কী লিখি কেন লিখি
মনিরুল মনির
আমার লিখবার কথা ছিল না। আমি লিখতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। পড়ি শুধু। অনুভূতি শুধু পড়ার। জানার। তবুও মাঝে মাঝে মনে হয় উড়ি। উড়তে থাকি। হাওয়ায় হাওয়ায় বেলা যায়। সময় পেরিয়ে এসেছি, যা জীবনের বড় অতিক্রম। কিছুই জানি না, বুঝিওনি। শুধু নতুন শব্দ খুঁজি। খুঁজতে খুঁজতে চলে যাচ্ছে বহু সময়। ছটপট করতে থাকি। দোনামোনায় থাকি। এই খোঁজ কেন? কী জন্য খোঁজতে থাকি? খোঁজটা কী লিখালিখি। কেন লিখি?
আমার লিখবার কথা ছিল না। সুর পছন্দ করি। সুরের মধ্যে দোলে ওঠতে চাই। জেগে থাকতে চাই। ঘুমিয়ে পড়তে চাই। একবার একটা গান লিখি, ছড়া লিখি। কেমন যেন, আনাড়ী শব্দ প্রয়োগ আমাকে বিচলিত করতে থাকে। আবার লিখি, এই লিখা দেখে সবাই প্রশংসা করে। কিন্তু বুঝতে পারি না। আমার ভুল কোথায়? তবে এইটুকুন বুঝতে পারি যে, সবাই প্রশংসা করলেও অনুভব কেউ করে না। আমারও কেন জানি তৃপ্তি হলো না। যন্ত্রণা হলো। এই যন্ত্রণা হচ্ছে লেখক হবার। লেখক হওয়া সহজ নয়, তাও বুঝতে পারলাম।
তবুও লিখতে থাকি আবোলতাবোল। এলোমেলো। গান আমাকে কবিতায় নিয়ে এলো। গান লিখতে লিখতে, দেখি সুরসৃষ্টির সাথীদের কাছে আমার গানগুলো কোনো গুরুত্ব পেতে থাকে না। তারা এড়িয়ে যায়। বুঝতে পারি, সুর বসানো সম্ভব নয়। আমার এক বন্ধু, সহকর্মি সাংবাদিক বললেন, ভাই আপনার গান কবিতা হয়ে যায়। গান হয় না। আমি তখন ভাবতে থাকি কবিতা। ছন্দ। মিল, উপমা। শিখতে থাকি, জানতে থাকি। কিন্তু হয় না। কিছুই হয় না। সংবাদ লিখি। সংবাদ কাটি। কবিতা লিখি, ছোট পত্রিকা করি। কী করবো জানি না? আমার কোনো মজবুত ক্যারিয়ার নেই। রুটি-রুজির সংস্থান নেই। সংবাদ ছেড়ে দিই, আবার সংবাদপত্রে কাজ করি। সব এলোমেলো।
মূলত বুঝতে পারি, আমি বই ভালোবাসি। বই পড়তে, সংগ্রহ করতে। একসময় মুদ্রণ ভালোবাসি। ছাপাখানায় শ্রমিক হয়ে যাই। ছাপাই ভরসাগুলো পড়তে থাকি। বইকে আবিষ্কার করতে থাকি। বই বানানো যায় কীভাবে, তা খুঁজে বের করতে থাকি। ততদিনে গদ্য শিখতে থাকি। বোধের উৎসার থেকে ব্যতিক্রম কিছু বের করতে চাই, হয় না।
এই যে হয়না, হয়নি। এই না-এর মধ্যে আমি দিব্যি থেকে যাই। থাকতে হয়। লিখতে হয়। কেন লিখি? জানি না। এখনও এর কোনো সঠিক উত্তর পাইনি। তবে যন্ত্রণাকে দীর্ঘায়িত করতে করতে অপূর্ব কোনো যন্ত্রণাকে পেয়ে যাই। হেরে যাই। ব্যর্থ হই। কখনোই জিততে চাইনি। তাই হয়তো লিখে যাই।
সবচেয়ে বড় কথা সম্পর্ক চাই। কথার সাথে, শব্দের সাথে, বর্ণের সাথে, মানুষের সাথে, প্রকৃতির সাথে সম্পর্ক চর্চা করে যেতে চাই। এই চর্চার মাঝে নিজেকে একা পেতে চাই। নিঃশব্দ থাকতে চাই। একা থেকে একা হতে চাই। বোধের মধ্যে নৈঃশব্দ্যের তরঙ্গ চাই। স্বপ্ন চাই, যাত্রা চাই, মেনে নিতে চাই, মনের পঙ্কিলতায় ভেসে যেতে চাই। তাই হয়তো লিখে যাই।
একটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত হিম চাই। ছেলেবেলাকে রোদে নাচাতে চাই। যৌবনকে জলে জলে ঢেউ বানাতে চাই। ও হাওয়া, ও জল, ও নৈঃশব্দ্যে তোমাকে চাই। তুমিহীন এক বিকেল কিংবা রাত হারাতে চাই। তাই লিখে যেতে চাই।
বহুদূর পর্যন্ত লিখতে চাই। পড়তে চাই। বই চাই। অনন্য বই, চেতনার বই, মগজের বই। তাই লিখি। নতুন লিখি, পুরাতন লিখি। ছোট লিখি, বড় লিখি। তোমাকে লিখি, আমাকে লিখি। ভালবাসা লিখি। আনন্দ-বেদনা লিখি। কথা লিখি। গান লিখি। লিখতেই চাই।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক, খড়িমাটি
0 মন্তব্যসমূহ