কী লিখি কেন লিখি
সৌম্য সালেক
কী লিখি কেন লিখি
সৌম্য সালেক
কবি, ঢাকা
আমি বেড়ে ওঠি মামার বাড়িতে। যতদিন পর্যন্ত মাতৃকোল একটি শিশুর জন্য অনিবার্য তারপর থেকেই সেখানে আমার ঠাঁই। মনে পড়ছে সেই পিচ্চিকালে, নানী সুরে সুরে গাইতেন কোনো এক অচিন পদ্যকারের লেখা ছড়া- ‘তাঁতির বাড়ি ব্যাঙের বাসা কোলা ব্যাঙের ছাও/ খায়-দায় গান গায় তাইরে নাইরে নাই...।’ কৈশোরজুড়ে মামার কণ্ঠে শুনেছি কবি নজরুলের বিদ্রোহী, কাণ্ডারি হুঁশিয়ার, খেয়া পারের তরণী'র তুঙ্গ উচ্চারণ। সেসব অবোধ্য শ্রবণ আমার রক্তে সঞ্চারণ ঘটিয়েছে এক মারাত্মক উৎপীড়ন, যার নাম কবিতা। তারপর বহুবার মজলিসে-মেহফিলে সমূলে উত্তাল হয়েছি ফার্সি কবিতার মত্ততায়; কবিতার সাথে সম্পর্কটা আমার সেখানে।
ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় আমি প্রথম কবিতা নামের কিছু একটা লেখার চেষ্টা করি, যতদূর মনে পড়ে তা ছিল এমন, 'এখনকার ছেলেরা মুখে মুখে বলে সব পারে/ আসলে তো মিছে ওরা কিছুই না পারে।'
আমার বড় আপা তখন স্নাতক পর্যায়ে পড়ছেন, তাদের বাংলা সংকলনটি ছিল দুর্দান্ত। বড় লেখকদের শ্রেষ্ঠসব লেখা সেখানে সংকলিত ছিল। সে বই থেকে, নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার প্রায় অর্ধেক মুখস্ত করেছি নিম্ন মাধ্যমিক শেষ করার আগেই। সেখানে ছিল-- গোলাম মোস্তফার 'ক্রন্দসী', কায়কোবাদের 'আহ্বান', মাইকেলের 'আত্মবিলাপ', রবীন্দ্রনাথের 'বলাকা'সহ বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্যসব কবিতা। আপার একটি রেডিও ছিল। রেডিও শুনতে শুনতে এরকম নেশা তৈরি হয়েছিল, সে নেশা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত বহাল ছিল। তখন সকাল বিকেল রবীন্দ্র- নজরুল সংগীত হোত। প্রথম প্রথম ভালো না বুঝলেও, কীভাবে যেন একসময় সেসব শ্রবণের কান তৈরি হয়ে গেছে জানি না। তারপর থেকে রাত সাড়ে এগারটায় সূচি শুনতাম, কখন নজরুল রবীন্দ্র হবে লিখে নিতাম এবং পরদিন সময় মতো শুনতাম। বুধবার রাতে বেতারে নাটক হোক, কত কত মধুর সব গল্প ছিল সেখেনে, কতরাত যে সঙ্গোপনে বিরহী প্রেমিকের বেদনায় চিত্রা বা ফুলজোড়া নদীর কিনারে ওদের চির বিচ্ছেদের পিছে পিছে মন চলে গেছে, তা আর এ কথায় শেষ হবে না।
নবম শ্রেণীতে পাঠ্য বাংলায় পেয়েছি মধুসূদনের কপোতাক্ষ নদ। সনেটের মাত্রা হিসেব না বুঝলেও চরণে চৌদ্দ বর্ণ আর চৌদ্দ পঙক্তি মিলিয়ে কবিতা লিখে পড়তে দিয়েছিলাম দুরসম্পর্কের এক খালাকে, 'সতত তোমার স্মৃতি মন মোর স্মরে...'। তার প্রতিক্রিয়ার কথা অন্য কোথাও একদিন বলা যাবে। আমার ছোট খালার ছিল উপন্যাস পড়ার শখ, ওদের সময় মাধ্যমিকে পাঠ্য ছিল, মোজাম্মেল হকের 'জোহরা'। জোহরা দিয়েই আমার বাংলা উপন্যাসের পাঠ শুরু। তারপর সুনীল - শরৎ -মানিকের বহু উপন্যাস আমরা পালা করে পড়েছি, কখনও সে পড়ে আমি শুনি, কখনওবা তার বিপরীত। স্কুল-কলেজে কবিতা আবৃত্তির প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম, মামার কাছ থেকে শেখা কবিতার চেতনাবহ প্রবল স্ফূর্তি রপ্ত করার ফলে কিনা জানি না, শিক্ষাজীবনে বহুবার আবৃত্তিতে পুরস্কার পেয়েছি। কবিতার প্রতি আমার ইচ্ছের প্রাবল্য দেখে, কলেজের বাংলা শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম স্যার তার কাছে কবিতার ছন্দ শেখার পরামর্শ দিলেন। মাসখানেক তার কাছে ছন্দ শিখেছি কিন্তু আশ্চর্য যে, শেষে তিনি আমাকে মুক্তক বা গদ্য ছন্দে কবিতা লেখার জন্য বললেন। তখন হঠাৎ বিষয়টি খটকা লাগলেও পরে অবশ্য বুঝতে পেরেছি, তিনি ঠিক পরামর্শই দিয়েছেন। রবীন্দ্র/ নজরুল জয়ন্তীর দিনগুলোতে রেডিওতে বিশেষ অনুষ্ঠান হতো, স্পিকারে কান পেতে শুনতাম লুকোনো ঝর্নার গান, 'আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই।' রিক্সায় চড়ার মতো পয়সা ছিল না বলে, কবিদের জন্মদিনগুলোতে চার কি.মি. পথ পায়ে হেঁটে চলে যেতাম কচুয়া বাজারে, জন্মদিনের বিশেষ ক্রোড়পত্র সংগ্রহ করার জন্য। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় একদিন বাবার কাছ থেকে উপহার পেলাম, রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি। তিনি কাষ্ঠশিথানে হেলান দিয়ে বসে, এমন কতদিন আমি সুরে সুরে পড়ে গেছি ঋষিকবির মুক্তবচন, 'কত অজানারে জানাইলে তুমি কত ঘরে দিলে ঠাঁই / দূরকে করিলে নিকট বন্ধু পরকে করিলে ভাই।'
কুমিল্লায় আমাদের দিন ছিল উদ্দাম, মেঘ-রৌদ্দুরে, প্রেমে-আবেগে মাখামাখি। ধর্মসাগর, রেল স্টেশন, কবি নজরুল হল, ভিক্টোরিয়া ক্যাম্পাস, শিল্পকলা, টাউন হল, আবৃত্তি সংসদ আর গোমতীপাড়জুড়ে আমাদের অফুরান গান, আড্ডা ও কথকথা ছিল; সময়ের দ্রুততা সেসব মুছে দিয়ে নতুন কত কী এনেছে, সে নতুন আমাদের জন্য নয়, আহা!
আমার প্রথম লেখা ছাপা হয়, ২০০৮ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় 'কাব্যধারিনী', নামের এক সংকলনে। গ্রামের বাড়ির ঠিকানায় সেটি এসেছে শুনে, একদিনও সময় নষ্ট না করে, বাড়ি গিয়ে অস্থির উত্তেজনায় ছুঁয়ে দেখি গ্রন্থপৃষ্ঠায় আমারি শব্দভাষণ। কতজনকে যে সংকলনটি আমি দেখিয়েছি, তা কম হলেও অর্ধশতক হবে। তাদের কতকের নিশ্চুপ নেতিবাচকতাও আমাকে দমাতে পারেনি। কুমিল্লার পথে প্রান্তে বহু আড্ডা হয়েছে কবি-লেখকদের সাথে, ছিলেন ইসহাক সিদ্দিকী, দীপ্র আজাদ কাজল, সৈয়দ আহমেদ তারেক, শরীফ আহমেদ ওলী, কাজী মোহাম্মদ আলমগীর, আলী হোসেন চৌধুরী, ইকবাল আনোয়ার, কাজী মাহতাব সুমন, বিজন দাসসহ আরো অনেকে। লেখার ও পঠন-পাঠনের বিষয়ে বিশেষ পরামর্শ পেয়েছি, তিতাশ চৌধুরী, শান্তিরঞ্জন ভৌমিক ও শান্তনু কায়সারের কাছ থেকে। বিভিন্ন লেখক বোদ্ধাদের সংসর্গে যেমন ঋদ্ধ হয়েছি, তেমনি তাদের পরামর্শকৃত পুস্তক ও জীবন ভাবনা নিজস্ব ভাবলোক তৈরির পথকে প্রশস্ত করেছে। যেসব গ্রন্থ আমার বোধ ও ভাবনাজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে, এমন পুস্তকের মধ্যে-- দি সোল অব রুমি, কাহলিল জিব্রান রচনা সমগ্র, হোসে সারামাগোর 'ব্লাইন্ডনেস', ক্যামুর আউটসাইডার, আরব্য রজনীর রহস্যগাথা, মেটাফিজিক্স অব ইকবাল, এডওয়ার্ড সাঈদের ওরিয়েন্টালিজম, বরকতুল্লাহ'র 'মানুষের ধর্ম', নিৎসে'র 'আমি এত প্রাজ্ঞ কেন', হেমিংওয়ের ওল্ড ম্যান এন্ড দ্যা সি এবং কার্লোস ফুয়েন্তেসের 'আউরা' উল্লেখযোগ্য।
২০১১ সালে ভাঁজপত্র হিসেবে আমি সম্পাদনা শুরু করি 'চাষারু', পরে ম্যাগাজিন হিসেবেও প্রকাশ করেছি। ২০১২ সালে খালেদ চৌধুরী, কায়সার হেলালসহ আমাদের তিনজনের সম্পাদনা শ্রমে প্রকাশ করেছি কবিতার ছোটকাগজ, 'শালবন'। মাঝে যুক্ত হই কুমিল্লা বেতারে। সেখানে উপস্থাপনা করেছি, কবিতা পড়েছি বহুদিন। তারপর চাকুরিসূত্রে চলে আসি চাঁদপুরে। চাঁদপুরেও সাহিত্যের বন্ধু জুটেছে অনেক, তাদের কথা এখানে শেষ করা যাবে না। ২০১৬ সালে একুশে বইমেলায় প্রকৃতি প্রকাশন থেকে বের হলো আমার প্রথম কবিতাগ্রন্থ, 'আত্মখুনের স্কেচ'। তার একমাস আগে জন্মেছিলো আমার পুত্র আহমেদ সালেকীন। একমাসের ব্যবধানে ভাববস্তু ও মনুষ্য-পরম্পার্য্যের এই দ্বিবিধ উন্মেষে আমার জীবনে যে আনন্দ সংঘটিত হলো, তার মতো কাঙ্ক্ষিত উৎফুল ঘটনা এ জন্মে আর ঘটবে কিনা জানি না। তবু অপেক্ষায় উৎকর্ণ আছি, যদি কোনও ধ্রুব সন্ধান পাই, যেখানে মুক্তির উজ্জ্বল দিশা।
রোমেন্টিক কবিতার অন্যতম সারথি এস টি কোলরিজের মতে- ‘উৎকৃষ্ট শব্দের সুনিপুণ পদবিন্যাস কবিতা’। অ্যারিস্টটল মনে করতেন- ‘কবিতা দর্শনের চেয়ে বেশি, ইতিহাসের চেয়ে বড়ো’। কবিতা কী, সে সম্পর্কে এমন ভিন্ন ভিন্ন বহু মত থাকলেও কোনো মন্তব্যই আসলে চূড়ান্ত নয়। তবে বোধ করি অনুভূতি যখন হৃদয়কে স্পর্শ করে তার নিপুণ শব্দবিন্যাস কবিতা। প্রায় সবটুকু লাল এখনো অন্তরীণ গোলাপের শীর্ষবিন্দুর ওই সৌন্দর্যটুকু কবিতা। চিতল হরিণী তার দ্রুতগামী ক্লান্তির শেষযামে যখন প্রস্রবণে পিপাসায় মুখ নামায় সেই জলপান শব্দ কবিতা। হাজার বছর ধরে মানুষের নুড়ে-পড়া ইতিহাস, বুকফাটা মাতম, ধ্বসে পড়া সভ্যতার প্রত্ন-নির্যাস, বিরহীর আশাহত আননের অশ্রুব্যঞ্জন আর শ্রান্ত-স্বেদবিন্দুর কলরোল কবিতা। প্রকৃতপ্রস্তাবে একজন কবির কাছে কবিতার চেয়ে অভীপ্সিত আর কিছু হতে পারে না। একটা কবিতার জন্য কত রাতজাগা। একটা কবিতার জন্য কতদূর পায়ে পায়ে ছুটে চলা। একটা কবিতার জন্য বিসর্জন ও ব্যর্থতার বৃত্তান্ত ভারি হতে থাকে। একটা কবিতার জন্য মমতার বুকে ছুরি বিঁধে- ভীতিকর পথচলা।
প্রথম যেদিন কামনা ও বিসম্বাদ সূক্ষ্মচালে একযোগে আঘাত করেছে হৃদয়কে- নিজের চিৎকার নিজেই শুনেছি, ভাষা খুঁজে পাইনি। আজো ভেতরে বাইরে সেই পাখা ঝাপটানি, হাহাকার; আজো ভাষাহীন আর্তলোনার সেই উচ্ছ্বাস: বাণী দাও, বাণী দাও...
0 মন্তব্যসমূহ