কবি ও সম্পাদক পুলিন রায়
মুখোমুখি
কবি ও কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর
পরিচিতি
পুলিন রায়। কবি, ছোটোকাগজ সম্পাদক ও সাহিত্য সংগঠক।
১৯৯০ সাল থেকে সম্পাদনা করছেন সুপরিচিত লিটলম্যাগ 'ভাস্কর'। ২০১৪ সালে প্রকাশিত ভাস্কর-এর কবি দিলওয়ার সংখ্যা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে রেফারেন্স পাঠ্যভূক্ত। এছাড়া সম্পাদনা করেছেন অমিয়, কল্লোল, কাব্যালোক ও কণ্ঠসাহিত্য।
কবি পুলিন রায় ইতোমধ্যে অর্জন করেছেন ঢাকার উৎস লেখক সম্মাননা। ভাস্কর সম্পাদক হিসাবে অর্জন করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'চিহ্ন সম্মাননা', বান্দরবানের 'সমুজ্জ্বল সুবাতাস' সম্মাননা, সিলেটের 'মাকুন্দা সাহিত্য' পদক, মৌলভীবাজারের 'কোরাস' সাহিত্য সম্মাননা এবং দুই বাংলার সম্পাদকদের সাথে ঢাকার 'সমধারা' সাহিত্য সম্মাননা।
২০১৬ সালে পুলিন রায়ের পঞ্চাশ পূর্তি এবং ভাস্কর-এর পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে 'পঞ্চাশে পুলিন, পঁচিশে ভাস্কর' শিরোনামে একশ এক সদস্যের উদযাপন পর্ষদের মাধ্যমে আড়ম্বরপূর্ণ একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে 'এখন যৌবন যার মিছিলে যার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ট সময়...' খ্যাত দেশবরেণ্য কবি হেলাল হাফিজ প্রধান অতিথি ছিলেন। এ উপলক্ষে সারা দেশের ৮০ জন লেখকের লেখা নিয়ে সমৃদ্ধ একটি সংকলন বের হয়।
পুলিন রায়ের প্রকাশিত গ্রন্থ ছয়টি। এর মধ্যে কাব্যগ্রন্থ চারটিঃ 'স্বপ্ন যাবে সমুদ্র স্নানে' (২০০১), 'কালের পালকে আঁকা'(২০০৬), 'সুঘ্রাণ ছড়ানো মৌনতা'(২০১৭) ও 'পাখির ঠোঁটে বসতি'(২০১৮)। গদ্যগ্রন্থ দুইটিঃ 'কষ্টের নোনা জলে যাপিত সবুজ জীবন'(২০০৪) এবং 'ওরা সবুজ, ওরা জীবনযোদ্ধা'(২০০৮) ।
ভাস্কর-এ বাংলাভাষাভাষি বিশেষ করে দুই বাংলার লিখিয়েদের লেখা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়। ২০১৮ সালে ভাস্কর-এর সম্পাদক হিসাবে পুলিন রায় ভারতের মণিপুরের ইম্ফলে অনুষ্ঠিত ইন্দো-বাংলা পয়েটস মিট-এ গেস্ট অব অনার হিসাবে অংশগ্রহণ করেন।
পুলিন রায়ের জন্ম ১ জুন, ১৯৬৬। পিতা : স্বর্গীয় ললিত মোহন রায়, শিক্ষক ছিলেন। মাতা: স্বর্গীয়া প্রফুল্ল বালা রায়। স্থায়ী ঠিকানা-গ্রামঃ লক্ষীপ্রসাদ, ইউনিয়নঃ দরবস্ত, উপজেলাঃ জৈন্তাপুর, সিলেট, বাংলাদেশ। বর্তমানে সিলেট নগরীর টিলাগড়স্থ গোপালটিলায় স্থায়ী বসবাস। লেখালেখি শুরু১৯৮৫, প্রথম কবিতা প্রকাশ ১৯৮৫ তে সাপ্তাহিক দেশবার্তা-য়। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি অমিয় সাহিত্য পরিষদ ও সুনামকণ্ঠ সাহিত্য পরিষদ। বর্তমান সভাপতি : সিলেট সাহিত্য পরিষদ, অমিয় সাহিত্য পরিষদ ও লোকচর্যা, সিলেট।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত। তাঁর সহধর্মিণী রঞ্জু রানী রায় একজন শিক্ষক। দুই ছেলের মধ্যে বড় জন অনিমেষ রায় পিয়াস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এবং ছোট ছেলে অনিরূদ্ধ রায় পরাগ তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র।
প্রশ্ন :১
কখন লেখালেখিতে এলেন?
পুলিন রায় :১
১৯৮৫ তে।তবে এখানে একটু বলে নিতে চাই। মাধ্যমিকে পড়াকালে কিছু পড়াশোনা করেছি। আমাদের পাশের গ্রামের এক বড় ভাই ইয়াজুল আমীন ভাইয়ের বইয়ের মোটামুটি সংগ্রহ ছিলো। তার কাছ থেকে পালাক্রমে বই ধার করে এনে এনে পড়তাম। আমাদের জন্ম প্রত্যন্ত গ্রামে(যেখানে বিদ্যুৎ এসেছে এই ২০১৫ সালে)। সেখানে বই পড়তে পারাটা ছিলো বড়লোকি ব্যাপার স্যাপার। এছাড়া আউট বই পড়া পুরোপুরি নিষেধ। এরপরও লুকিয়ে চুকিয়ে আউট বই পড়তাম। লেখালেখির চিন্তাও মাথায় আসতো না। তখন মনে করতাম লেখালেখি করেন দেবতাতুল্যরা কিংবা বড়লোকেরা। আমার আউটবই পড়ার ছেদ পড়ে নবম শ্রেণিতে পড়াকালে, ১৯৭৯ সালে আমার শিক্ষক বাবার মৃত্যুতে। তারপর কোনো রকমে ১৯৮১ তে এসএসসি পাশের পর আর আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সব ধরনের পড়াশুনার পাঠ পুরোদমে বন্ধ হয়ে যায়। দারিদ্র্যপীড়িত সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে হয় আমাকে। তাই পড়াশোনা করা কলেজে ভর্তি হওয়ার কথা মাথায়ও আসেনি। বেঁচে থাকার লক্ষ্যে কঠোর জীবন সংগ্রামে নিজেকে জড়াতে বাধ্য হয়েছি। শ্রমজীবী অনেক কাজ করতে হয়েছে। এসএসসি পাশ আমাকে। এক পর্যায়ে ১৯৮৫ সালে প্রাইভেটে এইচএসসি(উচ্চ মাধ্যমিক) পাস করি একদিনও কলেজে না গিয়ে। এরপরে বাংলা অনার্সে ভর্তি, বাম ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হওয়া এবং কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু সাহচর্য লাভ। শুরু হয় লেখালেখি।
প্রশ্ন :২
শ্রী হট্টে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মগান্ধী,সুভাসচন্দ্র থেকে অনেকেই গেছেন স্বাধীনতা আর অখন্ড ভারতের বিভিন্ন মুক্তি সংগ্রামের জন্য বারবার ছুটে গেছেন মানুষের হয়ে কথা বলার জন্য। রবীন্দ্রনাথ সিলেট নিয়ে সুন্দরী শ্রীভূমি লিখেছেন শতবছর আগে।সিলেটের সাংস্কৃতিক মানুষেরাও রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগামের শতবছর পুর্তি অনুষ্ঠানে সে বিষয় স্মরণীয় রেখেছেন।শ্রীভূমি আসলেই দ্বিতীয় লন্ডন। এখানকার আঁকা লুকি হাওর,শ্রীমঙ্গলের চা বাগান সবখানেই সুন্দর ঢেলে দিয়েছেন প্রকৃতি।দেশভাগের আগের এই সুন্দরী শ্রীভূমির অপরূপ সুন্দরের বিস্তৃত বলবেন পুলিন দাদা?
পুলিন রায়:২
সিলেটকে কবিগুরু শ্রীভূমি বলে এর মাহাত্ম্যই শুধু বাড়াননি সিলেটের নৈসর্গিকতাকেও মহিমান্বিত করেছেন। ওলিকুল শিরোমণি হযরত শাহজালাল এবং মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেবের পৈতৃক নিবাসের পূণ্যস্মৃতিধন্য প্রাণের সিলেট আমাদের অহংকার। সিলেটে রয়েছে প্রকৃতির নিপুণ এক তৈরি ঐতিহ্যের ধারক মুরারিচাঁদ কলেজসহ অনেক প্রাচীন স্থাপনা। রাধারমণ, হাছন রাজা, শিতালং শাহ, আরকুম শাহ, দুর্বিন শাহ, গিয়াস উদ্দিন, শাহ আবদুল করিম ও ক্বারী আমির উদ্দিন প্রমুখ বাউল/লোকশিল্পীদের চারণভূমি এই সিলেট। রম্যলেখক সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী, কবি অশোক বিজয় রাহা, বাগ্মীপুরুষ বিপিন পাল, দার্শনিক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, কথাশিল্পী শাহেদ আলী, কবি দিলওয়ার এই সিলেটেরই কৃতী সন্তান। তাঁদেরই উত্তরাধিকার হিসাবে সিলেটের সন্তান হিসাবে আমি গর্বিত।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুভাষ চন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী, জহরলাল নেহেরু, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ মনীষীর পদস্পর্শে ধন্য এই শ্রীভূমি। ২০১৯ সালে রবীন্দ্রনাথের সিলেট আগমনের শতবর্ষ পূর্ণ হয়। এ উপলক্ষে সিলেটে কয়েকদিন ধরে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন হয়। এতে দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা লেখক গবেষক শিক্ষাবিদসহ সাধারণ জনগণঅংশ গ্রহণ করেন। ভারত থেকে এসেছিলেন প্রখ্যাত রবীন্দ্র গবেষক উষারঞ্জন ভট্টাচার্য। কিছুদিন পর হবে কাজী নজরুল ইসলামের সিলেট আগমনের শতবর্ষ উদযাপন।
সুরমা, কুশিয়ারা, সারী ইত্যাদি নদ-নদীর কল্লোলিত নিনাদ, ছোটবড় পাহাড়-টিলা, চা বাগানের অবারিত সবুজ আবহ ও হাকালুকি-টাঙ্গুয়াসহ অসংখ্য হাওর-বাওর সিলেটকে করে তুলেছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ অমরাবতী।
এই সিলেট আমাদের অহংকার, গর্বিত এক জনপদ।
প্রশ্ন :৩
"শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আমরা জেগে আছি
পুলিন রায়
দিগন্তে রঙের খেলা শেষে
শুরু হয় শ্রাবণ বৃষ্টিপাত
অঝোরে ঝরে আকাশের কান্না
আমাদের নদীতে যে মাঝি মাছ ধরে
তার চোখেও কান্নার জল
কিষাণ-কিষাণীর বুকে আর্তনাদ
কাশবনে নেই কোনো ফুল
বাঁশবনের ফাঁকে দেখা যায় না চাঁদ
সবুজাভ ক্ষেতের শিয়র দিয়ে বয়ে যায়
কষ্টের-বেদনার নীল বাতাস
ওইখানে -ওই উর্বর সরোবরে
বাসা বেঁধেছিলো যে পাখি
স্তব্ধ হয়ে গেছে তার গান
আমাদের সমৃদ্ধ ইতিহাসের সড়ক থেকে
মুছেনি রক্তের দাগ
আমাদের হৃৎপিণ্ডের রক্ত ঝরা বন্ধ হবে না
বাঙালির কান্নার রোল ধ্বনিত হবেই চিরকাল
তারপরও, পিতা, আমরা জেগে আছি
লক্ষ কোটি তোমার সন্তান
বাংলা ভরে তুলবোই সোনার ফসলে
আমরা জেগে আছি"
কবিতাটি প্রাণ ছুঁয়ে দিলো।মুজিব তো সিলেটেও এসেছিলেন?
পুলিন রায় :
পুলিন রায় : ৩
কবিতাটি ভালো লেগেছে জেনে পুলক অনুভব করছি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ চলছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে তাঁর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। শোকাবহ আগস্ট ট্র্যাজেডির সকল শহিদের প্রতিও শ্রদ্ধা। সিলেট সবসময়ই আন্দোলনের সূতিকাগার। বঙ্গবন্ধু অনেকবার সিলেট আগমন করে স্বাধিকার আন্দোলনের সপক্ষে মানুষকে জাগিয়েছেন। তাঁর ডাকে সর্বসাধারণ বিপুল সাড়া দিয়ে স্বাধিকার আন্দোলনে উজ্জীবিত হয়েছে। আমাদের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদস্পর্শ সিলেটের জন্য গৌরবের।
প্রশ্ন :৪
আচ্ছা আমরা তো ত্রিপুরা প্রকাশনামঞ্চ আত্মপ্রকাশ করলাম।
আপনি এতে সদস্য হিসেবে থাকতে হবে।বছরে একবার আমরা প্রকাশনা উইসব করবো।আপনার প্রকাশনা সংস্থা ভাস্কর আমাদের সাথে ত্রিপুরা প্রকাশনামঞ্চের সদস্য হিসেবে আপনার উপস্থিতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকবেন তো?
পুলিন রায়: ৪
আপনাদের ত্রিপুরা প্রকাশনামঞ্চ গঠন একটি মহতী উদ্যোগ। আমি এতে সদস্য হতে ভীষণভাবে আগ্রহী।ত্রিপুরা প্রকাশনা মঞ্চ-এর সাথে যুক্ত থাকতে পারলে গৌরবান্বিত বোধ করবো। ভাস্কর সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থাকতে সদাসচেষ্ট। কৃতজ্ঞতা ও শুভ কামনা।
প্রশ্ন :৫
লিটল ম্যাগাজিন ভাস্কর রুচীশীল ছোট পত্রিকা। আমার কাছে আগরতলায় এসে দিয়ে যাওয়া,সংখ্যাগুলো আছে।আগামীদিন আমাদের লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা ও সংরক্ষণ কেন্দ্রে ভাস্কর্যের সবগুলো সংখ্যা চাই।আপনার লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা বিষয়ক ভাবনাচিন্তা জানবো?
পুলিন রায় : ৫
লিটল ম্যাগাজিন বিশুদ্ধ সাহিত্যের প্রাণ। পরীক্ষা নিরীক্ষার উপযুক্ত ক্ষেত্র। সাহসী এবং ব্যতিক্রমী ধারণা বহিঃপ্রকাশের মোক্ষম স্থান হলো ছোটোকাগজ। প্রতিশ্রুতিশীল তরুণদের আশ্রয়স্থল। লিটল ম্যাগের ভুবনকে সমুন্নত রাখতে লিটল ম্যাগ কর্মীদের আরো উদ্যগী ও যুথবদ্ধ হতে হবে।
আপনাদের লিটল ম্যাগাজিন গবেষণা ও সংরক্ষণ কেন্দ্র যুগোপযোগী একটি উদ্যোগ। এর সাফল্য কামনা করি। এটাকে সমৃদ্ধ করার লক্ষে সাধ্যমতো সবকিছু করার আশ্বাস ব্যক্ত করছি।
লিটল ম্যাগাজিনে নতুনদের প্রাধান্য দিয়ে সব বয়েসী কিংবা প্রতিষ্ঠিত লিখিয়েদের মননশীল-নিরীক্ষামূলক বাছাই করা লেখা ছাপবে এটাই স্বাভাবিক।
লিটল ম্যাগাজিনের সাথে গত একত্রিশ বছর ধরে যুক্ত আছি ভেবে খুব আপ্লুত হই। ভাস্কর এ উপস্থাপিত তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল অনেকেই আজ তুমুলভাবে প্রতিষ্ঠিত। এটা আনন্দের। ভাস্কর-এর কৃতিত্ব হচ্ছে, মেধাবীদের টার্গেট করে করে তাদের যথাযথভাবে পাদপ্রদীপের আলোয় আনতে পারা। লিটল ম্যাগকে নতুনত্ব এবং মানসম্মত রাখতে আপোষকামিতাকে পরিহার করতে হবে।
একজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকের উচিত মন জোগানো নয়, মন জাগানোর জন্য উদ্যোগী হওয়া।
ভাস্কর সব সময় তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল মেধাবীদের পক্ষপাতে বিশ্বাসী। ২০০৪ সালের ভাস্কর-এর দশম সংখ্যা থেকে প্রতি সংখ্যায় একজন তরুণতম প্রতিশ্রুতিশীল লিখিয়েকে তার সংক্ষিপ্ত জীবনীসহ একগুচ্ছ লেখা প্রকাশ করে আসছে। যারা আজ তুমুলভাবে প্রতিষ্ঠিত।
প্রশ্ন :৬
আপনার শুরুর দিনগুলো শুনবো?
পুলিন রায় : ৬
আমার শুরুর দিনগুলোর কথা বলতে হলে একটু পেছন থেকে আসতে হবে।
১৯৭৯ সালে পরলোকগমন করেন আমার পিতা স্বনামধন্য শিক্ষক ললিত মোহন রায়। বাবা মারা যাওয়ায় মাথায় যেনো বাজ পড়ে। তখন আমিa নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত এক অবোধ বালক। কোন রকমে ১৯৮১ সালে পাশ করলাম এসএসসি। এ ক্ষেত্রে আমাদের একান্ত শুভাকাঙ্ক্ষী পরমাত্মীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা-শিক্ষক দুর্যোধন বিশ্বাসের পরামর্শ ও সহায়তা স্মরণ করছি শ্রদ্ধায়। বাবা পরলোকগমনের পর সংসারের বড় ছেলে হওয়ায় আমাকেই ধরতে হয় সংসারের হাল। এ সময় আমার দশ/এগারো বছর বয়সের ছোট ভাই নির্মলকে পেয়েছি জীবন সংগ্রামের সহযোদ্ধা হিসেবে। এসএসসি পাশের পর সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লক্ষীপ্রসাদ গ্রামের বাড়িতে মা আর ছোট দুই ভাই ও এক বোন নিয়ে সংসারের হাল ধরতে আমাকে করতে হয়েছে জীবনের কঠোর সংগ্রাম। দুমুঠো ভাতের জন্য, বেঁচে থাকার তাগিদে তখন এসএসসি পাশ আমাকে মানুষের ক্ষেতে কাজ করা থেকে শুরু করে করতে হয়েছে পান সিগারেট, পলিথিনের ব্যাগ, ব্যাঙ ও মাছ ধরে বিক্রি করার কাজ। এরপর বড় বোনের দেওয়া দু'শ টাকায় ভর করে করেছি লাকড়ি এবং আটা ধান-চালের ব্যবসা। এই ব্যবসায় সাফল্য আসায় ছোট ছোট ভাইবোনকে স্কুলে ভর্তি করি।
১৯৮৫ সালের মাঝামাঝি আমি পল্লীগাঁ থেকে কাদামাটির শুঁদা গন্ধ গায়ে মেখে সিলেট শহরে আসি। গর্ভধারিণী জননী প্রফুল্ল বালা রায় তখন তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে নানাভাবে যুগিয়েছেন সামনে যাওয়ার প্রেরণা। এর আগে তুখোড় জীবনসংগ্রামের একপর্যায়ে একদিনও কলেজে না গিয়ে ১৯৮৫ সালে সিলেট এম সি (তৎকালীন সরকারি কলেজ) কলেজ থেকে প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে পাশ করি এইচএসসি। এই আইএ পাশের পেছনে প্রিয় অগ্রজ শ্যামানন্দ সরকারের রয়েছে দারুণ এক ভূমিকা। সম্ভবত ১৯৮৩ তে সম্পর্কিত এক কাকার বিয়ে উপলক্ষে তাদের বাড়িতে গেলে পরিচয় হয় তাঁর সাথে। আমরা প্রায় সারা রাত গল্প করে কাটিয়ে দেই। এসএসসি পাশ আমার জীবনকথা শুনে তিনি ইন্টার ক্লাসের বাংলা ও ইংরেজি মূল পাঠ্য বই এবং শ্রীকান্ত ও রক্তাক্ত প্রান্তর - এই চারটি বই পড়তে দিয়েছিলেন। তিনি তখন এমসি কলেজে বিএসসি-র শিক্ষার্থী। আমার জীবনসংগ্রামের ফাঁকে বই চারটি পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ করে ফেলি। প্রাইভেটে আইএ দেওয়ার পেছনে এটাও একটা প্রেরণা। এছাড়াও জীবন চলার পথে প্রিয় এই মানুষটির বিপুল উৎসাহ প্রাপ্তি বর্ণনাতীত।
যাহোক, বিএ -তে ভর্তি হতে আসি তৎকালিন সরকারি (বর্তমান এম সি) কলেজে। সনদ ও ছবি সত্যায়িত করতে গিয়ে দেখা হয় শ্রদ্ধেয়া শামসুন্নাহার ম্যাডামের সাথে। ম্যাডাম আমার এসএসসি ও এইচএসসি'র সনদ দেখে অনার্সে ভর্তি হতে বলেন। এই প্রথম 'অনার্স' নামের একটি শব্দ প্রবেশ করলো আমার কর্ণকুহরে। কেননা আমি এতোই গেঁয়ো ছিলাম যে, এইচএসসি পাশের পরও কোন ধারণা ছিলো না স্নাতক পাস বা অনার্স কোর্স সম্পর্কে। আমার ধারণা ছিলো শুধু বিএ, বিএসসি বা বিকম সম্পর্কে। ম্যাডামের কথার কোন উত্তর না দিয়ে কেবল শুনে যাই তাঁর কথা। অনার্স সম্পর্কে আমার যে কোন ধারণা নেই সেটা তাঁকে বুঝতে দেইনি। ভর দুপুরের এক অলস সময়ে তিনি আপনমনে অনার্স এবং পাস কোর্সের ভালোমন্দ দুটো দিকই বলে গেলেন ক্ষণিককাল। এ ব্যাপারে আমার ধারণা হলো এই প্রথম। পরিশেষে ম্যাডামের সাথে ফ্রি হয়ে গেলে আমার জীবন সংগ্রাম ও প্রাইভেট এইচএসসি দেয়ার কথা একটু বলে ফেলি। ম্যাডাম সব শুনে জেদ ধরে বসলেন, 'তোমাকে দিয়েই হবে। তোমাকে অনার্স পড়তেই হবে'। হায়রে নিয়তি বি.এ পড়তে আসা সেই বোকাসোকা 'গেয়ো' আমি একদিন ভর্তি হয়ে যাই অনার্সে, ঐতিহ্যবাহী এম সি (তৎকালিন সরকারি কলেজ) কলেজে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। শামসুন্নাহার ম্যাডামের প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতা থাকবে আমৃত্যু। তাঁর সাথে দেখা না হলে, কিংবা তিনি সঠিকভাবে নির্দেশনায় উদ্বুদ্ধ না করলে হয়তো পড়াই হতো না অনার্সে। ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করে এসে ম্যাডামের শুভাশিস নিয়েছি পুনরায়। যা হোক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সিলেট সরকারি কলেজে(বর্তমান এম সি কলেজ) চান্স পেয়ে গেলাম রাষ্ট্রবিজ্ঞান অনার্সে। একসময় বিশিষ্ট সাহিত্যিক অধ্যাপক সফিউদ্দিন আহমদ স্যারের পরম সান্নিধ্য পেয়ে চলে এলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে। স্যার তখন এই বিভাগের চেয়ারম্যান। আমার জীবন চলার পথে সফিউদ্দিন স্যারের প্রেরণা ও নির্দেশনা কতোটুকু তা জানি কেবল আমি। বিনম্র শ্রদ্ধা স্যারের প্রতিও। শ্রদ্ধা অন্যান্য স্যারের প্রতিও। বাংলা অনার্সে ভর্তি হওয়ার পরই ঘুরে যায় আমার জীবনের মোড়। বাদ দিয়ে দিতে হয় ব্যবসা। সিলেটে বসবাসের লক্ষ্যে ও পড়ালেখা চালিয়ে যেতে শুরু করতে হয় টিউশনি। কিন্তু টিউশনি পাবো কোথায়? আমার সব জেনেশুনে নিজের টিউশনি আমাকে ছেড়ে দিয়ে পায়ের নীচে মাটি এনে দিয়েছিলেন পরম আপন, অগ্রজ রাজনৈতিক বন্ধু মো. নিয়াজ উদ্দীন। তারপর জোগাড় করে নেই আরো কয়েকটি টিউশনি। সিলেট শহরে থাকা, পড়াশুনা করা, বাড়িতে ছোট ভাইবোনকে পড়ানোসহ সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়তে হবে তারও টাকা জমা করা- সব মাথায় নিয়ে নয়/দশটি টিউশনি চলতে লাগলো রুটিন মাফিক। সাথে কলেজের ক্লাস তো আছেই। পাশাপাশি তুমুলভাবে জড়িয়ে পড়ি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে। রাজনৈতিক বন্ধুদের সাহচর্যেই একদিন আমার প্রায় ১৯ বছর বয়সে প্রথম কোন লেখা ছাপা হয়ে যায় সাপ্তাহিক 'দেশবার্তা' পত্রিকায়। ক্রমান্বয়ে জড়িয়ে পড়ি সাহিত্য-সংস্কৃতি কর্মকাণ্ড, সম্পাদনা ও সাংবাদিকতার সাথে। লেখা ছাপা হতে স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা-সংকলন-
সাময়িকীতে। ঘনিষ্টভাবে যুক্ত হয়ে যাই সম্পাদনা এবং উদীচীসহ নানা শিল্প-সাহিত্য সংগঠনের সাথে। সময় মাপা এ সব কিছু মোকাবেলা করতে বাই-সাইকেলই ছিলো এক অনন্য নির্ভরতা। এভাবেই শুরু হয়ে যায় আর কী!
প্রশ্ন :৭
কী লিখি কেন লিখি?
পুলিন রায় : ৭
'কী লিখি কেন লিখি' এর উত্তর আসলে আগের প্রশ্নের উত্তরই। ৬ নম্বর প্রশ্নের উত্তরের বর্ণনার আমার জীবনযুদ্ধের কথাই লিখে চলেছি। সব লিখিয়েই আসল জীবন লিখেন। প্রত্যেক লিখিয়েই তার যাপিত জীবনকে নানা মাত্রিকতায় লিখে চলেছেন। বাংলা ভাষা প্রত্যেক লেখকের আলাদা আলাদ জীবনডায়েরি মিলেই তো বাংলা সাহিত্য।
কেন লিখি এর উত্তরে বলবো, লিখা হচ্ছে কি না জানি না। মনের আনন্দে জীবনাজ্ঞতার কথাই লিখছি। মানুষ পড়ছি, মানুষ লিখছি। মানুষের কল্যাণে শুভ সুন্দরের কথাই লিখার চেষ্টা করছি। মায়ের মুখের হাসি, বাংলা মায়ের রূপকথা লিখার প্রচেষ্টায় আছি।
প্রশ্ন :৮
আপনার জার্নিতে প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি বিষয়ে অভিব্যক্তি?
পুলিন রায় : ৮
প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির দোলাচলেই তো জীবন। অপ্রাপ্তির খেদের চেয়ে আমার প্রাপ্তির আনন্দটাই বেশি। গ্রামের কাদামাটি ছেনে জীবনসংগ্রামের পথ মাড়িয়ে আজ আমি যে অবস্থানে এসেছি সেটা আমার প্রাপ্তির ষোলকলার পূর্ণতা। তবে অপ্রাপ্তিও যে নেই তা নয়। আমার মনে হয় আজও আমি আমার কাঙ্ক্ষিত কবিতাটি লিখতে পারিনি কিংবা কাঙ্ক্ষিত সংখ্যা 'ভাস্কর' বের করতে পারিনি। তবে বড়ো একটা অতৃপ্তি আমাকে ভীষণ পীড়া দেয়, সেটা হলো আমার বাবা আমার কর্মজীবন বা আমার কোন কিছুই দেখে যেতে পারলেন না। বাবার জন্য আমিও কিছুই করতে পারলাম না। কেননা বাবা পরলোকগত হন আমি ৯ম শ্রেণিতে পড়াকালে, ১৯৭৯ সালে। এই দুঃখবোধ থেকে বের হতে পারবো না কখনও।
প্রশ্ন :৯
দেশভাগ মুক্তিযোদ্ধ কেমন দেখেন?
পুলিন রায় :৯
দেশভাগ রাজনীতির কঠিন খেলার অংশ। এটা হয়তো বা নিয়তি নির্ধারিত ছিলো। মহাভারতের ভারত যখন কল্পনা করি তখন অন্যরকম পুলক অনুভব করি।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের মহান এক অর্জন। আমরা জানি 'স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে'। বাঙালির রাজনৈতিক ও শোষণমুক্তির রাজটিকা হলো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত লালসবুজ পতাকা আমাদের অস্তিত্বের স্মারক, ভৌগলিক জয়মাল্যের সোপান। এবছর আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো মুক্তির সংগ্রামে। ত্রিশ লক্ষ শহিদের রক্ত আর দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় প্রিয় স্বাধীনতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বন্ধু প্রতীম ভারতের অপরিসীম সহায়তা বাঙালি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে অনন্তকাল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এককোটি শরণার্থীকে অাশ্রয় দিয়ে তাদের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করে তৎকালীন ভারত সরকার। এসময় আমি ক্লাস টু-এর ছাত্র ছিলাম। আমার ঝাপসা মনে আছে আমাদের সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লালাখাল সীমান্ত দিয়ে আমরা ভারত মেঘালয়ের মুক্তাপুর আমতরং ক্যাম্পে ছিলাম। আমার বাবা শিক্ষক ছিলেন। ক্যাম্পে গিয়েও শিক্ষকতা চালানোর চেষ্টা করেন। আমার স্পষ্টভাবে মনে আছে ক্যাম্পে একবার শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এসেছিলেন এবং শিক্ষকের ছেলে হিসাবে বিশেষ সুবিধা প্রাপ্ত হয়ে আমি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে হ্যান্ডশেক করেছিলাম। সেটা আমার জীবনের মধুর এক স্মৃতি। শরণার্থী ক্যাম্পে যাওয়া এবং সেখানকার দুসঃহ জীবন নিয়ে লেখার ইচ্ছে আছে।
প্রশ্ন :১০
আপনার সাহিত্যে কবিতায় সিলেট,দেশভাগ কি পরোক্ষভাবে কিংবা প্রত্যক্ষভাবে এসছে?
পুলিন রায় : ১০
সিলেট আমার প্রাণের শহর, ভালোবাসার শহর। আমার অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। সুতরাং আমার লেখায় সিলেট আসবে-এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যক্ষ পরোক্ষ দুভাবেই বহুবার এসেছে।
দেশভাগ আমার লেখায় খুব একটা প্রভাব পড়েনি। তবে পুরো ভারত আমাকে ভীষণ টানে। আমি কাঁটাতারের বেড়া, ভিসা পাসপোর্টের ঝক্কি ঝামেলার কারণেই হয়তো বা আমার কবিতার বইয়ের নাম 'পাখির ঠোঁটে বসতি'। কেননা পাখির তো আর ভিসা পাসপোর্টের কোন দরকার পড়ে না।
প্রশ্ন :১১
কবিতা আমাদের মনের যন্ত্রণারই প্রকাশ।হতে পারে প্রেম বিরহেরও।কিংবা আনন্দের বহিঃপ্রকাশও কবিতা।কেমন দেখেন কবিতাকে?
পুলিন রায় : ১১
যন্ত্রণাদগ্ধ জীবন থেকেও তো কবিতার জন্ম হয়। আশা-আকাঙ্ক্ষা, হতাশা-বেদনা, প্রেম-বিরহের নির্যাস কবিতায় আসতে বাধ্য। কবিরা স্বপ্নদ্রষ্টা। ব্যক্তিক দ্বন্দ্ব এবং কালপরম্পরায় সমসাময়িক বিষয়াবলী কবির কলমে ওঠে আসবেই। যেমন শহিদ নূর হোসেনের গণতন্ত্রের সংগ্রাম নিয়ে কবি শামসুর রাহমানের কী অসাধারণ উচ্চারণ 'বুক তার বাংলাদেশের হৃদয় '। কবি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
প্রশ্ন :১২
কবিতার জন্য কোন বৃহত্তর স্বার্থ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন?
পুলিন রায় : ১২
না, মোটেও না। বরঞ্চ কবিতা আমাকে বৃহত্তর সূত্রের সাথে যুক্ত করেছে।
প্রশ্ন :১৩
বিশেষ কোন কাজ যা আপনাকে তৃপ্ত করেছে?
পুলিন রায় : ১৩
লিটল ম্যাগ ভাস্কর -এ তরুণতম প্রতিশ্রুতিশীল লিখেয়েদের উপস্থাপনের বিষয়টি আমাকে খুব আপ্লূত করে। এটা হয়তো তেম বড় কোন বিষয় নয়, কিন্তু আমাকে ভীষণ আনন্দ দেয় এজন্য যে, ভাস্কর-এ উপস্থাপিত একসময়ের তরুণতমরা এখন তুমুলভাবে প্রতিষ্ঠিত। ভাস্কর-এর টার্গেট যে শতভাগ সঠিক তা আজ প্রমাণিত।
আরেকটা বিষয় আমাকে খুব আনন্দ দেয়। আর তা হলো শ্রমজীবী শিশুকিশোর নিয়ে কাক করা। যে বয়সে লেখাপড়া করার কথা সেই বয়সে যারা জীবিকার তাগিদে, বেঁচে থাকার জন্য জীবনের সাথে যুদ্ধ করে যায়(একসময় আমিও এই যুদ্ধ করেছি) তাদের নিয়ে আমার দুটো বই করা। বইগুলোর একটি হলো 'কষ্টের নোনাজলে যাপিত সবুজ জীবন'(২০০৪) এবং 'ওরা সবুজ ওরা জীবনযোদ্ধা'(২০০৮)।
প্রশ্ন :১৪
কেউ কেউ বাংলাদেশের কবিতায় বুদ্ধি নেই আছে হৃদয়।বিষয়টি কিরকম দেখবেন?আমি ঠিক এমন না দেখলেও এই ধারণাও আছে।
পুলিন রায় : ১৪
বাংলাদেশের কবিতায় বুদ্ধি নেই আছে হৃদয়--কথাটা মোটেও ঠিক নয়। এটা বলা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে হচ্ছে। আমি এটার তীব্র প্রতিবাদ করছি। এটি বলা সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। বাংলাদেশের কবিতায় বুদ্ধি এবং হৃদয় দুটোই চরমভাবে আছে। মহান ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত বাংলাদেশের সাহিত্যই বাংলা সাহিত্যের প্রকৃত রসদ। মাতৃভাষা বাংলাই আমাদের কথ্য বা লেখ্য ভাষার অবলম্বন। বাংলাই আমাদের সাহিত্যচর্চাসহ জীবনযাপনের একমাত্র নিয়ামক।
প্রশ্ন :১৫
আপনার উল্লেখযোগ্য সম্মাননাগুলো বলবেন।একটি সম্মাননা লেখককে আগামীদিনের জন্য আরো গঠিত করে না সম্মাননা লেখককে আগামীদিনের স্বপ্ন থেকে পিছিয়ে দেয়?
পুলিন রায় : ১৫
যথার্থই বলেছেন, 'একটি সম্মাননা লেখককে আগামীদিনের জন্য আরো গঠিত করে'। সম্মাননা লেখককে আরো দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে বলেও আমি মনে করি। নাহ্, সম্মাননা লেখককে আগামীদিনের স্বপ্ন থেকে পিছিয়ে দেয় না। বরং আরো স্বপ্নবান করে তুলে।
আমার পরম সৌভাগ্য যে, আমি ঢাকার 'উৎস লেখক সম্মাননা', রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 'চিহ্ন সম্মাননা', বান্দরবানের 'সমুজ্জ্বল সুবাতাস' সম্মাননা, সিলেটের 'মাকুন্দা সাহিত্য' পদক, মৌলভীবাজারের 'কোরাস' সাহিত্য সম্মাননা এবং দুই বাংলার সম্পাদকদের সাথে ঢাকার 'সমধারা' সাহিত্য সম্মাননা লাভ। আমার প্রতি এই ভালোবাসার মূল্য অসীম। এর প্রতিদান দেয়ার সাধ্য আমার নেই।
বান্দরবানের 'সমুজ্জ্বল সুবাতাস' সম্পাদক-কবি প্রিয়জন চৌধুরী বাবুল বড়ুয়া কোভিড-১৯ এ প্রাণ হারিয়েছেন। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
গোবিন্দ ধর
আপনাকে ধন্যবাদ দাদা।
পুলিন রায়
:কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা ও ধন্যবাদ।
২২:০৮:২০২১
0 মন্তব্যসমূহ