হারাধন বৈরাগী
||কাঞ্চনপুর নামকরণ----একটি আলোকপাত ||
কাঞ্চনপুর নামটি উচ্চারণ করলেই যেন এক উপত্যকার বহুস্বর ভেসে ওঠে। দেওভ্যালীর বুক জুড়ে বিস্তৃত এই জনপদ বহুজাতিগোষ্ঠীর স্মৃতি, সংঘাত, সহাবস্থান এবং নামকরণের জটিল ইতিহাসের ধারক। এখানে আজ রিয়াং, চাকমা, ত্রিপুরা, মিজো, মগ, হালাম, দেববর্মা…প্রভৃতি সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বসবাস করে বাঙালি সমাজের নানান শ্রেণির মানুষ। এই বহুত্বই কাঞ্চনপুরকে স্বতন্ত্র করে তোলে। তবু এর ভেতরেই একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—এই উপত্যকার প্রথম অধিবাসী কারা? আর কে বা কারা দিয়েছিল এই জনপদের নাম—‘কাঞ্চনপুর’?
একটি মত অনুসারে, ‘কাঞ্চনপুর’ নামটি এসেছে ত্রিপুরার মহারাজা বীরবিক্রম কিশোর মাণিক্যের মহিষী মহারানী কাঞ্চনপ্রভা দেবীর নাম থেকে। এই মতের সমর্থকেরা বলেন, ১৯৪৯ সালে উদ্বাস্তু বাঙালিদের পুনর্বাসনের জন্য মহারানী কাঞ্চনপ্রভা দেবী ‘স্বস্তি সমিতি’-র মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ জমি বন্দোবস্ত করে দেন। সেই কৃতজ্ঞতার স্মারক হিসেবেই বাঙালিরা এই অঞ্চলের নাম রাখে ‘কাঞ্চনপুর’। এই দাবির পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তুলে ধরা হয়—এই এলাকার প্রাচীন নাম ছিল ‘সরগার পাড়া’ বা ‘উলাতালুকদার পাড়া’, যার উল্লেখ এখনও সরকারি নথিতে বিদ্যমান।
কিন্তু ইতিহাস কেবল রাজদরবারে রচিত হয় না; তা গড়ে ওঠে মানুষের মুখে, স্মৃতিতে এবং লোককথার ভাঁজে…।চাকমা সমাজের দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, ‘কাঞ্চনপুর’ নামটির উৎস ‘কাঞ্চনছড়া’ বা ‘হাঞ্জনছড়া’। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আগত চাকমারা বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে এই উপত্যকায় প্রথম বসতি স্থাপন করে একটি ছড়ার তীরে, যেখানে প্রচুর ‘হাঞ্জনফুল’ (কাঞ্চনফুল) ফুটত। সেই থেকেই ছড়াটির নাম হয় ‘হাঞ্জনছড়া’ (চাকমা ভাষায় ‘ক’ ধ্বনি অনুপস্থিত), যা ক্রমে ‘কাঞ্চনছড়া’ এবং পরে ‘কাঞ্চনপুর/হাঞ্জনপুর’-এ রূপান্তরিত হয়। দেওনদীর পশ্চিম পারে এখনও ‘কাঞ্চনছড়া’ নামের সেই জলধারা নীরবে এই স্মৃতিকে বহন করে চলেছে।
চাকমা সমাজের নামকরণ-পদ্ধতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়—এখানে প্রকৃতি, পরিবেশ, অভ্যাস, এমনকি মানুষের শারীরিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্যও নামের উৎস হয়ে ওঠে। কোনো ছড়ায় মোরগের আধিক্য থাকলে তার নাম ‘হুরোছড়া’, মাছ বেশি হলে ‘উগলছড়ি’—এগুলি কেবল নাম ছাড়াও জীবন্ত ইতিহাসের দলিল। একই প্রবণতা ব্যক্তিনামেও দেখা যায়—চেহারা, স্বভাব বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য নামের সঙ্গে মিশে যায়। যেমন—ঝগড়াটে নারী ‘হত্তালি’, স্থূলপাছা-নারী ‘বরপুনি’,ডিমের মতো টানা চোখের পুরুষ ‘বদাচোগা’ বা নারী ‘বদাচোগী’, অতিরিক্ত ভুঁড়ি বড়ো হলে ‘পেদেলা’, মেয়ে-ঘেঁষা ছেলে ‘লেঙগুরো’, সর্বদা নাক দিয়ে সর্দিরস পড়লে ‘নাগোপেদা’, কথায় কথায় হাসে এমন ব্যক্তি ‘আইজ্যে-মো’, শরীরে অতিরিক্ত লোম থাকলে ‘ভালুগ্যে’—ইত্যাদি। এমনকি তাদের লিপির অক্ষরেও এই দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ পাওয়া যায়—যেমন চুচ্যাঙা(ঠাকলের মতো) কা,গুজন্যা( দেখতে গুজার মতো)খা,চান্দ্যা(দেখতে চাঁদের মতো)গা, তিনধ্যাল্যে(তিনটি ডালের মতো)-ঘা,ইত্যাদি।
তথ্য থেকে জানা যায়, চাকমারা একসময় বার্মায় রাজার উপদেষ্টা, মন্ত্রী এবং পালি ভাষায় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের অনুবাদক হিসেবে কাজ করত। রাজদরবারে প্রত্যক্ষ নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ায় তারা সেখানে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল। ‘চাকমা’ নামটির উৎস নিয়েও মত রয়েছে—বার্মায় তাদের সংক্ষিপ্ত নাম ছিল ‘সাক’, যা সংস্কৃত ‘শক্তিমান’ শব্দের বিকৃত রূপ বলে ধরা হয়। পরবর্তীতে তা ‘সাকমা’ হয়ে ‘চাকমা’-য় রূপান্তরিত হয়। এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য তাদের জীবনযাপন, নামকরণ ও স্থাননির্ধারণের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
এই প্রেক্ষাপটে কাঞ্চনপুর তথা দেওভ্যালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা বহু ছড়া, পাহাড় ও জনপদের নাম যে চাকমা সমাজের দেওয়া—এমন ধারণাও অমূলক নয়, তা ইঙ্গিত করে—এই ভূখণ্ডকে প্রথম অনুভব ও নামকরণ করেছিলেন তারাই, যারা এখানে প্রাথমিক বসতি গড়ে তুলেছিলেন।
তবে এই দুই মতের মধ্যে কোনো একটিকে একক সত্য বলে নির্ধারণ করা কঠিন। বরং এখানে ইতিহাসের দুটি স্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একদিকে লোকস্মৃতি, যা বলে নামের উৎস ‘কাঞ্চনছড়া’; অন্যদিকে প্রশাসনিক ইতিহাস, যা মহারানী কাঞ্চনপ্রভার নামকে উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
সম্ভবত সত্যটি এই দুইয়ের সংযোগস্থলেই নিহিত—প্রথমে ছিল একটি স্থানিক নাম, যা মানুষের মুখে জন্ম নিয়েছিল; পরে সেই নামই রাজকীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে নতুন অর্থে প্রতিষ্ঠা পায়।
পরবর্তীকালে, ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজসরকার কৈলাশহর বিভাগের অধীনে মহারানী কাঞ্চনপ্রভা দেবীর নামানুসারে ‘কাঞ্চনপুর’ নামে একটি পৃথক সাব-ডিভিশন (মহকুমা) গঠন করে। সরকারি আদেশনামায় প্রশাসনিক সুবিধা, প্রজাসাধারণের কল্যাণ এবং স্থানীয় উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে এই নতুন মহকুমার সীমানা নির্ধারণ করা হয়। দেওনদী, আন্ধারছড়া, জম্পুই রেঞ্জ প্রভৃতি ভৌগোলিক চিহ্নের ভিত্তিতে নির্ধারিত এই সীমানা কাঞ্চনপুরকে একটি প্রশাসনিক পরিচয় দেয়।
অতএব, কাঞ্চনপুর কেবল একটি নাম ছাড়াও—এটি বহুস্তরীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত আধার। এখানে নদীর নাম যেমন কথা বলে, তেমনি কথা বলে মানুষের স্মৃতি; এখানে রাজদরবারের আদেশ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ ছড়ার ধারে বসে থাকা প্রথম বসতকারীর উচ্চারণ। কাঞ্চনপুর নামের ইতিহাস তাই কোনো একক জাতিগোষ্ঠীর নয়—এটি সকলের, যারা এই ভূমিকে আপন করে নিয়েছে, যারা এই উপত্যকার মাটিতে নিজেদের স্মৃতি ও অস্তিত্ব ধরে রেখেছে।
0 মন্তব্যসমূহ