কী লিখি কেন লিখি নীলাদ্রিশেখর সরকার

কী লিখি কেন লিখি 
নীলাদ্রিশেখর সরকার
কী লিখি কেন লিখি 
নীলাদ্রিশেখর সরকার
জন্ম ০৯/১২/১৯৭৮

একটি ইচ্ছে বা শখ একদিন প্রেম হয়ে আসে জীবনে । পরবর্তীতে তা জীবনে বাঁচার রসদ হয়ে দাঁড়ায় । হ্যাঁ, আমার লেখক - সম্পাদক হয়ে ওঠার ঘটনার কথাই বলছি । বেথুয়াডহরি জে.সি.এম হাইস্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ি । নোটিশ বোর্ডে স্কুল ম্যাগাজিনে লেখা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেখে প্রথম বাবাকে গিয়ে বলি -একটা কবিতা লিখবো, স্কুল ম্যাগাজিনের জন্য । বাবা বললেন লেখ ।  সত্যি বলতে গ্রামের বাড়ির পূর্ণিমার উঠোনে বসে বাবা সেদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার জীবনের প্রথম লেখাটির কিঞ্চিৎ দায় নিয়েছিলেন  । 'ছোট ছোট তারা' শীর্ষক ছড়াটি ছাপা হয়েছিল । হয়তো সেই ছাপার অক্ষর দেখেই সেদিন প্রেমে পড়েছিল অশান্ত এই মন । পরবর্তীতে স্কুল-কলেজ, বিভিন্ন সংস্থার সুভেনির এ লিখেছিলাম । হঠাৎ সান্নিধ্য পেলাম কবি নবকুমার সরকারের, যিনি প্রথম হাত ধরে দেখিয়ে দিতেন কবিতা কিভাবে কবিতা হয়ে ওঠে । যদিও পরবর্তীতে কনক ঠাকুর এবং বিশিষ্ট সব্যসাচী লেখক শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ মহাশয় আমাকে লেখার ব্যাপারে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেন । 

প্রথম প্রথম ছোটদের জন্য ছড়া কবিতা গল্প লিখে বেশ মজা পেতাম । ধীরে ধীরে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, গান সবই লিখতে শুরু করি । দৈনিক আনন্দবাজার, আজকাল, প্রতিদিন, যুগান্তর, সকালবেলা, স্বভূমি, প্রাত্যহিক খবর, সুখবর এমন কত কাগজের লিখেছি ছড়া, কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, আঞ্চলিক খবর, সাংস্কৃতিক আলোচনা । প্রথম শ্রেণীর বহু বাণিজ্যিক ম্যাগাজিনে লিখেছি, লিখছি আজও । গৃহশোভা, পরিণীতা, সুস্বাস্থ্য, তথ্যকেন্দ্র, কিশোর ভারতী, সাম্প্রতিক সময়, নর্থ্স্টার  আরো কত । লিটিল তো ম্যাগাজিন শতাধিক ছাড়িয়েছে প্রথম দশকেই । কৃত্তিবাস, ভাষানগর থেকে শুরু করে  বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন পত্রিকায় লিখছি । লিখেছি বাংলাদেশের কিছু প্রথম শ্রেণীর পত্র পত্রিকাতেও ।

প্রথম বইয়ের কথা বলতেই মনে পড়ে যায় ২০০৯ এর পঁচিশে বৈশাখের কথা । একই দিনে দুটি বই প্রকাশ হয় প্রিয়ম প্রকাশন থেকে । একটি ছড়ার বই ' ঝিলিক ঝিলিক ভোরের আকাশ' ও একটি কবিতার বই 'কখনো মেঘ কখনো রোদ্দুর' । এরপর সময় যত এগিয়েছে লেখার বিভিন্ন দিকে কিভাবে নিজেকে মেলে ধরেছি তার কোনো হিসেব রাখেনি কোনদিন, সম্ভবও নয় । 'এক যে ছিল রাজা', 'ছড়ায় গাঁথা নীতির কথা', 'হীরের কুচি', 'ছড়ায় ছড়ায় সুকুমার রায়', 'অসূর্যম্পশ্যা', 'রংচোর',  'শঙ্খ ভোরের তানপুরা', 'নানা রঙে দ্বিজেন্দ্রলাল', 'দর্পণে সমাজবীক্ষণ' বেশ কিছু ছড়া- কবিতা -গল্প -প্রবন্ধের বই প্রকাশিত হল বিভিন্ন প্রকাশন থেকে । ইতিমধ্যে বাংলাদেশ থেকে তিনটি বই প্রকাশিত হয়েছে  । 'ট্রেন ভূতের খপ্পরে' ( গল্প,  শোভা প্রকাশ ), 'আকাশ ছোঁয়ার মই' (ছড়া-কবিতা, করি প্রকাশ) এবং পাবনার বিশিষ্ট সম্পাদক মানিক মজুমদারের সাথে 'মৃত্যুঞ্জয়ী কবি কার্তিক মোদক' ।

'কথাকৃতি' সাহিত্য বিষয়ক যে পত্রিকাটি আজ দুই বঙ্গের পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে সেটির প্রাণ প্রতিষ্ঠা করতে পেরে আমি সত্যিই গর্বিত । সম্পাদনা করতে গিয়ে, লেখা সংগ্রহ করতে গিয়ে বেশ প্রচার- প্রতিষ্ঠা পেয়েছি তা হলফ করে বলতে পারি । শঙ্খ ঘোষ, সুধীর চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, দিব্যেন্দু পালিত, দেবদাস আচার্য, সুবোধ সরকার, আল-মাহমুদ, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, অসীম সাহা, মোঃ নুরুল হুদা, সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজীও লিখেছেন এই পত্রিকায় ।  বিভিন্ন কবি- সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে কথাকৃতি প্রকাশ করেছে বিশেষ বিশেষ সংখ্যা । রবীন্দ্রনাথ, মদনমোহন, বিবেকানন্দ, দ্বিজেন্দ্রলাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মল্লিকা সেনগুপ্ত, কৃষ্ণা বসু, শৈলেন ঘোষ, অপূর্ব দত্ত, সুবোধ সরকার, বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ও গীতিকার তপন বাগচী কে নিয়ে একটি ৭৬০ পৃষ্ঠার সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছে । আবার মান্না দে, সুচিত্রা সেন, সুচিত্রা মিত্র কে নিয়েও প্রকাশিত হয়েছে বিশেষ সংখ্যা । বিশেষভাবে উল্লেখ্য দিল্লিতে ধর্ষিতা পরে লোকান্তরিতা দামিনী এবং পুরুলিয়ার মনিকা মাহাতো খুন ও ধর্ষণের ঘটনায় প্রকাশিত হয়েছিল দুটি বিশেষ সংখ্যা যা সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল । কখনো অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত বাড়িতে ডেকে নিয়ে লেখা দিয়েছেন কখনো নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ফোন করে কবিতা দিয়েছেন যা আমি লিখে নিয়েছি এসব জীবনের অমূল্য পাওয়া ।

কথাকৃতি আজ প্রকাশনারও দায়িত্ব নিয়েছে । দুই বঙ্গের অনেক খ্যাত-অখ্যাত সাহিত্যিকদের ছড়া- কবিতা- গল্প -নাটক -প্রবন্ধ- উপন্যাস প্রকাশ করেছে সে  । বহু লেখক যারা আর্থিক অপ্রতুলতায়, যোগাযোগের অভাবে বই প্রকাশে অক্ষম তাদের বই প্রকাশ করেছে কথাকৃতি , এ যেন এক সামাজিক দায়বদ্ধতা  সাহিত্যের অঙ্গনে । দুই বঙ্গের লেখক, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে জীবনকৃতি সম্মান দিতে পেরে  কথাকৃতি ধন্য । গতবছর লকডাউনে বেশকিছু দুস্থ পরিবারকে খাদ্য সামগ্রী ও ত্রাণ তুলে দিয়েছে এই সাহিত্য পত্রিকা, যেন সমাজকে নিয়ে চলার এক অঙ্গীকার তার ।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সেমিনার, অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ ও আলোচনায় অংশ নিয়েছি । সেটা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় হোক কিংবা বাংলাদেশে । আমন্ত্রিত হয়েছি বাংলাদেশের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সেমিনারে, ও দেশের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকাযর বার্ষিক অনুষ্ঠানেও অংশ নিয়েছি বেশ কয়েকবার  । আজ থেকে প্রায় ১১ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা অ্যাকাডেমি সভাগৃহে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে পত্রিকার (কথাকৃতি) এগিয়ে চলার পথের দ্বারোদ্ঘাটন করেছিলেন আজ সেই পত্রিকার অগণিত পাঠক-লেখক দুইবঙ্গেই , এ আমার সৌভাগ্য । এসব কাজের ফাঁকেও আকাশবাণীর প্রাত্যহিকীর জন্য মাঝে মাঝে পত্র লিখেছি । বেশ কয়েকটি ছড়া-কবিতার অ্যালবামও আছে আমার । বঙ্গের বিশিষ্ট বাচিক শিল্পীরা তাঁদের কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন আমার ছড়া কবিতা । প্রণতি ঠাকুর, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, কাজল সুর, ঋতব্রত ভট্টাচার্য, রোকেয়া রায়, সংগীতা দত্ত ও সোমা কাঞ্জিলাল এর মত বিশিষ্টজনেরা ।

এই কাজ করতে গিয়েই আঞ্চলিক ইতিহাস চর্চায় মনোনিবেশ । আমার জন্মভূমির প্রথম আঞ্চলিক ইতিহাস 'নাকাশিপাড়া সেকাল-একাল' সরকারি উদ্যোগে প্রকাশিত । আমার জীবনের এক উল্লেখযোগ্য কাজ বলে আমি মনে করি । এরপর 'নাকাশিপাড়ার কবি ও কবিতা' এবং সর্বোপরি শ্রদ্ধেয় শ্যামাপ্রসাদ ঘোষ মহাশয় এর সাথে যৌথ সম্পাদনায় 'সমীক্ষার আলো নদীয়ার কবিতা(প্রতিভাস)' এক অনন্য প্রয়াস । ছড়া-কবিতা-গল্পের বিভিন্ন সংকলন প্রকাশ করেছি এই গতিপথে ।  বিশিষ্ট অনুবাদক ও কবি শ্রদ্ধেয় প্রাণেশ সরকার আমার একটি কবিতার বইয়ের অনুবাদ করেছেন। আর এসব করতে গিয়েই প্রচুর পুরস্কার ও সম্মাননার অধিকারী হয়েছি । আজ পশ্চিমবঙ্গ সরকার, রাজ্যস্তরের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, জেলাস্তরের বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠন এমনকি বাংলাদেশেও সম্মানিত হয়েছি । ফরিদপুরের  জসীমউদ্দীন সাহিত্য পরিষদ থেকে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক' বাংলাদেশ কবিতা সংসদ (ঢাকা )থেকে 'বঙ্গবন্ধু‌ স্মারক সম্মান' আরো কত । আমার সাহিত্য কর্ম নিয়ে বিশিষ্ট কবি ও ইংরেজি ভাষার সাহিত্যিক স্বপন কুমার নাথ রচনা করেছেন "A Glimpse of Niladri" যা আমার ভাবনাতীত ।

সরকারি চাকরি করতে গিয়েও বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে রচনা করেছি বা সম্পাদনা করেছি বেশ কিছু গ্রন্থ । যেমন প্লাস্টিকের ভয়াবহতা নিয়ে 'আর নয় প্লাস্টিক' আবার ১৮৭৩ সালে ফরিদপুরে বিশেষ এক জাতিকে অস্পৃশ্য বলে ও তাদের দিয়ে নিচু কাজ করানোয় যে অসহযোগ আন্দোলন, সেই বিষয়ে রচিত 'মর্যাদা ১৮৭৩' যা এক অনন্য সৃষ্টি । সৃষ্টির আনন্দ আর সামাজিক দায়বদ্ধতা কাঁধে নিয়েই সকাল-সন্ধ্যা-রাত নিরন্তর ছুটে চলা । শব্দের পর শব্দ বসিয়ে বুনছি কল্পনা, ভাবের বিস্তার আর তাতে যুক্ত হয় ভাবাবেগ,অলংকার, কখনো নাটক, আলোচনা সর্বোপরি বোধগম্যতা । 

ছুটছি, আজীবন ছুটতে চাই । কিন্তু কেন ? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়তো দিতে পারবে না এই জীবন ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ