সাহিত্যিক রামকুমার মুখোপাধ্যায়
মুখোমুখি
কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
প্রশ্ন :১
আপনি কখন লেখালেখি শুরু করেন?
উত্তর :১.
লেখালেখির শুরু কলেজ জীবনে। আমি বেলুড় রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরে পড়তাম। এটি একটি আবাসিক কলেজ। সব ছাত্রকেই হস্টেলে থাকতে হত। শনিবার সন্ধেয় হস্টেলে সাহিত্যপাঠ, গান, বিতর্কসভা ইত্যাদির ব্যবস্থা ছিল। তার জন্যেই প্রথম গল্প লেখা ও পাঠ। সেটা সত্তরের দশক। তখনই লেখার শুরু।
প্রশ্ন :২
আপনার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি কাজের বিবরণ শুনবো?
উত্তর :২.
আমার জন্ম ১৯৫৬ সালের ৫ অক্টোবর কলকাতায়। তবে বছর দেড়েক বয়সে আমার বাবা মারা যান। তার কিছু মাসের মধ্যে মা আমাদের পাঁচ ভাইকে নিয়ে দেশের বাড়ি বাঁকুড়া জেলায় চলে যান। আমি ছোটো থেকে বাংলা ভাষার দুটি রূপের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি। বাড়িতে কলকাতার বাংলা আর বাড়ির বাইরে পূর্ব বাঁকুড়ার বাংলা। বাংলার এ দু' রূপেই গল্প-উপন্যাস লিখেছি। এখনও তাই লিখি।
প্রশ্ন :৩
আপনি ভ্রমণের আনন্দ বারবার নিয়েছেন। এতে কি লেখালেখির উপর চাপ পড়ে?
উত্তর :৩.
দেশ-বিদেশ ঘুরলে প্রকৃতির নানা রূপ ও নানা প্রকৃতির মানুষ দেখা যায়। তাতে লেখার অনেক নতুন উপাদান মেলে। তবে বেড়াতে গিয়ে নিজের সেলফি তুলে ফেসবুক ভরে দিলে তা হবে না। অন্যের মুখের দিকে তাকাতে হবে। মানুষজনের সঙ্গে সঙ্গ করতে হবে। কথা বলতে হবে। তখন এতকিছু মিলবে যে, একটা উপন্যাসই হয়ত এক যাত্রায় লেখা হয়ে গেল।
প্রশ্ন :৪
আপনার লেখাপড়া ও সাহিত্যচর্চা বিষয়ে বলবেন?
উত্তর:৪.
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। তখন জরুরি অবস্থা শেষ হয়েছে। আবার গণতন্ত্রে ফেরা গেছে। নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে বলে বিশ্বাস জাগছে। সত্তরের দশকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হানাহানি ও টোকাটুকি চলছিল। তা কাটতে শুরু করেছে সত্তরের শেষ দিকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসে আমরা শোষণহীন সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। আমি পরে পড়াশোনার সূত্রে সামান্য সময় লক্ষৌ ও হায়দ্রাবাদে কাটিয়েছি। তার কিছু কিছু ছোঁয়া আমার আশি ও নব্বইয়ের দশকে লেখা গল্প-উপন্যাসে আছে।
প্রশ্ন :৫
কী লিখি কেন লিখি?
উত্তর :৫.
লিখি নিজের চেনা মানুষজনের সুখ-দুঃখ আশা-নিরাশার কথা। নানা রকমের বাধার মুখোমুখি মানুষের লড়াইয়ের কথাও আসে।তা ভালো হয় কি মন্দ তা পাঠকই বলতে পারেন।
প্রশ্ন :৬
অনেকে বই কিনে পড়েন না বলে শুনেছি।শুধুই সাজিয়ে রাখেন।এ বিষয়ে আপনার মত কী?
উত্তর:৬.
কে বই পড়ে আর কে কিনে সাজিয়ে রাখে তার বলতে পারব না। তবে বেশ কিছু লেখাপত্র পড়ে মনে হয় লেখকেরা বেশ পড়াশোনা করেন। বাংলা ও ইংরেজি খবরের কাগজ ও পত্রিকা পড়েও দেখি অনেক পাঠক ভালোই পড়াশোনা করেন। তবে কিছু মানুষ ঘর সাজানোর জন্যে বই কিনতেও পারেন। দেখতে সুন্দর লাগে বলেই কেনেন। তাতেই-বা ক্ষতি কী ? সাহিত্যিকেরাও তো সুন্দরেরই সাধনা করেন।
প্রশ্ন :৭
নিম্নবর্গীয় মানুষ সম্পর্কে আপনার নিজস্ব ভাবনার জগৎ জানবো?
উত্তর:৭.
নিম্নবর্গের মানুষেরাই আমার লেখায় বেশি আসে। 'চারণে প্রান্তরে', 'মিছিলের পরে' বা 'দুখে কেওড়া' ইত্যাদি উপন্যাস পড়লে দেখতে পাবে।
প্রশ্ন :৮
লোকসাহিত্য মৌখিক সাহিত্য দুটো বিষয়ে আপনার সাহিত্য জীবনের অনেকদিনের সফর। একটু বলুন?
৮. লোকজীবন ভারতবর্ষের ভিত্তি। লোকসংস্কৃতিও তাই আমাদের প্রাণের জিনিস। আমার লেখায় তা ফিরে ফিরে আসে।'কথার কথা' উপন্যাসটি উত্তর-পূর্ব ভারতের লোককাহিনীকে ব্যবহার করে লেখা হয়েছে।
প্রশ্ন :৯
দেশভাগ আমাদের কথাসাহিত্যে কতটুকু ধরা দিয়েছে?
উত্তর :৯.
আমার জন্ম এপার বাংলায় এবং দেশভাগের বেশ কয়েক বছর পরে। তবে আমার অনেক বন্ধু ও পরিচিতজন দেশভাগের শিকার। তাঁদের কষ্ট দেখেছি। অনেকের লেখা দেশভাগের সাহিত্য নিয়ে আলোচনাও করেছি। আমার ওই বাংলায়' নামে একটি বই আছে। বাংলাদেশের নানা জায়গা ঘুরে লিখেছিলাম। সেখানেও দেশভাগের প্রসঙ্গ এসেছে।
প্রশ্ন :১০
আপনার কথন আঞ্চলিক ভাষায় হলেও প্রমিত উচ্চারণেও আপনি দক্ষ। এই অর্জনের নেপথ্যের শিল্পবয়ন শুনতে চাই?
উত্তর :১০.
আমি বেড়ে উঠেছি লোকজীবনের মধ্যে। ব্রতকথা, কীর্তন, রামায়ণ পাঠ, লোকগল্প ইত্যাদি শুনেছি প্রায় নিত্যদিন। আমার গল্প-উপন্যাসে কথকতার কথনভঙ্গি খুঁজে পাবে। আমি ছোটোবেলায় এক বৃদ্ধার কাছে খুব গল্প শুনতাম। নাম উমাশশী দেবী। পাড়ার লোক বলত 'দিবাকরের পিসি'। সেই পিসিকে আমি আমার 'ভবদীয় নঙ্গরচন্দ্র' উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছি। আর একটি বই উৎসর্গ করেছি আমাদের গাঁয়ের কীর্তনীয়া ফেঁতিরানি দাসীকে। নিরক্ষর কিন্তু ফেঁতিদির অনেক লীলা ও পালা মুখস্থ ছিল। নিজের কথা বলতে অস্বস্তি হয় তবু তথ্যের খাতিরে বলি আমি তিপ্পান্নটি ভারতীয় ভাষার লোকগল্প নিয়ে একটি সংকলন করেছি। গল্পগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছেন তেতাল্লিশজন অনুবাদক। অধিকাংশ মূল থেকে অনুবাদ। আমি মনে করি লোকসাহিত্য আমাদের নিজস্ব সম্পদ। বিলেতি শিক্ষাব্যবস্থা আমাদের অনেক শেকড় কেটে দিয়েছে। আমাদের কবিতা, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদিতে আমাদের দেশজ ফর্ম ও কথনরীতি ব্যবহার করা জরুরি।
প্রশ্ন :১১
দেশভাগ আমাদের কথাসাহিত্যে কতটুকু ধরা দিয়েছে?
উত্তর :১১.
দেশভাগের কথা আমাদের সাহিত্যে ভালোই এসেছে। সেই সব লেখা নিয়ে আলোচনাও প্রকাশিত হয়েছে। আমিও আলোচনা করেছি। তবে ঠিক কতটা লেখা হলে ভালো হতো তার তো কোনো নির্দিষ্ট মাপকাঠি নেই। তবে অনেক ভালো লেখা চোখে পড়েছে। মেয়েরাও লিখেছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক লেখার মধ্যেও দেশভাগের যন্ত্রণার কথা পেয়েছি। আর এই বিষয় নিয়ে লেখার সময় পেরিয়ে গেছে, এমনও নয়। বহু মানুষ আজও ভিটে ছেড়ে চলে আসছেন। কাজেই লেখাও চলবে।
আজ তাহলে এই পর্যন্তই থাক। সপরিবারে সুস্থ থেকো ভালো থেকো, গোবিন্দ।
রামকুমার মুখোপাধ্যায়
২ অগাস্ট ২০২১
0 মন্তব্যসমূহ