কী লিখি কেন লিখি খান মাহবুব

কী লিখি কেন লিখি 
খান মাহবুব
প্রাবন্ধিক-গবেষক-প্রকাশক


কেন লিখি-- এ প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর পাওয়া ও দেয়া দূরহ। এটা পরীক্ষার হলের কোনও বড় বা ছোট প্রশ্নের উত্তর নয় যে, পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে ছ্যাঁচেফেলে উত্তর দেবো। লেখকের লেখার শুরুটা এবং লেখাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি অন্তরগরজ থেকে বোধ করি। তবে লেখার প্রেরণা বা উদ্যোগে নানা উপকরণ কাজ করলেও ভিতর থেকে জেগে ওঠার একটা বিষয় থাকে কমবেশি। আমার কাছে লেখা একটি স্বপ্ন-- যা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়, স্বস্তি দেয় না। এ অস্বস্তিবোধও লেখার একটা কারণ। তবে লেখার কারণগুলো সব সময় একরকম ও একমাত্রিক হয় না। কালের কাজের আবর্তে লেখার যেমন গতিগন্তব্য পরিবর্তিত হয়, পরিশীলিত হয় লেখার কারণও অনেক সময় বাঁক পবির্তন করে।
লেখকের বা লেখার উদ্দেশ্যের সঙ্গে পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা লেপ্টে থাকে। যদিও সৃজনধর্মী লেখায় পরবাস্তবতাবাদ (সুররিয়ালিজম) ও জাদুবাস্তবতাবাদ (ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম) লেখকের মাঝে অনেক সময় ইন্দ্রজালিক পরিবেশ সৃজন করেন। লেখক তখন বাস্তবতার সঙ্গে কল্পনার মিশেলে নবসাহিত্য সৃজন করেন। সৃজনের আনন্দ লেখায় একটি বড় অনুসঙ্গ। সৃজনের যেমন আনন্দ, সাথে সাথে সারথি হয়ে চলে বেদনা। তবে সৃজনের আনন্দ-বেদনা আদতে বিমূর্ত বিষয়। লেখার জন্য আমার দৃষ্টিতে বড় একটা প্রয়োজন-- ঘোর। ঘোরের ভিতরই মানুষ লিখে। গভীর ঘোর না হলে লেখকের ভিতরের নির্যাস কাগজের জমিনে নেমে আসে না। এই ঘোর ইচ্ছে করলেই যখন-তখন লেখক তৈরি করতে পারেন না। এটা যেমন লেখকের উদ্যোগ ও আয়োজন তেমনি একটি স্বচালিত বিষয়।
লেখাটা লেখকই লিখেন তবে আমার মনে হয় ভিতর থেকে কে যেন কীভাবে লেখা চালিয়ে নেয়। এ যেন লেখকের ভিতরই আর এক বিমূর্ত সত্তা।
পরিণত বা পড়ন্ত বয়সে কেন লিখি বা লিখে কী হয় এ জাতীয় প্রশ্নের নানা উত্তর চক্রাকারে মাথায় এলেও লেখার শুরুর সময়ের অবস্থা কিন্তু অন্যরকম থাকে। অল্প বয়সে যাদের লেখালেখির হাতেখড়ি তাদের স্মৃতির খেরোখাতায় নানা রকম গল্প থাকলেও লেখার জন্য একটা ভিতভূমি তৈরি হয় চারপাশ থেকে। প্রতিবেশ আশ্রয়ী হয়েই মানুষ লিখতে শুরু করে। আমিও এর ব্যতিক্রম নই। যাপিত জীবনে চারপাশটা যেমন উপভোগের কখনো আবার বিড়ম্বনার। এই দুইয়ের দ্যোতনায় মানুষ বাড়তে থাকে। একসময় লেখার উপকরণ মগজে তারপর কলমে ভর করে কাগজে নামে। বলে রাখা ভাল প্রতিটি লেখকই নিজের লেখার একজন ইতিবাচক পাঠক। নিজের লেখা সম্পর্কে নি¤œধারণা নিয়ে লেখা চালিয়ে যাওয়া কঠিন। কারণ আমি মনে করি লেখাকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দেয় স্বয়ং লেখক। অনুগ্রহ বা অনুকম্পা নয় লেখাকে টিকে থাকতে ও চালিয়ে নিতে সংকল্প, উদ্যোগ, মমত্ব ও প্রেরণা প্রয়োজন।
এই সময়ে যদি প্রশ্ন করা হয় কেন লিখি তাহলে হয়তো নানা মাত্রিক বাক্যবর্ষণ করা যাবে কিন্তু যখন আমার লেখালেখির আতুরঘর যাপন তখন কিন্তু প্রেক্ষাপট ও প্রকরণ ভিন্ন ছিল। বলে রাখা ভালো বেড়ে ওঠার বয়সে প্রকৃতি, চারপাশের গাছপালা, নদী, পাখি একটা জগৎ তৈরি করে। এই জগতে মানুষের যতই আত্মীকরণ ঘটে মানুষ ততই লেখার দিকে ধাবিত হয়। কেউ লিখে কবিতা, গল্প কিংবা অন্যকিছু।
আমার জন্মশহর টাঙ্গাইল বা এর আশেপাশটায় একটা নৈসর্গিক পরিবেশ ছিল। মধুপুরের শালবন, যমুনা বিধৌত বংশী, ধলেশ্বরী, ফটিকজানির অববাহিকা টাঙ্গাইল জেলাকে দিয়েছে এক ভিন্ন মাত্রিকতা। পরিবার বিশেষতঃ দাদু ও নানার বাড়ির পরিবেশও লেখার প্রাকপ্রেক্ষাপট তৈরি করে। আমি বেড়ে ওঠার বয়সে গ্রামের বাড়ি ফটিকজানি নদীর তীরে মধ্যদুপুরে একদিন বসে ছিলাম। নদীতে তখন ¯্রােত ছিল না তেমন একটা। হয়ত শুষ্ক মৌসুম। একটা পানসী নৌকায় নব পরীণতা বধূ যাচ্ছিল এবং নৌকার মাইকে বাজছিল গান--
‘ইজবান কোরবান জানকোর বানতো সুন্দরী
রূপের বানতো সুন্দরী’
বলাবাহুল্য তখন পানসী নৌকায়ও প্রয়োজনে দাঁড় টানা হতো। আমাকে নৌকার গান এক ত্বরণ তৈরি করে দিল। আমি গানের কথার অর্থ না বুঝলেও প্রেমাচ্ছন্ন হলাম। গানের আবেশ এতটাই ভর করলো আমি নৌকাকে লক্ষ্য করে নদীর কিনার দিয়ে এগুতে থাকলাম। আমি হাঁটলাম ঝাওবন, কাশবন, বালু মাটি দিয়ে-- কোনো খেয়াল ছিল না। শুধু নৌকার গান আমাকে মোহাচ্ছন্ন করে সঙ্গে করে নিল। আমার মনে আছে বেশ কয়েক মাইল যাওয়ার পর আমার হুঁশ হয়েছিল যে, আমি তো বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছি। অতপর বাড়ি ফেরা। সেদিন আমার মাঝে কী হয়েছিল জানি না। তবে রাতে হারিকেনের আলোতে দু’চরণ লিখেছিলাম। পদ্য নাকি পদ্যনামীয় কিছু একটা লেখার চেষ্টা। লেখার ব্যাকরণ ব্যাবিচ্ছেদে সেটা কোনও লেখা হয়েছিল কিংবা হয়নি তারচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সেটাই ছিল লেখার খাতায় প্রথম পেরেক ঠোকা। সে লেখার কী কারণ তা আমি বলতে পারবো না। তবে আজ কেন লিখি সেটার কারণ অনুপুঙ্খভাবে বলতে না পারলেও কিছুটা বয়ান দেয়া যেতে পারে।
লেখা আমার কাছে আনন্দ, দায়বদ্ধতা-- সবচেয়ে বড় হচ্ছে লেখা আমার কাছে একটা আশ্রয়কেন্দ্র। যুগযন্ত্রণা অন্যদের মতো আমাকেও দগ্ধ করে পীড়ন দেয়। প্রতিবাদী হতে বলে। আমি সবসময় প্রতিবাদী হতে পারি না। আমার লেখা আমার প্রতিবাদের একটা আশ্রয়। ইদানিং লিখতে লিখতে একটা অভ্যস্ত ভাব চলে এসেছে। না লিখলে ভাল বোধ করি না। যেন মানসিক বৈকল্য তৈরি হয়।
 লেখার বড় একটা কারণ হচ্ছে আমার ভিতর বাস করা আমিটা লেখার মাধ্যমে আনন্দ ও প্রশান্তি পায়। আনন্দের বড় কারণ হচ্ছে যা চিন্তা ও কল্পনায় যাপন করি তা লেখার মাধ্যমে বেড়িয়ে আসে। এটা আমাকে মুক্ত করে দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা থেকে। ব্যক্তিজীবনে সবচেয়ে বেশি পচ্ছন্দ করি আমার স্বাধীনতাকে। লেখার ভুবনে আমি অনেকটা স্বাধীন। এই স্বাধীনতা বাড়-বাড়ন্ত হয় আমার লেখায়। চিন্তার সঙ্গে আমার না পেরে ওঠার কল্পনাও কখনো কখনো লেখার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আমাকে একজন নির্ভার মানুষ হিসেবে স্বস্তি দেয়। যা করতে চেয়ে করতে পারি না সেটা দিব্যি পেরে যাই আমার লেখার জগতে।
সবলেখাই একই কারণে লিখি তা সঠিক নয়। নানা লেখার বিবিধ কারণ থাকে। তবে সব লেখাতেই এক ধরনের গভীর সংযোগের চেষ্টা করি। লেখার সাথে সংযোগ ঘটানোটা লেখাকে এগিয়ে নেওয়ার একটা বড় শর্ত।
শুরুতেই বলেছিলাম কেন লিখি সেটার পরিস্কার বর্ণনা দেয়া পুরোপুরি সম্ভব নয় । তবে এইকাল পর্বে প্রসঙ্গত কিছু বিষয়ের অবতারণার প্রচেষ্টা রাখি। ভবিষ্যতে লেখার কারণ হয়তো আজকের কারণ থেকে ভিন্ন কিছু হলেও হতে পারে-- তাতে ক্ষতি নেই। মোদ্দাকথা লেখাকে আন্তরিকতা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে টিকিয়ে রাখার অদম্য বাসনাই লেখকের গন্তব্য। 

[সৌজন্য: মাহমুদ কামাল। অরণি’র ২৪তম সংখ্যা, জানুয়ারি-জুন ২০১৯]

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ