কী লিখি কেন লিখি
হারুন পাশা
কী লিখি কেন লিখি
হারুন পাশা
আমি লিখি গল্প এবং উপন্যাস। গল্পের বই করিনি এখনো; উপন্যাস বেরিয়েছে তিনটি। তিনটি উপন্যাস তিন ধরনের বিষয় নিয়ে লেখা।
‘তিস্তা’ উপন্যাস পানিহীন তিস্তা নদী এবং তিস্তাবাসীর দুর্বিষহ জীবনের আখ্যান। বেকারদের জীবনের হতাশা, হাহাকার এবং সাফল্যের আখ্যানে সাজানো উপন্যাস ‘চাকরিনামা’। আর করোনার কারণে দেশ এবং বহির্বিশ্বের বদলে যাওয়া অর্থনীতি, সমাজ, প্রকৃতি, মানুষের জীবন, স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতির বদল নিয়ে লেখা উপন্যাস ‘বদলে যাওয়া ভূমি’। এ বদল মানবভূমির সঙ্গে উপন্যাসের বর্ণনাকৌশলেরও বদল।
কেন লিখি?
এক কথায় উত্তর করা খুবই কঠিন। বেশি কথায় বলতে গেলেও সব বলে উঠা যাবে না। কম-বেশির মাঝে একটা হিসাব দাঁড় করিয়েই বলছি কেন লিখি গল্প-উপন্যাস।
এজন্য জীবনের ফ্ল্যাশব্যাকে যেতে হবে। ছোটোবেলা, মানে স্কুলে যাওয়ার বয়স থেকেই আমার চারপাশে যা দেখতাম তা বিশ্লেষণ করতাম। গল্প আকারে সাজাতে চাইতাম। বলতে চাইতাম। ছোটো ছোটো ঘটনা আমাকে আনন্দ দিত। আমি সেসব বিশ্লেষণ করে আনন্দে ডুবে থাকতে পছন্দ করতাম। আমি তো তেমন কারো সঙ্গ পেতাম না। এজন্য ঘটনা বিশ্লেষণের আনন্দ থেকে নিজেকে বিরত রাখতে চাইতাম না, হয়তো। একজন সঙ্গহীন বালক হিসেবে লেখার চেষ্টা করতে থাকি।
আমার গল্প শুনতে ভালো লাগে। গান শুনতে ভালো লাগে। মানুষের সঙ্গ ভালো লাগে। কিন্তু এসব হয়ে উঠত না। শৈশব-কৈশোরে গল্প শোনাবে এমন কাউকে পাইনি। গল্প শোনার জন্য আমাদের বড়ো ভরসা হয়ে উঠেন দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানি। আমি এতটাই অভাগা যে, আমার জন্মের আগেই তাঁরা মারা গেছেন। পরের ভরসা হলো বাবা-মা। আমার মা রান্না কিংবা সংসারের কাজ এবং আট ভাইবোনকে সামলাতেই সময়হীনতায় থাকতেন। বাবা চাকরি করতেন। তাঁর অত সময় ছিল না আমাকে দেওয়ার মতো। ভাইবোনদের ভেতর বড়ো বোন সামান্য সময় দিতেন, কিন্তু তা পর্যাপ্ত ছিল না। আবার ঐ সময়টুকুতে কোনো গল্প-টল্প থাকত না। তাঁর পড়ালেখা, মাকে সংসারের কাজে সহযোগিতা করা, অন্য ভাইবোনদের সামলানো। এজন্য আমার জন্য তাঁর সময় সামান্যের থেকেও ছিল বেশি সামান্য।
ফলে আমার গল্প শোনা হয়নি। সঙ্গ পাওয়া হয়নি। গল্প শুনতে না পারার অতৃপ্তি আর যন্ত্রণা ভুলতে আমি গল্প বলি চরিত্রের মধ্য দিয়ে। লেখার মাধ্যম হিসেবে বেছে নেই গল্প-উপন্যাস। আর এটা হয়ে যায় আমার কথাসাহিত্যের প্রকরণগত বৈশিষ্ট্য। আমার গল্প-উপন্যাসে এক চরিত্র শোনায় গল্প আরেক চরিত্রকে কিংবা চরিত্র নিজেই বলে গল্প।
তাদের গল্পে থাকে দেশ-বহির্বিশ্ব, সমাজ, সময় এবং মানুষের সংকটের কথা। কেন লিখি এর উত্তরেই এত কথা বলা হয়ে গেল।
আমি লিখি সংকটের কথা। লিখি আমার সময়ের কথা। আমার উপস্থিতকালে আমার দেশ কেমন আছে, আমার সমাজ কেমন আছে, আমার চারপাশের মানুষ কেমন আছে- তা তুলে আমি গল্প-উপন্যাসে।
সংকট কিংবা বঞ্চনার আখ্যান আমাকে পীড়া দেয় এবং পীড়া থেকে মুক্তি পেতে লিখি। আমি বৃহত্তর জীবন কিংবা সামষ্টিক চেতনাকে ধারণ করি লেখায়। অনুভব করি সামাজিক দায়বদ্ধতা। আমার লেখা দিয়ে সমাজ বা মানুষের কল্যাণ সাধিত হলে কিংবা রাষ্ট্র উপলব্ধি করতে পারলে বা সচেতন হয়ে সংকট সমাধানে সিদ্ধান্ত নিলে এটা হবে পরমপ্রাপ্তি। আমার লেখালেখির আর-সব কারণের মধ্যে এটাও একটি।
লিখি পিতার সম্মান বৃদ্ধির জন্যও। পুত্রের লেখা পড়ে কিংবা প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পুত্রকে দেখতে পেয়ে, পুত্রের কথা শুনতে পেয়ে তিনি যদি মনে মনে গর্ববোধ করেন এবং সম্মানিত বোধ করেন, এটা আমার কাছে অনেক বেশি দামি।
দেশ-বহির্বিশ্ব, সমাজ কিংবা মানুষের সংকটের প্রকাশ ঘটাতে লিখি। বাংলা কথাসাহিত্যে বিষয় ও প্রকরণে নতুন কিছু যোগ করার অভিপ্রায়েও লিখে চলছি।
হারুন পাশা
ঢাকা, বাংলাদেশ।
0 মন্তব্যসমূহ