মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ভি ডি নিউটন
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
১। ভি ডি নিউটন।
২। পিতার নামঃ সুভাষ চন্দ্র দাশগুপ্ত।
৩। মাতার নামঃ রেনুবালা দাশ।
৪। স্ত্রীর নামঃ পিয়া রানী দত্ত, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
৫। ছেলে দুজনঃ লেলিন দাশগুপ্ত ও স্ট্যালিন দাশগুপ্ত।
৬। জন্মঃ ১৩ মার্চ ১৯৭১।
৭। জন্মের স্থানঃ বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার স্বজনগ্রামে এক কায়স্ত পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।
৮। শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ মাস্টার্স অফ ল ( এল এল এম)।
৯। পেশাঃ ঢাকা জজ কোর্টের একজন আইনজীবী।
১০। বাংলাদেশ গনতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক। সিপিবি আইন শাখার সদস্য। লাখাই ছাত্র কল্যান পরিষদের উপদেষ্টা।
১১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষনা ও লেখালেখি।
১২। দেশভ্রমন: ভারত, নেপাল,মন্টিনিগ্রো,সার্বিয়া,ইতালী,
তুরস্ক,গ্রীস,বুলগেরিয়া।
প্রশ্ন :১
শুরুর দিনগুলো শুনবো?
ভি ডি নিউটন :
১৯৯১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক পরীক্ষা শেষ করে হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানায় নিজ বাড়ীতে চলে যাই। ফলাফল বের হবার আগ পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান করি। সেই সময় হবিগঞ্জ জেলা শহর থেকে সাপ্তাহিক খোয়াই নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আমি এলাকার উন্নয়ন নিয়ে অনেক প্রতিবেদন তুলে ধরি। রাস্তাঘাট,বিদ্যুৎ,শিক্ষা,স্বাস্থ্য,মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরতাম। ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক লাল সবুজ,দৈনিক আজকের কাগজে লেখতাম। এলাকার দুর্ভোগ নিয়েই সেই সময় বেশী লেখালেখি করতাম। এছাড়া " ভয়েস আমেরিকা ফ্রেন্ডক্লাব গঠন করেছিলাম। আমাদের কার্যক্রম ভয়েস অব আমেরিকা থেকে প্রকাশিত হলে মনের আবেগ অনেক বৃদ্ধি পায়।
প্রশ্ন :২
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিষয়ে আপনার বক্তব্য?
ভি ডি নিউটন :
১৯৭১ সালে দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধের ফলে ত্রিশ লাখ লোককে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী হত্যা করে এবং চার লাখ মাবোনের হিজ্জত নষ্ট করা হয়। হাজার হাজার অবৈধ সন্তানের জন্ম হয়। ভারতে এককোটির উপরে বাঙ্গালী শরনার্থী আশ্রয় নেয়। আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি নাই।মুক্তিযুদ্ধের সময় জন্ম। আমার এলাকায় একটি হত্যাকান্ড ঘটে ১৯৭১ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। হবিগঞ্জ জেলার লাখাই থানার কৃষ্ণপুর গ্রামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের সহযোগীতায় ১৮৬ জন হিন্দু লোককে হত্যা করা হয়, অসংখ্য মাবোনকে ধর্ষন করা হয়,বাড়ীঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাসে একটি বর্বর হত্যাকান্ড। এই হত্যাকান্ড আমার মনে একটি প্রতিবাদের আন্দোলনের জন্ম নেয়। এরপর আমি মুক্তিযুদ্ধের দিকে ঝুকে পড়ি। যদিও মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি শিশু ছিলাম।
প্রশ্ন :৩
দেশভাগ বাঙালি জাতির নিকট কেমন মনে হয়?
উওরঃ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে বিজয় হবার পর লাল সবুজের পতাকা,বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমার সোনার বাংলা জাতীয় সঙ্গীত, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ,গনতন্ত্র,ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্রসহ চারমুলনীতি পেয়েছিলাম। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর সেই পাকিস্তানে ফিরে গেছি। এখন বাংলাদেশের রাষ্টধর্ম ইসলাম।
প্রশ্ন :৪
আপনার গবেষণার বিষয় তো মুক্তিযুদ্ধ?
ভি ডি নিউটন :
হ্যাঁ,আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিশ্বাসী। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আগ্রহী।
প্রশ্ন:৫
মেজর জেনারেল (অব:)চিত্তরঞ্জন দত্ত।পুরো নাম চিত্ত রঞ্জন দত্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। ৪নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন।তিনি আমাদের ত্রিপুরার কৈলাসহর, কমলপুর ও খোয়াই অঞ্চলের দায়িত্বে ছিলেন।একটু বলবেন?
ভি ডি নিউটন :
মেজর জেনারেল (অবঃ) সি আর দত্ত বীর উত্তম।মিরাশী একটি গ্রামের নাম। একটি আভিজাত্য গ্রাম। একটি শিক্ষিত গ্রাম। গ্রামটির অবস্থান হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট থানায়। মিরাশী গ্রামে জন্ম গ্রহন করেছিলেন বৃটিশ আমলের শিক্ষা মন্ত্রী রায়বাহাদুর এডভোকেট প্রমোদ চন্দ্র দত্ত,সিলেট বিভাগের প্রথম গায়িকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্নেহধন্যা অমলা দত্ত কুইনী,রায়সাহেব মহেন্দ্র দত্ত,কলকাতা ভিক্টোরিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল সুপ্রভা দত্ত, গনসংগীতের হারকিউলিকস ও আন্তর্জাতিক গননাট্য সঙ্গীত শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস। এই মিরাশী গ্রামের সন্তান হলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ৪ নং সেক্টর কমান্ডার মেজর জেনারেল সি আর দত্ত।
পুরো নাম চিত্ত রঞ্জন দত্ত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার। ৪নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য "বীর উত্তম "খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।'একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। খেতাব নম্বর-১১। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিশ্বাসী। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।
১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি চিত্ত রঞ্জন দত্তের জন্ম আসামের শিলংয়ে। তার পৈতৃক বাড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশি গ্রামে। তার বাবার নাম উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত এবং মায়ের নাম লাবণ্য প্রভা দত্ত।
শিলংয়ের 'লাবান গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে' দ্বিতীয় শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা করেছিলেন৷ পরবর্তীকালে তাঁর বাবা চাকরি থেকে অবসর হবার পর হবিগঞ্জ শহরে এসে স্থায়ী বসবাস শুরু করেন৷
১৯৪৪ সালে হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেন। কলকাতার আশুতোষ কলেজে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হয়ে পড়াশুনা শুরু করেন।এরপর চলে আসেন খুলনায়। খুলনার দৌলতপুর কলেজের বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন৷
১৯৪৬ সালে খুলনার দৌলতপুর কলেজ উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন।
১৯৪৮ সালে খুলনা থেকে বিএসসি পাশ করেন৷
১৯৫১ সালে চিত্ত রঞ্জন দত্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন৷ 'সেকেন্ড লেফটেনেন্ট' পদে কমিশন পান।
১৯৫৭ সালে মাধবপুর থানার বেঙ্গাডুবা গ্রামের বিখ্যাত কায়স্ত পরিবারের মেয়ে মনীষা রানী রায়কে বিয়ে করেন। মনীষা ছাত্রী অবস্থায় হবিগঞ্জ শহরে বৃটিশ বিরোধী মিছিল করতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে কারাবরন করেন। মনীষার বাবা অর্থাৎ সি আর দত্তের শ্বশুর সাংবাদিক অনিল কুমার রায় ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের একান্ত সচিব ( পি এস) ।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধে পাকিস্তানের হয়ে আসালংয়ে একটা কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন। এই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাঁকে পুরস্কৃত করেন।
১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে ৬ ফন্টিয়ার ফোর্সে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর পুর্বে ছুটিতে হবিগঞ্জ শহরের বাসায় অবস্থান করেছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ হবিগঞ্জ ট্রেজারী থেকে অস্ত্রভান্ডার শুন্য করে ৫২০ টি রাইফেল এবং ১৭ হাজার ৭৩৮ রাউন্ড গুলি লুট করে নেয়া হয়েছিল। সেদিন কর্ণেল এম এ রব মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য মেজর সি আর দত্তের কাছে খবর পাঠালেন। সংবাদ পেয়ে সি আর দত্ত তৎক্ষনাৎ চলে আসেন। সি আর দত্তের আগমনে উপস্থিত জনতা " জয় বাংলা" শ্লোগান দিয়ে আনন্দ উল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন।জনগনের এই উচ্ছাসে তিনি উৎফুল্লু হয়ে উঠেন। মেজর সি আর দত্ত হাত তুলে সবাইকে অভিবাদন জানান। সেদিনই বিকেল পাঁচটায় ট্রেজারীর অস্ত্র নিয়ে হবিগঞ্জের মুক্তিপাগল মানুষদেরকে নিয়ে সিলেটের প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। শেরপুর, সাদিপুরের যুদ্ধে হবিগঞ্জের মেজর সি আর দত্তের এই বাহিনী পাকিস্তানী শত্রুর বিরুদ্ধে প্রথম সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়।
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর থানায় তেলিয়াপাড়া চা বাগানে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্য ঐতিহাসিক এক গোপন শপথ অনুষ্টিত হয়। এই শপথ অনুষ্টানে ২৭ জন সেনাকর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কর্ণেল এম এ জি ওসমানী, কর্ণেল এম এ রব,লেঃ কর্ণেল সালাউদ্দিন মোহাম্মাদ রেজা, মেজর কে এম শফি উল্লাহ, মেজর খালেদ মোশারফ, মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত, মেজর জিয়াউর রহমান,মেজর আবু ওসমান চৌধুরী, মেজর নুরুল ইসলাম, মেজর শাফায়াত জামিল, মেজর কাজী নুরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন নাসিম,ক্যাপ্টেন সুবিদ আলী ভুইয়া, ক্যাপ্টেন মইনুল হোসেন চৌধুরী, ক্যাপ্টেন মতিন,লেঃ মাহবুব,লেঃ আনিস,লেঃ সেলিম,লেঃ কাজী কবীর উদ্দিন, ভারতীয় বিএসএফ প্রধান খসরু এফ রুস্তমজী, ভারতের পুর্বাঞ্চলীয় বি এস এফের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার ভিসি পান্ডে,আগরতলার জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ওমেস সায়গল।
১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হওয়ার পর তাজউদ্দীন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেব দায়িত্ব দেয়া হয় এমএজি ওসমানীকে। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়।
৪ নং সেক্টর গঠিত হয় হবিগঞ্জ জেলা ও সিলেটের অংশ নিয়ে। মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত ছিলেন ৪ নং সেক্টরের কমান্ডার। সেই সেক্টর এলাকায় নিয়মিত ১৫০০ সৈন্যর পাশাপাশি প্রায় ৯০০০ গনযোদ্ধা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহন করেন।
সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল এবং খোয়াই শায়স্তাগঞ্জ রেল লাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট ডাউকি সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে ৪নং সেক্টর গঠন করা হয়।সেক্টর কমান্ডার সি আর দত্ত দায়িত্ব পাওয়ার পর সিলেটের রশীদপুরে প্রথমে ক্যাম্প তৈরী করেন। চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চা বাগান৷ চা বাগানের আড়ালকে কাজে লাগিয়ে তিনি যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণ করে দিতেন৷ পরবর্তী সময়ে তিনি যুদ্ধের আক্রমণের সুবিধার্থে রশীদপুর ছেড়ে মৌলভীবাজারে ক্যাম্প স্থাপন করেন৷
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্ট বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে ধংসাত্মক কার্যাক্রম শুরু করে। মেজর সি আর দত্ত ৯ ম এবং ১৬ তম পদাতিক ডিভিশন থেকে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেন। রশীদপুর চাবাগানে সামরিক ঘাটি স্থাপন করে প্রতিরোধ যুদ্ধ চালাতে থাকেন।
১৯৭১ সালে আগষ্ট মাসের শেষ দিকে লেঃ কর্ণেল পদে পদোন্নতি পান। ভারতীয় সেনাবাহিনীর তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধার ৬ টি ১০৫ মিমি কামান প্রদান করে। এই কামান দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকালীন দ্বিতীয় ফিল্ড আর্টিলারী ইউনিট গঠন করেন।এই আর্টিলারী ইউনিট ৪ নং সেক্টর এলাকায় ব্যাপক ফায়ার সাপোর্ট প্রদান করে চুড়ান্ত বিজয়কে ত্বরাম্বিত করে।
লেঃ কর্ণেল সি আর দত্তের পরিকল্পনা ও নেতৃত্বে ৪ নং সেক্টর এলাকায় অনেক যুদ্ধ সংগঠিত হয়। উল্লেখ যুদ্ধ হচ্ছে কানাইঘাটের থানা যুদ্ধ, নান্দুয়ার যুদ্ধ,শমসেরনগর যুদ্ধ। সিলেটের অধিকাংশ এলাকা নিজের দখলে নিয়ে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ৪ নং সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।
সিলেট জেলার পূর্বাঞ্চল, খোয়াই-শায়েস্তাগঞ্জ রেললাইন বাদে পূর্ব ও উত্তর দিকে সিলেট-ডাউকি সড়ক পর্যন্ত এলাকা নিয়ে ছিলো ৪ নম্বর সেক্টর।
এ সেক্টরের প্রথম হেডকোয়ার্টার ছিলো করিমগঞ্জ। পরবর্তীতে তা আসামের মাসিমপুরে স্থানান্তর করা হয়।
শুরু থেকেই সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত।
প্রায় ৯ হাজার গেরিলা যোদ্ধা ও প্রায় চার হাজার নিয়মিত বাহিনীর ৪ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত ছয়টি সাব-সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন-
• জালালপুর - মাহবুবুর রব সাদী।
• বড়পুঞ্জী - ক্যাপ্টেন এ রব।
• আমলাসিদ - লেফটেন্যান্ট জহির।
• কুকিতল - ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কাদের ও ক্যাপ্টেন শরিফুল হক।
• কৈলাশহর - লেফটেন্যান্ট ওয়াকিউজ্জামান।
• কমলপুর- ক্যাপ্টেন এনাম।
১৯৭২ সালে সি আর দত্ত রংপুরে ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে নিযুক্ত হন৷ সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন৷
১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য সীমান্ত রক্ষা প্রহরী গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে সরকার৷ এই বিষয়ে চিত্ত রঞ্জন দত্তকে দায়িত্ব দেয় বাংলাদেশ সরকার৷ পরবর্তীকালে তিনি সীমান্ত রক্ষা প্রহরী গঠন করেন। সি আর দত্ত নাম দেন "বাংলাদেশ রাইফেলস"। বর্তমানে এ বাহিনীর নাম বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। চিত্ত রঞ্জন দত্ত ছিলেন বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম ডাইরেক্টর জেনারেল ( ডিজি)।
১৯৭৪ সালে হেড কোয়ার্টার চিফ অব লজিস্টিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷
১৯৭৭ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন৷
১৯৭৯ সালে বিআরটিসির চেয়ারম্যান হন।
১৯৮২ সালে পুনরায় মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান হন৷
১৯৮৪ সালে এরশাদ সরকারের আমলে মেজর জেনারেল পদে থাকা অবস্থায় বাধ্যতামুলক অবসর দেয়া হয়।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশের ৮ ম সংশোধনীর প্রতিবাদ করলে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রেসিডেন্ট এরশাদের গুন্ডা বাহিনী মেজর জেনারেল সি আর দত্তের গাড়ীতে বোমা বিস্ফোরন ঘটালে গুরুতর আহত হন। বিদেশে চিকিৎসার করার পর সুস্থ হয়ে উঠেন।
১৯৮৮ সালে প্রতিষ্টা করেন বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদ। যার লক্ষ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ১৯৭২ সালের সংবিধান বাস্তবায়ন করা। তিনি ছিলেন সংগঠনের আজীবন সভাপতি।
২০১০ সালের ১৪ নভেম্বর মেজর জেনারেল সি আর দত্তের স্ত্রী মনীষা দত্ত মৃত্যুবরন করেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর ঢাকা বনানীর বাসায় তিনি একাকী হয়ে পড়েন।
২০২০ সালের ২০ আগষ্ট আমেরিকার ফ্লোরিডার মেয়ের বাসায় থাকা অবস্থায় বাথরুমে পড়ে যান। স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে যাবার পর কোমায় চলে যান। আর জ্ঞান ফেরেনি।
২০২০ সালের ২৫ আগষ্ট বাংলাদেশ সময় সকাল ৯টায় বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছে ছিলো প্রিয় মাতৃভূমিতে বাংলাদেশ হবে শেষ বিদায়ের কাজ। সেই ইচ্ছের প্রতি সম্মান জানিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার সিআর দত্তের মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়।
২০২০ সালের ৩১ আগষ্ট এমিরেটস’র এয়ার লাইন্সের ০৫৮২ নম্বরের বিমান যোগে সকাল ৮ টা ৪০মিনিটে আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে ঢাকা বিমান বন্দরে মরদেহ পৌঁছে।
ঢাকা বিমান বন্দর থেকে মেজর জেনারেল সি আর দত্তের মরদেহ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমাগারে রাখা হয়।
২০২০ সালের ১ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭ টায় তাঁর ঢাকা বনানিস্থ ডিওএইচ এর ২নম্বর সড়কের ৪৯ নম্বর বাড়ীর বাসভবন হয়ে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। এরপর মরদেহ ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বীর মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রদান করা হয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দির চত্বর থেকে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় রাজারবাগ বরদেশ্বরী শ্মশানে। সেখানে শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আগে মেজর জেনারেল দত্তের মরদেহের প্রতি সামরিক সম্মাননা জ্ঞাপনের জন্য গানস্যালুট প্রদান করা হয়।
ঢাকায় সবুজবাগ বদরেশ্বরী শ্মশানে দাহ করা হয় ১৯৭১ সালের বীরমুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারকে।
তিন মেয়ে ব্যারিষ্টার চয়নিকা দত্ত,মহুয়া দত্ত,কবিতা দত্ত, একমাত্র ছেলে চিরঞ্জীব দত্ত। মেয়ে ব্যারিষ্টার চয়নিকা দত্ত কানাডা প্রবাসী। সবাই আমেরিকা প্রবাসী।
রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন থেকে কারওয়ান বাজার সিগন্যাল পর্যন্ত সড়কটি 'বীরউত্তম সি আর দত্ত' সড়ক নামে নামকরণ করা হয়।
প্রশ্ন :৬
মুক্তিযুদ্ধের উপর আপনার কাজগুলো গ্রন্থের রূপ দিয়েছেন?
ভি ডি নিউটন :
আমি মুক্তিযুদ্ধের উপর চারটি প্রকাশনা সম্পাদনা করেছি। তবে মুক্তিযুদ্ধের উপর এখনো কোন বই প্রকাশ করতে পারিনি। ৩০১ জনের জীবনী নিয়ে " বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বন্ধু" নামে একটি বই প্রকাশিত হবে। সেখানে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী,অটলবিহারী বাজিপেয়ী,প্রনব মুখার্জী,ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্র লাল সিংহ,জ্যোতিবসু,সিদ্ধার্থ রায়,ফিল্ড মার্শাল মানেক শাহ, জেনারেল অরোরা,জেনারেল জ্যাকব,মার্শাল টিটো, ফিদেল কাস্ত্রোর অবদানের কথা উল্লেখ থাকবে। এছাড়াও ত্রিপুরা রাজ্যর ৩৮ জনের অবদানের বিবরন থাকবে।
প্রশ্ন :৭
আপনার শুরুর দিনগুলো শুনবো?
ভি ডি নিউটন :
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী হাজার হাজার। বাংলাদেশে স্বাধীনতার সংগ্রামী একজন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্টপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ,কমরেড মনি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ,এডভোকেট মনোরঞ্জন ধর,মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী,ক্যাপ্টেন মনসুর আলী,কামরুজ্জামান এদের অবদানকে মুল্যায়ন করা হয় না। পাঠ্যপুস্তকে এদের কোন অবদান নেই।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদগোর্ণীর কোন নাম নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় তাঁদের কোন নাম নেই।
আমার মনে এগুলো খুবই কষ্ট দেয়,যন্ত্রনা দেয়। বাংলাদেশের জনগন স্বাধীনতা বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট পায়। এখনো বেশীর ভাগ জনগনই পাকিস্তানকে ভালবাসে। স্বাধীনতার ইতিহাস পৌছে দেয়াই আমার কাজ। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ দিয়েই আমার দিনগুলো শুরু।
প্রশ্ন :৮
কী লিখি কেন লিখি?
ভি ডি নিউটন :
অজানা ইতিহাস লিখতে পছন্দ করি। মুক্তিযুদ্ধের অজানা ইতিহাস লিখি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনা শহীদ জগতজ্যোতি দাস। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকার " বীর শ্রেষ্ট উপাধি দিয়েছিলেন,দেশ স্বাধীন হবার পর বীর বিক্রম খেতাব দেয়া হয়। দিনাজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিনকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঘের খাচায় ছেড়ে দেয়া হলে হিংস্র বাঘ খেয়ে ফেলে। এই তরুন বীর মুক্তিযোদ্ধা সালাউদ্দিন কোন সম্মান পায়নি। শিরিন বানু মিতিল একজন মহিলা পুরুষ বেশে যুদ্ধ করেন, সেও সম্মান থেকে বঞ্চিত। কবি মেহেরুননেসাকে পাকিস্তান বাহিনী নির্মমভাবে হত্যা করেছে, পাঠ্যপুস্তকে নেই। এমন অসংখ্য কাহিনী।
কেন লিখি? বাংলাদেশের জনগন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে চায় না,জানতে চায় না। তারপরে লিখি। অন্ততপক্ষে কিছু ইতিহাস জানুক।
প্রশ্ন :৯
আপনার জার্নিতে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে অভিব্যক্তি?
ভি ডি নিউটন :
আমি ইউরোপের দেশ মন্টিনিগ্রোর একটি শহর মোজভেকে গিয়েছিলাম। যুগোশ্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল টিটোর বিশাল ভাস্কর্য। জনগন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, হাত তুলে সালাম দিয়ে প্রদর্শন করছে। সকাল বেলায় স্থানীয় লোকেরা ফুল দিয়েও সম্মান করেন।
ইতালীতে গিয়ে মুসোলিনীর নাৎসী বাহিনীর বিচারের রায় দেখলাম। যেখানে আপিল করার কোন সুযোগ নেই। অথচ বাংলাদেশে যুদ্ধ অপরাধীদের ট্রাইবুনালের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ ছিল।
তুরস্ক ইসলামী রাষ্ট হবার পরেও সমগ্র দেশে ভাস্কর্য আর ভাস্কর্য। আমাদের বাংলাদেশে মৌলবাদীরা স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য করতে বাধা দিচ্ছে। মৌলবাদীরা ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলে। ভাস্কর্যকে মুর্তি মনে করে।
প্রশ্ন :১০
দেশভাগ মুক্তিযোদ্ধ কেমন দেখেন?
ভি ডি নিউটন :
১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর ত্রিশ লাখ রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত। অনেক মুক্তিযোদ্ধা আছেন যারা অনাহারে অর্ধাহারে দিনযাপন করছেন। চাকুরীক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোন কোটা নেই। যদিও সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা দিচ্ছেন। বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধারা খেতাব থেকে বঞ্চিত। বীর শ্রেষ্ট থেকে শুরু করে সব খেতাবই পেয়েছেন সামরিক বাহিনীর লোকজন।
প্রশ্ন :১১
লেখালেখি খুব সহজ ভাবতাম।তিরিশ বছর লিখে মনে হলো এ বড় কঠিন জায়গায় শখ করে চলে আসলাম।চক্রব্যূহ থেকে না পারছি বের হতে না পারছি নিজের নিজস্ব পথ তৈরী করতে।তবুও লেগে আছি।কই আর যাই। তাই লিখি। লেখালেখা খেলা নয়।গভীর সাধনা।লেখক কোন অবতার নয়।লেখক একজন সৃজনশীল মানুষ।তার পথ বন্ধুর।একাকিত্বই তার সাধনা।আপনারও কি এরকমই মনে হয়?
ভি ডি নিউটন :
ক্লাস ওয়ান থেকেই লেখাপড়া শুরু করতে হয়। এরপর ধীরে ধীরে বার্ষিক পরীক্ষায় পাশ করে উপরে শ্রেণিতে উঠতে হয়।
প্রশ্ন :১২
মুক্তিযুদ্ধের কোন বিষয়টি এখনো আলোচিত হয়নি?
ভি ডি নিউটন :
মুক্তিযুদ্ধের একটি বিষয় হল ভারতের অবদান। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের অবদান স্বীকার করলেও বাংলাদেশের আর কোন রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনৈতিক নেতা স্বীকার করতে চান না। বাংলাদেশের জনগন ভারতকে দোষমন মনে করেন।
প্রশ্ন :১৩
আপনার বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলবেন?
ভি ডি নিউটন :
ভারতের জনগন জাতির পিতা মহাত্ম গান্ধী,বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কবি কাজী নজরুল ইসলাম,রাজা রামমোহন রায়ের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তুরস্কে কামাল আতাতুর্কের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এবং সার্বিয়াতে মার্শাল টিটোর প্রতি ভালবাসা। যা আমাকে মুগ্ধ করেছে।
প্রশ্ন:১৪
বাংলাদেশের বর্তমান সময়কে কিরকম দেখেন?
ভি ডি নিউটন : বাংলাদেশের বর্তমান সময় একটা ভয়াবহ। সমগ্র বাংলাদেশে মৌলবাদের ভয়ংকর মুর্তিহান। যেকোন সময় মৌলবাদের বিস্ফোরন ঘটতে পারে।
প্রশ্ন :১৫
আপনার পারিবারিক পরিবেশ কেমন বলবেন?
ভি ডি নিউটন :
আমার পারিবারিক পরিবেশ খুবই চমৎকার। আমার স্ত্রী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান। সব সময় আমাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উৎসাহ দিয়ে থাকেন। আমার দুই ছেলেও বিপ্লবী প্রকৃতির,যেমন ক্ষুদিরাম ও উল্লাসকর দত্ত
প্রশ্ন :১৬
বিপ্লবী হরিগঙ্গা বসাক।একজন বিপ্লবী, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী,একজন রাজনীতিবিদ, কংগ্রেসের নেতা, ত্রিপুরা রাজ্যের কংগ্রেস নেতা, একজন সাংবাদিক, ১৯৪৮ সালের ১৪ মার্চ ঢাকায় গ্রেফতার করার পর পাকিস্তান সরকার বিষক্রিয়া প্রয়োগ করে হরিগঙ্গা বসাককে হত্যা করে।পাশাপাশি তাঁর নামে ত্রিপুরায় হরিগঙ্গা বসাক রোড স্মৃতি স্বরূপ আছে।যদি অনেকেই সে ইতিহাস জানেন না।আপনি বলবেন?
ভি ডি নিউটন :
হরিগঙ্গা বসাক। একজন বিপ্লবী, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী,একজন রাজনীতিবিদ, কংগ্রেসের নেতা, ত্রিপুরা রাজ্যের কংগ্রেস নেতা, একজন সাংবাদিক, ১৯৪৮ সালের ১৪ মার্চ ঢাকায় গ্রেফতার করার পর পাকিস্তান সরকার বিষক্রিয়া প্রয়োগ করে হরিগঙ্গা বসাককে হত্যা করে।
১৯১২ সালে ঢাকা শহরের শাখারী বাজারে হরিগঙ্গা বসাক জন্ম গ্রহন করেন।তাঁর পিতার নাম কালাচাঁদ বসাক। কালাচাঁদ বসাক বৃটিশ আমলে পুরান ঢাকার একজন বড় ব্যবসায়ী ছিলেন।
১৯২৫ সালে কালাচাঁদ বসাক ব্যবসা করার উদ্দেশ্য ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় চলে যান। আগরতলা, ঢাকা,সিলেট ও কলকাতায় ব্যবসা শুরু করেন। হরিগঙ্গা বসাক পিতার ব্যবসাকে সহযোগীতা করতে ঢাকা থেকে আগরতলা চলে যান।
১৯৩৩ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে হরিগঙ্গা বসাক প্রথমে ঢাকায় গ্রেফতার হন। প্রথমে কুমিল্লা কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। এরপর বহরমপুর জেলে পাঠানো হয়। সর্বশেষ কলকাতা সেন্ট্রাল জেলে বন্দী করে রাখা হয়। জেলখানায় হরিগঙ্গা বসাকের উপর চরম নির্যাতন চলে।
১৯৩৮ সালের প্রথম হতে পশ্চিমবঙ্গের কাকদ্বীপে হাত পা বেধে বন্দি করা রাখা হতো হরিগঙ্গা বসাককে। এরপর আনা হয় ঢাকা কারাগারে।
১৯৩৮ সালের শেষ দিকে ঢাকা কারাগার থেকে হরিগঙ্গা বসাক মুক্তি পেয়ে আগরতলায় চলে যান।
১৯৪০ সালে আগতলায় গনপরিষদ গঠন করেন। উমেশ লাল সিংহ সভাপতি এবং হরিগঙ্গা বসাক সাধারন সম্পাদক হন।
হরিগঙ্গা বসাক,সুখময় সেনগুপ্ত, অজিতবন্ধু দেববর্মা,গোপাল চক্রবর্তী, নরেশ চ্যাটার্জী,কালী কুমার দে আগরতলায় ছাত্র সংগঠন গঠন করেন।
১৯৪২ সালে হরিগঙ্গা বসাক ঢাকা শহরে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আবার গ্রেফতার হন। প্রথমে ঢাকা কারাগার, এরপর কলকাতা কারাগারে পাঠানো হয়।
১৯৪৬ সালে দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাগার ভোগ করার পর মুক্তি পান। মুক্তি পেয়ে প্রথমে ঢাকা বাসায় কয়েকদিন অবস্থান করার পর আবার আগরতলায় চলে যান।
১৯৪৬ সালে ত্রিপুরা রাজ্য কংগ্রেসের সম্পাদক হন।
১৯৪৬ সালে ত্রিপুরাকে ভারতের সাথে অন্তভুক্তি করার জন্য মহাত্মগান্ধীর সাথে দেখা করেন।
১৯৪৭ সালের ৬ এবং ৭ জুলাই সিলেট জেলা নিয়ে গনভোট হলে কংগ্রেসের সমর্থনে প্রচার করেন। নিখিল ভারতের ডিপ্রেসড ক্লাসেস এসোসিয়েশনের সভাপতি বিরাট চন্দ্র মন্ডল ছিলেন হরিগঙ্গা বসাকের ঘনিষ্ট বন্ধু। ব্যারিষ্টার যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল জিন্নাহের পরামর্শে সিলেটে গিয়ে পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারে নামেন। হরিগঙ্গার বসাকের অনুরোধে বিরাট চন্দ্র মন্ডল সিলেটে গিয়ে কংগ্রেসের পক্ষে প্রচার করেন। ভাতৃসংঘের পুর্নিমা চক্রবর্তী, বিভা মজুমদার, বিরাট চন্দ্র মন্ডলের স্ত্রী শ্রীমতি অরুন্দ্বতি সরকার সিলেটের গনভোটে কংগ্রেসের পক্ষে প্রচারে নামেন।
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহর লাল নেহেরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের চুক্তি ভঙ্গ করার পর আখাউড়া- আগরতলা দিয়ে পুর্ব পাকিস্তান থেকে সব প্রকার আমদানী রপ্তানী আগরতলার সাথে বন্ধ হয়ে যায়। হরিগঙ্গা বসাক প্রতিবাদ এবং মিছিল করেন।
১৯৪৮ সালে ত্রিপুরা রাজ্যর সীমান্তে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর ব্যাপক হামলা ও গুলি চালায় । এ নিয়ে কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ করেন।
১৯৪৮ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরুর কাছে চিঠি লিখেন, ত্রিপুরাকে ভারতের সাথে অন্তভুক্তি করার জন্য।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গনপরিষদের সদস্য বিরাট চন্দ্র মন্ডল ঢাকা আসার জন্য হরিগঙ্গা বসাককে আমন্ত্রন জানান।
১৯৪৮ সালের ১৪ মার্চ বন্ধু বিরাট চন্দ্র মন্ডলের আমন্ত্রনে ঢাকায় আসেন হরিগঙ্গা বসাক। আসার সাথে সাথেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট মন্ত্রনালয়ের নির্দেশে রাষ্টদ্রোহিতার অভিযোগে হরিগঙ্গা বসাককে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার করার পর তাঁর উপর ব্যাপক পুলিশী নির্যাতন চলে। হরিগঙ্গা বসাককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ঢাকা শহরে কংগ্রেস প্রতিবাদ মিছিল মিটিং করেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু পর্যন্ত প্রতিবাদ করেন, মুক্তি দাবী করেন এবং আপ্রান চেষ্টা চালান।পাকিস্তান সরকার কোন কর্ণপাত করেনি।
১৯৪৯ সালে ৯ মার্চ বিরাট চন্দ্র মন্ডল পাকিস্তানের আইন ও শ্রমমন্ত্রী হলে হরিগঙ্গা বসাকের মুক্তি দাবী করেন। তাতেও কোন উপকার হয়নি।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হরিগঙ্গা বসাকের উপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। ঢাকা কারাগারে তাঁর শরীরে আর্সেনিক বিষাক্ত ঔষধ প্রয়োগ করা হয়। এই ঔষধ প্রয়োগ করার পর তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। নির্মম অত্যাচারে একেবারে নিস্তেজ হয়ে যান। তাঁকে রাখা হতো কারাগারের পস্রাবখানায়।
১৯৫২ সালের ১১ এপ্রিল নির্মম নির্যাতনের ফলে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী হরিগঙ্গা বসাক মৃত্যুবরন করেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী হরিগঙ্গা বসাকের নাম ইতিহাসের পাতা থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। তাঁর নাম হয়তো কেউ জানেন না। আগরতলা শহরে " হরিগঙ্গা বসাক" নামে একটি রাস্তা করা হয়েছে।
একজন সাংবাদিক থাকা সত্ত্বেও পত্রিকায় পাতায় তাঁর কোন সংবাদ নেই। বাংলাদেশের বাম রাজনীতিবিদ ও প্রবীন সাংবাদিক নির্মল সেন দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় লিখেছিলেন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী " হরিগঙ্গা বসাক" নিয়ে একটি কলাম।
প্রশ্ন:১৭
আপনার ইতিহাস নিয়েও আগ্রহ তাই দু-দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক মেল বন্ধনে আপনি আগ্রহী। এ বিষয়ে আপনার ভাবনাচিন্তা জানবো?
ভি ডি নিউটন :
সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ভারত হল একটি সুন্দর দেশ। বাংলাদেশের জনগন ভারতের সাংস্কৃতিককে খুবই পছন্দ করেন। বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে সাংস্কৃতিক নিয়ে বড় বড় অনুষ্টান করা হলে জনসাধারন উপকৃত হবেন।
আপনাকে ধন্যবাদ দাদা।
২২:০৮:২০২১
2 মন্তব্যসমূহ
অভিনন্দন ডিম ডিম নিউটন। ধন্যবাদ।
উত্তরমুছুনএই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।
উত্তরমুছুন