কী লিখি কেন লিখি সবিতা দেবনাথ

কী লিখি কেন লিখি
সবিতা দেবনাথ



কী লিখি কেন লিখি
সবিতা দেবনাথ

লেখা-লেখি, অর্থাৎ সাহিত্য যখন হৃদয় সংবাদী, - সাহিত্য সৃষ্টির কাজ শুরু হয় অনুভূতি থেকে। বিশ্বকবির ভাষায়, -" হৃদয়ের জগৎ আপনাকে ব্যক্ত করার জন্য ব্যাকুল, তাই চিরকালই মানুষের মধ্যে সাহিত্যের আবেগ "। 
পয়ষট্টি বৎসর বয়সে কবি সাহিত্য ভাবনার উপরে একটি শ্বাশ্বত কথা লিখেছিলেন, - " আমি আছি, আমি জানি, আমি প্রকাশ করি। আমি আছি অর্থে ব্যাক্তি মানুষের অস্তিত্ব, আমি জানি মানে আমার জ্ঞান উপলব্ধির ব্যপ্তি ও গভীরতা। আমি প্রকাশ করি অর্থে জ্ঞাতব্য বিষয়টিকে রস সমৃদ্ধ উপস্থাপন। এইভাবে সাহিত্য ভাবনা পথ করে নেয়। নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গের মতো, অন্তরের ভাবনাকে প্রকাশ করার ইচ্ছাতেই লেখার প্রয়াস চলতে থাকে। আর জ্ঞান-মেধা-মনন নিয়ে যে চলা, সেই পথে আর যাই হোক দেউলিয়া হবার ভয় নেই, -এ পথে খরচটাই সঞ্চয় হয়ে উঠে,- দু-হাতে ছড়িয়ে দিতে দিতে চললেও লোকসানে পৌঁছোয় না- - - । 
প্রমথ নাথ বিশিষ্ট লেখায় পাই, - কে কত সঞ্চয় করে তা নিয়ে জীবনের বিশালতা ও বিস্তৃতি হয় না। কে কি চিন্তা করে, কে কি আদর্শ নিয়ে চলে ও লিখে, তা নিয়েই জীবনের বিস্তার- - - । 
প্রমথ চৌধুরীর লেখায় পাই, - উদরের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের দেহ বাঁচেনা। মনের দাবি রক্ষা না করলে মানুষের আত্মা বাঁচেনা। লেখা তো সেই বেঁচে থাকার কাজটাই করে। আমাদের সুখ-দূঃখ, আনন্দ -বেদনা বিভিন্ন অনুভূতি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের নিকট ব্যক্ত করে শান্তি পাই, স্বস্তি লাভ করি, কারণ সহযোগিতা ও সহানুভূতি পাওয়াই আত্মার স্বভাব, হৃদয়ের প্রকৃতি। যে চিত্ত যথার্থ প্রাণবন্ত তার উৎসুক চির প্রবহমান। নির্জীব মনেরই দেখবার ইচ্ছা নেই, দেখাবার শক্তি নেই। আমরা যা কিছু একটা লিখি না কেন তা অন্তরের অর্থাৎ মনের একান্ত তাগিদ আছে বলেই না লিখি। সেটা সৃষ্টি করার তাগিদ। সেটা বিভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন রকম। কিছু একটা লেখা, ধরুন কবিতা একটি লিখলেই কেমন যেন গৌরব বোধহয়। যেন মনের গভীরে থাকা আপন ভাবের প্রদীপ শিখা হঠাৎ জ্বলে উঠল। লেখাটির মধ্যে কোন উৎকর্ষ অনুভব করে নিয়ে দেখা আনন্দ তা নয়, আসলে অন্তরের শক্তি সেই আপন রূপ নিয়ে দেখা দিল। মুহূর্তে তার মধ্যে অনির্বচনীয় এক আনন্দ অনুভূত হল। সৃষ্টি কর্ম তার যতই ক্ষুদ্র, তুচ্ছ নগন্য হোক না কেন রচনার আনন্দের প্রকাশই হচ্ছে নব নব সৃষ্টি রূপ। শত ফুল বিকশিত হওয়ার মতো সেই নব রূপের সৃষ্টি তে প্রতি বারেই অন্তরের অনুভূতিতে আনন্দের শাঁখ বেজে ওঠে। 
      মানুষের আত্মোপলব্ধির ক্ষেত্রে যুগ পরিবর্তনে বিষয়ের বৈচিত্র্যতায় বিস্তৃত হতে থাকে। 
     ছন্দে-শব্দে বাক্য-বিন্যাসের গুনে রচনা যথার্থ সার্থক সাহিত্য হয়ে উঠে। কথা দিয়ে ছবি আঁকেন লেখকেরালেখকেরা, তাদের মনের কথা গান হয়ে বাজে, রূপ হয়ে ফোটে। তাঁদের লেখা থেকেই প্রাণবন্ত হয়ে উঠে অন্তরের অনির্বচনীয় অনুভূতি। 
লেখার মাধ্যমে মানুষ নিজেরই অন্তরতম পরিচয় দেয় নিজের অগোচরে। যেমন পরিচয় দেয় ফুল তার গন্ধে, কোকিল তার কুহুতানে। জোনাকি তার আলোকে। এই পরিচয় আছে সকল জাতির জীবন বৃত্তে যজ্ঞে জ্বালিয়ে তোলা অগ্নিশিখার মতো। সেই শিখাই জ্বালে ভাবী কালের পথের মশাল, ঘরে ঘরে গৃহ প্রদীপ।।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ