই পারিবারিক একটা আবহের মধ্যে দিয়ে বড় হওয়া,আশেপাশের বিষয়বস্তুর নিরিখেই ডায়েরির সাথে সখ্যতা আর সেই থেকেই সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতি একটা আলাদা মায়া। আমি কি লিখি কেন লিখি বা আমার লেখার পরিচয় কি হবে তা আমার জানা নেই,এক একজন এক এক রকম ভাবে পরিচিতি দেয়। সেটাই তো আমার প্রাপ্তি।
৩)আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন?তখনকার বিশেষ স্মৃতি?
--->আমি মা হওয়ার এক মাস পর থেকেই আমার কলেজ জীবন শুরু। তারপর আমি পার্ট ১ পরিক্ষার পর ত্রিপুরা বোর্ডে একজন চুক্তিবদ্ধ কর্মী হিসাবে ঢুকে যাই। কাজেই যাপিত জীবন ও জীবিকার লড়াইয়ে কলেজ জীবনের উদ্যমতা কিংবা কলেজ জীবন নিয়ে সদ্য কিশোরী মেয়ের যে স্বপ্ন থাকে তা আমি অনুভব করতে পারি নি।কারন তখন আমার জীবন একটা সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়।সদ্যোজাত সন্তান,আমার সংসার, আমার জীবিকা প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমার কিছু দেওয়ার ছিলো।এবং আমার দায়িত্ব,কর্তব্য আমাকে একটা অন্য রকম জীবনবোধে উজ্জ্বিবিত করে রেখেছিলো
৪) এ অঞ্চলের সাহিত্যে ভিন্ন সুর আমরা অনুভব করছি।বৃহৎ বাংলার বাংলা সাহিত্যের সাথে সুর মিললেও তার আছে নিজস্ব স্বর।আপনি কেমন দেখেন?
--->প্রতিটি অঞ্চলেরই ভিন্ন ভিন্ন শিল্প সংস্কৃতি আছে, তাদের খাদ্যাভ্যাস, জীবন জীবিকা,প্রাকৃতিক পরিবেশ জীবন চর্চায় সেই সুর বাজে, কাজেই বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা দুটোই তো থাকবে।আর সমকাল সাহিত্যে খুব অনায়াসেই চলে আসে।সাহিত্য নির্মানে সেই সময়, পরিবেশ এবং সেই সময়কার শিল্প,সংস্কৃতি সবটাই তো উঠে আসবে, সেটাই তো স্বাভাবিক।
৫) একটি গ্রন্থ নির্মানে বইয়ের বিষয়ের সাথে প্রচ্ছদ কতটুকু একে অন্যের পরিপূরক?
---> খুব ভালো একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। একটি বইয়ের ভেতরের যে বাক্য ও শব্দ গুলো যে সুর তৈরি করে যার থেকে সৃষ্টি হয় একটি কবিতা,একটি প্রবন্ধ,একটি নিবন্ধ, তার সাথে মিল রেখেই একটি প্রচ্ছদ নির্মান অত্যাবশ্যক। যা বাইরে ভেতরে উভয় দিক কে বেঁধে রাখবে।
৬)কোন পথে আমাদের সময়।কোন পরামর্শ কিংবা আমাদেরকে পথ বাৎলে দেবেন?
---> সময় কারোর অপেক্ষা করে না। সে তার নিজস্ব গতিতে বয়ে চলে। তবে সময় কে আমরা শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতিতে ধরে রাখতে পারি। সংকট সব সময়ই ছিলো, শুধু তা থেকে কিভাবে উত্তরনের পথ খুঁজে নেবেন তা একেবারেই নিজস্ব হতে পারে কিংবা আলোচনার মাধ্যমেও হতে পারে। মূল কথা টা হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি এবং সময়ের সাথে মোকাবেলা করা।
৭)প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে কোন আক্ষেপ আছে?
---> প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি! আক্ষেপ!
জীবনটা একান্তই আমার,জীবনের বোধগুলোও একান্ত আমার। সামাজিক প্রাণী হিসাবে আমি মনে করি আমার একটা মানবিক মুখ থাকা দরকার।সেই মানবিক মুখ কে ভেবে দেখলে নিজের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে আক্ষেপ কোনোদিনই থাকার কথা নয়। আগে আমার কাছে যে প্রশ্ন টা আসে, তা হচ্ছে আমি কি দিতে পেরেছি!কি দিয়েছি! আর কি দিতে পারবো!নিজের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়ে আক্ষেপ করার মতো সময় আমার আসে নি।
৮)কি রেখে যেতে চান?যা ১০০ বছর পর চর্চা হবে?
--->হাজার বছর পরও তো চর্চা হবে অমর্ত্য সেন,রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ এমন সহশ্র মহীরুহকে নিয়ে,এঁনারা যুগ যুগান্ত ধরে চর্চায় আছেন,আমি কে!
৯) নিরন্তর সাধনারও আপনার দীর্ঘ জার্নি।এত প্রাণ কি করে পান?
--->আমার আশেপাশে আপনারা যারা আছেন, আপনাদের কে দেখে আমি প্রাণিত হই।আর কেবলই মনে হয় আমি আরও কেন প্রাণের সন্ধান পাই না।ভাবি আমার মধ্যে আরো প্রাণবন্ততার সঞ্চার হোক। জীবনটাই তো একটা সাধনা। জার্নি দীর্ঘ কিংবা হ্রস্ব দুইই হতে পারে কিন্তু তাতে অফুরন্ত প্রাণের স্পন্দন থাকুকনা। আর সেটা সম্ভব সবাই সবার পাশে থাকলে।
১০) লিটল ম্যাগাজিন কবিতার খেয়ার আপনি সম্পাদক। এখন আর বের হয় না?পরিকল্পনা আছে?
---> *কবিতার খেয়া* ২০১৯ পর্যন্ত নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। বিগত বছরে বিপর্যস্ততার কারনে প্রকাশিত হয় নি। কিন্তু আগামীতে আবার নিয়মিত হবে।
১১) আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে রবীন্দ্রনাথ কতটুকু প্রাসঙ্গিক?
---> কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে বরাবরই একটি দুরহ পাঠ।তবে রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে সকালের নরম আলো, গোধুলীর ছায়া ঘেরা মেঘমালা,এছাড়াও আমরা যখন এই সময়ে দাঁড়িয়ে ইট কাঠ পাথরে ঘেরা জায়গায় আবদ্ধ, যেখানে প্রতিটি ঋতুকে অনুভব করার মতো সুযোগ থাকে না, তখন রবীন্দ্রনাথ পাঠে আমরা প্রতিটি ঋতুকে অনুভব করতে পারি এবং মানষ চক্ষে অবলোকন করতে পারি।কবি গুরু আমার গোপন গভীরে নিয়তই এস্রাজের ছড় টেনে সুর তুলে যান বিভিন্ন রাগে, যা থেকে আমি সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে উঠতে প্রেরণা পাই।
১২) দেশভাগের যন্ত্রণা একজন কবিকে পীড়িত করে।আপনার পরিবার কি এমন কোন পরিস্থিতির শিকার?
---> আমার বাবার জন্মই হয়েছে উদয় পুরের জগন্নাথ দিঘীর পারে যেটা দেওয়ানজী বাড়ী বলে খ্যাত ছিলো। তবে ঠাকুমার মুখে শুনেছি বাংলাদেশের ফরিদপুরে আমাদের আসল বাড়ি ছিল।কাজেই এই পরিস্থিতি সম্বন্ধে আমার সম্যক ধারনা না থাকলেও দেশ ভাগের যন্ত্রনা বিদ্ধ মুখ এবং ইতিহাস আমাকে যন্ত্রনা কাতর করে তোলে বৈকি।
১৩) কী লিখি কেন লিখি?
---> কী লিখি?
কি লিখি বলার সময় এখনো হয় নি। আর যাই লিখি সেটা বলবেন আপনারা জনমানুষ,আমি কি লিখি।আমার সত্ত্বা যখন আমার বোধের জায়গা টা কে একটু একটু করে চাপ দেয় সেই চাপ আমাকে শব্দ শ্রমিক হতে তাড়িত করে।আমার সত্বাকে যখন আমার বোধ পরিচালিত করে তখন যা লিখতে ইচ্ছে হয় তা নিয়ে চেষ্টা করি।
১৪) আপনার কবিতা সংকলন গুলোর নাম নির্মানের গোপন জিয়নকাটি কিরকম?
---> নাহ।নাম নির্মানে কোনো জিয়ন কাঠি মরণ কাঠি নেই। এগুলো হয়ে গেছে।
তবে জীবনের পরতে পরতে জমে যাওয়া পলিমাটি গুলো আমাকে কলম ধরিয়েছে। শব্দের,বাক্যের সংমিশ্রণে এ আমার নিজের মতো করে বাঁচতে চাওয়া।
১৫) শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছায় একটি শিল্প রূপ পায়? নাকি আরো কোনো অতিভৌতিক কোন বিষয় প্রতিটি ছবির ঘরানা তৈরী করে?
---> আপনি এখানে শিল্প বলেছেন। আমি সেই থেকে বলছি, আপনি ইজেলে বা ক্যনভাসে আপনি ভাববেন আপনার প্রিয়তমার মুখটা।আঁকতে গিয়ে দেখলেন ক্রমশ মুখের আদল টা পালটে যাচ্ছে।এই নিয়ে আপনি কি বলবেন?।আমি শিল্প বলতে যা বুঝি, একজন শিল্পীর ইচ্ছা অনিচ্ছা থাকতেই পারে। আর কোনো অতিভৌতিক বিষয়টা সম্পূর্ণ শিল্পীর নিজস্ব ভাবনার উপরও নির্ভর করে বলে আমার মনে হয়।
১৬) আপনার সাথে তেমন আড্ডা আমার নেই। আপনি আড্ডারু সে আমি জানি।আড্ডা কি শিল্প সৃষ্টির উৎস মনে করেন?
---> নিশ্চয়ই। আড্ডা অবশ্যই শিল্প সৃষ্টির উৎস। আড্ডায় বহু কথা উঠে আসে,বহু আলোচনা হয় আর তার নির্যাস কিন্তু আমাদের মধ্যে থেকে যায়। নতুন সৃষ্টিতে আমাদেরকে উৎসাহ যোগায়।তাই আড্ডা জরুরি।
১৭) কবিতা তো একটি স্বতন্ত্রশিল্প ছবিও স্বতন্ত্র। একটি রেখা একটি বিন্দু কিংবা তুলির কতটুকু স্বাধীনতা এই সমাজ এই সংবিধান আমাদেরকে দিয়েছে?যদিও বাকস্বাধীনতা যেখানে এসে থমকে যায় শিল্প কি তেমন কোন আটকে পড়ার সম্ভাবনায় দমে যায়?
---> সমাজ তো আমি আপনি।কাজেই কে কি দিলো বড় কথা নয়। আমি আপনি কে কি সৃষ্টি করছি সেটাই বড় কথা।সমাজ সংবিধান তো আছেই।আমি যদি কোনো সমাজের কোন বিশেষ কিছুর ভাবাবেগে আঘাত করি তখন তো আপনা আপনিই সংবিধান মুখর হয়ে উঠবে। কোনো শিল্প সম্ভাবনা বাক স্বাধীনতার কারনে থমকে যায় না।শিল্প সম্ভাবনা ও বাক স্বাধীনতা এগুলো নিয়ে যখন প্রশ্নে উঠে থমকে গিয়ে ফিরে দেখে আবার এগিয়ে যাই ঠিকই।
১৮)আপনার পারিবারিক পরিবেশ শিল্প ও শিল্পীর।এই সম্মেলন কেমন লাগে?
---> ভীষণ ভালো। সবসময় একটা আবহ তৈরি হয়ে থাকে।
১৯)আপনার নিজস্ব ঘরনায় লৌকিক সংস্কৃতি কতটুকু আনতে পেরেছেন?আপনি কি সচেতনতার এই বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন?
---> আমি কোনো বিষয় কে সচেতন ভাবে লেখার মধ্যে আনিওনি বা এড়িয়েও যায় নি। আমার যখন যা মনে হয় তাই করি। কখনো কবিতা লিখি,কখনো প্রবন্ধ বা কখনো আবার নিবন্ধ লিখি।তাতে প্রেম বিরহ,মানুষের নিত্য দিনকার জীবন জীবিকার যন্ত্রণা সবই থাকে।
২০) জীবন কেউ কেউ নেশা বলেন।কেউ কেউ উৎসব। কেউ কেউ একটি নাটক।আবার কারো কারো নিকট জীবনে কবিতাই জীবন।আপনি কোন নিজস্ব জীবনচেতনায় তাড়িত নিশ্চয়ই। ব্যাখ্যা চাই।
---> আমার কাছে জীবন একটা নাট্যমঞ্চ।স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে রাখার পরেও কোন কোন সময় নিজের মতো করে তার রূপরেখা টেনে দেওয়া যায় না।আমরা চেষ্টা করি, কিন্তু সবসময় জীবনকে কেলকুলেটিভলি চালানো যায় না। আমার কাছে যাপিত জীবন মানেই একটি অনির্দেশ্য উজান বাওয়া।কে তার জীবনকে তার নিজের মতো করে চেয়েছে বা পেয়েছে!, কে মুক্ত কন্ঠে বলতে পেরেছে বা পারে যে আমি আমার জীবনে 'সব পেয়েছির দেশে' আছি।অনেকটা ই নির্ভর করে নিজস্ব চিন্তা চেতনা ও তাড়নার উপর।
২১) তরুণদের সম্পর্কে কিছু বলবেন?
---> হ্যাঁ, খুব ভালো বিষয় বলেছেন।আমাদের এই সময়ের তরুণরা এতো উৎসাহী,তারা সাহিত্যের ক্ষেত্রে নিত্যনতুন কিছু করে দেখাতে চাইছে আর তা করছেও।আমার তো মনে হয় এক ঝাক তরুণ তরুণী যারা আছেন, এই কঠিন সময়ে দাঁড়িয়েও তারা একটু একটু করে আগামীর উজ্জ্বল মুখ হয়ে উঠছে। আমাদের কাজ হলো তাদেরকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করা, উদ্দ্বুত্ব করা,সঠিক পথের দিশা দেখানো।
0 মন্তব্যসমূহ