চলুন, সুস্থ্ সমাজ গড়ি
সুমিতা দেব
অনেকদিন পর আজ ইচ্ছে হল ছোট বন্ধুদের সাথে গল্প কবিতা খেলা এসব নিয়ে আড্ডা হবে। রোববার হওয়ায় এই বাড়তি পাওনা। কাজের চাপে ওদের সাথে আমার গল্প করা হয়ে উঠে না। আমাকে পেয়ে ওরা যত না খুশি দ্বিগুণ খুশি আমি হই। হঠাৎ ওম বলে উঠল পি আজ কি করব আমরা? বললাম আজ গল্প শুনব সবাই সবার। তার আগে সামনে পূজার ছুটি তাই সবকিছু নিয়ে পরিকল্পনা আছে। প্রতি বছর পূজায় একদিন আমরা সবাই মিলে বৃদ্ধাশ্রমে যাই এবং তাদের সাথে পূজা পরিক্রমা করে দুপুরে একসাথে সবাই খাওয়া দাওয়া করে ফিরে আসি। এবার আমাদের এই পরিক্রমায় ছোট বন্ধুরাও সামিল হবে ওরা বলল।
হঠাৎ এক কোণে আদি-র দিকে চোখ পড়ল। এমনিতে খুব দুষ্টু কিন্তু পড়াশোনা ও আঁকাতে সে ভালো । জিজ্ঞেস করলাম তুই কেন চুপচাপ আজ? বলল, পি মনটা ভালো নেই। কারণ জিজ্ঞেস করায় বলল ওর বাবা আজ ওর দাদাকে রিহেব সেন্টারে পাঠিয়েছে। ওর দাদা নীল। দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিষয়ের ছাত্র। এমনিতে নীল শান্ত ও মিষ্টি স্বভাবের। কিন্তু গত ছয় মাস যাবত নীল মাদকাসক্ত হয়ে পড়ায় পড়াশোনায় মন দিতে পারছিল না। মা বাবা দুজনেই ভালো চাকরি করে। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। খাওয়া দাওয়া টাকা পয়সা কোন কিছুর অভাব নেই। অভাব শুধু মা-বাবাকে কাছে না পাওয়া।
শুধু নীল না আকছার পত্র পত্রিকায় চোখ রাখলেই আমরা এসব দেখতে পাই। কতশত কচি প্রাণগুলো এভাবে ঝরে যাচ্ছে। আমরা চুপ চাপ দেখছি। আসলে আমরা ভীতু। প্রতিবাদ করতে ভয় পাই। তার সাথে স্বার্থপরও। রোজ নামচার টেনশন এক অঘোষিত প্রতিযোগিতার দৌড়ে আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। পরিবারের সাথে সময় কাটানো, গল্প গুজব আজকালকার ব্যস্ততার যুগে সম্ভব হয়ে উঠছে না। এরই সুযোগে বন্ধু বান্ধবরা হয়ে উঠছে চরম বিশ্বাসী। এই সুযোগে কিছু বন্ধুদের চাপে পড়ে প্রথম প্রথম কৌতুহলবশত পরে অভ্যাসগত কারণে যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়
হাতের নাগালে সমস্ত আধুনিক নেশা সামগ্রী দেদার বিকোচ্ছে। এক শ্রেণির মা-বাবা ভাবছেন টাকা পয়সা দিয়ে দিলেই দায়িত্ব মুক্ত হওয়া যায়। আদৌ কি তাই!!ভাবার সময় এসে গেছে। গন্ধহীন নানা মাদক জাতীয় সেবনের ফলে ধীরে ধীরে নিজেকে সব কিছু থেকে এরা দূর করে নিচ্ছে নিজেদের অজান্তেই। শিশু কিশোর তরুণ তরুণী কেউ বাদ নেই এই তালিকায়। জানা বোঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে কতটা ক্ষতি করছে নিজেদের তার সাথে পরিবারের লোকদের। সামাজিক মূল্যবোধও হারিয়ে ফেলছে।
পারিবারিক কলহ মা বাবার সাথে বোঝাপড়ার অভাবে মাদকাশক্তির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একটা জিনিষ ভাবার খুব দরকার স্কুল কলেজের সামনের দোকানগুলোতে কি করে নেশার সামগ্রী বিক্রি হয়? সব প্রশাসন চাইলেই এর বিহিত করতেই পারে। মাদক দ্রব্যের এইযে দংশনে আক্রান্ত আজকের এই যুবসমাজ তা রোধ করতে প্রথম পদক্ষেপটা পরিবার নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ক্লাবগুলোকেই নিতে হবে। স্কুল ও কলেজস্তরে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদক সেবনের কুফল সম্পর্কে শিক্ষাদান করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারলে ভালো হবে।
কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে আমাদের রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী যুব সমাজকে এই ভয়াবহ নেশার কবল থেকে মুক্তির জন্য "খেলো ত্রিপুরা সুস্থ ত্রিপুরা" নামে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথা বলেছেন। ভারতবর্ষের সাথে সাথে আমাদের এই ছোট্ট পার্বতী ত্রিপুরাও ব্যতিক্রম নয়। এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আসন্ন দুর্গাপূজা কালীন সময়ে রাজ্যের প্রতিটি মহকুমা, ব্লক ও জেলা স্তরে নেশামুক্তির অভিযান চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন। যুবসমাজ আমাদের ভবিষ্যৎ। তাদের সুন্দর মন ও মেধাকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদেরই দায়িত্ব।
রিহেব সেন্টারে কতটা নীলের ইতিবাচক সাড়া মিলবে জানিনা আমরা । তবে যুব সমাজকে এই মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে আমাদের সবাইকে অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হবে। আমাদের নেওয়া একটি সঠিক পদক্ষেপ নীল দের মত যুবকদের সুন্দর সমাজে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
আজকাল অনলাইন অফলাইনে নানা উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি বেরিয়েছে। প্রাইমারি বিভাগ থেকেই আমরা নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সাধারণ জনগণ ও শিক্ষার্থীদের এর কুপ্রভাব থেকে বিরত রাখতে নানান খেলা ধূলা, শিল্পকলা সর্বোপরি তাদের ভালো লাগা গুলোকে নিয়ে কাজ করতে পারি।
0 মন্তব্যসমূহ