বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ||ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের মুখোমুখি ||গোবিন্দ ধর ||এই পর্বে কবি পীযূষ রাউত

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের 
মুখোমুখি ||গোবিন্দ ধর ||এই পর্বে কবি পীযূষ রাউত 


বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি 
------------------------------------------
ত্রিপুরার বিশিষ্ট কবিসাহিত্যিক গুণিজনদের 
মুখোমুখি ||গোবিন্দ ধর ||এই পর্বে কবি পীযূষ রাউত 


১০নভেম্বর। ১৯৪০এ জন্ম হয় পীযূষদার।ষাটের দশকে জোনাকি কবিতা পত্রের সম্পাদক ও কবি হিসেবে পীযূষ রাউত রাজ্যের সাহিত্য জগতে উদয় হোন।সামনেই তিনিবপীযূষ রাউত ৮১ বছরে পড়বেন।
পূর্বোত্তরের কত কবি সাহিত্যিক আমাদের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

জোনাকি সম্পাদক কবি পীযূষ রাউতের  ৮১ তম জন্মদিনের অগ্রীম শুভেচ্ছা ।স্রোত পরিবারের শ্রদ্ধা।সারা জীবনের সাহিত্য কর্মের জন্য আমাদের প্রণাম।যার কলম প্রতিদিন গর্জে ওঠে,কোন না কোন সমাস্যা তাঁর কবিতার কাব্যভাষা।চির রোমান্টিক,চির তরুণ পীযূষ রাউত জন্মজুয়াড়ীও।বারবার বাসা বদল যাঁর জীবনের একটা বিরাট অংশজুড়ে তাঁর কলম থেকে আমরা অন্যরকম কবিতার স্বাদ পেয়েছি।
আমরা তাঁর দীর্ঘজীবন সুস্থজীবন কামনা করি।কলার উচিয়ে কাঁধে হাত রেখে এখনো দীর্ঘ পথ যিনি পার হতে পারেন তিনিই পীযূষ রাউত।স্রোত পরিবার তাঁর নির্বাচিত কবিতা,অবসরের আগে ও পরে,পীযূষ রাউত উজ্জ্বল উদ্ধার,আমার কবি জীবন প্রকাশ করতে পেরে আনন্দিত গর্বিতও।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পীযূষ রাউত ত্রিপুরার খোয়াই ছিলেন।তখন তাঁর একমাত্র পুত্র সন্তান সৈকতের জন্ম হয়।


(১)আপনার পারিবারিক পরিবেশ সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশে কীরকম ছিলো যদি একটু বলেন?

উত্তর :(১)অপার স্বাধীনতা ছিল।

(২)আপনার ছোটবেলায় যখন একদেশ ভারত তখনকার ভারতের একটি চিত্র লিখে আমাদের কৌতূহল দূর করুন যখন পাকিস্তান বাংলাদেশ ছিলো না?

উত্তর :(২)১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ তখনতো একদেশ ভারতবর্ষ স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে।

(৩)আপনার জন্মের সময় আপনাী বাবা মা পরিবার কোথায় বসবাস করতেন?

(৪)ত্রিপুরার সাথে মুক্তিযুদ্ধের সময় দুদেশের সম্পর্ক কেমন ছিলো?

উত্তর :(৪)শুধু ত্রিপুরা কেন, সমগ্র ভারতের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো ছিলো।

(৫)ত্রিপুরার কোন কোন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প গড়ে উঠেছিল? সে সব ক্যাম্পে স্থানীয়দের মধ্যে কারা সহযোগী ছিলেন?

উত্তর :(৫)মনে নেই

(৬)বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কিংবা মুক্তিযুদ্ধে ত্রিপুরা এত আন্তরিক কেন ছিলো?

উত্তর :(৬)ত্রিপুরার অধিকাংশ বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান থেকে  এসেছিলেন। অধিকন্তু কমবেশি সকলেরই আত্মীয় স্বজন তখনও ওদেশে। স্বভাবতই একটা আবেগ কাজ করেছিল।

(৭)ত্রিপুরার সংবাদপত্রের ভূমিকা কীরকম ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে?

উত্তর :(৭)শতশতাংশ ইতিবাচক

(৮)দৈনিক সংবাদ না জাগরণ কারা বেশী আন্তরিক ছিলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ পরিবেশনে?

উত্তর :(৮)উভয়ই।

(৯)আপনার পরিবার তখন কোথায় থাকতেন?পরবর্তী সময়ই বা কোথায় এলেন?

উত্তর :(৯) কৈলাসহরে।

(১০)শুনেছি আমাদের বাবা মা ও ঠাকুমার কাছে তখন মাইন পেতে রাখা হতো।এতে নানা ঘটনার সাক্ষী আমাদের আত্মীয় স্বজনদের করুন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। আপনার এ বিষয়ে কোন অভিজ্ঞতা?

উত্তর :(১০) কথাটা শুনেছি। তবে কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

(১১)বাঙ্কারও নাকি ত্রিপুরার বর্ডার বাসী সকলেই ঘরে ঘরে করে রাখতেন।বিপদের আঁচ পেলেই সমবেতভাবে সকলেই লুকিয়ে থাকতে হতো।আমাদের রাতাছড়ার বাসায়ও বাঙ্কার করা হয়েছিল। আপনি বিষয়টি বিস্তারিত বলুন?

উত্তর :(১১) আমি স্ত্রী - পুত্র সহ তখন  খোয়াই- কল্যাণপুরে। থাকতাম হাসপাতাল কোয়ার্টারে। কাছেই তৈরি হয়েছিল বাঙ্কার। সাইরেন শুনে আমিও একাধিকবার বাঙ্কারে আশ্রয় নিয়েছিলাম। এ বিষয়ে আমার একটা কবিতা  দিচ্ছি। দেখে নিও।

সৈকতের শরীর 
---------------------

সৈকতের শিশু শরীরে হাত দিলেই / রক্তের মধ্যে শিহরণ অনুভূত হয়। 
কল্যাণপুর হাসপাতাল চত্ত্বরে ট্রেঞ্চ  খুঁড়ছে / রামচন্দ্র নামে জনৈক দিনমজুর। / যুদ্ধ লাগতে পারে, যুদ্ধ লাগবে, এই রকম /একটা উন্মাদ বাতাস ফিসফিস করছে /দীর্ঘ  কয়েক মাস। 
যদি সত্যি হয়? যদি সত্যি হয়?/সৈকতের শিশু শরীরে হাত দিলেই /রক্তের মধ্যে শিহরণ অনুভূত হয়। 
সৈকত, শোন বাবা,আমরা বাঁচব তো? / আমার কবিতার ডায়েরির আশেপাশে /কয়েকটা ইঁদুরছানা ছুটোছুটি করে সারারাত। /টর্চ জ্বালতেই আলোয় আলো, কোথাও /কিছু নেই। কোন শব্দও নেই। 
সৈকত ও কবিতার ডায়েরি 
আমার মনের মধ্যে, শরীরের অলিতে-গলিতে /এক অন্ধ ভালোবাসার স্রোত /নদী হয়ে ছুটে। /গোপন দুঃখে,অজানিত আশংকায় /কেঁপে ওঠে একত্রিশের দেহ। জোরে /হাঁক দিই ---কই হে কৃষ্ণ /ছিলে কোথায় এতোক্ষণ?

(১২)যদিও আগেই জানা দরকার ছিলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বাংলাভাষার অবদানের কথা তা যথা সময়ে না জানলেও এখন যদি বলেন?

উত্তর :(১২)বিশ্বের যে কোনো দেশের  স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষার অবদান অন্যতম প্রধান অস্ত্র। বাংলাদেশের মুৃক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষিতেও এর অন্যতা ঘটেনি।এমনকি আজও বাংলাদেশের কবিতায় এই প্রসঙ্গ চোখে পড়ে।

(১৩)মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আপনি কখনো শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখেছেন?

উত্তর :(১৩)না। কোন দিনই বঙ্গবন্ধুকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি।

(১৪),পরিবারের কেউ মুক্তিযুদ্ধের সাথে কোনভাবে যুক্ত ছিলেন?

উত্তর:(১৪)না।

(১৫)একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে এত কম সময়ে সাফল্যের স্বাদ পেতে পারে তা মুজিবই দেখিয়েছেন। আবার কম সময়ে এীকম অসম যুদ্ধে জনসম্পদের যে ক্ষতি এতে আত্মীয় হারানো মানুষের মনের ক্ষত কি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন না?

উত্তর :(১৫)সত্যি কথা। তবে সময় সকল রকমের ক্ষয়ক্ষতি  এবং স্বজন হারানোর দুঃখকে এবং সর্বোপরি দেশের বিপর্যয় থেকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করে। ওরা পেরেছে। শেষের বিষয়ে তো বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অনেক উন্নত।

(১৬)অপূরণীয় ক্ষতি এসব কি একটি দেশ মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্যে দিয়ে ভুলে যেতে পারে?

উত্তর :(১৬)জয়লাভের পর পরই একটা অসামান্য আবেগের জোয়ার সৃষ্টি হয়। অপূরণীয় ক্ষতির কথা কালক্রমে মানুষ অনুধাবন করতে পারে। বাংলা দেশ শেষপর্যন্ত মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছে।

(১৭)দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ হয়ে যাওয়ার ক্ষতে কী প্রলেপ দেওয়ার জন্য ভারত সহযোগিতা করেছিলো না এতে কোন আত্মীক দায়বদ্ধতার বিষয় ছিলো?

উত্তর:(১৭) ছিলইতো। নচেৎ এই বিজয় আরো বিলম্বিত ও সমস্যা সংকুল হতো।

(১৮)জনজীবনে মুক্তিযুদ্ধের প্রভাব আলোকপাত করবেন দয়া করে।

উত্তর :(১৮)আমার কবি -জীবনে এবং কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের  প্রত্যক্ষ প্রভাব খুব একটা পড়েনি বলে মনে হয়। একটা কবিতা, যেটা একটু আগেই উল্লেখ করেছি।  একটা ছোটগল্প আছে, সিলেটের একটা লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছিল। পরিশেষে পাঠিয়ে দেবো। তবে পরোক্ষ প্রভাব সুদূর প্রসারী হয়েছিল। সত্তরের শুরু থেকে আশির দশকের বেশির ভাগ সময় আমি খুব বেশি রকমে নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। যার ফলশ্রুতিতে আমার অধিকাংশ কবিতায় আমার জন্মভূমি, পূর্ববর্তী পূর্ববঙ্গ,অর্থাৎ বাংলাদেশের আবহ অসংখ্য বার অংকিত হয়েছে।
এই গল্পটা মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরেই সিলেটের একটা লিটল ম্যাগাজিনে মুদ্রিত হয়েছিল।

   এই গল্পটা মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরেই সিলেটের 
   একটা লিটল ম্যাগাজিনে মুদ্রিত হয়েছিল।

(১৯)আপনার দেখা ১৯৭১ একটু বিশদভাবে জানতে চাই?

উত্তর :(১৯)আমি তখন কল্যাণপুরে। নাম মনে নেই, একজন নোতুন ডাক্তার হাসপাতাল কোয়ার্টারে থাকতেন। জনৈক অবাঙালি মেজর ডাক্তারের বন্ধু। তিনি মাঝেমধ্যে কোয়ার্টারে আসতেন। দেখতে অতীব সুপুরুষ সেই মেজরকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। একদিন বললেন আজই খোয়াই ফ্রন্টে যেতে হচ্ছে। যদি বেঁচে ফিরে আসতে পারি, দেখা হবে। পরের দিন তরুণ ডাক্তার তার মৃত্যু সংবাদ দিলেন। আজও তার কথা মনে পড়ে।

এখানেই শেষ করবো। পরিশেষে বাংলাদেশের একজন লেখকের কথা না বললেই নয়। তার নাম নৃপেন্দ্রলাল দাস। মুক্তিযুদ্ধের সময় কমলপুরে এসে এক আত্মীয় বাড়িতে অনেক দিন  ছিলেন। তিনি শ্রীমঙ্গল কলেজে অধ্যাপনা করতেন। আমার সংগে বহু বছর যোগাযোগ ছিল। কমলপুরে থাকাকালীন সময়ে একটা লিটল ম্যাগাজিনও করেছিলেন।যদিও লিটল ম্যাগাজিনের নাম মনে নেই।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ