দুই বাংলার জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার মুখোমুখি কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর

দুই বাংলার জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী 
শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার 
মুখোমুখি 
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর 

পরিচিতি 
আন্তঃবিদ্যাচর্চা মানুষকে বিশেষ অভিজ্ঞান দান করে। তেমনই একজন শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার। আদতে বরাক উপত্যকার সন্তান। বর্তমানে কর্মসূত্রে দক্ষিণবঙ্গবাসী। ভূতপূর্ব গণিতের অধ্যাপক বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন আধিকারিক। রবীন্দ্রনাথের গান হোক কিম্বা পূববাংলার ভাটি অঞ্চলের সুর, গণসংগীত কিম্বা আধুনিক সময়ের স্বরলিপি -  যার মুখের ভাষা, আন্দোলনের হাতিয়ার হয়ে বারবার ঝলসে উঠেছে। গণনাট্য আন্দোলনের কর্মী শুভপ্রসাদের কলমও সব সময়েই সরব। তাতে ধরা দিয়েছে নানা বিষয়। তা সে সঙ্গীত হোক বা সমাজ। ভাষাশহিদের মাটিতে দীক্ষিত, আপসহীন সেই কলম থেকে উঠে আসে ভাষাবিষয়ক নিবন্ধও।দুই  বাংলায় তিনি পরিচিত।পেয়েছেন অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা।তাঁর সাথে কথাবার্তা হলো নানা বিষয়ে সম্প্রতি।তারই নির্যাস এই সাক্ষাৎকার।

প্রশ্ন :১
আপনি গণ সংগীত থেকে রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী। এই যাত্রা পথে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তিগুলো যদি আমাদের জন্য বলেন?

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :১
একজন রাজনৈতিক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে গণসঙ্গীত এবং রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে আমি কোনো চিনের প্রাচীর তুলি না। এটা দুটো পৃথক দূরবর্তী ভূগোলও নয় যে এর মধ্যে কোনো যাত্রা থাকবে। এরা নিকট প্রতিবেশী যাদের মাঝে কোনো বেড়া নেই। ফলে মাঝেমাঝেই কোনো না কোনো রবীন্দ্রসঙ্গীত একটি গণসঙ্গীতের মতই গভীরভাবে রাজনৈতিক বার্তাবহনের ক্ষমতা নিয়ে আমার কাছে ধরা দেয়। শুধু আমি কেন, আরো অনেকের কাছেই দেয় নিশ্চিতভাবে। এর চেয়ে বলা কিছু নেই এ বিষয়ে।

প্রশ্ন:২
দেশভাগের যন্ত্রণা দেশভাগের ইতিহাস ও দেশভাগের রাজনীতির চর্চা বিষয়ে আপনার অনুভূতি বলবেন?

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :২
দেশভাগের সময়পর্বের হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ সহ সমস্ত সহিংসতার ঘটনাবলীকে গত ৭৫ বছর ধরে একতরফা ঘটনা হিসেবে দেখানো হয়ে এসেছে। দেশভাগের ইতিহাস ও দেশভাগের রাজনীতির চর্চাকে উপেক্ষা করেছেন সকলে। ভেবেছিলেন চোখ বুঁজে থাকলেই ঘটনাবলী অদৃশ্য হয়ে যাবে। এই একতরফা ইতিহাস নির্মাণের উপর ভিত্তি করে গত শতকের আটের দশক থেকে হিন্দুত্ববাদীদের রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্মিত হয়েছে। গত ৪০ বছর ধরে তারও কোনো নিবিড় মোকাবেলার চেষ্টা করে নি কোনো অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল। সব চর্চা সীমাবদ্ধ থেকেছে ইতিহাসবিদদের বইয়ের পাতায়। উল্টোদিকে বিকৃত ইতিহাস পেয়েছে রাজনৈতিক সক্রিয়তার আনুকূল্য। অন্যদের কথা ছেড়ে দিলাম, প্রতিটি বামদলেরও সিংহভাগ সদস্য দেশভাগের একতরফা বৃত্তান্তের কারাগারেই বন্দী। এই দায়িত্বজ্ঞানহীন উপেক্ষার মাশুল দিতে হয়েছে বারবার। 

একতরফা ইতিহাস রাষ্ট্রীয় শীলমোহর পেল এখন নরেন্দ্র মোদীর ঘোষণায়। তিনি বলেছেন এখন থেকে ১৪ আগস্ট পালিত হবে দেশভাগের বিভীষিকা স্মরণের দিন হিসেবে। তার মানে এখন দেশভাগের ইতিহাসে ঠাঁই পাবে শুধু পশ্চিম পাঞ্জাব সহ পশ্চিম প্রান্তের হিংসাত্মক ঘটনাবলী। ঠাঁই পাবে নোয়াখালী আর ভৈরব। বাদ যাবে পূর্ব পাঞ্জাব, দিল্লি, গড় মুক্তেশ্বর, বিহার শরিফ, বর্ধমান, বসিরহাট, হাওড়া ও নিম্ন আসামের ঘটনাবলী। দেশভাগের খণ্ডিত এবং একতরফা ভাষ্যকে তুলে ধরে সারাদেশে এই মুহূর্তে সীমাহীন লাঞ্ছনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। পদে পদে তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে এ দেশে থাকতে হলে তোমাকে সবধরনের বৈষম্যের আচরণ মুখ বুঁজে মেনে নিতে হবে। এক অর্থে তাঁদের সহ্যশক্তির পরীক্ষা নিতে চাইছে হিন্দুত্ববাদীরা। ওরা চাইছে অপমান সইতে সইতে এ দেশের মুসলিমরা যেন মনে প্রাণে দেশদ্রোহী হয়ে ওঠে। তখন এই অজুহাতে আইন কানুন ভোটাধিকার সমস্ত কিছুতে যেন তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে করা যাবে হিটলারের জার্মানিতে যেমনটা করা হয়েছিল ইহুদিদের জন্যে। নইলে বলুন, একজন মুসলিম মানুষ তাঁর ধোসার দোকানের নাম হিন্দু দেবতার নামে কেন রেখেছেন এটা কখনো অপরাধ হতে পারে? কেন হঠাৎ করে আসামে মন্দিরের পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে গো-মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হবে? হঠাৎ করে কর্ণাটকে যে কোনো মন্দিরের সামনের রাস্তায় কোনো অ-হিন্দু মানুষকে গাড়ি পার্কিং করতে দেওয়া হবে না বলে সরকারি বিধি প্রকাশিত হবে? কোন ধর্মগ্রন্থে এসব বিধান দিয়েছে? এগুলো তো সবই ইচ্ছে করে মুসলিমদের অপমান করা। এখন প্রত্যুত্তরে পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সরকার যদি নিয়ম করে যে কোনো মসজিদের পাঁচ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে ঘন্টাধ্বনি, উলুধ্বনি ও মূর্তিপূজা করা যাবে না, তখন ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের প্রতিক্রিয়া কী হবে? এই সমস্ত কিছু করা হচ্ছে দেশভাগের ইতিহাসের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের মনকে স্থায়ীভাবে বিষিয়ে দিয়ে। নয়ত রাতারাতি এত বড় বড় অন্যায় হত না। আর মানুষও এভাবে চুপ করে থাকত না।  

এত বড় একটা জ্বলজ্যান্ত অন্যায় প্রায় বিনা বাধায় চালু হচ্ছে। এর দায় থেকে মুক্ত হতে পারব কি আমরা? উদাসীন অসাম্প্রদায়িকরা?


প্রশ্ন :৩
আসাম ভেঙে নতুন রাজ্য গঠনে আপনার নিজস্ব এক মূল্যবান ভাবনা আছে বিষয়টি আরো একটু খোলামেলা আলোচনা শুনবো?

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার : ৩
হঠাৎ করে আসামকে ভাঙা হবে কেন? আসাম তো বহুবার ভাঙা হল, কোনো সমাধান হয়েছে কি কোনো সমস্যার? জাতিগত বৈরিতা সামান্য হ্রাস পেয়েছে কি তাতে? আসলে আমরা আসামের সমস্যাটিই বুঝি নি। আসাম একটা বহুজাতিক বহুভাষিক বহুসংস্কৃতির রাজ্য। সরকারিভাবে এই বহুত্বকে অস্বীকার করা এবং এই বহুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা, এই দুইয়ের মধ্যেকার দ্বন্দ্বই হচ্ছে স্বাধীনতা উত্তর আসামের রাজনীতি। আসামের কোনো একটিও অঞ্চল নেই, যেখানে বহুত্ব নেই। ফলে ভাগ করলে সমস্যা বাড়বে। কমবে না। সেজন্যেই আমি আসাম ভাগ বা বরাক উপত্যকার পৃথকীকরণ জাতীয় দাবির মনপ্রাণ থেকে বিরোধিতা করি। বহুত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সামাজিক সাংস্কৃতিক আদান প্রদান এবং উপর থেকে নিচে পর্যায়ক্রমে সমস্ত স্তরের প্রশাসনিক কাঠামোর বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে। সব ক্ষমতা দিসপুরে কেন্দ্রীভূত হলে কোকরাঝারও সন্তুষ্ট হবে না, হাফলং বা ডিফুও হবে না, শিবসাগর তিনসুকিয়াও হবে না, বরাক উপত্যকা তো হবেই না। 


প্রশ্ন :৪
"রেখেছো বাঙালি করে উনিশ করনি "বিষয় ঠিক কি বলতে চাইলেন?


শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :৪
১৯ মে নিয়ে কথাটা বলেছিলাম। ১৯ মে নিঃসন্দেহে বাঙালির গৌরবের দিন। কিন্তু গৌরবটা শুধু বাঙালির নয়। একজন পাঞ্জাবি, একজন চাকমা, একজন অসমীয়া, একজন হিন্দিভাষী, একজন উজবেক বা একজন ক্রোয়েশীয়রও হতে পারে। যদি উনিশের তাৎপর্য যথাযথভাবে বুঝি।  ১৯ মে বাঙালির লড়াইয়ের দিন। কিন্তু লড়াইটাও শুধু বাঙালির ছিল না। একজন মনিপুরী, একজন খাসি, একজন ডিমাসা, একজন হিন্দিভাষী, এমনকী একজন অসমীয়াভাষী কিংবা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মাতৃভাষাপ্রেমীর লড়াই। একটি বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ভাষার অধিকারের লড়াইয়ের দিন ১৯ মে। দিনটাকে আমরা শুধু বাঙালি করে রেখেছি। একে বাঙালি বনাম অসমীয়া করে রেখেছি। তাই এর মধ্যে হিন্দু মুসলমানও ঢুকে পড়ে কখনো। একটি বহুত্বের লড়াইকে এভাবে সংকীর্ণ করে রেখে এর রাজনীতিকে ভুলেছি। মিথ্যা আত্মগর্বে একে পূজার সামগ্রী করে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেছি। উনিশ আমাদের বহুত্বের মন্ত্রে ভাষার অধিকারে উদ্বুদ্ধ করুক। তবে বহুভাষিক ভারতে হিন্দির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে অসমীয়া ভাষাও ১৯ থেকে প্রেরণা পাবে। এমন কী বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেকে রক্ষার লড়াইয়ে হিন্দি ভাষাও ১৯ থেকে প্রেরণা পাবে।


প্রশ্ন : ৫
আসামের শিলচর শহরের কোন এক মফস্বল থেকে কলকাতায় আজকের শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার হয়ে ওঠার নেপথ্য কাহিনী পড়েছিলাম আপনার একটি লেখায়।অনুগ্রহ করে কথাগুলো আবার যদি পাঠকের জন্য বলেন দাদা?


শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার : ৫
শিল্পী হওয়ার জন্যে আমি শিলচর থেকে কলকাতায় কোনো যাত্রা কখনো করি নি। জীবনের নানা ঘটনায় আমি শিলচর থেকে কলকাতায় এসে পড়েছি। প্রথমবার এসেছিলাম ঠিক কলকাতায় নয়, বর্ধমানে। স্নাতকোত্তর পড়ার জন্যে। তখন আসামে বিদেশি বিতাড়ণ আন্দোলন চলছে। বাঙালি হিসেবে এবং বামপন্থী ছাত্রকর্মী হিসেবে তখন গুয়াহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া সম্ভব ছিল না, তাই। আমি কলেজে পড়ার সময় থেকেই আকাশবাণীতে বড়দের গ্রুপে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতাম। তাছাড়া শিলচরে ‘দিশারী’ সংগঠনের সাথে জড়িতে থাকার সুবাদে গণসঙ্গীত চর্চার সাথেও ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে এখানকার অনুষ্ঠানে জড়িয়ে গেলাম। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, পরে বর্ধমানের বিভিন্ন জায়গায় ও লাগোয়া বিভিন্ন জেলার কলেজ সোস্যাল ও অন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেতে শুরু করি। এদিকে আকাশবাণী কলকাতায় বদলি নিয়ে ফেলায় আকাশবাণী কলকাতা থেকেও রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছি। তখন কলকাতায় অর্ঘ্য সেনের কাছেও গান শিখেছি দু’বছর। ওই অনুষ্ঠানের একটি রিভিউ আজকাল পত্রিকায় বেরিয়েছিল আমার প্রশংসা করে। তাছাড়া আমার এক সহপাঠী বন্ধু আসানসোল থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে আমার একটি সাক্ষাৎকার ছেপেছিল। তারপর পড়াশুনা শেষ করে আমি শিলচরে ফিরে যাই। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সচেতনভাবেই কলকাতার শিল্পী হওয়ার চেষ্টা না করে শিলচরে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে কাজ করার জন্যেই ফিরে আসি। একক শিল্পী হওয়ার স্বপ্ন কখনোই আমার ছিল না। এখনও নেই। ছোটবেলা থেকে বাড়ির প্রভাবে গান গেয়েছি। শিলচরের আনন্দময়ী ভট্টাচার্য বাবাকে বলে আমাকে গান শেখাতে ডেকে নেন। এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু। ওই করতে করতে প্রতিযোগিতায় গান গেয়েছি। ছোটদের বিভাগে আকাশবাণীতে গেয়েছি। পরে কলেজে পড়ার সময় যখন বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হই, তখন আমার দিদি বাবাকে বলে প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রশিক্ষক ভক্তিময় দাশগুপ্তর কাছে শেখাতে পাঠিয়ে দেয়। ওদের ভাবনা ছিল, সপ্তাহে একদিন অন্তত মিছিল মিটিং থেকে সরে থাকবে। শিখতে যাওয়ার পর প্রথমদিনই ভক্তিদা বললেন, রেডিওতে অডিশন দিয়ে দে। দিলাম, পাশ করে গেলাম। রেডিও আর্টিস্ট এই অভিধা পাওয়ার পর অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ আসতে থাকে। আমি শিল্পী হয়ে যাই। তবু বর্ধমান থেকে ফেরার পরও আমার মূল লক্ষ্য ছিল একজন যথার্থ রাজনৈতিক কর্মী হওয়ার। গণসঙ্গীত গাইলেও সাংস্কৃতিক সংগঠক হওয়ার কোনো অভিপ্রায় ছিল না। আমি চাইতাম শ্রমিক বা কৃষক সংগঠনে কাজ করি। সফদার হাসমির মৃত্যু সাংস্কৃতিক আন্দোলনের রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে আমার ধারণা বদলে দেয়। তখন থেকেই গুরুত্ব সহকারে গণনাট্য আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠি। নিজের গান গাওয়াকেও একটু গুরুত্বের সাথে ভাবা, ইত্যাদি শুরু হয়। ফলে নিজের গান গাওয়া, শেখা এবং অনুশীলন বা চর্চাকে আমি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটা সাংগঠনিক কাজ হিসেবেই দেখি। এককভাবে গাই ঠিকই, কিন্তু নিজের যাত্রাপথকে এককভাবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজ হিসেবে দেখি না। রবীন্দ্রসঙ্গীত, লোকগান বা গণসঙ্গীত- সবই এই ভাবনা থেকেই করি। তখন কলকাতায় গিয়ে ক্যাসেট করেছি, অনুষ্ঠান করেছি বা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় এরপরও অনুষ্ঠান করেছি। কিন্তু সবটাই করেছি উত্তরপূর্ব ভারতের একজন হয়ে। ‘কলকাতার শিল্পী’ হওয়ার কোনো স্বপ্ন কখনো দেখি নি। জীবনের বাধ্যবাধকতায় পুত্র সন্তানের প্রয়োজনে কলকাতায় দ্বিতীয়বার আসতে হল বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি নিয়ে। যেভাবে শিলচরে গান গাইছিলাম সেভাবেই এখানেও গাইছি। শুভেন্দু মাইতি, আমার বন্ধু পূবালী দেবনাথ, আমার সুপ্রিয় অনুজ কালিকা প্রসাদ- এরা উদ্যোগ নিয়ে আমাকে বিভিন্ন অনুষ্ঠান মঞ্চে, টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়ে গেছে। এভাবেই হয়ত কারো কারো কাছে আমি ‘কলকাতার শিল্পী’ হয়ে গিয়েছি। কিন্তু এটা আমার স্বপ্ন ছিল না। একজন রাজনৈতিক সঙ্গীত শিল্পী ও সংগঠক হিসেবে যে ভূমিকা আমি বরাক উপত্যকায় বা উত্তরপূর্বে পালন করেছি, সেই জীবন থেকে অনেকখানি সরে এসেছি। গণনাট্য করছি এখনও, কিন্তু শিলচরের সক্রিয়তার জীবন আমার হারিয়ে গেছে। এটা আমার ভীষণ দুঃখ।  


প্রশ্ন : ৬
দেশভাগ মুক্তিযুদ্ধ আবেগ যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বাঙালি বিদ্ধ। আপনার নানা সময় এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া আমরা পাঠ করে একজন শিল্পী হৃদয়ের ক্ষত অনুভব করি।তাও পাঠককে যদি বলবেন?


শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার : ৬
আবেগ আছে ঠিকই, কিন্তু আবেগের চেয়েও বড় এই ঘটনাগুলি নিয়ে আমার ভাবনা। দেশভাগ আমাদের উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অপরাধ। দেশভাগ শুধু একটি ভূগোলের দু’টুকরো হওয়া নয়। একটি অখণ্ড মানবজাতিকে, মানবহৃদয়কে রক্তাক্ত করে দ্বিখণ্ডিত করেছিল। দেশভাগের অভিশাপ থেকে আমাদের উপমহাদেশ এখনও মুক্ত হয় নি। যতবার উপমহাদেশের কোনো না কোনো কোণে কোনও সংখ্যালঘু রক্তাক্ত হয়, ততবার ইতিহাস আমাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। মুশকিল হচ্ছে, দেশভাগ বিষয়টি কী ছিল, আমরা সেদিও বুঝি নি, আজও বুঝি না। দেশভাগকে ভারতে, পাকিস্তানে, বাংলাদেশে- এক একটি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে এক একটি পরস্পর বিরোধী খণ্ডিত ভাষ্য নির্মিত হয় যা শেষপর্যন্ত ধর্মীয় উগ্রতার রাজনীতিকেই উৎসাহ জোগায়। এই উপমহাদেশের প্রগতিশীল রাজনীতির মানুষদের প্রয়োজন দিনের পর দিন মুখোমুখি বসে দেশভাগের একটি অভিন্ন ভাষ্য নির্মান করে এই সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসা যে দেশভাগ একটি ক্ষমাহীন রাজনৈতিক অপরাধ ছিল। মানচিত্র বদল করার প্রয়োজন নেই, মনটা বদল করা জরুরি। কাঁটাতার সীমান্ত থেকে উপড়ে ফেলতে হবে না, সবার মনের ভেতরে থাকা দুর্লঙ্ঘ্য কাঁটাতারকে উপড়ে ফেলার সাধনাই হতে হবে প্রগতিশীল রাজনীতি ও সংস্কৃতি আন্দোলনের প্রধান কাজ। দেশভাগের অভিশাপ ও দেশভাগের বিকৃত ভাষ্য এখনও আমাদের পঙ্গু করে রেখেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে আমি শুধুমাত্র একটি দেশের স্বাধীনতা বা আবেগ প্রবণ হয়ে পূর্ব পুরুষের জন্মভূমির স্বাধীনতা হিসেবে দেখি না। মুক্তিযুদ্ধ আসলে এই উপমহাদেশের বিগত ৭৫ বছরের ইতিহাসে দেশভাগের অভিশাপ থেকে মুক্তির একমাত্র রাজনৈতিক সংগ্রাম। একুশে ফেব্রুয়ারি ও কাগমারী সম্মেলন দ্বিজাতিত্ত্বকে প্রত্যাখান করে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চারা রোপণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধ দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রত্যাখানকে বাস্তবায়িত করে চোখের সামনে একটি সচেতন অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রকে দৃশ্যমান করেছিল। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট সেই মুক্তিযুদ্ধকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশ সেই অন্ধ নাগপাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক লড়াই করে, এটা ঠিক। তবু একাত্তর ফিরে আসে নি। একাত্তরের ষোলো ডিসেম্বর পরবর্তী বাংলাদেশের পুনর্জন্ম এখনও হয় নি। বরং নিঃশব্দ পদধ্বনিতে আবার ফিরে আসার পথ খুঁজছে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট। জাতীয় আদর্শের প্রতিষ্ঠার কাজে কোথাও একটা সমস্যা ছিল নিশ্চয়ই। এখনও নিশ্চিতভাবেই সমস্যা রয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকট হচ্ছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লড়াইটা তো একান্তই বাংলাদেশের নিজের লড়াই। তাঁরা নিজেরা লড়েছে, লড়ছে, আরো লড়বে। এর চেয়ে বেশি ব্যক্তিগত মতামত দেওয়াটা অভিপ্রেত নয়। 


প্রশ্ন :৭
দুই বাংলায় আপনি সমান জনপ্রিয়। একজন শিল্পীর জীবনে এই জনপ্রিয়তার পেছনে কতটুকু খাটাখাটুনি করতে হয়?


শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :৭
এটা আপনার একটি অভিমত। আমি জীবনে এমন কিছুই হই নি যার জন্যে ‘দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয়’ বলে একটি বিশেষণকে মেনে নেবো। এমনটা আমার মনে হওয়ার প্রশ্নই নেই। এটাকে সত্য মান্য করে কোনো উত্তর দিলে পাপই হবে। 

প্রশ্ন :৮
ব্যক্তি জীবনে আপনি একজন মতাদর্শগতভাবেই বামপন্থী। এই সময়ে দাঁড়িয়ে বামপন্থার ভবিষ্যৎ কতটুকু উজ্জ্বল? 


শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :৮
প্রভাত পট্টনায়ক বলেছিলেন, ভারতে বামপন্থীদের ভবিষ্যৎ আছে কিনা জানি না। তবে এটা জানি বামপন্থাকে বাদ দিয়ে ভারতের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সামগ্রিকভাবে এটা আমারও কথা। বামপন্থীরা না থাকলে ভবিষ্যৎ কেন, ঘটমান বর্তমানের দ্বিপ্রহরেই যে রাত্রির নিকষ অন্ধকার নেমে আসে তা তো পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আলাদা করে যুক্তি সাজিয়ে বলার প্রয়োজন আছে কি?

প্রশ্ন :৯
সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক সচেতনতা প্রয়োজন?


শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :৯
সংস্কৃতিটা তো রাজনীতির বাইরের জিনিস নয়। বরং রাজনীতিটাও এক ধরনের সংস্কৃতি, আবার সংস্কৃতি নিজেই একটি রাজনীতি। রাজনীতিমনস্ক সংস্কৃতি এবং সংস্কৃতিমনস্ক রাজনীতি ছাড়া এগোবার পথ কোথায়!

প্রশ্ন :১০
দোহার নিয়ে আপনার বক্তব্য শুনবো।শুনবো কালিকাপ্রসাদের মৃত্যুসংবাদ আপনাকে কতটুকু ভেঙে দিয়েছিলো?এই ঘটনা একজন মানুষ হিসেবে আমরা কেউ মনে হয় ভুলতে পারছি না।তাঁর আরো প্রয়োজন ছিলো আমাদেরকে গানে গানে বাঁচিয়ে রাখতেই।

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :১০
দোহার একটা নিছক গানের দল নয়। কালিকা সচেতনভাবেই দোহারকে একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন হিসেবেই গড়ে তুলেছিল। আন্দোলন কথাটা আমি সচেতনভাবেই বলেছি। কারণ ওদের মধ্যে আমরা শুধু গান শুনি নি। আমরা লোকায়ত সংস্কৃতির সাথে সংলাপ রচনার একটি ধরনকে লক্ষ্য করেছি। লোকায়ত এবং নাগরিক, তার আন্তঃসম্পর্কের নানা সমস্যা ও নতুন নতুন দিগন্তের কথা শুনেছি। একটা টেলিভিশন চ্যানেলের একটি সঙ্গীত প্রতিযোগিতাকে কেমন একটা আদর্শগত উপস্থাপনে পরিবর্তিত করে দেওয়া যায় সেটা দোহার দেখিয়েছিল কালিকা প্রসাদের নেতৃত্বে। ওরা শুধু লোকগান গায় নি। লোকায়ত স্রষ্টাদেরও যথার্থ মর্যাদায় আমাদের সামনে হাজির করেছে। যখন জি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে একটা মনসুর ফকির, একটা হরেকৃষ্ণ, একটা তুলিকার সামনে যখন নতমস্তকে বাণিজ্যিক সঙ্গীতের রথী-মহারথীরা দাঁড়াতো, মনে হত কালিকাপ্রসাদ গ্রামীণ সঙ্গীত দিয়ে নয়া উদারবাদের মৃগয়াভূমি মহানগরকে ঘিরে ধরেছে। মনে হত সত্তরের গ্রাম দিয়ে শহর ঘিরে ফেলার রাজনৈতিক স্বপ্নকে সংস্কৃতির মঞ্চে দেখছি। একটা বড় সাংস্কৃতিক যুদ্ধকে গড়ে তোলার মুহূর্তেই কালিকা প্রসাদ চলে গেল। এটা কত বড় ক্ষতি সে তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে যা হারিয়েছি সেটা তো কখনোই পূরন হবে না। কিন্তু কালিকার সাংস্কৃতিক যুদ্ধটাকে যদি আমরা সত্য অর্থে অনুধাবন করতে পারি তবে সকলে মিলে তার যুদ্ধটা জারি রাখতে পারব। দোহার এই মুহূর্তে সেটাই করছে। আমাদের সকলের তাদের সহযাত্রী হওয়া বোধহয় উচিত।
  

প্রশ্ন:১১
আপনার প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে জানবো?

শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার :১১
এভাবে কখনো ভাবি নি। আর না ভেবে জীবনটা কাটিয়ে দিতে দিতে চাই। পাওয়া না-পাওয়া কামনা বাসনার সাথে সম্পর্কিত। স্বপ্নের সাথে পাওয়া না-পাওয়ার সম্পর্ক থাকে না। আমি কামনা বাসনার পথে হাঁটি নি। হাঁটার যোগ্যতাও ছিল না। সচেতনভাবেই স্বপ্ন দেখতে চেয়েছি। স্বপ্নের পথেই হাঁটতে চেয়েছি। কালিকা যে স্বপ্নের প্রসঙ্গে বলেছে ‘এই স্বপ্ন দুচোখ খুলে জেগে দেখা যায়..’। সেখানে সফলতা অসফলতা, প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির সম্পর্ক থাকে না।

৩০:০৮:২০২১

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ