কী লিখি কেন লিখি
বাসুদেব দাস
কী লিখি কেন লিখি
বাসুদেব দাস
আমি মূলত অনুবাদক।তাই আমার লেখালিখি মূলত অনুবাদকে কেন্দ্র করে। তবে এক সময় বাংলা সাহিত্যকে কেন্দ্র করে প্রচুর প্রবন্ধ লিখেছি। গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত ‘সময় প্রবাহ’পত্রিকায় সেগুলি মোটামুটি নিয়মিত বেরিয়েছে। শৈশবে কখনও খেলাধুলো প্রায় করিনি বললেই চলে। আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র তখন আমাদের বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের ৬০০ বই পড়ে ফেলেছিলাম।আমি এর মধ্যে কোনো বাহাদুরি আছে বলে মনে করি না।আমি জানতাম আমাকে দিয়ে আর কোনো কাজ হবে না,তাই সবচেয়ে সহজ কাজ পড়াশোনাকেই বেছে নিয়েছিলাম।পড়াশোনার মধ্যে আমি নিজেকে খুঁজে পাই,ভীষণ আনন্দ পাই। অন্য কোনো কাজে আমাকে কেমন যেন বেমানান মনে হয়।
শৈশবে ‘দেব সাহিত্য কুটির’ এর হাত ধরে বিশ্বসাহিত্যের জগতে ঢুকে পড়েছিলাম।একে একে টলস্টয়,চেকভ,তুর্গেনিভ,ডিকেন্স,মোঁপাসা,বালজাঁক,ভিক্টর হুগো,গোর্কির বর্ণময় জগতটা চোখের সামনে খুলে যাচ্ছিল। তখন বুঝতে পারিনি আমার মন বিশ্ব বীণার তারে বাঁধা পড়ে যাচ্ছিল। তার সঙ্গেই চলছিল বাংলা সাহিত্যের ব্যাপক অনুশীলন। স্বপন কুমার আর প্রভাবতী দিয়ে শুরু করে খুব সহজেই তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জগতে পৌছে গিয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ ছিল প্রতি মুহূর্তের সঙ্গী। রবীন্দ্র সাহিত্যের সঙ্গে রবীন্দ্র সঙ্গীত হয়ে উঠেছিল আমার প্রাণের আরাম। দৈনন্দিন জীবনের রক্তাক্ত অধ্যায়কে,প্রতিদিনের জীবন ধারণের গ্লানিকে ভুলে থাকার জন্য সাহিত্য হয়ে উঠেছিল আমার একমাত্র অবলম্বন। এবার কী লিখি এবং কেন লিখি এই প্রশ্নের উত্তর দেবার চেষ্টা করব।
প্রথমেই বলে নিয়েছি আমার এখনকার লেখালিখি মূলত অসমিয়া সাহিত্যের অনুবাদকে কেন্দ্র করে। অথচ আমি যখন কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন অসমিয়া সাহিত্যের সঙ্গে আমার কোনো যোগাযোগই ছিল না। আজ ভাবতে অবাক লাগে অসমের জল হাওয়ায় জন্ম এবং লালিত পালিত হয়েও আমার অধ্যয়নের বিষয় ছিল বাংলার সঙ্গে সঙ্গে অনুবাদের মাধ্যমে বিদেশি সাহিত্যের পাঠ,অসমিয়া সাহিত্য আমার কাছে এই সেদিনও ছিল দিল্লি দূর অস্ত। তারপর একদিন হোমেন বরগোহাঞির সাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় হল।আমি মন্ত্রমুগ্ধ হলাম। সামগ্রিক ভাবে অসমিয়া সাহিত্য চর্চা আমার ধ্যান জ্ঞান হয়ে উঠল। মানুষ যা ভালোবাসে তা অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চায়।আমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হল না। অসমিয়া সাহিত্যের পাঠ আমার মনের যে ব্যাপ্তি ঘটাল,আমি যে বিপুল আনন্দের সম্মুখীন হলাম তার কিছুটা অংশ আমি বাংলার পাঠক পাঠিকার সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইলাম। অনুবাদের প্রতি ভালোবাসা শৈশব থেকেই ছিল।আমি এটাও জানতাম যে আমার মৌলিক সৃষ্টির ক্ষমতা নেই। গল্প ,উপন্যাস বা কবিতা আমার থেকে সহস্র মাইল দূরে বাস করে। কাজেই গল্পকার বা কবি হওয়ার বৃথা পণ্ডশ্রম না করাই ভালো। বরং আমার সীমিত ক্ষমতা দিয়ে আমি যদি একটি ভাষাকে অনুবাদের মাধ্যমে অন্য একটি ভাষার মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারি ,দুটি বিবদমান জাতির মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি তাহলে হয়তো আমি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকতে পারব। লেখালিখিই বলুন বা অনুবাদই বলুন আমার মনে হয় এর একটি উদ্দেশ্য নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকা।
রবীন্দ্রনাথ তার বহু পঠিত ‘পুরস্কার’ কবিতায় এই প্রসঙ্গের অবতারণা করেছিলেন। কবির মনেও হয়তো কোনো এক দুর্বল মুহূর্তে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল এই যে বিপুল হারে গল্প,কবিতা,উপন্যাস ,নাটক রচনা করছি এর কি সত্যিই কোনো প্রয়োজন আছে?মানব সমাজের কী লাভ হবে এতে? কবি নিজেই এই প্রশ্নের একটি সুন্দর জবাব দিয়েছেন।–
সংসার মাঝে দুয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর,
দুয়েকটি কাঁটা করি দিব দূর
তারপরে ছুটি নিব।
আমরা ফরাসি সাহিত্যের জা জেঁনের কথা পড়েছি। নানা ধরনের অপরাধের জন্য তিনি কারাগারে আজীবন বন্দি ছিলেন। সেই মানুষটা একদিন লেখালিখি শুরু করলেন।আমার প্রশ্ন জা জেঁনে কীসের জন্য লিখতে শুরু করেন? অর্থ,সম্মান,খ্যাতি না কি অমরত্বের লোভ ? যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত এই কুখ্যাত আসামীর পক্ষে এর কোনোটাই তো লাভ করা সম্ভব ছিল না। তবু জেলের মধ্যে জা জেঁনে নিরলস চেষ্টায় লিখে গেছেন। তার লেখাগুলি যে কোনোদিন ছাপার মুখ দেখবে সে আশাও হয়তো তিনি করেন নি। অমরত্বের প্রত্যাশা তো দূরের কথা। আসলে আমার মনে হয় জা জেঁনে না লিখে পারেন নি। তার ভেতরে যে প্রকাশের ব্যাকুলতা ছিল তাই তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। জা জেঁনের জীবন যাপনের মধ্যেই আমরা কী লিখি কেন লিখি এই প্রশ্নের জবাব পেয়ে যেতে পারি।
ব্যাপারটাকে আমরা একটু অন্যভাবে দেখতে পারি। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিবেকানন্দকে ঈশ্বর দর্শন সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছিলেন ঈশ্বরকে দেখতে হলে মনের মধ্যে প্রচণ্ড ব্যাকুলতা থাকতে হবে। যখন মনে হবে ঈশ্বরকে ছাড়া আমার জীবন বৃথা তখনই ঈশ্বর লাভ সম্ভব হবে। লেখালিখিও অনেকটা তাই, নয় কি?আমি এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানি না। না জানলেও আমার বিন্দুমাত্র দুঃখ বা আফশোষ নেই।আমি শুধু জানি না লিখে আমার নিস্তার নেই।
----------
0 মন্তব্যসমূহ