কী লিখি কেন লিখি জ্যোতির্ময় সেন

কী লিখি কেন লিখি 
জ্যোতির্ময় সেন


কী লিখি কেন লিখি 
জ্যোতির্ময় সেন
কবি-ছড়াকার-গীতিকার

 

লেখালেখির শুরুর গল্পটা বহু দিনের পুরনো। শুরুরও শুরু আছে। লিখতে হলে পড়তে হয়। বই পড়ার প্রতি আমার নেশাটা ধরিয়েছিলেন আমার শিক্ষক পিতা স্বর্গত মনোহর সেন। প্রচুর পড়তেন তিনি। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্যের প্রতিও তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। বড় বড় কবি সাহিত্যিকের জীবনী ও সাহিত্য, ভারতীয় পুরাণ প্রভৃতি আমাকে গল্পের মতো করে বলতেন তিনি। আমি ছিলাম তাঁর গুণমুগ্ধ শ্রোতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কাব্যের কবিতাগুলো ছেলেবেলায় বাবা বড় যতœ করে আমাকে শোনাতেন। ছাত্রজীবনে আমি একদিন সন্ধ্যে রাতে পাঠ্যবইয়ের পড়া না করে লুকিয়ে পাশের বাড়ি গল্প শুনতে যাই। ফিরে এসে আমার খাতায় লেখা একটি ছড়ার দিকে দৃষ্টি যায়। ছড়াটি লিখেছেন আমার বাবা। প্রচলিত প্রবাদের মিশেলে লেখা ছড়াটি ছিল এ রকমÑ

          “জ্যোতির্ময় সেন,
            তুমি পড়ো না কেন্?
            শুধু গল্প শোনা,
            সময় নষ্ট করো না।
            সময় অমূল্য ধন,
            চলে গেলে পাবে কি কখন?
            তাই মন দিয়ে পড়ো,
            গাড়ি, ঘোড়া চড়ো।”

হয়তো বাবা মজা করেই ছড়াটি লিখেছিলেন। বাবার লেখা সেদিনের সেই ছড়াটি এবং এর অন্ত্যমিল পরবর্তীতে আমার মনে দাগ কাটে। হাইস্কুল জীবন থেকেই আমার কবিতা লেখার হাতেখড়ি হয়। আমি যখন নবম শ্রেণির ছাত্র তখন ত্রিপদী ছন্দে লিখেছিলাম ‘কে তুমি ভাই তোমাকে জানাই’ শীর্ষক প্রথম কবিতাটি। লেখালেখি ও বই পড়ার প্রথম অনুপ্রেরণা পাই বাবার কাছ থেকেই। সে হিসেবে তিনিই আমার ছড়া লেখার প্রথম গুরু।

          কী লিখি? কেন লিখি? এ প্রশ্নের উত্তর কি সহজে দেয়া যায়? লিখি মনের টানে। লিখতে ভালো লাগে তাই লিখি। যদিও যা লিখি তাতে আমি তৃপ্ত নই। তবুও লিখি। আমি শিশুসাহিত্য নিয়েই বেশি লেখালেখি করি। শিশু-কিশোর উপযোগী ছড়া ও গল্প লিখি। এ পর্যন্ত প্রকাশিত আমার ছড়াগ্রন্থ ১৮টি। বড়দের জন্যও অনেক ছড়া লিখেছি। শিশু-কিশোর উপযোগী গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে  ছ’টি। কলেজ জীবন থেকে গান লিখতাম নিয়মিত। সে অভ্যেসটা এখনও রয়ে গেছে। কিশোর বয়সে স্বপ্ন দেখতাম রেডিও, টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার হবো। আমার সে স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। কবিতা লেখার প্রতি আমার দুর্বলতা বেশ পুরনো। এখন পর্যন্ত আমার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দুটি। তবে এ সংখ্যাটা ভবিষ্যতে আরো বাড়বে বলেই বিশ্বাস করি। কিছু কিছু প্রবন্ধও লিখেছি। আমি মূলত ছড়া, কবিতা, গান লিখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। দীর্ঘ দিনের নিরলস প্রচেষ্টায় পেশাগত দায়িত্বের ফাঁকে ফাঁকে লিখেছি ‘পৌরাণিক শব্দের উৎস অভিধান’ শীর্ষক একটি গবেষণাধর্মী বই। বইটি ‘ঐতিহ্য’ প্রকাশনী প্রকাশ করেছে ২০২০ সালে। ‘অভিশপ্ত পৌরাণিক চরিত্র’ শীর্ষক অন্য একটি পৌরাণিক গ্রন্থ আগামীতে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা ২৭টি।

          আমি স্কুল জীবন থেকে লেখালেখি শুরু করলেও এর বিকাশ ঘটতে থাকে কলেজ জীবনে এসে। আমাদের এলাকায় ‘আমগ্রাম সাধারণ গ্রন্থাগার’ নামে একটি বড় পাঠাগার আছে। আমি সেই গ্রন্থাগারের সদস্য ছিলাম। স্কুল ও কলেজ জীবনে আমি সেখানেই বেশি সময় আড্ডা দিতাম। গ্রন্থাগার থেকে পছন্দের বই বাড়িতে এনে পড়তাম। সেগুলো ফেরত দিয়ে আবার অন্য বই পড়তাম। আমগ্রাম সাধারণ গ্রন্থাগার থেকে দেয়াল পত্রিকা বেরুতো। সেখানে আমার লেখাও ঠাঁই পেতো। আমগ্রাম সাধারণ গ্রন্থাগারের আড্ডায় লেখালেখিতে আমাকে প্রেরণা দিতেন বড়ভাই গোকুল বাগচী, আমার হাইস্কুল জীবনের শিক্ষক প্রয়াত প্রেমানন্দ সরকার, বড়ভাই

নারায়ণ দাস প্রমুখ ব্যক্তি। মাদারীপুর সরকারি নাজিম উদ্দিন কলেজে ডিগ্রি পড়াকালীন লেখালেখিতে প্রেরণা যোগাতো আমার বন্ধুরাই।     

পত্র-পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশের যাত্রা শুরু হয় নব্বই দশকের গোড়ার দিক থেকে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের  জগন্নাথ হলে। কবিতার ছন্দ বিষয়ে তখন আমার হাতেখড়ি হয় কলেজ জীবনের অকৃত্রিম বন্ধু বর্তমান এন.সি.টি.বি-এর প্রধান সম্পাদক কবি ড. সন্তোষ ঢালীর কাছে। আমি তাঁর কবিতার একজন অনুরাগী পাঠকও বটে। পাশাপাশি কক্ষে অবস্থান করায় সাহিত্যচর্চায় আমি তখন তাঁর প্রেরণা পেয়েছি সবচে বেশি । সে সময় পরিচয় ঘটে বন্ধুপ্রতিম ছোট ভাই বর্তমানে বাংলা একাডেমির উপপরিচালক লেখক ও গবেষক ড. তপন বাগচীর সাথে। তপন আমাকে লেখালেখিতে দারুণ ভাবে উৎসাহিত করে। আমি ছড়া লেখার বেশি প্রেরণা পেয়েছি তপনের কাছ থেকেই। আমার প্রথম প্রকাশিত ছড়াগ্রন্থ (১৯৯৪) তাঁর হাত ধরেই প্রকাশিত হয়। ১৯৯০ সালে দৈনিক আল আমিন পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা ও ছড়া প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে দৈনিক বাংলার বাণী, সংবাদ, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, আজকের কাগজ, প্রথম আলোসহ অনেক পত্রিকার শিশুসাহিত্যের পাতায় আমার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। জনকণ্ঠের সাহিত্যের পাতায় আমার বেশ কিছু কবিতাও প্রকাশিত হয়েছে। এজন্য আমি জনকণ্ঠের তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক কবি নাসির আহমেদ ভাইয়ের কাছে কৃতজ্ঞ। সমকালীন শিশুসাহিত্যিকদের অনেকের লেখাই আমার ভালো লাগে। এঁদের মধ্যে লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আসলাম সানী, সুজন বড়–য়া, ফারুক নওয়াজ, আনজীর লিটন, তপন বাগচী, আলম তালুকদার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। কবিতার ক্ষেত্রে আমার প্রিয় কবির সংখ্যা অনেক। তাঁদের মধ্যে শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, নির্মলেন্দু গুণ, আসাদ চৌধুরী, মহাদেব সাহা, আবিদ আনোয়ার, নাসির আহমেদ, অসীম সাহা, মুজিবুল হক কবীর প্রমুখ অগ্রগণ্য।

লেখালেখিতে আমার অর্জন যৎ সামান্য। লেখালেখির জন্য ২০১২ সালে পেয়েছি ‘গাঙচিল সাহিত্য পুরস্কার’। ২০১৯ সালে দিল্লীতে সার্ক সাহিত্য সম্মেলনে বাংলাদেশের লেখক হিসেবে যোগদান করাটা ছিল আমার কাছে এক বড় প্রাপ্তি। কী পুরস্কার পেলামÑ এ নিয়ে আমি ভাবি না। আমার লক্ষ্য পাঠককে আনন্দ দান করা। আমার লেখা পড়ে কেউ যদি আনন্দ পান আমি তাতেই খুশি হই। পাঠক বন্ধুদের ভালোবাসাই আমার বড় অর্জন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য লেখালেখিতে বিঘœ ঘটলেও প্রবল মনোবলের কারণে সে বাধা পেরিয়ে যাই। আমি আমার সাধ্যমতো লেখার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতেও আমি লেখালেখির এ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চাই। সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।

১০ জুন, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ/ ঢাকা, বাংলাদেশ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

3 মন্তব্যসমূহ