অণিমা মুক্তি গমেজ
সংগীতশিল্পী-গবেষক-ছড়াকার
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্লাশে প্রথম স্থান পেয়ে গেলাম। এ জন্য সবাই যখন আদর করতে লাগল তখন বেশ আনন্দ লাগত। পড়াশোনার মজাটা এখান থেকেই পেয়েছিলাম। ছোট্টবেলা থেকে জানার আগ্রহটা বরাবরই আমার বেশি ছিল।
পাঁচ বছর বয়সে তাই আকাশ ছুঁয়ে দেখতে গিয়ে বহু দূরে হারিয়েও গিয়েছিলাম। সে নিয়ে এক তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছিল বাড়িতে। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছোটবেলায় যেমন টানতো, এখনও তেমনি টানে। বোধের বিষয়টি একটু বদলে গেছে, এই যা। পড়াশোনা, প্রকৃতিতে ঘুরে বেড়ানো কিংবা গান গাওয়া সব কিছুই করতাম যখন যা করতে ভাল লাগত, তখন। সুতরাং, প্লান করে আমি কিছু করতে পারিনি কিংবা করিওনি। মাথায় চাপ নিয়ে কিছু করা না গেলেও, চাপে না পড়লে মানুষ অনেক বড় কাজ যে করতে পারে না এটাও সত্য। ভালভাবে পড়াশোনা করব এটা পণ থাকলেও গানে কীভাবে পেয়ে বসল বুঝিনি। স্কুলের দিদিমণিরাই আমাকে সংগীতে স্বর্গদুয়ারে এনে, এই জগতকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
গান গাই, পড়াশোনা করি--আনন্দেই কাটছিল দিনগুলি। গ্রামে তখন কোন পত্রিকা পাওয়ার উপায় ছিল না। পত্রিকা বলতে সাপ্তাহিক ‘প্রতিবেশী’। গ্রামের বয়স্ক মানুষদের লেখা থাকত আর পরিচিতদের নাম পত্রিকায় ছাপা অক্ষরে দেখতে বেশ ভাল লাগত। স্কুলের আমার ক্লাসের বান্ধবীদের মধ্যে পড়াশোনার প্রতিযোগিতা যেমন লেগে থাকত তেমনি নাচ, গান, আবৃত্তি এবং খেলাধুলায়ও প্রতিযোগিতার ভাব থাকত যদিও এর বাইরে আমরা ছিলাম এক আত্মার মানুষ।
আমাদের গ্রুপের লিডিয়া ইমেল্ডা গমেজ তখন খুব সুন্দর ছড়া লিখত, সেটা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময়কার কথা। লিডিয়ার ছড়াগুলো ভাল লাগত। আমাদের গল্প বই পড়ার অভ্যাসটা শুরুও তখন। তাই, লিডিয়ার গুরুত্ব ছিল আমার কাছে অন্য রকম। এক সময় সাপ্তাহিক ‘প্রতিবেশী’তে ওর ছড়া ছাপা হল, সেই উল্লাস এখনও হৃদয় ছেয়ে আছে। এ যেন পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার চেয়েও বেশি। তখন আমার মনে হত, প্রতিদিন পড়লে ক্লাসে প্রথম হওয়া যায় কিন্তু ছড়া লিখতে বিশেষ কিছু লাগে। বিষয়টা সেই থেকে আজও একই গুরুত্ব বহন করে আমার মাঝে।
গ্রামের বিনোদন বলতে তখন ছিল, বড়দিনের ছুটিতে দুদিনব্যাপী মঞ্চনাটক আর ঈদের ছুটিতে ‘অগ্রদূত’ ছাত্র সংগঠনের ’ তিনদিনব্যাপী সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান। এই সংগঠনের দাদা-দিদিরা বছরে একবার ‘মঞ্জরী’ নামে পত্রিকা বের করত। যাতে গ্রামের যুবক-যুবতীরা লেখার সুযোগ পেত। বেশ কয়েকবার সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ান হলেও, ভিতরে ভিতরে পত্রিকার পাতায় নিজের নাম দেখার বাসনা যে আমায় আচ্ছন্ন করত না তা নয়। অষ্টম শ্রেণিতে আমি পুরোপুরি রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়ে যাই। তাঁর গান-কবিতা সব আমায় কুরে কুরে খায় তখন। ‘ক্ষণিকা’ কবিতার বই পড়তে পড়তেই নিজের মধ্যে লেখার বিষয়টা চলে এল। রবীন্দ্রনাথের গান দিয়েই গান শুরু, কবিতাও তাঁর মাধ্যমেই। তাই রবীন্দ্রনাথই আমার লেখার প্রথম অনুপ্রেরণা। গোপনে কত কিছু লিখি আর ছিঁড়ি। এভাবে বছর শেষে গোপনে ‘মঞ্জরী’তে লেখা জমা দিলে সেটি মনোনীত হয়ে ছাপাও হয়ে যায়। খুশিতে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে যাই। ভীষণ ভয় ছিল পরিবারের কে কী বলে বসেন! কারণ, পরিবারে পড়াশোনাটাই ছিল আগে। কিন্তু সে রকম কিছু ঘটেনি বরং উল্টে যেটা হয়েছিল, গল্পবই পড়া, কবিতা পড়ার প্রতি আগ্রহ দেখে আমার বাবা তখন কলকাতার বড় বড় কবি-সাহিত্যিকদের ভাল ভাল বই সহ আকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্ত বই কলকাতা থেকে আমার জন্য সংগ্রহ করে আনতেন। স্বাভাবিকভাবেই গানের সাথে সাথে আমার বই পড়ার নেশাটা বাড়তে লাগল।
স্কুলের বান্ধবীদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে লাগল কবিতা লেখা। সেগুলো আক্ষরিক অর্থে কবিতা ছিল না এখন সেটা বুঝতে পারি, কিন্তু তখন যে কী অদম্য উৎসাহ আমাদের মাঝে কাজ করত সেটা বলা কঠিন, যা ভাবলে এখন অনেক ভাল লাগে। এমন কি, আমাদের ক্লাসের আমরা বান্ধবীরা বাংলা প্রশ্নোত্তর কখনও মুখস্তও করিনি। আমরা সেই উত্তরগুলো নিজেদের মত করে লিখতাম, ক্লাস-পরীক্ষার পর কে কত পেল সেই নাম্বার মেলাতাম। যে বেশি নাম্বার পেত বুঝতাম তার বানানো লেখা সবচেয়ে ভাল হয়েছে। তাকে পরাজিত করতে পরের পরীক্ষার পড়া তৈরিতে চলতো জোর চেষ্টা। বিষয়টা নিয়ে সারা স্কুলের শিক্ষকদের মাঝেও আলোচনা চলত, তারা বিষয়টা উপভোগ করতেন এ জন্য ভালও বাসতেন খুব।
১৯৮৯ সালে এস.এস.সি পরীক্ষার আগে সারা স্কুলে স্বরচিত রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হল। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে ব্যাপক বন্যা হয়েছিল। সেই বিষয়ের উপর রচনা প্রতিযোগিতা। সকল বান্ধবী যথারীতি ঝাঁপিয়ে পড়লাম যার যার লেখায়। আমার খুব টেনশন হচ্ছিল। উপজেলা নবাবগঞ্জে অনেক স্কুলের সামনে যখন স্বরচিত রচনা প্রতিযোগিতার প্রথম স্থান অধিকার করা মেয়েটির নাম ঘোষণা করা হল তখন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার নাম শুনে আমি বোকা হয়ে গিয়েছিলাম। বান্ধবীর ভুল বুঝল, কারণ ওরা যখন জানতে চেয়েছিল তখন আমি বারবার বলেছিলাম, ’ লেখাটা তত ভাল হয়নি রে আরও ভাল হতে পারত ’। যাহোক এ ভাবেই নদীর সাথে, পাখির সাথে, ফুল আর পাখির সাথে কথা বলতে বলতে তখন কত কিছুই তো লিখেছি মনের আনন্দে। কী হয়েছে, কী হয়নি সে ভাবনা কখনওই দুশ্চিন্তায় ডুবায়নি আমায়। পড়তে, ভাবতে লিখতে ভাল লাগতো, তাই লিখতাম।
গ্রাম ছেড়ে যখন শহরে এলাম তখন সব কিছুই কেমন ফিকে হয়ে যেতে লাগল। শহরের ইট-বালু-কাঠে ভিতরের রস যেন একটু একটু করে শুষে নিল। ভাটা পড়ল লেখালেখিতে। গান নিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে লিখতে পারার কথাটি চাপা পড়ে যেতে লাগলো। কিন্তু পড়া থামেনি বা থামাতে পারিনি। কৌতূহল বরাবর বেশি ছিল, ঢাকা শহরে এসে তার মাত্রা বাড়তে লাগল। গান শিখি, আবৃত্তি শিখি, অভিনয়ের প্রশিক্ষণ নিই। এক সময়, ‘কণ্ঠশীলন’ আবৃত্তি ও উচ্চারণচর্চা সংগঠনে যুক্ত হলাম। বাংলার বিখ্যাত পণ্ডিত পরম শ্রদ্ধেয় নরেন বিশ্বাস স্যার ও পরম শ্রদ্ধেয় ওয়াহিদুল হক স্যারের সান্নিধ্যে জীবন ধন্য হয়েছে। আবৃত্তি করতে করতে কিছু কিছু কবিতা লিখি। তত দিনে বিয়ে হল। স্বামী রঞ্জিত চন্দ্র দাস, আমার এ গুণের কথা জানলে হাসবে, এ রকমই ভয় ছিল। কিন্তু, হল তার উল্টো। তিনি গানের পাশাপাশি লেখাতেও উৎসাহ দিলেন আবার মস্তিষ্ক চাপ পড়তে পারে এ নিয়ে একটু ভাবনায়ও পড়লেন।
আমি যেহেতু ধারাবাহিক লেখক নই তাই এই দুর্ভাবনা তার বেশি দিন রইল না। লোকগান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। গান শিখতে বসি এ দেশের প্রখ্যাত লোকসংগীত শিল্পী শ্রী ইন্দ্রমোহন রাজবংশী স্যারের কাছে। স্যার অসাধারণ গুণী মানুষ ছিলেন। গান গাওয়ার পাশাপাশি তিনি প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন, গীতিকার-সুরকার হিসেবে তাঁর বেশ জনপ্রিয়তাও আছে। স্যার আমার সামনে অনেক গান লিখেছেন। সেই সময়টা ছিল আমার কাছে সব চেয়ে আনন্দের। আমি ভাবুক স্যারকে দেখতাম গান লিখছেন গভীর মনোযোগ সহকারে, দেখতাম ক্ষ্যাপাটে সুরকারকে। স্যার গানের সুর করার সময়ে কোন রকম টু শব্দ করা যেত না। দেখতাম ধৈর্যশীল স্নেহপূর্ণ শিক্ষককে। স্যার এ সব গান অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের তুলে দিতেন অত্যন্ত সুন্দরভাবে। সেই থেকে গান লেখার বিষয়টি আমাতেও সংক্রমিত হয়। লুকিয়ে কিছু গান লেখা শুরু করলাম। কিন্তু লজ্জায় কাউকে দেখানোর সাহস পাইনি। স্যার আজ স্বর্গবাসী। কিন্তু, তাঁর সেই গান লেখার পরিবেশটা আমায় ঘিরে আছে।
খুব বড় একটি স্বপ্ন ছিল আমার কবিতা নিয়ে বই মেলায় বই বেরুবে। স্বামী ছাড়া কাউকে কোনদিন বলিনি সে কথা। ২০১০ সালে গানের জন্য আমেরিকানে গেলাম। ছয় মাসের ভিসা। আত্মীয়-স্বজন কেউ ছাড়লেন না। বেশ অনেক দিন থাকলাম সেখানে। সাপ্তাহিক ছুটির দিন ছাড়া অন্যদিনগুলোতে বাড়ির কাউকে সারা দিন কাছে পাওয়ার আশা করা বোকামি। কারণ, সবাইকে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হয়। এ ছাড়া বিদেশে উপায়ও নেই। সেখানে, কাজ আছে মানে, বেঁচে থাকা। রবিবারের ছুটিতে অনুষ্ঠান করা ছাড়া আত্মীয়দের বাড়িতে আমি সারা দিন একা। কোন কোন এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমায় ব্যাকুল করে তুলত। নিউইয়র্কের জ্যাকহাইটসের বাঙালি এক দোকান থেকে ছোট্ট একটি খাতা কিনে ফেল্লাম। কারণ, সেই অনুভূতিকে আমি কাগজে আটকে রাখতে চাইলাম, লেখায় বন্দি করতে চাইলাম ২০১০ সালটিকে। সেই ইচ্ছে মত, কয়েক মাসে অনেক কবিতা লিখে ফেল্লাম। ধারাবাহিকভাবে কবিতা লিখা সে বারই প্রথম। লেখার বিষয়টি আমার কেউ জানতো না। জানলো আমার স্বামী, যাকে আমি লিখে পাঠাতাম। সে খুব খুশি হত এবং উৎসাহ দিত যেন কবিতার বই হয় এমনভাবে লিখি। আর জানলো আমার প্রিয় পিসি পূর্ণিমা গমেজ এবং কাকা বিকাশ ডি কস্তা। তারা সেখানে আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিতেন লেখার জন্য।
২০০৯ সালে ভাওয়াইয়া গানের উপর ছোট্ট একটি গবেষণামূলক কাজ করতে গিয়ে গবেষণামূলক অনেক গ্রন্থ পড়তে হয়। সে সময় থেকে গবেষণাধর্মী কাজে প্রবল টান অনুভব করলাম। গান নিয়ে কিছু গবেষণা কাজ করতেই হবে, এমন ইচ্ছে তখন থেকেই পেয়ে বসে কিন্তু এ বিষয়ে সাহায্য পাওয়ার গুণী মানুষদের সহজে পেলাম না। যাদের কাছে শিখব বলে এগিয়ে গেলাম, আমার গান গাওয়ার কারণে তারা পিছিয়ে যেতেন। বিষয়টি আমায় কষ্ট দিত।
২০১২ সাল থেকে আমি প্রবন্ধ লেখার দিকে ঝুঁকে পড়ি। প্রথম আলো, যুগান্তর, জনকণ্ঠ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ এবং ঈদ সংখ্যা খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ি তখন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বার্তা প্রধান কামাল লোহানী, লোকসংস্কৃতি বিশষজ্ঞ শামসুজ্জান খান, সংগীতজ্ঞ মোবারক হোসেন খান, বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী মোস্তফা জামান আব্বাসী - এঁদের অসাধারণ লেখা আমায় যেমন মুগ্ধ করত তেমনি টানতো। গানের পাশাপাশি প্রবন্ধ লেখার আগ্রহ যে এঁরা দিয়েছিলেন তা বলাই বাহুল্য। গোপনে প্রবন্ধ লেখার চর্চাও করি। লিখি আর কাগজ ছিড়ি। সেভাবেই চলতে থাকলো। বিষয়টি কাউকে না বলা রয়ে গেল। তবে, আমাদের গ্রামের এক ছোট ভাই লোকগান নিয়ে লেখা চাইলে তাকে ‘বাংলার লোকগান’ বিষয়ক এক প্রবন্ধ লিখে দিয়েছিলাম। সে কোন এক ম্যাগাজিনে ছাপিয়েও ছিল।
প্রতি বছর সোনারগাঁও লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরে মাসব্যাপী লোক ও কারুশিল্পের মেলা উপলক্ষ্যে মাসব্যাপী লোকগানের অনুষ্ঠান হয়। লোকগান পরিবেশনের জন্য আমারও ডাক পড়ে। চমৎকার পরিবেশে আন্তরিক আতিথেয়তা পাই সেখানকার প্রত্যেক কর্মকর্তার কাছ থেকে। এ জন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। লোকগানের পাশাপাশি, লোকসংস্কৃতি বিষয়ক দেশ-বিদেশের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, গবেষক আর বক্তাদের দারুণ মেলা বসিয়েছিলেন কবি রবীন্দ্র গোপ। মেলায় আগত দর্শনাথীরা যেমন রকমারি পণ্যসামগ্রী কিনে আনন্দ পেতেন তেমনি লোকসংস্কৃতির ধারণা নিয়ে ঋদ্ধ হয়ে বাড়ি ফিরতেন। এ জন্য কবি রবীন্দ্র গোপকে ধন্যবাদ না জানিয়ে পারা যায় না। গান গাওয়ার পাশাপাশি আমি প্রবন্ধগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। কখনও কখনও প্রবন্ধকারের বিষয়কে সামনে রেখে গানও গাইতাম। কোন প্রবন্ধ ভাল লাগলে তা প্রাবন্ধিকের কাছ থেকে চেয়েও নিতাম। এখানেই দেখা হয় বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক, গীতিকার, গবেষক ড. তপন বাগচীর সাথে। অন্যদের মত, তিনিও জানতেন না গানের বাইরে আমি একটু লিখি। লেখা হয় কি হয় না, এটা নিয়ে আমার বেশ দ্বিধা ছিল তাই কখনও প্রকাশ করিনি। কিন্তু দাদা বাংলা একাডেমিতে উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত এবং লোকগান নিয়ে প্রচুর গবেষণা করেন তাই আমার স্বামী আমার আড়ালে দাদাকে লেখার বিষয়টি জানিয়ে দেন। ড. তপন বাগচী হলেন সেই লোক যিনি নিজে তো লিখেনই নতুনদেরও তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। তিনি অনেকটা জোর করেই আমার লেখাগুলো নিলেন, পড়লেন এবং প্রশংসা করলেন। আমি এবার সাহস পেলাম, উৎসাহ বোধ করলাম। স্বামী রঞ্জিত দাসও স্বস্তি পেলেন। পেশায় ক্রীড়াবিদ, তাই সে আমার লেখা নিয়ে কিছু করে উঠতে পারছিলেন না। দাদাকে পেয়ে তিনি বইয়ের বিষয়টা জানালেন। দাদাও রাজি হলেন।
লেখার বিষয়ে তপন দা খুব কড়া প্রকৃতির শিক্ষক। কবিতার পাণ্ডুলিপি যিনি দেখেছেন তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত কবি ও প্রখ্যাত গীতিকবি আবিদ আনোয়ার। তাঁর সঙ্গে গানের জন্য আগেই আমার পরিচয় ছিল। বাংলাদেশ বেতারে আবিদ ভাইয়ার লেখা গান গাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি আমার লেখা পেয়ে খুব খুশি হলেন। তার মত বিশিষ্ট কবি লেখা নিয়ে বেশ কিছু বিষয় শিখিয়েছেন, এ আমার পরম পাওয়া। আবিদ ভাইকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই নত মস্তকে। তিনি আমার কবিতার বই‘ ‘চাঁদের আলোয় পুড়ছে বিরহক্ষণ’-এর জন্য একটা আশীর্বাণীও লিখে দিলেন।
আমার gfcv জন্য আশীর্বাদ করলেন দেশের প্রখ্যাত কবি আসাদ চৌধুরী। তিনিও অবাক হয়েছেন আমার লেখার বিষয়টি জেনে। কারণ, সংগীতের জন্য তাঁর সাথে আমার বহু আগে আমার পরিচয়। তাঁর মত প্রখ্যাত কবি আমায় যে উৎসাহ জুগিয়েছেন তার তুলনা হয় না। আমি কৃতজ্ঞ চাচার কাছেও। কৃতজ্ঞ স্বাধীন বাংলা বেতারের বার্তা প্রধান, জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর কাছে। যিনি আমার লেখার বিষয়ে আমায় আশীর্বাদ করে গেছেন।
ড.তপন বাগচী বুঝতে পারলেন আমি হয়ত পারব। তাই তিনি প্রায় ই বিভিন্ন বিষয়ে চাপ দিয়ে আমাকে লিখিয়ে নেন। সেই চাপ রঞ্জিত পর্যন্ত পৌঁছায়। সংগীত জগতে যেমন সংগীত গুরু প্রয়োজন, লেখালিখির জন্যও তেমনি গুরু দরকার। ড. তপন বাগচী আমার লেখালিখির গুরু হয়ে উঠলেন সাথে আমার স্বামী রঞ্জিত তো আছেই। লেখার বিষয়, চলন, তথ্য এ সব বিষয়ে প্রথমে ওর সাথে আলোচনা, বিষয়ের ভুলগুলো প্রথমে সে ই ধরিয়ে দেয়। তারপর ছন্দগত, শব্দগত, তথ্যগত কোন ভুল থাকলে তপনদা বেশ কড়াভাবে শক্ত কথায় বুঝিয়ে ছাড়েন। এভাবে গানের পাশাপাশি কখন যে লেখার মাঝে, গবেষণার মাঝে ডুবে গেলাম টের পাইনি। মনের সুপ্ত বাসনা এ ভাবেই বাস্তব রূপ পরিগ্রহ করে ২০১৭ সালে।
সে এক অন্য রকম অনুভূতি। ২০১৭ সালের একুশের বইমেলায় ছোটদের জন্য লেখা আমার একটি ছড়া এবং গল্প বই প্রকাশ পায় ‘কলি প্রকাশনী ’ থেকে। ভাগ্য আমার সাথে ভাল ব্যবহার করেছিল, নয়তো কলির মত ভাল প্রকাশক পাওয়া হত না আমার। কলি কে শুধু মাত্র প্রকাশক বললে ভুল বলা হয়। আমি প্রকাশনার জগতে একজন ভাই পেলাম। পরিবার পাবলিকেশন্স থেকে বের হয়েছে ছড়ার বই ‘আমার রঙিন ঘুড়ি’ (২০২৭)। একই বছরে ডাংগুলি থেকে শিশুতোষ গল্প ‘আকাশ ছোঁয়ার গল্প; আর কলি প্রকাশনী থেকে কিশোর-উপন্যাস ‘ভালো ভূতের গল্প’। পরের বছর বের হয় কবিতার বইটি। একই বছর সাতভাইচম্পা প্রকাশনী থেকে বের হয় শিশুতোষ গল্প ’গানের মাস্টার কোকিল’। তবে আলোকায়ন প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে আমার সম্পদনায় ‘কুটি মনসুরের গান’ গ্রন্থটি ২০১৯ সালে। একই বছর বাংলা একাডেমি প্রকাশ করে আমার গবেষণাগ্রন্থ ‘সমর দাস’ নামের জীবনী। তৎকালীন মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সংগীত-পরিচালক সমর দাসের জীবনী প্রকাশের জন্য। আমার মতো গবেষকের লেখা বই বাংরা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়েছে এটি আমার জন্য অনেক বড় সম্মানের। নানান ব্যস্ততায় ২০২০ সালে কোনো পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে পারিনি। ২০২১ সালে করোনার মধ্যে কলি প্রকাশনী প্রকাশ করেছে আমার কিশোরতোষ গ্রন্থ ‘টুঙ্গীপাড়ার দুরন্ত কিশোর’। এটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সহজভাষার জীবনী। পাঠকের সমর্থন থাকলে হয়তো গানের পাশাপাশি আমি সাহিত্যের মঞ্চেও উপস্থিত থাকতে পারব ভবিষ্যতেও।
লেখার বিষয়টি আমি গানের মতই দারুন উপভোগ করি। তবে, সত্যিকার অর্থে খুব ভাল লিখতে পারি, তা ভাবতে যাই না কখনও। কারণ, নিজের চেয়ে অন্যদের লেখা আমার বেশি ভাল লাগে। লিখতে গিয়ে সহজ ভাষাতে আমি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। লোকগান যেমন সাধারণ মানুষদের গান, আমার লেখাও তেমনি সাধারণ মানুষদের জন্য। লেখা নিয়ে অনেক কিছু করব তেমন হিসেব কষা হয়নি কখনও। আর করোনার ছোবলে ‘ পরিকল্পনার ‘ পরি উড়ে গিয়ে এখন যা ভাবি তা সবই কেবল “কল্পনা”। সামনের দিন নিয়ে তাই তেমন ভাবনা নেই। এখনও বেঁচে আছি, বিষয়টাই বিষ্ময়কর। যত দিন বাঁচব গান গাইব, শেখাব, লিখব আর কিছু গবেষণামূলক কাজ করে যাব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য। কারণ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যে দিন আসবে তা ভয়াবহ বলে ই আমার মনে হয়। তারা মোবাইলের মত যন্ত্রের বাটন টিপে সব জানতে চাইবে, পেতে চাইবে। যখন বাটন টিপে কোন তথ্য না পাবে তখন হয়ত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে। তাই তাদের কথা চিন্তা করেই এখন থেকে তাদের জন্য একটা চমৎকার পথ তৈরীর কাজ শুরু করতে হবে আমাদেরই, এখন থেকেই।
গান নিয়ে স্বপ্ন গুলো যে বাস্তবে কখনও রূপ নেবে তা এক সময় ভাবনারও অতীত ছিল। আজ, চলতে চলতে লেখা হল তা আবার ছাপা হচ্ছে। দেশের অনেক গুনী শিল্পী সাহিত্যিক গণ পড়ছেন, তাদের মতামত দিচ্ছেন আমার ইচ্ছের নৌকা দ্বিগুণ উৎসাহে ছুটে চলছে। লেখা নিয়ে এমন ভাবে উৎসাহ পাব সেও ভাবনায় খেলেনি। তাই, আমার লেখক জীবনে স্বল্প সময়ে আমি সকলের কাছে
আন্তরিক ভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সকলের দেয়া অনুপ্রেরনা গুলো আশীর্বাদের ঝুড়িতে পুরে আমি লিখে যেতে চাই জীবনের শেষ মূহূর্ত পর্যন্ত।
অণিমা মুক্তি গমেজ: অধ্যক্ষ, ঢাকা ক্রেডিট কালচারাল একাডেমি, ঢাকা
0 মন্তব্যসমূহ