কবি কচি রেজা
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
কচি রেজা ( নিরোজা কামাল )
নব্বই দশকের উল্লেখযোগ্য কবি
জন্ম ৮ এপ্রিল
জন্মস্থান গোপালগঞ্জ
পড়ালেখা গোপালগঞ্জ
প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে---১৯৯৯ সালে
উল্লেখযোগ্য বই-
১ অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর
২ ভুলের এমন দেবতাস্বভাব
৩ অন্ধ আয়নাযাত্রা
৪ মমি ও কাচের গুঞ্জন
৫ কফিনভর্তি কোলাহল
৬ নাকছাবির ইতিকথা (দুই বাংলার যৌথ কবিতার বই)
৭ মনে করো
৮ নির্বাচিত কবিতা
প্রকাশিতব্য বইরে নাম :চলো নিরোজা
প্রশ্ন:১
কখন কিরকম লেখালেখির শুরু?
কচি রেজা :১
বিকালের খেলা শেষ করে কলেজ মোড় ঘুরে ছুটকাদার দোকান। মালা পছন্দ হয় একটা মেরুন কালার পাথরের। হাতে টাকা নেই ।থাকার কথাও না।
মা কে বলি,চিরকাল যা বলে এসেছে সেই কথাই জারি রাখে। তোমার বাবা কবে আমার হাতে দুটো টাকা দিয়েছে।
পড়ায় মন বসেনা। না খাই,না ঘুমাই। বাবা নাটক করে রিহার্সাল শেষে কখন যেন এসেছে । ঘুম ভাংলো কালো কালো ভোরের আলোর অভিঘাতে।
রাস্তায় মেয়েটি আর বাবা। হালকা শীত শীত। দোকানের সামনে এসে দেখে বন্ধ। তাতে কি দোকানির নাম ছুটকা
মেয়েটি ছুটকাদার বাসা চেনে ।
কেনা হয় মালা। সেই ভোর রাতে।
বাবা ছাড়া কোনো পুরুষকেই কিছু দিতে বলেনি মেয়েটি কোনোদিন। এটা সে বুঝে গেছে, বাবার সমান কেউ না। কেউ হয়না।
বড়ো হচ্ছি কিনা জানিনা। জামা টান টান হলে লুকিয়ে রাখছি আলনার পিছনে। ওড়না পরতে মুশকিলে পড়ছি। কেউ চেয়ে থাকলে মাকে রেগে মেগে বলছি। অংকের জন্য সেরা মাষ্টার রেখেছেন বাবা, নাইনে উঠেছি জ্যামিতি আর বীজ গণিত কোনোমতে করে। নিরোজার কি কপাল, প্রথম দিনেই যাওয়ার সময় স্যার কিনা তার মুখে হাত বুলালো। পরেরদিন টেবিলে নিরোজা নেই। মা ডাকছেন। স্যার ডাকছেন। যাবে নাতো যাবেইনা। মেয়ের জেদ জানেন মা।
স্যারকে বিদায় দিয়ে বললেন, কি ব্যাপার? নিরোজা যার নাম সে কি এক বারে দুবারে জিগেস করলে উত্তর দেবে? সাধ্যসাধনা তাইলে কাকে বলে!
একদিন অনেক রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেল। অর্ধেক সিঁড়ি নেমে দেখি , কোথা
থেকে ভিক্ষে চাওয়া একটি মেয়েকে বিছানায় শুইয়ে মাথায় জল ঢালছে মা।
মেয়েটি কদিন হল আমাদের বাসায় । তার যে কি আহ্লাদ , মনে মনে সত্যি
রাগ ধরে। আমার মা কাউকে আদেখলার মত আহ্লাদ করতে পারে , না
দেখলে বিশ্বাস হত না ।
দেখি আর আমার কেমন যে লাগে। আমরা তার বড়ো বিছানার ধার ও ধারতে
পারি না । যাও যাও উপরে যাও--নীচে কোনো শোয়া নাই। আর সেই কুড়ানো
মেয়েকে দিব্যি নিজের পাশে শুইয়ে রাখে। কিছু করার নেই। আমার মায়ের
কথার উপরে কথা বলার সাহস কারুর নেই । মা এমনিতেই তর্ক পছন্দ করে না ।
সিঁড়িতে বসে অনেকক্ষন কান্ড দেখলাম আর প্রলাপ শুনলাম। মা বোলে যাচ্ছে,
আহ, কোথা
থেকে এসেছিস, কোথায় মা , কোথায় বাপ, কী জ্বর ---
মেয়েটি আমার সমান হলেও আমার চেয়ে কালো , তাকে মা এত ভালবাসে ,
তাইলে আমি কালো বোলে আমার বাবাকে কেন শুনিয়ে বলে ' এই না কালো
মেয়ে তার মেজাজ দারোগার মত বিয়ে দিলে পরের দিন ফিরিয়ে দিয়ে যাবে,
কান ধরে উঠবস করাতে পারে তেমন নাইলে তো মেয়ের সাথে বনবে না ,
পরের ছেলে কি আর কথা শুনে চলবে।'
কোনো মা এমন বাজে কথা বলে , আমার জীবনে শুনি নি--
আমার বাবা সপাটে জবাব দ্যায় , মেয়ে তো আমি বিয়ে দেব না , এইসব
চিন্তা বাদ দাও , লেখা পড়া করবে , স্বাবলম্বি হবে তারপর দেখা যাবে--'
বাবার কথায় প্রানে জল আসে---
মাঝে মাঝে আমি না ভেবে পারি না কেন এই মা-কে আমার বাবা
বিয়ে করলো
সোজা কথা আমার বাবা ত্যাজ্য হলেন।
তখন আমি জন্মাইনি। আমার এক ভাই কেবল,আর ছোটো আরেক বোন।
মায়ের কাছে এইসব শুনেছি বড়ো হয়ে। আর জেনেছি বুঝতে পেরেছি, আমি সেই বাবার মেয়ে , যার জেদ আর আত্মসম্মান নিজে গুঁড়িয়ে গেলেও নিজে কখনও ভাংবেনা। মচকাবেনা। আর শিল্প সংস্কৃতির এইযে টান, যে টানে করোনার ভিতর বা যে কোনো দুঃসময়েও আমার বর্ম এই শিল্প ।
বাবা ভোর হতেই মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন বাড়ি থেকে। বিশাল উঠোনের দুপাশে দোতলা ঘর। এখন সেখানে গোপালগঞ্জ পাওয়ার হাউজ আর দাদার কবর। থিয়েটার রোড সেখানে কয়েকটি দোতলা ঘর এবং দোকান জমি জমা সব পিছনে ফেলে।
একটি গদ্য
এই সমাজে হাঁস মুরগি গরু ছাগলের সঙ্গে মানুষ জাতিটি চিরকাল হয়ে থেকেছে, সমাজেরই অনুষঙ্গ । মানুষের ভেতর আবার দুইটি খুব শক্তিশালীর একটি ভাগের নাম নারী।
মানুষ সেও। কিন্তু এই যুগে এবং বিগত যুগেও পুরুষ অপেক্ষা তার সমস্যা ভিন্ন থেকেই গেছে। অথচ অন্য গ্রহের আলো কি খেলা করে না তার মুখেও! বাড়ন্ত শরীরে কেবল যে সে জামা পরতে গিয়ে বোতাম ছেঁড়ে তা নয়, পায়ে পায়ে তাকে লড়তে হয়, কেবল যে চুল ওড়না অথবা নিজের অচেনা শরীরের বিন্যস্ততা নিয়ে তানয়, এই বয়েসেই মেয়েটিকে অন্যত্র ভিন্নত্র অজানা ভয়ংকর এক পাত্রপক্ষের হাতে , পরিবারের কাছে হস্তান্তরের ভীতি লুকিয়ে রেখে।
আমরা জানি, পৃথিবীর যে অগ্রশীলতা সেটি সব খানে সমানভাবে , সমান পর্যায়ে হয়নি। তাই প্রগতিশীলতার মানে সব সংসারের সব মেয়েটিই শৈশবের দুর্ধর্ষ সময়টা সাইকেল চালিয়ে ঘোড়ায় চড়ে কাটায় না।
এবার, যখন সেই মেয়েটিই লিখতে বসে অথবা লেখার যাপন সে যখন অনুভব করে , সে কিন্তু প্রথমে তার পা থেকে যে অবিচার পেয়ে এসেছে , লেখাটা শুরু করতে পারে সেখান থেকে।
প্রশ্ন :২
এই সময়ের কালখণ্ডে এগিয়ে যাওয়ার পথ কি?
কচি রেজা :২
কেউ আটকে থাকে নিজের সমস্যায় কেউ বা চোখ মেলে সমাজটাকে দেখে, দেখে এই সমাজের হাঁস মুরগি অথবা পুরুষ সবাই নির্যাতিত কোনোনা কোনো ভাবে।
দেখে, সবার জন্য বাসস্থান নেই, শিক্ষা নেই, খাদ্য নেই চাকরি নেই।পেয়েছি আর পাইনি-র তখন এবং এখনও শুরু হয় অসম যুদ্ধ।
সমাজ বিস্তৃত এবং বিশাল বিশাল সমস্যায় জর্জরিত।
কারা যেন কবিতা লেখে তবু। হিরেটা কত বিস্তৃত বিপ্রতীপ কোণে খাঁজে সমীকরণে কেটে উজ্জ্বল করা যায় কেউ কেউ এই কাজটাই করে চলে।
এই কাজ সমাজ বিবর্জন নয়।
প্রশ্ন :৩
লিখতে লিখতে এখন কি মনে হয়?
কচি রেজা :৩
আমি নিজে যখন লিখি, "ওড়না ঠিক ঠাক তো?
কাজিন কি বুকে হাত দেয়? ছেলে বন্ধুরা চিঠি লেখে?
আমাকে জানিও" "
হ্যাঁ সত্যি স্বীকার করি আজ, এই জীবন এই শৈশব আমার ছিলনা। আমি যাপন করিনি এমন। লেখা হয়ে গেছে তবু এই বাস্তবতা।
লেখাটাই আসলে আর্তনাদ। চিৎকার। প্রতিবাদ। এটি আসে যন্ত্রণাবোধ থেকে। সেটিও আবার টেকনিকের মুখাপেক্ষী। শিল্প বোধের পরীক্ষায় নিত্যই তাকে বসতে হয়। কিছু বোদ্ধাদের দরবারে। সকলের কাছে নয়।সকলের চেয়ে নিজের কাছেই যেন বেশি।
প্রশ্ন :৪
সময় কেমন কাটছে?
কচি রেজা :৪
এ বড়ো সুখের সময় নয়। একদিন আমাকেও ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চড়ে বসবে পৃথিবী, পেন্সিল দিয়ে চোখে খোঁচা দেবে কোনো রাগি সহপাঠি।
কত আর ইমোশনাল ব্লাক মেইল করবে আগুনবাতাসজল ?
ছেড়ে দাও ঈশান কোন, প্রনাম করো মাটি। খেলনাগুলো ফিরিয়ে দিয়ে এসো যে শুন্য থেকে তারা এসেছে
তারপর এই অ-পরাভব জীবন একটি বৃক্ষের ডাল পুঁতে দাও শিশুর শিয়র।
প্রশ্ন :৫
কী লিখি কেন লিখি?
কচি রেজা :৫
কবিতা কিভাবে লেখা হয় আমি জানিনা। জানিনা কোথা থেকে কেমন করে আসে। একটি কবিতা প্রসব হবে বলে আদৌ কি কোনো আসন ভঙ্গি রয়েছে!
যেভাবে ধ্যান করার জন্য দীপাবলির আলোয় ধূপ জ্বালিয়ে পট্টবস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে কপালে কপোলে চন্দন এঁকে বসা হয়!
নাকি গাছ তলার নাকি পাঁচ তলার দাবি কবিতার!
আমি যাপনের মধ্যে মাঝে মাঝে বিষন্ন হই--সে কী কবিতা লেখার অনুভব বেদনা? সে কী অসুস্থ সন্তানের আরোগ্যকামনার থর থর ? সন্তান কি কবিতার চেয়ে বেশি বা কম?
আমি কি কবিতাকেই আশ্রয় ভাবি যখন হতাশ হই অথবা কন্ঠে জড়াই আশালতা ?
এইসব অবান্তরতায় আমার দেহ কুশবিদ্ধ হয় অথবা আবৃত হই আঁশে। যেনবা আমি মাছ। গাছ । কান্ড খুঁড়ে যাচ্ছে কোনো কাঠঠোকরা।
কিছুর উন্মোচন হবে বলে কবিতা লিখিনা। আমার সবই উন্মোচিত অথবা সবই গোপন। সেই মোড়োক আমি খুলতে পারিনা। প্রদর্শন করতে পারিনা।
মাঝে মাঝে হাতে ঠেকে যায় সেই চাবি। তখন ভুল সড়ক দিয়ে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে যাই কিছু কবিতা।
যেমন সেদিন খুব ভোরবেলায় দেখি, এক সারি গাছের ঊর্ধশাখার কাঁচা পাতা। মনের ভেতর ঘনিয়ে উঠলো কিযে লাবণ্য! কি তাদের রঙ । কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে উধাও হলো সব।
ভাবি,
১।' চলে যাচ্ছে এক একটি শরতকাল'।
কখনো কখনো যাপনে দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে কেবল। শ্বাস নিতে গিয়ে অপারগ হয় শ্বাসযন্ত্র। অক্সিজেনের কল্পিত মজুদ যেন তখন মনে হয় অন্য কোথাও। অন্য কোনো নীল দ্বীপের বিজনে। বলতে ইচ্ছে করে আরও কল্পিত কাউকে,
২। 'কেউ বলেনা , চলো দ্বীপবাসি হই, পাখিতে নিঃশ্বাস নিই'' ।
কিংবা হাঁটতে বেরোলে যে অজস্র ঘ্রাণ ছাতিমের ফুলে ভরা গাছটি পাশ কাটিয়ে যেতে হয়-----
মনে মনে কে বলে উঠলো,
৩। কি ঘ্রাণ তোমার দু"হাতে! 'তুমি কি ছাতিম তলা দিয়ে এসেছ! '
কোথাও না কোথাও রোজ কেউ মারা যাচ্ছে নিজের মৃত্যুও তো নির্দিষ্ট।
৪। 'এক আশ্চর্য ভঙ্গিতে আমি মরে যাব।'
এক বসন্তের সন্ধ্যায় ধানমন্ডির রাস্তায় দাঁড়িয়ে জনসমাগম দেখতে দেখতে একটি রিক্সায় দেখি একটি ছেলে ও মেয়ে। কিসুন্দর সেজেছে। হঠাত হাওয়া এসে আধ ঢাকা হয়ে গেল মেয়েটির মুখ।
মন গুন গুনিয়ে উঠলো,
৫। 'লোধ্ররেণু, তুমি আজ এত সেজেছ কেনো?'
৬।' প্রার্থনার পর আমি অনুভব করি নিজের ভাংগা কন্ঠস্বর;' লেখা হয়েছিল অসাড় কোনো দিনে ।
৭।'সংসারের নিয়মে আমি এখন জুতোর বাক্সে ঘুমাই' কি জানি এমন চরম সত্য কিভাবে লেখা হয়ে গেছিল।
এইভাব, এই বোধের ক্ষুদ্রাংশ দিয়েই আমি কবিতা বানাই।
১
এক একটি শরতকাল চলে যাচ্ছে। এভাবেই যায় । জলের রঙে বদলে যাচ্ছে মাছ
শিকারির ফাতনা একবার দুলে ওঠে বিষন্ন চিরুনির মত। একদিন ভোরে, বহু দূরের
একসারি গাছের ঊর্ধ শাখার পাতায় পাতায় দেখি অপ্রসুত শরত
পর পর কয়েকটি খুব ভোরে, আমি, আমার চোখ দেখি, ঝরে পড়ছে একমাত্র কুয়াশাই
শরত নয় ?
একবারই পরেছিলাম টিপ। কখন যেন পরে !
২
কেউ বলেনা, চলো, দ্বীপবাসি হই,পাখিতে নিশ্বাস নিই
আবছায়া চোখ, চোখের ড্রপস যেন বিচিত্র হরিণের সাক্ষাত
একদিন স্নান করেছিলাম মহুল নদীতে
ভুল করে রেখে এসেছি যে ক্ষীন কোমর
মাঝে মাঝে দর্পণে দেখি সেই সম্ভাবনা
এখন এই অর্ধজীবন, এ জীবন আমি চুরি করেছি
বাদামঅলার কাছ থেকে ।
৩
কি ঘ্রাণ তোমার দু;হাতে, তুমি কী ছাতিম তলা দিয়ে এসেছ !
রোজ ভিক্ষা পেরিয়ে যেতে যেতে আমিও শিউলি কুড়াই অথবা
ভোরবেলা হই পাখি সামলানো আকাশ !
রোদ্দুর মেখে নিই এত যেন সাঁতারের সময় অক্লান্ত থাকি মাছের
কানকোর মত !
ঠিক তাই ছাতিম গাছটার নীচে তোমার অপেক্ষা ফিরিয়ে
আমি পিঠে জড়িয়ে নিই দুপুর ! বেদনার ওজন নিতে নিতে ভাবি
আমার সব রকমের বিচ্যুতি , সব রকমের অভিশাপ কেনো এত বেদনামুখী !
লুব্ধ হয়ে উঠি দুপুরের জন্য, এই দুপুর বেদনার চেয়ে কম !
৪
আশ্চর্য এক ভঙ্গিতে আমি মরে যাব।মনে হবে,
এইতো চোখ মেলে চেয়ে হেসে টেনে নিচ্ছি র্যাঁবোর বই
যেন আমি আগের মতই
হ্যাঁ, মৃত্যুকেও আমি এই ভঙ্গিতেই পাঠ করব !
৫
লোধ্ররেণু, তুমি আজ এত মেখেছ কেনো? বসন্ত নিয়ে
আমি কোনোদিন লিখিনি। যেন দুঃসময়ের এক পৃষ্ঠা
হঠাত উড়ে আসে কালান্তর থেকে। অপরিমিত চুলে
ঢেকে যায় মুখ। আমি হারাতে হারাতেই বলি, ফুটেছ কেন যে!
আমার ছিলনা রক্তপ্রীতি, তুমি পদ্ম বেছে নিলে। কেটে গেছি ডানায়।
৬
প্রার্থনার পর আমি অনুভব করি নিজের ভাঙ্গা কন্ঠস্বর। প্রার্থনা
অনুমোদিত হয় ভেবে আবার হাঁটু ভেঙ্গে বসি। মাঝে মাঝে
স্ফিংক্সের মত পাথর সময় আসে,। এক ক্যারাভ্যাব বালু দিয়ে
কারা যেন বানায় আমাকে। এ বিষয়ে আমার হাসিই শুদ্ধ যন্ত্রনা।
৭
সংসারের নিয়মে আমি এখন জুতোর বাক্সে ঘুমাই। জুতোর বাক্সে ঘুমাতে আমার ভালো লাগেনা।
তখন পুতুলগুলোর কথা মনে পড়ে। পুতুলগুলোও রাত্রে জুতোর বাক্সে ঘুমাতো।মাঝে মাঝে বিছানায়
আমার কাছে নিয়ে আসতাম। দেখতাম,পুতুলগুলোর হাসি মুখ। পুতুলগুলো একদিন এক বাক্স থেকে
আর এক বাক্সে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেদিন কিন্তু ওদের কান্না আমি শুনেছি। অথচ হঠাত একদিন
বিসর্জনের বাঁশি বেজে উঠলে আমার মায়ের ভারি আঁচলে দুলে ওঠে ভারি রুপোর চাবি। মন্ডপের
ছায়ায় নিভে যায় চার পাঁচ হাজার নীল বাতি।প্রতিমার অসহায় কান্না কেউ শুনতে পায়নি সেদিন।
আমিও পাইনি। বরং কাঁধে আঁচল ঘুরাতে শিখেছিলাম। অনেক প্রস্তুতির পর কিশোরি মাথার চুলে
শিখেছিলাম খোঁপা বাঁধতে।নতুন শাড়ি, ব্রোকেড ব্লাইজ, কিশোরি চুলগুলো কতটা লম্বা এখন ।
আমিও সেদিন সেজেছিলাম মিথ্যে মা। আসলে সব মা-ই মিথ্যে।
আজ যখন একটি হাত আমার ঘুমন্ত মুখ হাতড়ায়। চুল বেঁধেছি কিনা, চোখ ভিজে কিনা, দম আটকে
মা যখন বলে, খেলবি? পুতুল বানিয়ে দেব আবার!'আমার ছেঁড়া কাপড়ের পুতুল কি এত কেঁদেছিল
সেদিন আমার মায়ের ভাঙ্গা পুতুলের মত!
--------------------------------------------------------------------------:কবি:: কচি রেজা, ( নিরোজা কামাল )। জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার গোপালগঞ্জ শহরে। ছোটোবেলা থেকে দেশের বাইরে। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাস। জন্ম ৮ এপ্রিল
কিছু প্রকাশিত বইঃ- অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর
ভুলের এমন দেবতা স্বভাব
অন্ধ আয়না যাত্রা-
-মমিও কাচের গুঞ্জন
দুই বাংলার যৌথ কবিতা , নাকছাবির ইতিকথা
মনে করো
নির্বাচিত কবিতা
৩১:০৮:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ