কী লিখি কেন লিখি
নাসির আহমেদ
নাসির আহমেদ
জন্ম : ৫ই ডিসেম্বর ১৯৫২
বহু বছর ধরে এই একটি প্রশ্নের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই : কেন লিখি? আসলে কেউ কি স্থির করে বলতে পারবেন কেন লেখেন? বিভিন্ন সময়ে এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। এক রকম হয়নি। ভাবনা বদলায়, দৃষ্টিভঙ্গি, মূল্যবোধ, দর্শন বদলায়। উত্তরও পাল্টে যায়। আসলে এক সময় মনে হতো শুধু কি অলৌকিক সৃষ্টির আনন্দভার বিধাতা দিয়েছেন বলেই বুকের মধ্যে এত চাপা দীর্ঘশ^াস আর এত অব্যক্ত কথা আত্মপ্রকাশের জন্য উš§ুখ? এর উত্তর এক এক সময় এক এক রকম মনে হয়েছে। এখন পরিণত বয়সে এসে মনে হয়, আসলে স্রেফ নিজের সঙ্গে নিজের কথাই হচ্ছে যে কোনো লেখকের সৃজনপ্রয়াস। জানি না অন্য কবি-সাহিত্যিকরা তা মনে করেন কিনা। নিরন্তর বুকের মধ্যে কেউ কথা বলছে। স্নায়ুকোষে কেউ স্মৃতির মালা গাঁথছে, সাজাচ্ছে নতুন নতুন স্বপ্নের পসরা। সেই স্বপ্নের জগৎ, সেই কল্পনার মায়ালোকে এমনই অভূতপূর্ব দৃশ্য, সেখানে গেলে মন আর নির্মম বাস্তবতার কাছে ফিরতে চায় না। কিন্তু সৌন্দর্য বলি আর শিল্পবোধই বলিÑ কোনো কিছুই তো বাস্তববিবর্জিত নয়। একজন কবি যে অসাধারণ শৈল্পিক চিত্রকল্প রচনা করেন, সেখানে চিত্রটি কল্পনার মিশেলে যতই অপূর্ব হোক, তার ভিত্তিভূমি কিন্তু বাস্তবের পরিপাশর্^ আর মানুষ। যে অপ্সরীতুল্য অপরূপা বুকের মধ্যে ঝড় তুলে দিয়ে যায়, সেও কি নিছক কল্পনার? কখনও নয়। সব সুন্দরের অধিষ্ঠানই এই মৃত্তিকালগ্ন সমাজ-সংসার। কল্পনা তার সৌন্দর্যের সম্প্র্রসারণ করে। এমনকি একজন শ্রমক্লান্ত মানুষের শরীরে জ্বলন্ত চিকচিকে ঘামের মধ্যেও যে একজন কবি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন, তার মধ্যেও কল্পনার চেয়ে বেশি সত্য বাস্তবতা। কারণ, কবি শ্রমজীবী মানুষের ত্যাগকে মহিমান্বি^ত করেন।
হ্যাঁ, কবির দৃষ্টিভঙ্গি সৌন্দর্যের নতুন মাত্রা সৃষ্টি করতে পারে, এমনকি যা কল্পনার সত্য তাকেও অর্থময় করতে পারে তার বিশ^াসের শক্তিতেই। পান্নার রঙ যে সবুজ কে না জানেন! কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখন বলেনÑ ‘আমারই চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ’, তখন সেই অনুভূতির সত্যও কি অস্বীকার করা যাবে। নজরুল যখন বলেন, ‘আমার চোখের দৃষ্টি দিয়ে/তোমায় যদি দেখতো প্রিয়ে’Ñ তখন ওই যে বিশেষ দেখা বা চেতনার রঙ মিশিয়ে দেখা সেই উপলব্ধি দিয়ে সুন্দরকে চিহ্নিত করার প্রয়াস দেখি, যেখানে আমি সুন্দরকে উপলব্ধি করেছি বলেই সে অসাধারণ। তা না হলে সাধারণত্ব ছাড়িয়ে যেতে পারে না দৃশ্যমান কোনো কিছুই। কবির কাজ, সৃজনশীল লেখকের কাজ সেই সৌন্দর্য আবিষ্কার করা। সম্ভবত সেই আবিষ্কারের তৃষ্ণাই একজন লেখক কবির লেখার প্রধান প্রেরণা।
পাওয়া না পাওয়ার মিশ্র অনুভূতি, পরিতৃপ্তি আর অতৃপ্তির মিশেলে যে প্রাত্যহিক জীবন, সে জীবনে আর দশজন সাধারণ মানুষের চেয়ে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ আলাদা জীবনযাপন করেন। তিনি স্পর্শকাতর, তীব্র অনুভূতিপ্রবণ। সহজে তাকে ছুঁয়ে যায় যে কোনো দুঃখ-ব্যথা। যে কোনো আনন্দ তাকে আপ্লুত করতে পারে, দেখাতে পারে স্বপ্নের রহস্যময় নান্দনিক পথ। তখন তার সেই একান্ত আনন্দ কিংবা বিষাদ শেয়ার করারও কেউ থাকে না। কারণ তার মতো করে তো আর কেউ দেখবেন না, উপলব্ধি করবেন না। করতে পারেন না। তখনই কবি বা সৃষ্টিশীল লেখক বড় একা। নিঃসঙ্গতার দংশনে নীল তার অস্তিত্ব^। অন্য অনেককে ওই ঘটনা হয়তো স্পর্শই করবে না। তখন মুক্তির সবচেয়ে বড় আর প্রশস্ত পথটি হচ্ছে লেখার কাছে আশ্রয়। কিংবা আরও সহজ করে বললেÑ নিজের কাছেই আশ্রয়। নিজের সঙ্গেই নিজে নিভৃতে সেই নিঃসঙ্গতার, সেই গোপন প্রাপ্তির আনন্দ-বেদনা শেয়ার করেন। একান্ত অনুভূতিমালা বাক্সময় করে তোলেন অক্ষরের পর অক্ষর সাজিয়ে, শব্দের পর কাক্সিক্ষত শব্দটি বিন্যাস করে।
আমার অন্তত এই মনে হয় যে, নিজেকে দেখার আয়না হচ্ছে প্রত্যেক লেখকের সৃষ্টি। সেই আয়নায় ™ি^তীয় সত্তার সঙ্গে প্রথম সত্তার যে কথোপকথন, তারই নাম সাহিত্য। একজন কবি, অন্যজন নির্মম বাস্তবের কষাঘাতে ক্লান্ত মানুষ। এই দুই সত্তার মিলনই হচ্ছে নিজের সঙ্গে নিজের একান্তে কথা বলা। সেই কথাই কবিতা। সেই কথাই আমার কিংবা আমাদের সাহিত্য। একান্তে বলা সেই কথার শেষ নেই বলে তৃপ্তিও নেই। আমৃত্যু কেবল প্রকাশের আকুতি।
===============
মাহমুদ কামাল সম্পাদিত ‘অরণি’র ১৮তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৩) প্রকাশিত
1 মন্তব্যসমূহ
আমার মনে হয় লেখাটা ঠিকই আছে। শত সংগ্রাম এবং দুঃখ কষ্টের মধ্যেও জীবন যে শত দুঃখ কষ্ট সংগ্রাম সত্ত্বেও জীবন সুন্দর এবং পৃথিবীটাও সুন্দর।সেই সুন্দর পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে এই মৃত্যুভাবনা মাঝে মাঝে বিষণ্ন করে দেয় আমার কবিতাকে। গত কয়েক বছরে লেখায় এই ভাবনাটার ছায়া পড়ছে আমার লেখায়। এই ভাবনা থেকেও লিখি যে আমি থাকবো না কিন্তু আমার ভাবনারা হয়তো কোথাও না কোথাও রয়ে যাবে।
উত্তরমুছুনএই অংশটুকু জুড়ে দিতে পারেন একটি জায়গায়।