কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন
মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
রেজাউদ্দিন স্টালিন। পিতা-শেখ বোরহানউদ্দিন আহমেদ।মাতা-রেবেকা সুলতানা।জন্মস্হান-যশোর।গ্রাম-নলভাঙা।অর্থনীতিতে স্নাতক সম্মান।রাষ্টবিজ্ঞানে এম এ। নজরুল ইন্সটিটিউটের সাবেক উপ পরিচালক। কৈশরেই লেখালেখি শুরু।১৯৭০সালে যশোর থেকে প্রকাশিত শতদল পত্রিকায় প্রথম 'শপথ' নামে কবিতা প্রকাশ।মোট গ্রন্হ১০১।কাব্যগ্রন্হ ৬৫।উল্লেখ্যোগ্য-ফিরিনি অবাধ্য আমি।ভেঙে আনো ভেতরে অন্তরে।সেইসব ছদ্মবেশ। আঙুলের জন দ্বৈরথ। হিংস্র নৈশভোজ। ভাঙা দালানের স্বরলিপি।সবজন্মে শত্রু ছিলো যে।জ্যামিতি বাক্সের গল্প।তদন্তরিপোর্ট। অবুঝ যাদুঘর।প্রতিবিদ্যা।
ছড়াগ্রন্থ -হা্ঁটতে থাকো।শৈশব। চিরশিশু।
গদ্য বই-রবীন্দ্রনাথ আরোগ্য।নজরুলের আত্ম নৈরাত্ম। নির্বাসিত তারুণ্য। কাঠ কয়লায় লেখা।
কবিতা অনূদিত হয়েছে-ইংরেজি।হিন্দী। উর্দু।হিন্দী। উড়িয়া।স্পেনিশ।গ্রিক। রোমানিয়ান।ফরাসী। জাপানি। নেপালি। সুইডিশ। রুশ সহ২১টি ভাষায়।
ভিডিও সিডি১০টা।আবৃত্তিএ্যালবাম-৬টা।প্রদীপ ঘোষের কন্ঠে আবৃত্তি এ্যালবাম-আবার একদিন বৃষ্টি হবে।
পুরস্কার-বাংলাএকাডেমি।মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার। দার্জিলিং নাট্যচক্র
পুরস্কার। ভারতের সব্যসাচী পুরস্কার। পশ্চিমবঙ্গের সেন্টার ফর স্টেজ সম্মাননা।সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার।খুলনা রাইটার্স ক্লাব পুরস্কার।ধারা সাহিত্য আসর পুরস্কার। তরঙ্গ অফ ক্যালিফোর্নিয়া সম্মাননা।লসএন্জ্ঞেলস বাদাম সম্মাননা।লসএন্জেলস রাইটার্স ক্লাব সম্মাননা। ইংল্যান্ড জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন সম্মাননা।
সম্পাদিত পত্রিকা- রৌদ্রদিন।পদাবলি।
মঞ্চ ও টিভি উপস্হাপক।
ভ্রমণ -ভারত।নেপাল।দুবাই।আমেরিকা।ইংল্যান্ড। চীন।
প্রশ্ন :১
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার বয়স কত?তখনকার কোনো বিশেষ স্মৃতি মনে পড়ে?
উত্তর :১
প্রশ্নটি চমৎকার। কৈশোরে অনেক
ছবি আঁকতাম।নদী,গাছ ঘরবাড়ি,রবীন্দ্র নজরুল,সিরাজউদ্দৌলাহ।পাখি,আম, কবুতর।ধীরে ধীরে
এই ছবির খাতা দখল করে নিলোতত ছড়ার ছন্দে,কবিতার রঙধনু।
প্রশ্ন:২
আপনার জীবনের সাথে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কোন বিশেষ ভূমিকা নিয়েছিলো?
উত্তর :২
আমি ১৯৭০ সনে প্রথম লিখি ক্লাস ফাইভের ছাত্র। কবিতার নাম শপথ।ছাপা হয় শতদল পত্রিকায়।সম্পাদক আয়েশা সরদার।
মুক্তিযুদ্ধ ঐ বয়সে দেশকে গভীরভাবে ভালোবাসতে শিখিয়েছিলো।প্রথম কবিতা তারই
বহিঃপ্রকাশ।
প্রশ্ন :৩
পারিবারিক কোন স্মৃতি?
উত্তর :৩
পরিবারের স্মৃতি বিষাদ।মায়ের উপার্জনে চলা।পিতার ২য় বিবাহ।
মায়ের বেদনা অপার।আর ছোটবেলা কেটেছে শঙ্কায়।আনন্দ
কিছু আছে।ফুটবল খেলা,ঘুড়ি উড়ানো।
প্রশ্ন:৪
ছোটবেলা থেকে বেড়ে ওঠা কেমন কাটছে দিন?ছোটবলার বেড়া ওঠা গ্রামের বিশেষ কোন স্মৃতি?আপনার জন্মের সময় আপনার বাবা মা পরিবার কোথায় বসবাস করতেন?
উত্তর :৪
আমি যশোর মাইকেল মধুসূদন মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হই ১৯৭৬সালে।ধীরে ধীরে যুক্ত হই বাম রাজনীতির সাথে।কলেজের প্রথম দিনেই নবীনবরণ উৎসবে বক্তৃতা দিয়ে বাজিমাত করি।তারপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত অর্থনীতিতে অনার্স পড়া পর্যন্ত ৫ বছরে নানা স্মৃতি।প্রেম বিরহ আর বিপ্লব।নির্বাচনে বিজয়,সংঘর্ষ। মৃত্যু আর রাজনৈতিক দোলাচল।
কত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি মাইকেল,রবীন্দ্রনাথ, নজরুল,পহেলা বৈশাখ।কত পিকনিক কত বন্ধুত্বের বন্ধন।
একদিন সেই আনন্দময় জগত ছেড়ে আসতে হলো।সবকিছু আজ স্মৃতি।
প্রশ্ন :৫
তরুণদের নিয়ে আপনি আশাবাদী নিশ্চয়ই।কিন্তু পিঠ চাপড়ানোর একটা রেওয়াজ চলছে।এতে সাহিত্যের লাভক্ষতি কি তেমন হচ্ছে?
উত্তর :৫
তরুণদের নিয়ে আশা রবীন্দ্রনাথেরও ছিলো।প্রশংসা ভালো তোষামোদি, পিঠ চাপড়ে দেয়া ভালো না ওগুলো টেকে না।
প্রশ্ন :৬
প্রায় সকল প্রকাশক, লেখক যখন পাঠক শূন্যতা ঢের পান তখন কেউ কেউ একেকটি মেলায় কোন কোন বইয়ের দ্বিতীয় তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার বিজ্ঞাপন দেন।এটা তাহলে পাঠকশূন্যতা নয়? নাকি অন্য কোন যাদুবলে একজন লেখক পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন? কিংবা একজন প্রকাশক পাঠকের চাহিদা সত্যি সত্যি অগ্রীম ধরে নিতে পারেন?
উত্তর :৬
কবিতার বই কোথাও খইমুড়ির মত যায় না।আত্মপ্রসাদ
লাভে কেউ কেউ বিজ্ঞাপন দিতে পারেন, ওসব চালাকি চলে না।মানুষ পাঠক বোঝে।উপন্যাস
কিছু যায়।তাও সস্তাগুলো।
প্রশ্ন :৭
কবিতার দিনগুলোর প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি আছে?
উত্তর :৭
প্রাপ্তি কবিতায় পরোক্ষ। পাঠকের সমর্থণ আর মানুষের
ভালোবাসা।
কবিতা কোনো ভিন্ন গ্রহের বিষয় না।মৃত, প্রচলিত নিয়ম ভাঙার মন্ত্র কবিতা।কবিতা অন্তর স্পর্শ করলে মানুষ জেগে ওঠে।এখানেই জিয়নকাঠির রহস্য।
প্রশ্ন :৮
আপনার সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এলে বলুন?বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিরা এত আন্তরিক কেন ছিলো?
উত্তর :৮
এই যুদ্ধটা ছিলো বাঙালির অস্তিত্বের।হাজার বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির।মাতৃভাষার পবিত্রতা রক্ষার।এজন্য বাঙালি আন্তুরিক ছিলো।
প্রশ্ন :৯
মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ কোনো স্মৃতি যা কোথাও বলা হয়নি?
উত্তর :৯
মুক্তিযুদ্ধের একটা স্মৃতি কাউকে বলা হয়নি।আমি ৫ম শ্রেণির ছাত্র।পাড়ার বড়রা যেখানে স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতো সেখানে গিয়ে সংবাদ শোনার আশায় বসতাম।কিন্তু আমাকে ছোট বলে তাড়িয়ে দিতো।একদিন রাতে বাজিয়ে
ফুটিয়ে ভয় দিয়েছিলাম।
প্রশ্ন:১০
দেশভাগের যন্ত্রণা একজন কবিকে পীড়িত করে।আপনার পরিবার কি এমন কোন পরিস্থিতির শিকার?
উত্তর :১০
দেশভাগ নিশ্চয় প্রতিটি কবি সাহিত্যিকের কাছে বেদনার।বাংলাভাষা ও সংস্কৃতি দ্বিখণ্ডিত। রাজনীতির অদূরদর্শীতা আমাদের স্বপ্নকে ভেঙেছে।
প্রশ্ন :১১
জনজীবনে কিরকম প্রতিক্রিয়া ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়।দেশভাগের ফলে আমাদের বাংলা সাহিত্যের উপর কিরকম প্রভাব পড়ে?
উত্তর :১১
কবে দেশ স্বাধীন হবে।কবে আমরা মুক্তি পাবো।এই ছিলো আকাংখা।
প্রশ্ন :১২
কবিতায় আপনি বরাবরই সাম্যবাদের কথা বলেন।মানুষের কথা বলেন।সমস্যা নয় সমাধানের পথ বাৎলে এগিয়ে যেতে চান এক মানবিক বিশ্বগঠনে।এই চেতনায় দীক্ষিত হবার পূর্বপাঠ যদি বলেন?
উত্তর :১২
আমি মনে করি কবিতা মানুষের কাজে না এলে অসার হয়ে যায়।শিল্প মানবকণ্ঠ। পৃৃথিবীর কোনো কবি সাম্যের কথার বাইরে কিছু বলেন না।আমি কবি যত মানুষের।
দশমশ্রেণির ছাত্র থাকাকালীন পাঠ নিই মার্ক্সসিজমের।এখনো মানুষের সমান অধিকারে বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন :১৩
আপনার পরিবার তখন কোথায় থাকতেন?পরবর্তী সময়ই বা কোথায় এলেন?
উত্তর :১৩)
আমরা থাকতাম যশোর নিউমার্কেট। মুক্তিযুদ্ধে গ্রামে ফিরি।নলভাঙা গ্রাম,নানী বাড়ি।আর বয়স যখন৪/৫ থাকতাম যশোর কালিগন্জ্ঞে।
প্রশ্ন :১৪
দেশভাগ বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর সাহিত্যে কিরকম প্রভাব ফেলেছে?
উত্তর :১৪
দেশভাগ বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটা ঐতিহাসিক বিষয়।এর সাথে জড়িত রাজনৈতিক সংস্কৃতি।হিন্দু মুসলমানরা মাইগ্রেট করার ভেতর অনেক গল্প অনেক বেদনা
তৈরি হয়েছে।তা সাহিত্যের একটা পলাবদলে সহায়তা করেছে।
প্রশ্ন:১৫
আপনার কবিতাসংকলনগুলোর নাম নির্মানের গোপন জিয়নকাটি কিরকম?
উত্তর :১৫
প্রতিটি গ্রন্হের আলাদা আলাদা উদ্দেশ্য থাকে।মেটাফর ভিন্ন।নামকরণও সেখান থেকে আসে।
প্রশ্ন :১৬
দেশভাগ আমাদের কথাসাহিত্যকে কতটুকু সমৃদ্ধ করতে পেরেছে বলে মনে করেন?
উত্তর :১৬
দেশভাগ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক কারণে কথাসাহিত্যের বিষয়কে ত্রিমাত্রিক ভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
প্রশ্ন :১৭
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কৈলাসহরের ভূমিকা কেমন ছিলো?
উত্তর:১৭
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কৈলাসহরের ভূমিকা গুরুত্ববহ। মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দান,সহযোগিতা, শরণার্থীদের প্রতি সহমর্মিতার ক্ষেত্রে উনোকটি জেলার এই এলাকাটির ভূমিকা ঐতিহাসিক। বাংলাদেশের মানুষের ঋৃণ আছে।
প্রশ্ন :১৮
আপনার সাহিত্যে দেশ ভাগের প্রভাব কতটুকু?কিংবা এই বিষয়টি কেমন করে আসে?
উত্তর:১৮
দেশভাগের বিষয়টি কবিতায় আসে ঐতিহাসিক কারণে। কবি কাজী নজরুল বাঙালি জাতির অখণ্ড আবাসভূমির দাবি করেছিলেন।আমাদের অপারগতা আমরা পারিনি সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটাতে।
প্রশ্ন :১৯
আপনার কবিতায় দেশভাগ,মুক্তিযুদ্ধ কিরকম এসছে?
উত্তর :১৯
আমার কবিতায় দেশভাগের যন্ত্রণা আছে।প্রজন্মের দায়বদ্ধতা থেকে এই বোধ। বেশ কয়েকটি কবিতায় আমি সে কথা বলেছি।
প্রশ্ন :২০
বাঙালি জাতির জীবনে কাঁটাতার নিশ্চয়ই খণ্ডিত জাতিসত্তার জন্ম দিয়েছে?নাকি এর প্রভাব শুধু শিল্পসাহিত্যেই বাস্তবে কিছুই নয়?
উত্তর :২০
কাঁটাতারের ক্ষত বাস্তবতায়।যখন তা পার হতে গিয়ে প্রাণ দিতে হয়।শুধু কবিতা কথাসাহিত্য কিংবা প্রবন্ধে নয় বরং কাঁটাতার এক সংগ্রামের নাম।
প্রশ্ন :২১
কী আঁকেন কেন আঁকেন কিংবা কী লিখি কেন লিখি?
উত্তর :২১
লেখককে এই প্রশ্ন শুনতে হয় আজন্মকাল। আমার চারপাশে অনন্তর সংঘটিত কার্যাবলী আমার অনুভব ও অভিজ্ঞতা দিয়ে লিখি।যেখানে সমকালীন সমাজের মানুষের শিল্পীত অভিব্যক্তি প্রকাশ পায়।
কেন লিখি,লিখে আনন্দ পাই তাই লিখি।আমি একজন আনন্দবাদী। দু:খদীর্ণসময়ের
প্রান্তরে আনন্দ অন্বেষক। কিন্ত
একুশ শতকে কুহক।আমি একজন আদর্শ পাঠকের জন্য লিখি।প্রথমে নিজের কল্পনা দিয়ে
পাঠকের অস্তিত্ব তৈরি করি পরে নিজের মনের মধ্য পাঠককে ধারণ করি এবং লিখি।
0 মন্তব্যসমূহ