কী লিখি কেন লিখি অরুণাভ রাহারায়

কী লিখি কেন লিখি 
অরুণাভ রাহারায়

কী লিখি কেন লিখি 
অরুণাভ রাহারায়
কবি-সাংবাদিক। কলকাতা

আমার বয়স যখন ৬/৭, ভোর বেলায় ঘুম থেকে উঠেই দেখতাম আমার বাবা টেবিলে ঝুঁকে খসখস করে কিছু লিখছেন। ওই বয়সে কৌতূহল হত যে তিনি কী লিখছে? কিছুটা বড় হলে জেনেছি তিনি কবিতা লেখেন। বাবার টেবিলে ছড়িয়ে থাকত খোলা কলম, পাকানো প্রুফ সিট এবং অসমাপ্ত কবিতার পাণ্ডুলিপি। এই দৃশ্যই ওই বয়সে আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল কবিতার কাছে!

বাবা রবিঠাকুরের কবিতা মুখস্থ করিয়ে দিতেন। বাড়িতে কিনে আনতেন কবিতার আবৃত্তির ক্যাসেট। তার সংগ্রহে নানা বই। সেইসব বই আমি ছোটবেলায় উল্টেপাল্টে দেখতাম। তবে পড়তাম না। কিন্তু ভালো বইয়ের কাছাকাছি থাকার জন্য আমার মন কিছুটা সাহিত্যমুখী হয়ে পড়েছিল। তাই একথা বলতেই হয়, আমার সাহিত্যের প্রাথমিক অনুপ্রেরণা বাবার কাছ থেকে পাওয়া। 

১৮ বছর বয়সে পশ্চিমবঙ্গের এক মফস্বল শহর থেকে কলকাতায় পড়তে যাই। বঙ্গবাসী কলেজে ভর্তি হই। কলেজ স্ট্রিটে ৬ বছর থাকার কারণে বহু মানুষের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়। ২০১১ সালে এক সাহিত্যের অনুষ্ঠানে সৌভাগ্যবাসে কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। তাঁর জীবন চর্যা আমাকে অনুপ্রাণিত করে। আমি তাঁর কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পাই। যাদবপুরে তাঁর বাড়িতে গেলে মন্ত্রের মতো তিনি কানে ঢুকিয়ে দিতেন কবিতা। সেই সময় অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত বইপত্র তুমুল ভাবে পড়তে শুরু করি। আমাই তাঁর কাছ থেকে লেখার অনুপ্রেরণা পাই।

রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ পড়ার সময় স্পেশাল পেপার নিয়েছিলাম রবীন্দ্র সাহিত্য। তাই পাঠ্য পড়াশোনার তাগিদেই গভীর ভাবে রবীন্দ্রনাথের লেখা পড়তে হয়। তাঁর সৃষ্টি ও জীবন দর্শন আমাকে নানা ভাবে অনুপ্রাণিত করে। গোরা এবং যোগাযোগ উপন্যাস বহুবার পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। আনন্দ পেয়েছি তাঁর গান শুনে। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানে নির্ভর করে আমি কবিতার ভাব জগতে পৌঁছে যেতে পারি। 

সৌভাগ্যবসে বেশ কয়েকজন গুণী মানুষের সান্নিধ্য আমাকে লেখালিখি করার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিল। জয় গোস্বামী তাদের মধ্যে একজন। তাঁকে লেখার কাজে সহযোগিতা করার জন্য আমি এক সময় নিয়মিত তাঁর বাড়িতে যেতাম। তিনি পাইচারি করতে করতে লেখেন এবং লেখার সময় জানলার দিকে তাকিয়ে আকাশ দেখেন। অনেক পড়াশোনা করেন। এসবই আমাকে কবিতা লেখায় গভীর ভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। 

এক সময় কবি সুবোধ সরকারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তাঁকে দেখেও আমি নানা ভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছি। বিদেশি সাহিত্য পড়ার জন্য তিনি আমাকে বারংবার উৎসাহিত করেছেন। পরে তাঁর সম্পাদিত ভাষানগর পত্রিকায় কাজ করার সূত্রে আমি কবিতার অনুবাদ করতে শুরু করি। মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ, সুইডেনের নোবেল জয়ী কবি টোমাস ট্র্যান্টোমার, কানাডার মার্গারেট অ্যাটউড, চিলির কবি রাউল জুরিতার কবিতা অনুবাদ করি এবং তাঁদের লেখার দ্বারাও অনুপ্রাণিত হই।

সব শেষে বলব তরুণ বয়সে একবার প্রেমে পড়ে এক নারীর কার থেকেও আশ্চর্য ভাবে আমি কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা পেয়েছি। প্রায় এক দেড় বছর সময় কালে আমি তাঁকে নিয়ে একাধিক প্রেমের কবিতা লিখেছি। পরে সেই কবিতাগুলো নিয়ে আমার একটি বই প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের কলকাতা বইমেলায়। বইটির নাম 'স্নিজার সঙ্গে জোড়াসাঁকোয়'!

অরুণাভ সাহারায়: সহকারী সম্পাদক, ‘ভাষানগর’, কলকাতা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ