কী লিখি কেন লিখি
নীলিমা বেগম
কী লিখি কেন লিখি
নীলিমা বেগম
কি লিখি কেন লিখি বলতে গেলে বলতে হয় যা কাউকে বলা যায় না তাই লিখি। ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে দুটি সত্তা কাজ করে। একদিকে আমি খুব কথা বলতে ভালোবাসি, আড্ডা দেই হাসি ঠাট্টা করি, অবশ্য ইতিবাচক। অন্যদিকে আমার আমিকে আমি এতটাই গোপনে রাখি যে মাঝে মাঝে খুঁজে পেতে নিজেই হিমশিম খাই। আর এই গোপন সত্তার অনেক কথাই যেগুলি আমি শুধু নিজের সঙ্গে বলি, মাঝে মাঝে কলমের সাহায্যে খাতায় লিখে নিজেকে হালকা করি। ছোটবেলা থেকে হীনমন্যতায় ভোগা আমি কখনোই নিজের মনের গোপন কথা কাউকে বলতে পারতাম না। গল্পে গল্পে মজলিস জমিয়ে রাখা আমিই আবার দিনশেষে মুখ লুকাতাম খাতার পৃষ্ঠায়।
ছোটবেলায় বাড়িতে যেটা অফুরন্ত পেয়েছি তা হল গল্পের বই আর ডায়েরি। আমার বাবা তখন বীরচন্দ্র লাইব্রেরীর সদস্য ছিলেন। পনের দিন বা মাস পর পর কবে বাবুর বই পড়া শেষ হবে আর বদলে নতুন বই আনবে তার অপেক্ষাতেই সব ভাইবোন মিলে বসে থাকতাম। পুলিশের চাকরির সুবাদে বাবুর ডিউটি আওয়ারটা ছিল অনেক বেশি তাই বলে বাবু বাড়িতে না থাকলেই যে পুরো সময়ের জন্য গল্পের বই হাতে পেয়ে যাব তার সুবিধা ছিল না। চার ভাইবোন মিলে চুলচেরা হিসাব করে সময় ভাগ করতাম কার ভাগে কতটা সময় থাকবে গল্পের বইটা। বাড়ির ছোট হবার সুবাদে অনেক সময় আবার বড়দের রেগিং খেয়ে এক আধটা দিন পেতামও না। কিন্তু যখন হাতে পেতাম গল্প যেন পড়তাম না, গোগ্রাসে গিলতাম। ওইটুকু স্কুলের বয়সেই শরৎ সমগ্র তিন খন্ডই পড়ে ফেলেছিলাম। তবে সব শব্দের অর্থ হয়তো তখন বুঝিনি কিন্তু গল্পটা বুঝতাম। আর যেই গল্পের শেষটা সুখের হতো না, ওই গল্পটা পড়ে খুব কাঁদতাম। আমার এখনো মনে আছে, ' দেবদাস ' গল্পটি যখন পড়ি তখন আমি ক্লাস নাইনে মাত্র। দুঃখে কষ্টে কয়দিন খেতে ঘুমাতে পারিনি। এমনকি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকালীন শাহরুখ আর ঐশ্বর্য অভিনীত
'দেবদাস ' সিনেমা রিলিজ হল তখনো আমি দেখিনি, আজও দেখিনি। সব বন্ধুদের তখন বলেছিলাম এটা আমার জানা গল্প, কিন্তু ওদের বলিনি এটা যে আমার একটা জানা ' কান্নার ' গল্প। তেমনি হয়েছিল ' মহেশ ' গল্পটি পড়ে, গফুর আর মহেশের ভালোবাসায় ও দুঃখে চোখের জলে ভেসে ছিলাম আমি অনেকদিন। হয়তো সেজন্যই কোন অন্যায় অবিচার আর মন ভাঙ্গায় আমার কলম চলে, শব্দরা এসে ধরা দেয়, আর আমিও লিখি। কবিতা কয় ধরনের হয়, ছন্দ কিভাবে লিখতে হয় এসবের কিছুই আমি জানি না। আমার তো মনে হয় আমি আসলে কবিতা ভেবে লিখিই না। শুধু মনের ভাব লিখি কবিতা আকারে।
ছোটবেলায় দেখতাম বাবু ডায়েরিতে রোজদিনের ডিউটি চার্ট লিখে রাখতো। আর প্রত্যেক পাতাতে দুই তিন লাইনের বেশি লেখা থাকতো না বলে বছর শেষ হয়ে গেলে পুরোনো ডায়েরি গুলিতে গিয়ে ভাগ বসাতাম। এর মধ্যে নিজের দিনলীপি লেখার চেষ্টা করতাম। সে থেকেই হয়তো লেখার হাতে খড়ি। তারপর কারো জন্মদিনে দুলাইন, তো নববর্ষের কার্ডে পাঁচ লাইন, বন্ধুদের জন্মদিনে যদি আটলাইন লিখেছি তো কারোর ফেয়ারওয়েলে লেখা আর কান্না সমানে সমানে পাল্লা দিতে। তখন লেখার জন্য খুব ভারী ভারী শব্দ খুঁজতাম, ছন্দ খুঁজতাম। তাই লেখা খুব একটা মিলাতে পারতাম না বলে লিখতামও খুব কম। এরমধ্যে আমাদের স্কুলের বাংলা শিক্ষিকা পুতুল দিদিমণি এবং বাংলা শিক্ষক ভুবন স্যার দুইজনেই দুইদিন ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রায় একই অর্থের কথা বলেছিলেন। যেটা আজও আমি একমনে মেনে চলি। আর কথাগুলি ছিল অনেকটা এরকম, ' কঠিন কথা বলে কাউকে কিছু না বুঝতে দেওয়ার চেয়ে সহজ ভাষায় যদি তুমি তোমার কথা সবার মনে পৌঁছে দিতে পারো, সবার মন ছুঁয়ে দিতে পারো, সহজ ভাবে বুঝতে পারো, বুঝাতে পারো, তাহলে জীবন অনেক সহজ ও সুন্দর হবে।' এরপর আর কোনদিন আমি শব্দ খুঁজিনি, যা মনে এসেছে তাই লিখেছি। উনাদের ছায়ায় আমি বড় হয়েছি। ক্লাসে প্রথম হওয়ার সুবাদে উনাদের কড়া নজরদারি ছিল আমার উপর তাই হয়তো সামনে বসিয়ে হঠাৎ করে ভাব সম্প্রসারণ রচনা চিঠি বা কোন প্রশ্নের উত্তর লিখতে হতো নিজের মত করে। আর এইগুলোই হয়তো একটু একটু করে আমাকে এই আমি হতে সাহায্য করে করেছে।
এরপর প্রেমে পড়া, প্রেমে উঠা, চাকরির জন্য যুদ্ধ, বিয়ে-সংসার, বাচ্চা প্রত্যেকটা জিনিস নিয়ে কিছু না কিছু লিখতাম। চারপাশে যা দেখতাম, যা বুঝতাম, তাই লিখতাম। তবে এগুলি নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত ছিল। পাঠকের সামনে তুলে ধরতে হবে বা কোথাও ছাপানোর জন্য পাঠানোর তাগদা কোনোকালেই আমার ছিলনা এক আধটা আমার হাজব্যান্ড বা বন্ধুরা পড়ে ভালো লাগলে বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়েছে, তো ছেপেছে।
প্রাপ্তির খাতা যদি খুলি তাহলে আজকের ফরিয়াদ পত্রিকা, বিশালগড় বইমেলার ম্যাগাজিন ও আরো কিছু ম্যাগাজিনে টুকিটাকি আমার লেখা ছাপা হয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজের জন্য খুব অলস একটা মানুষ। কোথাও লিখে হারিয়ে ফেলি তো কোথাও নির্দিষ্ট তারিখ চলে গেলে মনে হয় লিখে তো ছিলাম, জমাটা দেওয়া হয়নি। তারপরও আলগোছে অলস আমি, চাকরি সংসার বাচ্চার সামলে নিজের জন্য সময় খোঁজা আমি, অতিরিক্ত খুশি বা দুঃখে যখন মনের মধ্যে খুব জোরে ভূমিকম্প অনুভব করি তখন যেন আপনা থেকেই আমার কলম জেগে উঠে খাতায় নতুন আঁক কাটতে।
5 মন্তব্যসমূহ
বাহ্,মন ছুঁয়ে গেল একদম।
উত্তরমুছুনধন্যবাদ দিদি, অফুরান্ত ভালোবাসা।
মুছুনবাহ্,মন ছুঁয়ে গেল একদম।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ লিখেছেন।
উত্তরমুছুনApurbo
উত্তরমুছুন