কী লিখি কেন লিখি সুমন সরদার

কী লিখি কেন লিখি 
সুমন সরদার


কী লিখি কেন লিখি 
সুমন সরদার

কবি-গীতিকার

বিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পর্যায় পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষে শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দের প্রশ্নোত্তর পর্বে আমার একটি বাক্য ছিল হরহামেশা, ‘স্যার, আমি বলতে পারি না, লিখতে পারি’। কখনও কখনও স্যার বলতেন, ‘তাহলে লিখ’। এভাবেই কি লেখক হলাম? লেখক কি হতে পেরেছি? ‘কী লিখি’(?) আর ‘কী লিখি’(!) এ দুয়ের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি। এমন বিষয়ে লিখতে হবে, এ যেমন ভাবিনি, তেমনি লিখতে গিয়ে একটি বাক্যের দু’টোরূপ আমাকে দগ্ধ করছে। আর কেন লিখি? এর উত্তর আমার জানা নেই। বাধ্য করলে বলবো, লিখতে আমার ভাল লাগে, আমার কথাগুলো অন্যকে জানাতে চাই। তাই লিখি। এর বেশি কিছু নয়। অর্জনের দিকে কখনও মুখ ঘুরিয়ে দেখিনি। কোন অর্জন আমাকে খুব একটা উদ্বেলিত করে না। অর্থযোগ থাকলে কিংবা আলোচিত হলে উৎসাহ পাই। তবে আলোচনা কিংবা অর্জনের দিকে আমার ছুটে চলা নেই।
শিশুকাল থেকেই আমার বই পড়ার নেশা গড়ে ওঠে। এ নেশাটা আমাকে কেউ ধরিয়ে দেয়নি। তবে পরোক্ষভাবে যিনি দিয়েছেন তিনি আমার বাবা। শিশুকাল কেটেছে আমার গ্রামের বাড়িতে, ইছামতি নদীর পাড়ে। আমার বাবা ছাত্রজীবনে বন্ধুদের নিয়ে গ্রামেই গড়ে তুলেছিলেন বালার্ক সাহিত্য সংসদ, বালার্ক পাঠাগার, নবারুণ নাট্য সংসদ আর ডায়মন্ড ফুটবল ক্লাব। পাঠাগারের অবস্থান ছিল আমাদের বাড়িতেই। আমি যখন ১৯৬৬ সালে প্রথম স্কুলে ভর্তি হই তখন বালার্ক সাহিত্য সংসদ কিংবা বালার্ক পাঠাগারের কোন কার্যক্রম ছিল না। কিন্তু পাঠাগারের চারটি বড় আলমারি ভর্তি থেকে গিয়েছিল বই আর বই। আরেকটু বড় হলে সেই আলমারিগুলোতে খুঁজে বেড়াতাম কোন্ বই পড়া যায়। এভাবে একসাথে প্রচুর বই নাড়াচাড়া করতে করতে বইয়ের সাথে জন্মায় ভালবাসা। কিন্তু লেখক বা কবি হবো এরকম কোন ইচ্ছে মনে উঁকি দেয়নি। মূলত বৃহত্তর পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বেড়ে উঠেছি আমি। গান গাওয়া, ছবি আঁকা, অভিনয় করা, অধ্যাত্ম সাধনা, সাধু-সন্ন্যাসি হয়ে যাওয়া এসব দাদার উত্তরাধিকারীদের অস্থিমজ্জায় প্রোথিত। কিন্তু কেবল আমিই এর কোনটির সাথেই মানিয়ে নিতে পারিনি। এসব যোগ্যতা আমার ছিলও না। 
পারিবারিক ধারায় বেড়ে উঠতে না পারায় নিজের অজান্তে বিকল্প পথে হাঁটা যেন অনিবার্য ছিল। কিন্তু কেন, জানি না। সেই ১৯৭৫ সালে সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন জীবনের প্রথম লিখেছিলাম, Òএক রাতে এক স্বপ্ন দেখি পাখির মতো ডানা,/ হয়েই গেল দু’হাত জুড়ে উড়তে যে নেই মানা।/ পদ্মা নদী পেরিয়ে দূর নয়া ডিঙির চরে,/ যাচ্ছি উড়ে ভেসে ভেসে পরদাদারই ঘরে।” চাচার কাছে কাছে শোনা আমাদের আদি বংশধর ও নিবাসের গল্প শুনে লেখা এটি। মায়ের কাছে শুনেছি, বাবা চুপি চুপি ছড়াটি পড়ে মায়ের কাছে আমার প্রশংসা করেছিলেন। এটিই বোধ হয়, আমার প্রথম প্রেরণা। এরপর শুধু লিখতাম আর জমিয়ে রাখতাম একটি খাতায়। আমার ভাল লাগতো। কলেজে ওঠার পর একটি দেয়ালিকা সম্পাদনা ছাড়া আর কিছু করা বা লেখা হয়নি। আমি তখন একটি বাম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের সাথে জড়িয়ে পড়েছিলাম। ১৯৯০ পর্যন্ত এরশাদবিরোধী আন্দোলনে মেতেছিলাম বাম রাজনীতির উত্তাল তরঙ্গে। সরকারি চাকরির সুবাদে রাজনীতি থেকে থিতু হয়ে মূলত আমার লেখালেখি। রাজনৈতিক জীবনে দেখা সমাজের নানা অসঙ্গতিসহ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের সাথে প্রকৃতির মিশেল আমার কবিতার উপজীব্য। বড় ভাইয়ের বন্ধু কবিতাকর্মী হোসেন ইমামের উৎসাহ এবং পরবর্তী সময়ে নন্দিত কবি নাসির আহমেদের সস্নেহ পথনির্দেশে আমার পথচলা। ঢাকার প্রায় সকল প্রথমসারির দৈনিক ও সাপ্তাহিকে কবিতা ছাপা হওয়া এক অনন্য আনন্দাভূতির পরশ আমাকে উদ্বেলিত করে। ছন্দ, চিত্রকল্প, মিথÑ এই তিনের প্রতি আমার প্রবল দুর্বলতা। এ দুর্বলতার কিঞ্চিত প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে আমার চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ‘মানবযাত্রা’য় (Human Race) বলে মনে করি।
কবিতা দিয়ে শুরু, এরপর প্রবন্ধ লেখা, তারও পরে এক বন্ধুর পিড়াপিড়িতে টিভি নাটক/ধারাবাহিক নাটক লেখা ও প্রচারিত হওয়া অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি গীতিকবিতা আমাকে পেয়ে বসে। প্রায় দুইশত গান রেকর্ডিং হয়েছে, যার সিংহভাগই বেতারে। যখন যেটা মন চায় সেটাই লিখি। টিভি নাটকের কিছু পাণ্ডুলিপি পড়ে আছে ঘরে। সেগুলো উপন্যাসে রূপান্তরের ইচ্ছেটা পেয়ে বসে। এ বছরের যায়যায়দিন ঈদ সংখ্যায় বেরিয়েছে উপন্যাস ‘নীলবাড়ি’। তবে নিজেকে কবিতাকর্মী হিসেবে ভাবতেই ভাল লাগে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ

  1. অনেক কিছু জানলাম। আসলে ভেতরে ভেতরে একটা প্রেরণা না থাকলে কোনো লেখকই লিখতে পারে না। শুভকামনা নিরন্তর।

    উত্তরমুছুন