কবি সুবল দত্ত মুখোমুখি কবি গোবিন্দ ধর

কবি সুবল দত্ত 
মুখোমুখি 
কবি গোবিন্দ ধর 
গোবিন্দ ধর: আপনি প্রথম কখন লেখালেখিতে আসেন?
সুবল দত্ত:   যারা আমার লেখা সম্মন্ধে অবহিত তারা আমাকে সত্তর দশকের কবি বলেন। আমার জন্ম ১৯৫৫ সালে। আমি কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পাই জীবনানন্দ দাশ ও বুদ্ধদেব বসু পড়ে। তখন আমি ক্লাস সিক্স কি সেভেনে পড়ি। ১৯৬৬ কি ৬৭ সালে আমার প্রথম কবিতার খেরো খাতা। প্রথম কবিতা এরকম, ‘আমার বিবেকসুধা পান করে/হে আমার মহাকবি সুখ/তৃপ্ত হও তৃপ্ত হও তৃপ্ত হও তুমি সবান্ধবে’ এবং এইভাবে সেই জীর্ণ কবিতার খাতায় কয়েকটি অপ্রকাশিত কবিতার মধ্যে একটি : পাখপাখালী ডাকল আমার চোখে পড়ল রো/সুরকি বিকেল খিড়কি খুলে এলেই যখন গো/চালতা শিকড় চিরে ফাল/কাটুম কুটুম লালে লাল/কাঠের রাজা কেঁদে ভাসায় ফিরে যেওনা/বয়েস হলো আবার কি/সবুজ বনের উকুনটি/ভুল বুঝেছে কালো শিরায় আঙুল রেখোনা। ১৯৭০ থেকে ১৯৯০ অব্দি অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার যত লড়াই করতে হয়েছে তত আমার হাত দিয়ে যেসব কবিতা বেরিয়েছে সেগুলোর অনেক প্রকাশিত হয়নি কিন্তু আমার খুব প্রিয়। যেমন: ‘সারা রাত জাগে এলিট বস্তি শ্রমিক মশার ধুম/মশা তাড়ানোর রসায়নে রাণী মশাদের ডিম ভাসে/সুইমিং পুলে পুরুষের রেতে সভরে মশার শুঁড়’ বা ‘আমরা সব উষ্ণতার খুব কাছে আছি’। আমার প্রথম কবিতার চটি বই ‘মুখোশের চোখের ছেঁদায়’। তখন আমি ধানবাদে। সেই সময়কার কবিতা সংকলন ‘ দাহ্য পৃথিবী’। এর পাশাপাশি আমার যেমন যেমন অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আমি গদ্য প্রবন্ধ ও ছোটগল্প ও খসড়া চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ছোটবেলা থেকেই আমার লেখা প্রকাশের কোনো তাগিদ ছিলনা। কেন জানিনা,আমার মনে হয়,এইসব লেখা আমার ভিতর থেকে উত্সরিত হয়েছে যখন তখন নিজেই নিজের রাস্তা খুঁজে নেবে। এবং তাই হয়েছে। আমি তন্ময় বীর,বিশ্বজিত বাগচী ও মানবেন্দু রায় এর কাছে চির কৃতজ্ঞ।      
 
গোবিন্দ ধর: লেখালেখির মতো আঁকিবুঁকিতেও  আপনার পারদর্শীতা থাকে। বিষয়টি কখন শুরু হয়?
সুবল দত্ত:  ছবি আঁকা কবে থেকে শুরু করেছি আমার মনে নেই। কিন্তু আমার আঁকা ছবি মূলত অমূর্তধর্মী বা অ্যাবস্ট্রাক্ট। এবং সেটা শুরু থেকেই। কলেজে ভর্তি হওয়ার ঠিক পরেই আমার ছবির একল প্রদর্শনী হয়। কিন্তু আমার ক্যারিয়ারের কথা ভেবে হোক বা লেখালেখির কথা ভেবেই হোক, ছবি আঁকা আমি গৌণ করে রেখেছিলাম। কিন্তু তবুও আমার ছবির অনেকগুলি প্রদর্শনী হয়ে গেছে। ঝাড়খন্ডে, বিহারে, আমেদাবাদে এবং পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জায়গাতে আমার ছবির প্রশংসা হয়েছে। পুরস্কারও পেয়েছি। ছবিগুলোকে আঁকি আমি কাব্য ভাবনাতে যার জন্য ছবিগুলো রিয়ালিস্টিক হয়না। পোর্ট্রেটও এঁকেছি। ভিন্ন মাত্রায়। 
 
গোবিন্দ ধর: কবিতার দিনগুলোর প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি আছে?
সুবল দত্ত:  কবিতার দিনগুলোর হিসেব দিতে আমি একটু অতীতের খেই ধরতে চাই। সেকালের পটকথা বাউল কবিতার শব্দগুলির ভাব জন মানুষের কষ্ট গ্লানি থেকে পরিত্রাণের প্রার্থনা। তারপর রবীন্দ্রনাথ অব্দি কবিতায় সমর্পণ। সেখান থেকে নজরুল এবং সমসাময়িক কবিরা কবিতাকে দ্রোহ মুক্তি ও সমাজ সংস্কারের হাতিয়ার করেছেন। তারপর জীবনানন্দ দাশ প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রমুখ কয়েক দশক ধরে রাখলেন কবিতায় অদ্ভুত আবেগ। কিন্তু তারপরই ক্ষুধা যৌন পীড়া যন্ত্রনা ও অস্তিত্ব সংশয়ের ঢেউ বয়ে গেল কয় দশক। যেমন হাংরি নিম আদি কাব্য আন্দোলন। এর মাঝে অবশ্য কিছু ভাবপ্রবনতা কবিতায় অবশ্য ছিল। কিন্তু তার শৈলী ছিল, ব্যাকরণ ছিল, নিয়ম ছিল। তারপর একটি অসফল প্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলন চলেছিল। শতাধিক কবি একজুট হয়ে কবিতার প্রবাহকে উত্কর্ষতা দিয়েছে। কিন্তু বেশীদিনের জন্যে নয়। সেসময় সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ছিল না। প্রচুর উত্সাহ বর্ধক কবি সম্মেলন হতো।
এখন জানিনা কেন মনে হয়, কবিতায় বড়বেশি আমি আমি ভাব। সেটাও বুঝি ক্যালিডোস্কোপিক। ছেঁড়া ছেঁড়া বহু আবেগের মিশ্রণ।এতোবেশি, যে অনেক কবির কবিতার একলাইন পড়ে পাঠকের মনে যে ভাব জাগে, দ্বিতীয় লাইনে তার ভাব দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। কনফিউজন ছাড়া কবিতার কোনো মর্ম নেই। সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচণ্ড দাপট। তাতে ভাব চুরি, সরাসরি চুরি, যাকে বলা হয় প্ল্যাগিয়ারিজম অবাধ। এতে ভাবুক স্পর্শকাতর অন্তর্মুখী কবিরা কেমন যেন চুপ মেরে গেছে। সত্যিকারের যারা কবি, তারা কবিতা লিখে কখনোই বিনিময় চায় না। নিজের রক্ত নিংড়ে কবিতা লেখে তার প্রশংসাও হয়তো কখনো চায় না। সে নিবেদন করেই খুশি। কিন্তু সমাজের কি দায়? জানিনা।    
 
গোবিন্দ ধর: আপনার জন্মের সময় আপনার বাবা মা পরিবার কোথায় বসবাস করতেন?
সুবল দত্ত:  জন্ম থেকেই আমার দেশের বাড়িতে প্রত্যন্ত গ্রাম্য পরিবেশে আমার মা বাবার সঙ্গ পেয়েছি। ওদের সান্নিধ্যেই আমার বড় হওয়া। উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে আমি আমার জন্মভূমি মানবাজার ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিহার প্রদেশে (বর্তমানে ঝাড়খণ্ড) সিংভূম জেলার সদর মহাকুমা চাইবাসায় আমার মেজদার কাছে চলে এলাম সেখানের কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান স্নাতকে ভর্তি হলাম। মা আমার সাথে ছিলেন। তারপর চাকরিসূত্রে ধানবাদে এলাম। বিয়ে হল। পরিবারের সাথে সেখান থেকেই আমার শুরু হল জীবন জীবিকা।

গোবিন্দ ধর: আপনার ছোটবেলার স্মৃতি শুনবো?
সুবল দত্ত:  আমার শৈশব কাল একরকম নিঃসঙ্গই কেটেছে। আমি নিজে নিজেই সমবয়সী বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে সরে থাকতাম। ওরা যখন খেলত ঝগড়া করতো মারপিট করত তখন আমি নিঝুম সবুজ প্রকৃতিতে প্রজাপতি, ঘাসফড়িং, বর্ষার লাল ভেলভেট পোকা, কেন্নো খুব কাছ থেকে তন্ময় হয়ে দেখতাম। ভয় ডর ছিল না। বর্ষায় যখন পুকুর টইটুম্বুর, তখন পাড়ের পাশে অশত্থ গাছের মগডালে চেপে  জলে ঝাঁপ দিতাম। সন্ধ্যেবেলায় তিন মুড়িয়া দাদুর কাছে (দুই হাঁটু ও মাঝে  মুন্ডু) বসে থাকতাম। উনি হুঁকো  টানতেন আর কাশতে কাশতে রাত কথা শোনাতেন।শুনতে শুনতে কোথায় যেন হারিয়ে যেতাম। শরের তৈরি কলম ও নীল বড়ি গোলা কালি দিয়ে হাতের লেখা মকশো করতাম। আমাদের পুরনো মাটির দোতলা বাড়ির কোঠাঘরের জানালার পাশে বসে থাকতাম। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হওয়ার সময় অসম্ভব নির্জনতা ভেদ করে এক বড় সাপ একটা ভাঙ্গা দেওয়ালের ফাঁক দিয়ে বের হতো। ছোট কুলোর মতো ফনাও তুলতো তারপর সর সর করে চরতে চলে যেত। রোজ বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হবার সময় ও আবার আসত। এ নিত্য নৈমিত্তিক রুটিন। তারপর কবে যে ও কোথায় চলে গেল আমার মনে নেই। আমি যখন ক্লাস ফাইভে উঠলাম বড় স্কুলে ভর্তি হলাম সেখানে আমার অতি প্রিয় ঘনিষ্ঠ বন্ধু হল প্রদীপ মুখার্জী। তার বাড়ি আমাদের লোকালয় ছেড়ে অনেক দূরে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের ভিতরে। নাম হরিহরপুর। ওদের খুব বড় বাড়ি। করোগেটেড টিনে  ছাওয়া চালা। অনেকগুলো ঘর। বাড়ি থেকে একাই সাইকেল নিয়ে চলে যেতাম সেখানে। ছুটির দিন ওখানে কাটিয়ে বাড়ি ফিরতাম। তখন আমি ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ি। আমাকে কেউ বাধা দেয়নি। প্রদীপের বড়দা আমাদের সঙ্গে নিয়ে বন্দুক দিয়ে বুনো হাঁস শিকার করতে বেরতেন। দূরে সুবর্ণরেখা নদীর বিস্তীর্ণ বাঁধ। কংসাবতী প্রজেক্ট। দূরে নীল পাহাড়ের বাঁধের দিকে মুখ করে এ পাড় থেকে আমরা খুব জোর চেঁচিয়ে নিজেদের নাম ডাকতাম।     প্রতিধ্বনি ফিরে আসত। ছোটবেলা আমার খুব ভালোভাবে কেটেছে।
 
গোবিন্দ ধর: ছোটবলার বেড়ে ওঠা গ্রামের বিশেষ কোন স্মৃতি?
সুবল দত্ত:   আগেই বলেছি, আমাদের গ্রামের কাছাকাছি এক গভীর জঙ্গল ও নির্জন নদীতীর। যখন আমি সাইকেল পুরোপুরি শিখে ফেলেছি,তখন থেকে প্রকৃতিপ্রেমের অবাধ টানে চলে যেতাম একাই। আমার গ্রামের স্কুলের বন্ধু যত অন্তরঙ্গ ততটা আমি কলেজ ও কর্মজীবনে পাইনি। সন্ধে বেলায় স্কুলের মাঠে আমাদের ভিতর কত বিষয়ে কত যে আলোচনা হতো সে এখন সুখদায়ক স্মৃতি। সেখানথেকে আমার ছবি আঁকা, অঢেল রবীন্দ্র সঙ্গীত, অধুনা বিজ্ঞান বিষয়ে রুচি এবং নানান বিষয়। শরীর চর্চাও একটা রুটিন ছিল আমাদের। আমাদের গ্রুপকে গ্রামে বিশেষ স্নেহের নজরে দেখতো।  

গোবিন্দ ধর: আপনার কলেজ জীবনের গল্প বলুন?তখনকার বিশেষ স্মৃতি?
সুবল দত্ত:   আমি পুরোপুরি বাংলা মিডিয়ামের ছাত্র হয়েও আমাকে পারিবারিক চাপে বিহার প্রদেশের(অধুনা ঝাড়খন্ড) সিংভূম জেলার চাইবাসার একটি কলেজে ভর্তি হতে হয়। কিন্তু একাডেমিক ক্যারিয়ারের জন্য, বিশেষ করে বিজ্ঞানের পদার্থবিদ্যার ছাত্র হয়েও আমি নিভৃতে বাংলাভাষা চর্চা করছিলাম। এব্যাপারে কলেজ আমাকে একেবারেই সাথ দেয়নি। কিন্তু চাইবাসাতে আমি সমীর রায়চৌধুরী মত একজন প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিককে সঙ্গে পেয়েছিলাম এবং আমি ও কয়জন তার সাথে মিলে ‘উইঢিবি’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশিত করেছি। সেখানে শক্তি চট্টোপাধ্যায় কমল চক্রবর্তী বারীন ঘোষাল লিখতেন। সন্তোষ কুমার ঘোষ চাইবাসাতে বসে একটা লেখা লিখে আমাদের দিয়েছিলেন। তার সাথে হিন্দী জগতের প্রখ্যাত সাহিত্যিক সী ভাস্কর রাও, রীতা শুক্ল, প্রখ্যাত মৈথিলী কবি মন্ত্রেশ্বর ঝার সান্নিধ্য পেয়েছি এবং তাই আমাদের সেই পত্রিকাটি জাতীয় স্তরে উঠে গেছিল। সত্তর দশকে সেই পত্রিকাটি উত্তর আধুনিকতার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে বিশেষ নাম করেছিল। আমার লেখালেখির ছাপা অক্ষরে প্রকাশনার সেই ছিল সূত্রপাত।

গোবিন্দ ধর: দেশভাগের যন্ত্রণা একজন কবিকে পীড়িত করে। আপনার পরিবার কি এমন কোন পরিস্থিতির শিকার?
সুবল দত্ত:  দেশভাগের পীড়া আমি পড়ে জেনে উপলব্ধি করেছি কিন্তু আমার পরিবার এমন কোনো পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি।
 
গোবিন্দ ধর: আপনার সাহিত্যে দেশ ভাগের প্রভাব কতটুকু? কিংবা এই বিষয়টি কেমন করে আসে?
সুবল দত্ত:    আমার জন্ম হয়১৯৫৫ সালে এমন একটি স্থানে, যেখান থেকে সদর জেলা পুরুলিয়া বাঁকুড়া টাটা রাঁচী কলকাতা সব শহরগুলি একশো থেকে পাঁচশো কিমি রেঞ্জে। দেশ ভাগ দূরে থাক স্বাধীনতার প্রভাব পর্যন্ত আমাদের বোধে সরাসরি আসেনি। পরিবহন প্রায় ছিলই না বলা চলে। তাই যতটুকু জানা তা পুস্তক মাধ্যমে। কিন্তু আমার সাহিত্যে এই জ্ঞানের অভাবের জন্য ভিন্ন মাত্রিক কষ্ট ও ভিন্ন যাপনে এক ভিন্নরকমের পরাধীনতা এসেছে যা এখন পাঠককে আকৃষ্ট করে। দেশভাগের অভিজ্ঞতা আমার সরাসরি হয়নি যখন পড়ার সময় হয়েছিল পরে জ্ঞান অর্জনের বয়স হল তখন জানতাম জেনেছি ও তাতে অনুভবে যা হয়েছে তাতে আমার দেশমাতৃকার উপর প্রেম কম নয়। আমার কবিতায় সেই দেশপ্রেমের প্রভাব আছে। 
 
গোবিন্দ ধর: কথাসাহিত্যেও আপনার পদচারণা উল্লেখযোগ্যভাবেই বাংলাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে। বিনয় মজুমদারকে আপনার উপন্যাসের প্রস্তুতি নিয়ে জানবো
সুবল দত্ত:  আমার উপন্যাস ফিকশন ছোটগল্পগুলি বেশীরভাগ সিংভূম মানভূম হিমাচল প্রদেশ ও ওড়িষ্যার প্রত্যন্ত গ্রাম ও জঙ্গল এরিয়ার মানুষদের আদিম সংস্কৃতি ও জীবনযাপন ও তাদের উপর শোষণ নিয়ে। যা পাঠক মহলের অনেকের কাছে বিস্ময়কর ও অপরিচিত লাগে। তাই বুঝি আমার গল্পগুলি পাঠকের এত প্রিয়। বিনয় মজুমদার আমার অতি প্রিয় কবি। প্রতিটি কবিতার ছত্রে ছত্রে এমন কিছু আছে যে, তার থেকে যে আবেগ উঠে আসে সেই আবেগ কিছু লেখার জন্যে প্রলুব্ধ করায়। আমি বলব বিনয় মজুমদার একটি সাহিত্য আন্দোলন।  
 
গোবিন্দ ধর: আপনার কবিতা সংকলনগুলোর নাম নির্মানের গোপন জিয়নকাটি কিরকম?
সুবল দত্ত:   আমার প্রথম কবিতার বইয়ের নাম ‘মুখোশের চোখের ছেঁদায়’। নামটি আমার কবি বন্ধু নির্মল হালদারের একটি কবিতার লাইন থেকে নেওয়া। এই সংকলনের প্রায় সব কবিতাই মুখোশ নাচিয়ের অন্তর্দৃষ্টি তার নানা আবেগ অত্যাচারিত হওয়ার জ্বালা প্রকাশ করেছে। যেমন একটি দ্রোহ, ‘…মাটির ভিতরে কানশিরা ফুলেদের সরোষ স্বমেহনে/জ্বলে ওঠে খাদান বিদ্রোহ/সব বন হৃদয় ঘাতক/সব গাছে দাহ্য ফুল ফোটে/নারীর নির্জন প্রদেশে এইবার বিশ্রামের শেষে/রমণীয় কোমল ফুলেরা সব কঠিন পুরুষত্ব লাভ করে’। দ্বিতীয় কবিতা সংকলন ‘দাহ্য পৃথিবী’। এর বেশীরভাগ কবিতা কয়লাখনি অঞ্চল ধানবাদে থেকে লেখা। সেখানের বদ্ধ কালো ধুয়োয় আচ্ছন্ন হাজার নিরুপায় মানুষের পরিত্রাণের আশা কবিতাগুলিতে। অধুনা একটি কবিতা সংকলন ‘এক এক মুগ্ধতার ছটা’। প্রায় এডভান্স  স্টেজের ক্যান্সারে আক্রান্ত ভেলোর হাসপাতালে আমি যখন কেমো নিচ্ছিলাম, সেইসময়কার কবিতাগুচ্ছ এই কবিতা সংকলনে লিপিবদ্ধ হয়েছে। 
 
গোবিন্দ ধর: কবিতায় আপনি বরাবরই সাম্যবাদের কথা বলেন। মানুষের কথা বলেন। সমস্যা নয় সমাধানের পথ বাৎলে এগিয়ে যেতে চান এক মানবিক বিশ্বগঠনে। এই চেতনায় দীক্ষিত হবার পূর্বপাঠ যদি বলেন?
সুবল দত্ত:  আমার অভিজ্ঞতায় আমি সার বুঝেছি, আমরা যারা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর,তারা প্রতি পদক্ষেপে শোষণের ফাঁদে পড়ে। পড়েই। এ এক অনিবার্য নিয়ম। যারা অবহেলিত সমাজ বহির্ভূত শোষিত তাদের জন্য এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর দয়ালু মানুষেরাই কাঁদে। কিন্তু সেই আমরাই ওদের সেন্টিমেন্টাল এক্সপ্লয়টেশন এর বলি হই। এদিকে শোষকশ্রেণীর গোষ্ঠী দল বা পরিকাঠামো, প্রকৃতি পরিবেশ সমাজ অর্থনীতি আইন ইত্যাদির উপর এমন শোষণ তন্ত্র চালায় এবং প্রতি বছর দুই কি পাঁচবছরে আধুনিক আপডেটেড হতে থাকে যে কিছুই করার থাকেনা। আমরা মধ্যবিত্তেরাই সাম্যবাদের কথা ভাবি, আন্দোলনের কথা ভাবি কিন্তু সফল হইনা। কারণ আমাদের অস্তিত্বের ভয়। সেইদিক থেকে আমাদের উপরের ও নিচের স্তরের মানুষেরা দলবদ্ধ গোষ্ঠীবদ্ধ থাকতে পারে। আমরা মধ্যবিত্তেরা পারিনা। এটা আমার ভাবনা। যখন থেকে জ্ঞান হয়েছে তখন থেকেই শোষক শোষিত সাম্যবাদ, সংসার ও পরিবেশের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে এমন মানসিকতা হয়েছে যে সেই দৃষ্টিভঙ্গী ছাড়া লেখালেখির কথা ভাবা যায় না। কিন্তু আমি চেষ্টা করি শোষণের বিজ্ঞান ও সমাজপ্রসূত নানা দিক গল্পের মাধ্যমে তুলে ধরা।
 
গোবিন্দ ধর: তরুণদের নিয়ে আপনি আশাবাদী নিশ্চয়ই। কিন্তু পিঠ চাপড়ানোর একটা রেওয়াজ চলছে।এতে সাহিত্যের লাভক্ষতি কি তেমন হচ্ছে?
সুবল দত্ত:   বিশ্বায়নের পটভূমিতে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য এখনকার প্রজন্ম বাংলা ভাষাই ভুলতে বসেছে। বেশিরভাগ বিদ্যালয়গুলি ইংরেজি মিডিয়াম। বাংলা মিডিয়ামের ছাত্রদের ক্ল্যাসিক্যাল সাহিত্য ও ব্যাকরণ শেখাতে শেখাতে তাদের রুচি ও অনুভুতিগুলো ক্লান্ত হয়ে পড়ে। অনেক দেরি হয়ে যায়। কর্মজীবন যাপনের জন্যে ভিন্ন ভাষাভাষীর রাজ্যে বিচরণ করতে হয়। সেখানের সংস্কৃতি ভাষা শিখতেই হয়। তাই বাংলা আধুনিক উত্তরাধুনিক সাহিত্যের ধারক বাহক হবার যোগ্যতা আর কত জনের? যে কজন উঠছে তাদের উত্সাহ দিতে পিঠ থাপড়ানো ছাড়া আর কি উপায় আছে? এতে যদি পঠনপাঠনের রুচি বাড়ে তো সাহিত্যের স্রোত অক্ষয় থাকবে বলে আমার মনে হয়। তবে স্বনামধন্য সাহিত্যিক বাণিজ্যিক পত্র পত্রিকা ও প্রকাশকদের একটু বাজিয়ে নিয়ে তবে পৃষ্ঠপোষক হওয়া উচিত। এটা সেরকম হয় বলে মনে হয়না। তার জন্যেই চিন্তা।    

গোবিন্দ ধর:  প্রায় সকল প্রকাশক, লেখক যখন পাঠক শূন্যতা টের পান তখন কেউ কেউ একেকটি মেলায় কোন কোন বইয়ের দ্বিতীয় তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশ হওয়ার বিজ্ঞাপন দেন।এটা তাহলে পাঠকশূন্যতা নয়? নাকি অন্য কোন যাদুবলে একজন লেখক পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠেন? কিংবা একজন প্রকাশক পাঠকের চাহিদা সত্যি সত্যি অগ্রীম ধরে নিতে পারেন?
সুবল দত্ত:  আমার মনে হয়, এই দু তিন দশক ধরে বাণিজ্যিক প্রকাশকেরা তাদের নির্ধারিত কথা সাহিত্যিকদের বই দিয়ে পাঠকদের ধরে রাখতে পারছেন না। নতুন প্রজন্ম এখন বড় বেশি ইংরেজি বেস্ট সেলারগুলোর দিকে ঝুঁকছে। ওরহান পামুক, পাওলো কেলো, ম্যাট হেগ আদির উপর খুব আকর্ষণ। বাংলাদেশের সাদাত হোসেন,আরিফ আজাদ এদের বই প্রচুর বিক্রি হয়। তাই পাঠক শূন্যতা আমার মনে হয় নেই, বরং পশ্চিমবঙ্গে লেখক শূন্যতাই বেশি মনে হয়। আর লেখক শূন্যতা বলছি, এটাও হয়তো ঠিক নয়। যারা জেনুইন লিখছেন তাদের কাছে সেই প্রকাশকেরা পৌছচ্ছেন না। তারাই সেইসব নির্ভেজাল সৃষ্টিশীল লেখকদের কাছে যাচ্ছেন, যারা ওদের নিরুত্সাহিত করেন ও প্র্যাকটিক্যালি ছাপানো ও প্রচারের নামে টাকাকড়ি কেড়ে নেবার তালে থাকেন। তাছাড়া আমাদের বাসস্থানের সংস্কৃতির ও মানসিকতা আর বাংলায় সীমাবদ্ধ নয়। অস্তিত্বের সংকট এমন যে বাঙালি সম্প্রদায় সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে, অথচ বাংলা ভাষার সেইরকম প্রচার প্রসার কম। মনে রাখতে হবে, বিশ্ব সাহিত্যে বাংলার স্থান ওপর দিকেই। তাই পাঠকের মনস্কতা দেখে পঠন পাঠন অধুনা হওয়া স্বভাবিক ও লেখক প্রকাশকের দৃষ্টিভঙ্গি পোস্ট মডার্ন হওয়া উচিত বলে মনে করি।

গোবিন্দ ধর :কি লিখি কেন লিখি?        

সুবল দত্ত:‘কবিতা কেন যে লিখি/ হা তু ড়ি এই তিন অক্ষর লিখলেই কি আর/হাতুড়ি সভরে পড়ে চোখে?’ আজ চার দশক আগের যে খেদ, আজও তাই। যা পড়ছি বুঝছি, লিখছি কম, যা লিখছি তার হয়তো ভাবী প্রভাব কম। উদ্দেশ্যহীন হয়ে গেছি নাকি? কেউ কিছু বলে না। জনস্রোত নির্লিপ্ত প্রবাহিত। প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলছি। আঘাত কোনদিক থেকে কিভাবে আসছে বুঝতে পারিনা। বহু হতাশ সৃজনশীলের মতোই অবদমিত হতে হতে এই অব্দি। তবুও দশক ভেঙে ভেঙে আমাকে আপডেটেড হতে হয়েছে। এই অব্দিই।
       তবে এই জীবনেই কখনো একসময় অক্ষরের ঘাত প্রতিঘাত সত্যিই হাতুড়ির মার ছিল। সৃজন প্রক্রিয়ায় চরম উত্কর্ষতা আনতে অনুসন্ধিত্‍সু থাকতাম। জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘সবার মধ্যে থেকে মুদ্রাদোষে হতেছি আলাদা’। সেই মুদ্রাদোষে অবচেতন থেকে স্বতঃই বেরিয়ে আসে চিন্তন মনন। মর্মলোকের বিবর্তনধারায় আমারও যে একটা ভূমিকা রয়েছে সেই তাগিদ যখন তাড়িত করে, তখন যেকোনো পরিস্থিতিতেই থাকি না কেন, লেখা ঠিক বেরিয়ে আসে। আর যখন সেই তাগিদে যখন লিখি, জানি না কেন সেটা পাঠকের কাছে প্রশংসনীয় হয়। যেমন কোনো কোনো চিত্রকরের আঁকা ছবি দেখলেই বোঝা যায় এই ছবিটি তাঁরই আঁকা,তার জন্য চিত্র সমালোচক বা অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করার দরকার হয় না,তেমনি সৃষ্টিশীল লেখার স্টাইল ও ভাষা বিন্যাস বলে দেয় এই লেখাটি অমুকের। বস্তুতঃ মৃগনাভির গন্ধ পেয়ে যেমন হরিণ উত্স খোঁজার জন্য ছটফট করতে থাকে, সৃজনশীল লেখক তার নিজস্ব ফ্লেভার খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আমার মধ্যেও হয়তো তাই,কিন্তু আমি ওই হরিণের মতই বুঝিনা।
         ছক কেটে ঘর ফেলে পাত্র পাত্রীকে বসিয়ে বিস্তর মাথা পেচ্চি করে গল্প লেখা আমার কল্পনা বিরুদ্ধ লাগে। আসলে গল্প লেখার আগে কল্পনার যে চারণভূমি তৈরি হয়,তা যেন হারিয়ে না যায়,সেই ভয় হয়।  লেখাটা ছোটোগল্পের ফরম্যাটে (প্রচলিত প্রথা আরকি) হচ্ছে কি না, ফিকশন হয়ে যাচ্ছে না তো? ছাপলে লোকে পড়বে কি না, আদৌ ছাপবে কি না ইত্যাদি আমার মাথা থেকে গায়েব হয়ে যায়। আমি যা বুঝতে পারি,আমার এই লেখন স্পৃহা অবশ্যই পোস্ট মর্ডানিজমের চরিত্র লক্ষণের মধ্যে কিছুটা পড়ে। আধুনিকতা থেকে উত্তর আধুনিকতায় যাওয়ার লক্ষণগুলি মোটামুটি এরকম: ফর্ম ভেঙে এন্টিফর্মে যাওয়া, রোমান্টিসিজম না রেখে ডাডাইজমের দিকে এগিয়ে যাওয়া(প্রচলিত সাহিত্যের বিলাসবহুল হাওয়াকে পাক দিয়ে পাক দিয়ে নতুন কিছু অবাস্তবধর্মী)। তবে আমি দর্শন বুঝে করিনি। এটা বোধহয় পার্থিব সময়ের প্রকোপ। পোস্ট মডার্নিজমের একটি সহজ মানে সমীর রায়চৌধুরী দিয়েছেন।‘প্রত্যেক পরিবর্তন পুনরাবৃত্তির গোঁড়ামি অতিক্রমের অনিবার্যতা’। উত্তরআধুনিকতার তিন চরিত্র একসাথে বাংলা সাহিত্য শিল্প জগতে দেখা দিয়েছে কি না,আমার মনে হয় না। এক, skepticism। যা লেখা হচ্ছে আদৌ সেগুলো সত্যি না ভ্রান্তি? দুই, subjectivism। যা ঘটছে তার হুবহু বাস্তব জ্ঞান। কোনও সম্ভাবনা, কল্পনা, অতিরঞ্জন, অধ্যাত্মিকতা কিছু না। তিন, relativism। একটি বিশেষ কালচারে পূর্ণ সহমত তার বাইরে কিছু না। তা বাদে বুদবুদ ফেনার মতো বৃহত্‍ লেখা বর্জন আর deconstruction বা বিনির্মান। এইসব ভিন্ন দর্শনের একজন অনন্য শরিক জ্যাক দেরিদা। সমসাময়িক ছিলেন ফ্রান্সিস লিয়োটার্ড। তাঁর প্রথম সাবধান বাণী ছিল,নিম্নবর্গের নিচু জাতের ভাষা টন্ট করে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে দূরে সরিয়ে রাখা ঠিক না। আমি যা আমার ছোটো গল্পে অক্ষরে অক্ষরে পালন করি।  বাংলা সাহিত্যে কমলকুমার মজুমদার লেখাতে দ্রোহ প্রগতি বিদ্বেষ ও গল্পহীনতা এনেছেন।  
          তবে আমি মাঝামাঝি বসে নতুন ফর্মের কথা ভাবছি। খসড়া করিনা,অবাধ স্বপ্ন দেখার মত লিখে যাই শেষ অব্দি। প্রকৃতিকে দুমড়ে মুচড়ে পরিবেশ তৈরির শিল্পতে মন দিই। গল্প আপনা আপনি শেষ ধরে নেয়। শেষ হলে পরে পড়ে নিয়ে নিজে নিজেই বিস্মিত হই। পরম সৃষ্টিকারকে বারবার ধন্যবাদ দিই। প্রসঙ্গক্রমে বলি,ভাষাতত্ত্ববিদ ও দার্শনিক ফার্দিন্যান্দ দ্য স্যসুর সারাজীবন শব্দ সংকেত নিয়ে(linguistic sign) খেলেছেন। তাঁর মতে ভাষা আসলে চিহ্ন সমূহ ছাড়া কিছু নয়। মাছ যেমন জলে বাঁচে,আমরা বাতাস ও শব্দের ভিতর বাঁচি। ভাষা শব্দের যে যেমন ঢেউ তুলে আলোড়ন করে অন্যকে জাগাতে পারে !
   যে চরিত্র ও তার ঘটনাক্রম পাঠককে বেঁধে রাখতে পারে সেটা প্রতিটি গল্প লেখক খুঁজতে থাকে,আমি তার ব্যাতিক্রম নই। তবে কেউ কেউ শব্দ শাব্দিকের অংক কষে,কেউ বিস্তর ডায়লগের জাল বোনে,কেউ পাত্র বা পাত্রীকে নিয়ে নিছক বেড়াতে ভালোবাসে। আমার কল্পনাই আমাকে গাইড করে। প্রকৃত ভাবাবেগ যেমন আমার মাথায় কাজ করে আমার গল্প তেমনই কথা বলে। আমাকে অনেকে বলতো ‘ডায়েরি লেখক’। প্রকাশিত করার স্পৃহা থাকতো না। মুরাকামির কথাটা আমার নিজের জন্যে খুব খাটে।‘লেখাতে যত না আনন্দ আছে তার চেয়ে বেশি আছে যন্ত্রনা’। ওই সুখদায়ী পারচুরিশন(গর্ভ খালাস) যন্ত্রনা পেতে আমি লিখে যাই। জানিনা পাঠকের ঐরকম হয় কি না।
আমার জন্ম পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম মানবাজারে। যেখানে মানুষ হয়েছি সেখানে কারো বাড়িতে পায়খানা ছিল না। ছোটো থেকেই ম্যাল নিউট্রিশনে বড় হওয়া। প্রকৃতই আমি সাবঅলটার্ন। একেবারে গ্রাউন্ড লেবেল থেকে উঠে এসেছি। কিন্তু প্রকৃতি আমাকে তার একটি একটি রূপকলা খুলে খুলে দেখিয়েছে। আমি তৃপ্ত। এবং শুধু লিখেই আমি তৃপ্ত হই। ব্যবসায়িক হওয়ার স্পৃহা নেই চান্সও নিইনি কখনো। একসময় এক অবানিজ্যিক বাংলা ভাষা আন্দোলন হয়েছিল,প্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলন,নাম শতজল ঝর্ণার ধ্বনি। সেটাতে ঢুকে পড়ে দেখি এখানে আমি ঠিক বিকশিত হতে পারবোনা। সরে দাঁড়াতেই বেশ কয়েকটা গল্প লিখে ফেলতে পেরেছি। প্রচারবিমুখ হলেই দেখি আমি ঠিক থাকি।  
           অবশ্য জন্ম থেকে যেসব শব্দঘিরে আমি বড় হয়েছি তার ওপর আমার একটা প্রচ্ছন্ন কর্তব্যবোধ ও সন্মান জানানোর ব্যাপার মাথায় থাকে। তবে শব্দ নিয়ে খেলা ও নতুন শব্দের বহুরৈখিক ব্যবহার করাতে অবশ্যই সমীর রায় চৌধুরীর প্রভাব আমি শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করি। সমীরদার হাতধরে দিনের পর দিন চাইবাসাতে হেঁটেছি। চাইবাসাতে আমার পত্রিকা ‘উইঢিবি’ তো তাঁরই দেন।তাঁরই সান্নিধ্যে আমার লেখাগুলো সাবালকত্ব প্রাপ্ত হয়েছিল। অবশ্য শব্দ নিয়ে নতুন নতুন সিন্ট্যাক্সে বা বাক্য কারিকুরিতে শুরু থেকেই আমার অত উত্সাহ ছিলনা। ছবি আঁকিয়ে আমি, তাই নিখুঁত দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে মন চায়। আমি দৃশ্য দেখে শব্দ শিকার করেছি। সমীরদার সাথে চাইবাসার অঢেল বনজ দৃশ্য দেখেছি, অবচেতনায় গেঁথে রয়েছে। তারপর ধানবাদে এসে আমার পথ চলা। ধানবাদে কয়লা কালো রুখু বিষন্ন মানুষগুলো দেখতাম,ঘটনা দৃশ্য হতাশা লুঠমার কোলিয়ারি জীবনযাত্রা দেখতাম।  এখন যে দুটি উপন্যাস প্রকাশের মুখে,সেগুলোতে আমি অন্যরকম নির্মাণ সচেতনতার ছাপ ছাড়তে চাই। চেষ্টা করেছি বহুমাত্রিক চিত্রকল্প ফুটিয়ে তুলতে। দেখা যাক এই এক্সপেরিমেণ্ট কেমন হয়।
         যেমন ছবি আঁকার সময় শিল্পী বিষয় ও রঙের বিন্যাস এমনভাবে করে বা হয়ে যায় যে দর্শক ছবি দেখেই চিনে ফেলে এই ছবি অমুক শিল্পীর। সাহিত্যের ক্ষেত্রেও তাই হয়। ক্লাসিক আলট্রাক্লাসিক রোমান্টিক আধুনিক উত্তরআধুনিক এইসব লেখাগুলোর উপর লেবেল সাঁটানো হলেও সেটি নিজের রূপ নিজেই খোলসা করে নেয়। স্বতস্ফুর্ত লেখার ভিতর দিয়ে আমাদের যে আকুতি প্রার্থনা কামনা উঠে আসে অবচেতন ও অতিচেতন মন থেকে, তার বিচার বিবেচনা প্রশ্ন ঠিক ঠিক ওঠে পাঠকের ভিতর থেকে। এ অতি স্বাভাবিক। তা নাহলে পুরো লেখাটা কেউ পড়তই না। এই স্বতঃ চেতনা মানুষের মৌলিক আবেগ। আমাদের অন্তরের এই লিটারারি জাস্টিস চাওয়ার কত যে আন্দোলন হয়েছে আর হচ্ছে। ভাষার ক্রমবিকাশ তো এটাই আমার মনে হয়। আমি একটা কথা সার বুঝি। আমার লেখা আমি উত্তরসূরীদের দিয়ে যাবো। এই আমার লেখার উদ্দেশ্য।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ