কী লিখি কেন লিখি
কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য
কী লিখি কেন লিখি
কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য
প্রগাঢ় নীল কর্কশ আকাশ--শূন্যতায় পাক খেতে খেতে এক চিলপুরুষ সাঁতার কাটছে--নীল আকাশে র প্রেক্ষিতে ওর পুরুষ ডানায় ঝলসে যাচ্ছে সূর্য কিরণ--ভাবছি--এই দৃশ্য টাকে যদি আমি নির্মাণ করতে চাই--কিভাবে করব?একটু পরেই তো প্রকৃতির ইরেজার এই দৃশ্য পটকে মুছে দিয়ে আবার নতুন কোনও দৃশ্যে র বিনির্মাণ করবে--প্রকৃতির এই নির্মাণ/বিনির্মাণে র খেলা কে ধরে রাখতে গেলে শব্দ,রং তুলি,সুরের সাহায্য আমাদের নিতে হয়--আর এভাবেই সৃষ্টি--এভাবে ই শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কখনও নতুন শব্দ তৈরি করে লেখার শুরুয়াত---
সবাই কবি নয়--কেউ কেউ কবি--হয়তো সবাই ঠিক মতন শব্দের পিঠে শব্দ সাজিয়ে নির্মাণের কাজ টি ঠিক মতন করতে পারেন না--কিন্তু সৃজনশীল মন সবার মধ্যেই রয়েছে--নইলে একটি কবিতা পড়ে মানুষ বাহবা দেয় কেন? কেন একটি লেখা পড়ে ,নাটক দেখে মানুষ আবেগ তাড়িত হয়?আসলে কবি মন,সাহিত্যের মন কম বেশি সকলের মধ্যেই আছে--যেমন ধরা যাক--একজন মৃৎশিল্পী যখন দুগ্গা পিতিমা গড়েন তখন সেই নির্মাণ দেখে আমরা মুগ্ধ হ ই--আমাদের ভেতরে ভক্তি ভাব জেগে উঠে--আমরা আবেগ তাড়িত হই--আমরা সেই শিল্পিত মাটির প্রতিমাকে মা বলে পুজো করি।আমরা সবাই মৃৎশিল্পী নই--কিন্তু আমাদের ভেতরের ভাবটি কে একজন মৃৎশিল্পী জাগিয়ে তোলেন-- এই ভেতরে র ভাব,ভালবাসা, রিরংসা,লোভ,কামনা, বাসনা--বলা যায় নবরস একজন লেখক তাঁর লেখার মাধ্যমে জনমানসে ফুটিয়ে তোলেন---একজন লেখক শব্দের সাহায্যে মানুষের মনের সমস্ত অনুভূতি কে ব্যক্ত করেন--হয়তো এই নিজস্ব অনুভূতি প্রবাহ কে অন্য সবার সঙ্গে শেয়ার করে নেবার জন্য ই একজন লেখক লেখার প্রেরণা পান--এটা অবশ্যই একেবারে লেখা র
আদি পর্ব--সূতিকাগার ও বলা যায়--
এবার আমি কেন লিখি??সত্যিই তো আমি নিজে এ নিয়ে খুব একটা ভাবিনি--আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় আমি যখন নবম শ্রেণীতে পড়ি---বরাক উপত্যকা র শিলচর শহরের --শ্রী জ্যোতির্ময় সেনের --"পঙ্খীরাজ"পত্রিকা য়--।এটা র ও একটা গল্প আছে--আমি যে গদ্য লিখি(তখন কবিতা লিখতাম না-গল্প,প্রবন্ধ)--সেটা মোটামুটি পাড়ার সবাই জানতেন।একবার বাবার এক ছাত্রের প্রায় না লেখা খাতা কয়েক দিন বাড়িতে পড়ে থাকতে দেখে আমি আমার লেখার নমুনা জাহির করে খাতাটি প্রায় ভরিয়ে ফেলেছিলাম--তারপরের গল্প অন্যদের জন্য হাস্যরসের অবতারণা করলেও একটি ক্লাস ফাইভের মেয়ের জন্য বেশ যাকে বলে--হৃদয় বিদারক!!তা সেরকম একটি ঘটনা র থেকেই পাড়ার দীপিকা দিদি তাঁর সম্পাদক মামার কাছে আমার নাম সুপারিশ করেন এবং--ফলে আমরা লেখা ছাপা হয়--অবশ্য তার আগে সম্পাদক মামার কাছে আমার লেখা জোখার নমুনা দেখাতে হয়--এবং উনিই প্রথম আমাকে লেখা সম্পর্কে একটি দারুণ উপদেশ দিয়েছিলেন--বলেছিলেন--"যে অভিজ্ঞতা, স্থান তোমার নিজস্ব চেতনা য়,চোখে দেখোনি বা অনুভব করো নি--সেটা নিয়ে কখনো লিখবে না--ধার করা অনুভূতি নিয়ে লেখা হয় না--"
অসাধারণ!!আমি আজও সেই কথা গুলো মনের গভীরে রেখে দিয়েছি।
একটি কালখন্ডে দাঁড়িয়ে আছি--মানবিক, বিচার, সত্য মিথ্যা র ফারাক এর বোধ বুদ্ধি নিয়ে--ঘটমান সমস্ত চিত্র শুধু চিত্র কল্প নয় বাস্তব বোধগম্যতার উপর প্রতিনিয়ত আঘাত/প্রতি ঘাত/ হেনে চলেছে--এই সব অভিঘাত --দেশ,কাল,সমাজ,বিশ্বজনীন মহাজাগতিক সমস্যা ঘটনা পরম্পরা মনে র ভেতর এক টানাপোড়েন--এক বিশাল মন্থনের জন্ম দিচ্ছে--আমি পৃথিবীর ঘটনা প্রবাহের সাথে জড়িয়ে আছি--দুঃখ পাচ্ছি ,ব্যাথা পাচ্ছি--অথচ আমি নিরাময় করতে পারছি না--এর ফলে এক অসহায়, নিরুপয়তা এবং এক ক্রোধ আমাকে ঘিরে ফেলে--আর তখনই আমি লিখি--লেখা র মাধ্যমে আমার মোক্ষোণ বা ক্যাথারসিস হয়---এই মোক্ষোণ আমাকে মানসিক ভাবে,মানবিক ভাবে সুস্থ রাখে-- আমাকে একবার দিল্লির একটি ইংরেজি ম্যাগাজিন (নামটা ঠিক মনে করতে পারছি না--Eye-view বা eye witness এরকম কিছু হবে)--থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিল--"why do you write?
আমি বলেছিলাম--I write, because I have no other choice!
Because,I have to keep my conscience
And spirit
And My self
Alive!
Because I have no other
Alternative!
শেষে আরও একটু যোগ করছি
আমি লিখি আনন্দ রূপ অমৃত কে উপলব্ধি করার জন্য
আনন্দ যতদিন আমার লেখা র সঙ্গে জড়িয়ে থাকবে
ততদিন আমি লিখব---
মারী,অতিমারী, বিশ্বজোড়া ট্রানজিট ক্যাম্প রিফ্যুজী ক্যাম্প ডিটেনশনন সেন্টার--সীমান্ত যুদ্ধ, সাম্রাজ্য বাদ যতদিন থাকবে--লেখা ও থাকবে--আর এভাবেই সমস্ত দিনের জঞ্জাল সরিয়ে অন্ধকার আকাশে র দিকে তাকিয়ে বসে থাকবো--শান্ত একটি চাঁদ লিখব বলে---
----কৃষ্ণা মিশ্র ভট্টাচার্য
1 মন্তব্যসমূহ
Khub sundar likhechis.
উত্তরমুছুন