কথাসাহিত্যিক শ্যামল ভট্টাচার্য
মুখোমুখি
কবি ও প্রাবন্ধিক সঞ্জীব দে
কথাসাহিত্যিক শ্যামল ভট্টাচার্য
মুখোমুখি
কবি ও প্রাবন্ধিক সঞ্জীব দে
শ্যামল ভট্টাচার্য -- জন্ম ১৯৬৪ সাল ৮ই জুলাই, আগরতলা। শ্যামল দা মানেই এক বৈচিত্র্যময় জীবনের নাম। তাঁর মাতৃভাষা বাংলা হলেও ইংরেজি, হিন্দি, পাঞ্জাবী, ডোগরি এবং রাজস্থানি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেছেন। একদা এয়ারফোর্সে চাকুরি ছেড়ে যোগ দেন ইকফাই ইউনিভার্সিটিতে এরপর সেখানেও নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি , তা ছেড়ে যোগ দেন সকালবেলা পত্রিকার সহ সম্পাদক হিসাবে। সেখানেও তিনি বেশিদিন ছিলেন না। এখন তিনি একজন মুক্ত সাংবাদিক, লেখক ও অনুবাদক। আজ আমরা শুনবো একাধারে কবি, গল্পকার, ওপন্যাসিক, অনুবাদক, সাংবাদিক ও সম্পাদক শ্যামল ভট্টাচার্যকে।
------_----------------------------------------------------------
সঞ্জীবঃ- দাদা কবে আসা সাহিত্য জগতে?
শ্যমলঃ- অষ্টম – নবম শ্রেনীতে পড়ার সময় থেকেই, পল্টুদা- রমাপ্রসাদ দত্ত, আর নেতাজি সুভাষ বিদ্যানিকেতনের বাংলার মাস্টারমশাই মৃন্ময় দত্তের উৎসাহেই আমার পড়ার বইয়ের বাইরে বিশাল পাঠের জগতে প্রবেশ। নেতাজি স্কুলের গ্রন্থাগার ছাড়াও নেতাজি চৌমুহনীর গান্ধী শিশু গ্রন্থাগারের সব শিশুপাঠ্য বই আমি পড়ে ফেলেছিলাম মাধ্যমিকের আগেই। প্রথম লেখা ছাপা হয়েছে – একটি ছড়া; সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার ও নলিনী দাশ সম্পাদিত ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় ১৯৭৮ সালে। প্রথম ছোটোগল্প ‘সোনার ধ্বস’ ত্রিপুরার একটি রাজ্যভিত্তিক আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পেয়েছিল। গল্পটি গণসংবাদ পত্রিকার রবিবারের পাতায় প্রকাশিত।
সঞ্জীবঃ-- আপনার প্রথম বই কোনটি কত সালে প্রকাশ?
শ্যামলঃ-- প্রথম বই একটি ছোটোগল্প সংকলন – চিলতে দাগ, ১৯৮৩ সালে।
আমার প্রথম প্রকাশিত ছড়া - অথ শিক্ষানবিশ ইতিকথা
অংকটা বিচ্ছিরি, দুনিয়ার কত কী,/ বিয়োগ পূরণ ভাগ বাকি আছে কিছু কী!/ ঐকিক সুদকষা মাথামুণ্ডু কত যে,/ সারাদিন মাথা কূটে বুঝি না তো কিছু যে!/ দাদার অংকগুলি দেখি ভারী সোজা/ থিটা বিটা পাই ফাই, কতকিছু ভারী মজা/ স্যারের হাতে সেগুলি যেন খাজা গজা,/ লুফে লুফে ধরে আর করে দেন সোজা!/ গামা সিগমা আর আলফা না ডেলটা/ হুইসল দেয় যেন কলনের মেলটা/ নাম্বারের বেলা কেন হয়ে যায় উল্টা,/ দাদার গোল্লা আর আমার ফেলটা! মোদ্দা কথা কি জানো ভাই অংকম, স্যারের হাতেই তুমি উপযুক্তম,/তিনি তো বোঝান মোদের জলবৎ বকলম,/ তারপর কী ফ্যাসাদ সবটাই বকলম। / পণ্ডিত বুঝিয়ে দেন সমাস ও সন্ধি,/ আরে বাবা ব্যাকরণ সূত্রেতে বন্দী,/ বিজ্ঞতায় মাথা নাড়ি, বুঝে গেছি সবটা/ কোনখানে গোল নেই, লট, লোট, লং-টা,/ পণ্ডিত শুধালেন, বল তো রে মানকে, ‘ব্রূহি’ বলতে কী বুঝিস, বুঝিয়ে দে সবকে,/ কোথা হতে কী যে হল, জিভ গেল শুকিয়ে,/ বিদ্যেটা জট খায় তাল গোল পাকিয়ে। / হিস্ট্রিতে ভারী মজা, পাতা ভরা কিচ্ছে,/ দহরম, মহরম কত বিতিকিচ্ছে,/ এ যদি রাজা হয়, ওর গা জ্বলবে,/ তাই নিয়ে মারামারি কাটাকাটি চলবে।/ হিস্ট্রি স্যার শুধালেন, পাগলাটে লোক তো!/ হুমায়ুন বাদশার বাপ কেডা বলতো?/ কেন স্যার, শের শাহ, বলি বুক চিতিয়ে,/ শুনে স্যার ফিট হল,দাঁত মুখ খিঁচিয়ে।
সঞ্জীবঃ- কবিতার বাঁক নির্ধারিত হয় সময়ে সময়ে বাঁক নেওয়ার যে বিবর্তন আসলে কার, কবিতার, কবির না উভয়ের? আপনার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাই।
শ্যামলঃ-- কবি যদি তাঁর কবিতায় সময়কে ধারণ করেন তাহলে সময়ের প্রয়োজনেই কবিতার ভাষা- শৈলী- রূপকল্প – প্রতীকের ব্যবহার – ছন্দ – সব বদলাতে থাকে। এটাই সৃষ্টিশীলতা, সেজন্যে বিবর্তনও অবশ্যম্ভাবী।
৪)সঞ্জীবঃ--সাহিত্য বিকাশে অন্তর্জাল একটা ভূমিকা তৈরি করে চলছে! কী মনে করেন?
শ্যামলঃ-- অবশ্যই। তবে অধিকাংশই অসম্পাদিত সাহিত্য। এতে বেনোজলও প্রচুর। এখানে যাঁরা ভালো সম্পাদকদের ছাকনি হিসেবে বসাতে পারছেন, তাঁরা ভালো কাজ করছেন, লেখক ও পাঠক উভয়েই উপকৃত হচ্ছেন।
সঞ্জীবঃ--ই-বুক বর্তমান প্রজন্মকে কি হাতে নিয়ে বই পড়া ও বই কেনার ক্ষেত্রে কি কোন প্রভাব তৈরি করছে? কী মনে করছেন?
শ্যামলঃ--- করছে। তবে এর সীমাবদ্ধতা আছে। এ যেন অনেকটা ভার্চুয়াল প্রেমের মতন ব্যাপার। অনুভব করা যায়, ছোঁয়া যায় না।
সঞ্জীবঃ---আধুনিক কবিতা সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি জানতে চাই। অনঙ্গমোহিনীর সময়ে উনিই ত্রিপুরার প্রথম আধুনিক কবি, আবার বর্তমানে যারা লিখছেন তাঁরাও আধুনিক! আসলে আধুনিক শব্দটা এই ক্ষেত্রে ব্যবহারের প্রায়োগিক মহত্মটা যদি একটু পরিস্কার করেন -
শ্যামলঃ----এই প্রশ্নের জবাবে একটি বড়ো বই লিখে ফেলা যায়। এ নিয়ে জীবনানন্দ খুব সুন্দর লিখে গেছেন, ‘সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি!’ যিনি প্রকৃত কবি, তাঁকে একটি সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে আধুনিক হতেই হবে। অনঙ্গমোহিনী তাঁর সময়ে হয়েছেন, আজকের কবিরা আজকের সময়ে আধুনিক।
সঞ্জীবঃ---সাহিত্যে রাজনীতির প্রবেশ --ব্যাপারটাকে কিভাবে দেখছেন আপনি?
শ্যামলঃ-- শিশু –কিশোর সাহিত্য আর কিছু রোমান্টিক লেখা ছাড়া সাহিত্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতি থাকবেই। লেখক যেহেতু একজন সমাজসচেতন মানুষ, তাঁকে সমাজের বিবেকের কাজ করতে হয়। সেজন্যে তাঁকে অনেক সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয়, দুর্নীতির সমালোচনা করতে হয়, ফলে অন্যায়কারী ও দুর্নীতিবাজ ছাড়াও তাঁদের সমর্থনে চলা অনেক ক্ষমতাবান মানুষের, এমনকি সরকার, প্রশাসন ও সুবিধাভোগী লেখকগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হতে হয়; প্রাণসংশয়ও হয়। আমাদের ছোট্ট ত্রিপুরাতেও এরকম উদাহরণ আছে। তবুও চিরকাল লেখকরা মানুষের বিবেকের কাজ করে যান বলেই তাঁরা শ্রদ্ধেয়।
৮)সঞ্জীবঃ--আধুনিক কবিতার জটিলতা নিয়ে অনেক পাঠক আজকাল প্রশ্ন তুলছেন! কবিতা নাকি বোধের বাইরে চলে যাচ্ছে, --- কী বলবেন?
শ্যামলঃ-- সময় যত জটিল হবে, কবিতাও হবে। পাঠক যদি মাধ্যমিকের অংক করে জটিল ইঞ্জিনীয়ারিং তত্ত্ব বুঝতে চান তাহলে কেমন করে হবে? পাঠককেও সমানভাবে নিজেদের শিক্ষিত করতে হবে। কবিতা একটি শিল্প, তাঁর ব্যাকরণ আছে, ছন্দ ও রূপকল্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আছে, অনেক দর্শন ও প্রতিদর্শনের পাঠ নিয়ে তবেই একজন আধুনিক কবি এই সময়ের কবিতা লেখেন। তবে আমি অনেক জটিল কবিকে পরের দিকে সরল ভাষায় সহজবোধ্য পরিবেশন করতে দেখেছি। সেটা হয়তো তাঁর নিজের দক্ষতার চূড়ান্ত পর্যায়।
সঞ্জীবঃ----আবহমান বাংলা সাহিত্যের মতো ত্রিপুরার সাহিত্যেও সময়ের সাথে সাথে কবিতার বিষয় পরিবর্তিত হয়েছে, তার বাক পরিবর্তিত হয়েছে -- সেই সূত্র ধরে বাংলা কবিতায় ত্রিপুরা কোন পথে বা তার বর্তমান অবস্থান যদি একটু বলেন।
শ্যামলঃ--- দেখুন আমি কবি নই। কবিতার পাঠকমাত্র। পাঠক হিসেবে আমি সব সময়েই দেখেছি, ত্রিপুরায় বসে যারা বাংলা কবিতা লিখছেন, তাঁদের অনেকের লেখায় অভিনব স্বকীয়তা থাকলেও সমসাময়িক বৃহত্তর বাংলা কবিতার বিভিন্ন লক্ষণ তাঁদের অধিকাংশের কবিতায় অনেক পরে ধরা পড়েছে। অবশ্য তাতে বিশেষ কিছু আসে যায় না। কবিতা হলেই হলো। আবার হাতেগোণা কয়েকজন ব্যতিক্রম অবশ্যই রয়েছেন। নাম করেই বলতে পারি, ৬০ এর দশকে শঙ্খপল্লব আদিত্য, পীযূষ রাউত, প্রদীপ চৌধুরী, মিহির দেব, মানিক ধর, প্রদীপবিকাশ রায়, মানস দেববর্মণ, কল্যানব্রত চক্রবর্তী ও স্বপন সেনগুপ্ত ছাড়া আর সবাই পিছিয়ে ছিলেন। ৭০ দশকের গোড়ায় খগেশ দেববর্মণ, সাধন সাহা, অজিত ভৌমিক, সুশীল দে, নকুল রায় -রা, আর পরের দিকে দিব্যেন্দু নাগ, সেলিম মুস্তাফা, সন্তোষ রায়, রাতুল দেববর্মণ, হিমাদ্রি দেব, সমরজিত সিংহ, দিলীপ দাস, অজিতা চৌধুরী, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী আর রামেশ্বর ভট্টাচার্য, ৮০-র দশকে দীপংকর সাহা, নন্দকুমার দেববর্মা, কল্লোল দত্ত, সঞ্জিত বণিক, শুভেশ চৌধুরী, নকুল দাশ, মিলনকান্তি দত্ত, মাধব বণিক, জাফর সাদেক,সুবিনয় দাশ, লক্ষণ বণিক, দেবাশিস তরফদার, প্রত্যুষ দেব, সমর চক্রবর্তী, বিধান রায়, বিধু দেব, বিশ্বজিৎ দেব, অরূপ দত্ত, মণিকা বড়ুয়া, হিমাদ্রি দারিং, পল্লব ভট্টাচার্য, প্রবীর চক্রবর্তী, মৃন্ময় সেন, দেবাশিস চৌধুরী, অশোকানন্দ রায়বর্ধন, রসরাজ নাথ, নিউতি দাস, পার্থপ্রতিম চক্রবর্তী, জালালউদ্দীন আহমেদ, শংখশুভ্র দেববর্মণ, সাত্ত্বিক নন্দীরা ত্রিপুরার কবিতাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছেন। ৯০ দশকে ত্রিপুরায় বাংলা কবিতায় নবীন রক্তসঞ্চার করেন প্রবুদ্ধসুন্দর কর, অশোক দেব, অলক দাশগুপ্ত, স্বাতী ইন্দু , আকবর আহমেদ , বিমল চক্রবর্তী , অপাংশু দেবনাথ , অশীন বর্মণ , সুস্মিতা চৌধুরী , নির্মল দত্ত, গোবিন্দ ধর, সত্যজিৎ দত্ত, সুনীল ভৌমিক, বিনয় সিনহা, পার্থ চক্রবর্তী , শঙ্খ সেনগুপ্ত , অনন্ত সিংহ , সুরঞ্জন কুণ্ডু চৌধুরী , সুতপা রায় , নীলিমেশ পালরা । পরিবর্তিত কবিতার ভাষা ও প্রকাশভঙ্গী , এবং উত্তর-আধুনিতার ঢেউ তাদের কবিতাকে পূর্ববর্তীদের থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। তাঁদের কবিতার ভাষায় উঠে আসা বহুস্বর ত্রিপুরায় বাংলা কবিতাচর্চাকে পুনর্নবীকৃত করে । নিবিড় পাঠে আমরা লক্ষ্য করি , এমনকি প্রবীন কবিরাও অনেকে তাদের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গী দ্বারা প্রভাবিত হন । এই সময়ে আটের দশকে লিখতে শুরু করা কৃত্তিবাস , সুবিনয় , মাধব , পল্লব , শুভেশ , মিলনকান্তি, সাত্ত্বিকরা তাঁদের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত দক্ষতায় কবিতাকে কেউ দর্শন ও গণিতের সঙ্গে মিলিয়ে , কেউবা ইতিহাসের প্রেক্ষিতে দাঁড় করিয়ে , এমনকি কেউ স্থাপত্যকলার সৌন্দর্য ও গাঁথুনিতে বুনতে চাইলেন কবিতায় । তাঁদের কবিতাপাঠে অনুভূত হয় চিত্রকল্পের বিচিত্র আভা কিম্বা সঙ্গীতের মূৰ্ছনা। নয়ের দশকের কবিরা কিন্তু এই ধ্রুপদী চর্চাকেও বুঝতে চেষ্টা করলেন তাঁদের মতন করে।
সঞ্জীবঃ-- আধুনিক কবিতার ক্ষেত্রে ছন্দ কতটা জরুরি কিংবা সদ্য লেখতে আসা তরুণ যারা শুরুতেই আধুনিক কবিতা দিয়েই শুরু করছেন --- অনেক ক্ষেত্রেই ছন্দ বিষয়ক ত্রুটি ইত্যাদি বিষয়ে কথা উঠছে -এই সম্পর্কে আপনার অভিমত জানতে চাই বিস্তারিত।
শ্যামলঃ-- ছন্দ জানতেই হবে। নিজের ভাষার পাশাপাশি সম্ভব হলে সমসাময়িক অন্যান্য অগ্রণী ভাষার সাহিত্যের ছন্দ জানতে হবে, শিখতে হবে। শিখলে তবেই ছন্দ ভেঙে নতুন ছন্দে লেখার প্রশ্ন আসছে। তা না হলে তো কবিতা কবিতাই থাকবে না, অনুগল্প কিম্বা বিবৃতি হয়ে পড়বে। এ বিষয়ে আমার অভিমত স্পষ্ট।
সঞ্জীবঃ---নবীন ও প্রবীন কবিকে আপনি কিভাবে চিহ্নিত করেন?
শ্যামলঃ-- বয়স ও অভিজ্ঞতা দিয়ে, এর বেশি কিছু নয়। একবার ১৯৯৬-৯৭ নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি চত্বরে কেউ আমাকে অন্নদাশংকর রায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। আমি তাঁকে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেলে তিনি আমাকে তা না করতে দিয়ে বুকে টেনে নিয়ে বলেন, প্রণাম করবেন প্রয়াতকে, আমরা সমসাময়িক! তারপর বলেন, সাহিত্যে নবীনরা প্রবীণদের অনুগত নয়, প্রতিস্পর্ধী হবেন। তবেই একটা ভাষার সাহিত্যে নিয়মিত নতুন রক্তসঞ্চারের সম্ভাবনা থাকবে।
সঞ্জীবঃ---আপনার ছোটবেলার বেড়ে ওঠা সম্পর্কে কিছু বলুন।
শ্যামলঃ--- সে তো অনেক কথা! এখানে প্রাসঙ্গিক, আমার ছোটবেলায় গল্প শুনিয়ে ভাত খাওয়ানোর জন্য আমার দিদিমা ও মামাদের ভূমিকা অপরিসীম। আমি সৌভাগ্যবান। তাঁদেরও উপকার হয়েছে। স্নায়ুবিজ্ঞানীরা মনে করেন, গল্প বলার মাধ্যমে আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন কোষ জেগে ওঠে। এবং অনেক ক্ষেত্রেই শ্রোতা গল্পটিকে নিজের অভিজ্ঞতা, নিজের ভাবনা দিয়ে একেবারে নিজের অংশ বানিয়ে নেয়। মানে, একেবারে মন- বাক্সের ভেতরের খোপে গল্পটি অবলীলায় ঢুকে যায়। যে শিশুর জীবনে গল্প শোনানোর কেউ নেই সে অভাগা। আমরা যখন গল্প শুনি তখন ডোপামিন, অক্সিটোসিনের মতো রাসায়নিক নির্গত হয়। ডোপামিন আমাদের কাজ করার ইচ্ছাশক্তি বাড়িয়ে তোলে। আমাদের করে আরও মনোযোগী। অন্য দিকে অক্সিটোসিনের মতো রাসায়নিক একজনকে করে তোলে আরও সংবেদনশীল। আরও সহমর্মী। অর্থাৎ গল্পটির সঙ্গে শ্রোতা খুব সহজেই একাত্ম হয়ে যায় এবং ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়ে গল্পের ঘটনাগুলোর সঙ্গে।
সঞ্জীবঃ--আপনার ভালো লাগা কিছু স্মৃতি যদি শেয়ার করেন
শ্যামলঃ--- এক# ছোটোবেলায় অরুন্ধতিনগরে মামা বাড়ির উঠোনে মেঝমামা, ছোটমামা, বাবলুমামা(মায়ের মামাতো ভাই)রা গোল্লাছুট কিম্বা দাড়িয়াবান্দা খেলতো, আমার বয়স তখন বছর তিনেক। তখন আকাশে উড়োজাহাজ দেখে চেঁচিয়ে বলেছিলাম –পেইন, পেইন! ছোটমামা আমাকে বলেছিল, পেইন মানে ব্যথা, আর এইটা এরোপ্লেন – এ ই আর ও পি এল এ এন ই – এরোপ্লেন। এভাবে শেখা এই ‘এরোপ্লেন’ আর ‘পেইন’ ই আমার শেখা আদি ইংরেজি শব্দ। পরবর্তী জীবনে বিমানবাহিনিতে ২০ বছর চাকরির প্রেক্ষিতে ওই প্রথম শেখা শব্দটির কোনও ভূমিকা আছে কিনা জানি না।
দুই # আমার দিদিমা উঠোনে তিনমুখী উনোনে মাটির বাসনে রান্না করতেন। বাড়ির গাছের শুকনো পাতা আর ডাল দিয়ে আগুন জ্বালাতেন। একদিন আমি মাংস খাওয়ার বায়না ধরলে দিদিমা বলেন, ভাই কৈতরের মাংস খাইবা? আমি হাঁটুর উপর শাড়ি উঠিয়ে বসে রান্না করতে থাকা দিদিমার ফর্সা পায়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, না, তুমার উড়াতের মাংস খামু!
তিন # মামারা আমাকে খ্যাপানোর জন্যে একবার আমার বাবাকে ‘কালা বেডা’ বলেছিল, তাই রেগে বলি, আমি মাডিৎ গইর দিমু! তারপর ভাল জামাকাপড় নিয়ে মাটিতে গড়ালে মামারা মার খাওয়ার ভয়ে আমাকে ভাল ভাল গল্প বলে শান্ত করতেন!
চার # আমার বয়স যখন বছর পাঁচেক তখন বড়োমামার বিয়ে হয়। তখন মামাবাড়িতে স্থায়ী কামলার কাজ করতেন জগাদাদু। তিনি আমাকে বলেছিলেন, গোঁফ না থাকলে বরযাত্রী যাওয়া যায় না।
পাঁচ # যতনবাড়িতে থাকাকালীন সময়ে প্রথম হেলিকপ্টার দেখা, ইন্দিরা গান্ধী তীর্থমুখেএসেছিলেন। যতনবাড়ি থেকে গোমতী পার হয়ে এসে নতুন বাজারে সার্কাস দেখা, হাতি বাঘ সিংহ বাঁদরের পাশাপাশি জোকার ও জিমন্যাস্টদের দেখে মোহিত হয়েছি। আবার জাদুকরের জাদু দেখে এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলাম যে বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় খোঁড়া ট্রেঞ্চে আমার ভাই সুভাষকে মাটিচাপা দিয়ে প্রায় মেরেই ফেলছিলাম আরকি, ভাগ্যিস আমাদের মাস্টারমশাই পুলিনবাবু দূর থেকে দেখে ফেলেছিলেন, ছুটে এসে ভাইকে বাঁচিয়েছেন। আরেকবার জাদুকরের মতন ব্লেড খেতে গিয়ে জিভ ও ঠোঁট কেটেছি।
সঞ্জীবঃ-- সমাজের কোন জিনিষটা আপনাকে ভীষণ কষ্ট দেয়?
শ্যামলঃ---অর্থনৈতিক, সামাজিক ও লিঙ্গ বৈষম্য।
সঞ্জীবঃ--আপনার লেখার শুরুর দিক ও বর্তমান এই যে সময়- লেখালেখির জগতে কি পরিবর্তন অনুভব করেন এই সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।
শ্যামলঃ----হ্যাঁ, প্রকাশ-মাধ্যমে অনেক বৈচিত্র এসেছে, সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি শ্রুতির ভূমিকা নতুন রূপে জনপ্রিয় হচ্ছে। ইন্টারনেটের দৌলতে রেফারেন্স পরিষেবা পেতে অনেক কম সময় লাগে। সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে তাড়াতাড়ি অনেক বইয়ের খবর ও পর্যালোচনা সম্পর্কে জানতে পারি।
সঞ্জীবঃ---কবি জীবনে মনে আন্দোলিত হওয়া বিশেষ কোন আনন্দমুখর স্মৃতি শুনতে চাই।
শ্যামলঃ----আমি কবি নই যে! আনন্দমুখর স্মৃতি হল স্কুলের বন্ধু অমলের সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁর দুই কৃতি দাদা কবি বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী ও শিল্পী নির্মল চক্রবর্তীর সান্নিধ্য, ‘ঝিনুক’ পত্রিকা উপহার পাওয়া, নেতাজি চৌমুহনীর শিশু গ্রন্থাগারে পল্টুদার (রমাপ্রসাদ দত্ত) সান্নিধ্য আর অনেক অনেক শিশুসাহিত্য পাঠ। কৈশোরে সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার এর সঙ্গে দেখা হওয়া - কিছু ঘনিস্ট মুহূর্ত। সদ্যযৌবনে ভীষ্মদেব ভট্টাচার্য, বিমল চৌধুরী, কালিপদ চক্রবর্তী, নকুল রায়, সন্তোষ রায়, কৃত্তিবাস চক্রবর্তী, শুভেশ চৌধুরি, মাধব বণিক, নকুল দাশ, রামেশ্বর ভট্টাচার্য, সঞ্জিত বণিক, কিশোর রঞ্জন দের সান্নিধ্য আর ঘন্টার পর ঘন্টা সাহিত্য আলোচনা। অমলের দিদির বিয়েতে পরিচয় হয় দেবব্রত দেবের সঙ্গে। তখন সবে ‘মুখ’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যা বেরিয়েছে। আমাদের পরস্পরকে এত ভাল লাগে যে আমরা সারাজীবনের সাহিত্যবন্ধনে জড়িয়ে যাই। আমার জীবনে তাঁর ভূমিকা দেবদূতের মতন। আমার বহু ভাবনাকে মূর্তরূপ দিয়েছেন দেবব্রতদা। বাবা-মা, মামারা আর হাতেগোনা কয়েকজন শিক্ষক ছাড়া আমার জীবনে যে তিনজনের ভূমিকা সবচাইতে বেশি, তাঁরা হলেন এই দেবব্রতদা, বিমলেন্দ্রদা আর আমার ছোটোভাই সুমন। এরপর তো অনেক বিশ্বখ্যাত মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, যাঁরা আমার জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছেন, এরকম অন্তত ১৬০-১৬৫ জনের ছোটো-বড়ো অনেক দীর্ঘ কবিতা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, আত্মজীবনী আমি অনুবাদ করেছি, সেজন্যে অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছি, অনেক বিদেশ যাত্রার সুযোগ পেয়েছি। এগুলিই আমার জীবনের আনন্দমুখর স্মৃতি।
সঞ্জীবঃ---সাহিত্যে নবীন প্রবীন দ্বন্দ্ব চিরকালীন!- আপনার মতামত
শ্যামলঃ--- সেই যে অন্নদাশংকর রায়ের কথা বললাম, সাহিত্যে নবীনরা প্রবীণদের অনুগত নয়, প্রতিস্পর্ধী হবেন। তবেই একটা ভাষার সাহিত্যে নিয়মিত নতুন রক্তসঞ্চারের সম্ভাবনা থাকবে। দ্বন্দ্বের গোড়ায় মূলতঃ থাকে প্রবীনের অসূয়া ও অহংকার। তাঁরা সেটা কাটিয়ে উঠতে পারলে নবীনদের কাছে শ্রদ্ধেয় হয়ে ওঠেন। ত্রিপুরায় অশীতিপর শঙ্খপল্লব আদিত্য, পীযূষ রাউত, মিহির দেব, মানস দেববর্মণ, সুবিমল রায়, কল্যানব্রত চক্রবর্তীরা এজন্যেই সকলের শ্রদ্ধেয়।
সঞ্জীবঃ---- সাহিত্য গোষ্ঠি দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে - সাহিত্যের গোষ্ঠীর ক্ষতিকারক দিক ও সমকালীন ভাবনা যদি তুলে ধরেন প্লিজ।
শ্যামলঃ--সাহিত্য একটি ব্যক্তিগত চর্চার বিষয়। গোষ্টীর প্রয়োজন পারস্পরিক ভাবনার আদানপ্রদান, পাঠের পরিধিবৃদ্ধি আর কিছু বিরলক্ষেত্রে সাহিত্য আন্দোলন গড়ে তুলে সাহিত্যের মরা নদীতে বান ডাকার আবহ গড়ে তোলা। গোষ্ঠীর ক্ষতিকারক দিক হল – রেশারেশি, ল্যাং মারামারির মতন অসাহিত্যিক প্রবণতা। অনেক গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে মিশেছি, তাঁদের আলাপ আলোচনায় ঋদ্ধ হয়েছি, তাঁদের তর্কে অংশ নিয়েছি, কিন্তু আমার জীবনে কোনও গোষ্ঠীর প্রয়োজন হয়নি।
সঞ্জীবঃ---লেখক ও পাঠকের মধ্যে দূরত্ব কমাতে না পারলে -বেশি বেশি পাঠক কি করে তৈরী হবে! -পাঠককে কাছে আনতে হলে লেখককে আরো আরো মননশীল ও মাটির কাছাকাছি আসতে হবে - কি মনে করেন?
শ্যামলঃ---- পাঠকের জন্য নয়, নিজের জন্যই লেখককে মননশীল ও মাটির কাছাকাছি থাকতে হয়। আমার মতে, লেখকরাই সবচাইতে বেশি পড়েন। অন্য পাঠকদের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর দায় লেখকের নয়। পাঠককেই শিক্ষিত হতে হবে। হ্যাঁ, প্রকাশক ও সাহিত্যপত্রিকা সম্পাদকরা নানা স্কুল কলেজ ভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে ও করাতে পারেন। ছাত্রদের, পাঠকদের বিভিন্ন স্টাডি গ্রুপে বিনামূল্যে বই সরবরাহ করে বৃহত্তর বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্য পাঠের আগ্রহ বাড়াতে পারেন। আর তারপর ক্রমে তাঁদের সাহিত্যপাঠের অনুষ্ঠানে কবি ও লেখকদের সঙ্গে স্কুল কলেজের ছাত্রদের পরিচয়ের মাধ্যমে তাঁদেরকে আরও আগ্রহী করে তুলতে পারেন।
সঞ্জীবঃ----কবিতা শ্রাব্য না পাঠ্য ---- এই সম্পর্কে কবিতার তফাত কোথায়? আপনার ভাব প্লিজ
শ্যামলঃ--- প্রাচীনকালের শ্রুতি থেকেই পাঠের উদ্ভব। এখন তো আমাদের কাছে দুটোরই গুরুত্ব আছে। তবে শ্রাব্যমাধ্যমে নাটকীয়তা যেমন কবিতাকে জনপ্রিয় করে, অতিনাটকীয়তা তেমন ক্ষতিও করে।
সঞ্জীবঃ---আধুনিক প্রজন্ম সাহিত্য বিমুখ, অদ্ভুত একটা ধারার মধ্যদিয়ে নতুন প্রজন্ম এগিয়ে চলছে। আত্মীয়তা বন্ধুত্ব সহমর্মিতা পারস্পরিক বিশ্বাস ভালোবাসা সবকিছুই কেমন নড়বড়ে। সাহিত্য পাঠ লেখালেখিও কমে আসছে --- মননশীল লেখা তেমন হয়ে উঠছে না --- কি মনে করেন?
শ্যামলঃ-- আমি তা মনে করি না। কোনও কালেই সমস্ত শিক্ষিত মানুষ সাহিত্য পাঠ করেন না। এখন তো অন্যান্য মনোরঞ্জনের মাধ্যম অনেক প্রবল হয়ে উঠেছে। তবু সমাজে মোট শিক্ষিত মানুষের মধ্যে শতকরা হিসেবে কমলেও মোট পাঠক বেড়েছে, বইয়ের চাহিদাও বেড়েছে বলেই জানি। লকডাউনে বইয়ের ব্যবসায় ভাটার টান প্রবল হলেও এখন অনেক প্রকাশক অনলাইনে অর্ডার নিয়ে বই হোম ডেলিভারি দিচ্ছেন। আমি নিজেও হোম ডেলিভারিতে বেশ কিছু বই কিনেছি। খাতায় কলমে লেখা কমলেও নানা সামাজিক মাধ্যম এবং ব্লগে লেখালেখি বাড়ছে। এগুলির মধ্যে যথেষ্ট মননশীল লেখাও থাকছে। লকডাউনে অনেক আগে বসে যাওয়া লেখকও আবার লিখছেন, বিশেষ করে মহিলা কবি ও লেখকদের মধ্যে প্রকাশের প্রবণতা বাড়ছে। এগুলি শুভলক্ষণ। আমি আশাবাদী।
সঞ্জীবঃ--- নারী আপনার জীবনে কতটা সৃষ্টির ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা যোগায়,?
শ্যামলঃ--- আমার দিদিমা ও মা আমার জীবনে অনুপ্রেরণার প্রথম দুই উৎস। কিন্তু তিনি প্রত্যেককে ব্যক্তি হিসেবে, মানুষ হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছেন। তাই এরপর থেকে যে মহীয়সীরা আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছেন, যেমন লীলা মজুমদার, আমার ছোটোমামীমা বীথি চক্রবর্তী, রাজস্থানের জয়পুরের রানী গায়ত্রী দেবী, কথাকার ইভা খাসনবীশ, তিন পাঞ্জাবী কবি ও কথাকার অমৃতা প্রীতম, অজিত কৌর, রাজিন্দর কৌর(যাকে আমার একবারও চোখে দেখার সুযোগ হয়নি, কিন্তু আমার জীবনে তাঁর প্রেরণা অপরিসীম), অস্ট্রেলিয়ার লেখিকা অ্যালেক্সিস রাইট, পাঞ্জাবের হিন্দি কবি ও ঔপন্যাসিক গীতা ডোগরা, কবি প্রমীলা আরোরা, প্রয়াত মীনাক্ষী সেন, স্বপ্না ভট্টাচার্য, অরূপা পটঙ্গিয়া কলিতা, বন্টি শেঞ্চোয়া, অঞ্জলি সেনগুপ্ত, প্রয়াত ঝঞ্ঝা ভট্টাচার্য, অরুণা মুখোপাধ্যায়, জয়া মিত্র, গৌরী বর্মন, আমার স্ত্রীর বৌদি মুক্তি চক্রবর্তী, দেবব্রতদার স্ত্রী কথাকলি বৌদি, বিমলেন্দ্রদার স্ত্রী লতিকাবৌদির মতন অগ্রজা, কবি ও কথাকার স্বপ্না দত্ত, কবি ও কথাকার তৃষ্ণা বসাক, কবি ও কথাকার শ্যামলী রক্ষিত, কবি ও স্প্যানিশ অনুবাদক জয়া চৌধুরী, কবি নবনীতা সেনগুপ্ত, ইরানী অধ্যাপক ও গবেষক মান্দানা মহম্মদী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষিকা তবসসুম খাতুন, কন্নড় কবি আরতি এইচ এন, রাজ্যশ্রী এইচ এন, কন্যাসমা অনুবাদক ও গবেষক শম্পা রায় – তাঁরা প্রত্যেকেই জীবনের পথে সহমর্মী মানুষ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রেরণা জুগিয়েছেন, যেমন প্রেরণা জুগিয়েছেন বয়সে ছোটো বড়ো অনেক পুরুষও। তাছাড়া আমার স্ত্রী তপতী, কন্যা জাগৃতি, বৌমা সুশ্বেতা, কন্যাসমা ছায়া পাল থেকে শুরু করে আমার নাতনি আইভি জিশা পর্যন্ত সবাই আমার শাসক, প্রেরণাও বটে।
সঞ্জীবঃ---আমরা জানি আপনার জীবনে নানা ঘাত প্রতিঘাত সামলে সাহিত্যে আপনার অবস্থান দৃঢ়-কি গল্প কি উপন্যাস কি শিশুসাহিত্য কি প্রবন্ধ কি অনুবাদ কিম্বা সাংবাদিকতা সব ধারায় আপনার সমান বিচরণ - কিভাবে সম্ভব?
শ্যামলঃ--- আসলে গল্প-উপন্যাস-শিশুসাহিত্য ইত্যাদিই আমাকে নানা ঘাত প্রতিঘাত থেকে উত্তরণে সাহায্য করেছে। যে কোনও নেতির বিরুদ্ধে নিজেকে ইতিবাচক করে তুলতে বইপড়া(সম্প্রতি সামান্য অনলাইন সাহিত্যপাঠ) আর নিজের মতন করে প্রবন্ধ- উত্তর সম্পাদকীয়, পাঠপ্রতিক্রিয়া ও অনুবাদ ইত্যাদি আমার চারপাশে নিজস্ব একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে। গত দশ-বারো বছর ধরে এগুলিকেই আমি পেশা হিসেবে নিতে পেরেছি। এখন পেনশন থেকে যত টাকা পাই এর থেকে ঢের বেশি টাকা এগুলির মাধ্যমে রোজগার করি।
সঞ্জীবঃ---- আপনার জনপ্রিয় উপন্যাস ‘বুখারী’ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত, এরপর লোদ্রভার কাছাকাছি সাড়াজাগানো উপন্যাস -এগুলো ছাড়া অন্যান্য গ্রন্থ তো আছেই --- এখন ধারাবাহিক প্রকাশ হচ্ছে দারুণ একটি উপন্যাস --মহা সত্যের বিপরীতে --- আমি জানার ইচ্ছা এই উপন্যাসের ভাবনা কি করে এলো -- তার প্রেক্ষাপট যদি একটু বলেন।
শ্যামলঃ--- আসলে সবার আগে ‘মহাসত্যের বিপরীতে’ লেখার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি সেই ১৯৯২ সাল থেকে। এই উপন্যাসের কিছু চরিত্র যেমন অলোক, ছিলিং পাঞ্চুক জানবাক, ডাম্মা ডুলকু, স্তুকা রাজকুমারী, তাঁর স্বামী থুপস্থান ছেবাং-রা ‘বুখারী’ উপন্যাসেও ছিল। শুধু বিষয়ের পার্থক্য। ‘মহাসত্যের বিপরীতে’-র বিষয় ভারতে তিব্বতি শরণার্থী ও তাঁদের ডায়াস্পোরা, কাজেই আমার চোখে চীন-তিব্বত-ভারত সম্পর্ক ঘিরে বিশ্ব রাজনীতি এর প্রেক্ষাপট রচনা করে চলেছে গত ২৮ বছর ধরে, এখনও লিখে চলেছি।
সঞ্জীবঃ----সারা পৃথিবী যখন করোনার আবহে এক দুর্বিষহ সময় অতিক্রম করছেন - এই সময়টা কি করে কাটছে আপনার?
শ্যামলঃ-- যে কোনও দুর্বিষহ পরিস্থিতিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে কাজ করে যাওয়ার নামকেই আমি জীবন বলে মনে করি। প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে কাটছে! প্রতিদিন প্রায় ১৪-১৬ ঘন্টা শুধু ডেস্কটপ ল্যাপটপ ও মোবাইলে কাজ করতে হচ্ছে। সেজন্য আমার ওজন বেড়ে যাচ্ছিল, আর গিন্নির ক্রমহ্রাসমান। সম্প্রতি ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মিত সকালে কাছাকাছি একটি মাঠে দৌড়ে এক কেজি ওজন কমিয়েছি, আর চিকিৎসায় গিন্নির দু’কেজি পুনরুদ্ধার করা গেছে।
সঞ্জীবঃ---বর্তমান কঠোর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে তরুণদের উদ্দেশ্যে আপনার বার্তা কি হবে
শ্যামলঃ---সচিনের কোচ যেমন তাঁকে কঠিন সময়ে বলতেন, ‘পরিশ্রম করতে থাকো, আর ব্যাট নিয়ে যখন ক্রিজে দাঁড়াবে –প্লে উইথ ইউর বেসিক স্কিল!’ সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও একথা সত্য। নিবিড় পাঠের কোনও বিকল্প নেই, বাছাবাছিরও প্রয়োজন নেই। পর্নোগ্রাফি থেকে শুরু করে রান্নার বই – সবই কাজে লাগবে।
2 মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ সঞ্জীব। নিয়তিদির নামটা নিউতি টাইপ হয়েছে। এটা পালটে দেওয়া গেলে ঠিক করে দিও। ধন্যবাদ 'স্রোত'। আমাকে তাহলে আর 'কেন লিখি, কী লিখি' লিখতে হচ্ছে না!
উত্তরমুছুনখুব ভাল লাগল। সাক্ষাৎকার টি পুঙ্খানুপু্খভাবে লেখা হয়েছে। ❤️
উত্তরমুছুন