কী লিখি কেন লিখি নিতাই সেন

কী লিখি কেন লিখি 
নিতাই সেন
জন্ম : ১১ই নভেম্বর ১৯৫৪

সৃষ্টি রহস্যের গুঢ়তত্ত্ব হলো পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই উপাদানে সৃষ্টি হলেও চেহারা ও হাতের রেখা এক এক জনের অন্য জনের চাইতে আলাদা। সম্ভবত একারণেই মানসিক গঠন ও একজনের এক রকম, অন্যজনের অন্যরকম। মানুষ প্রত্যেকের, নিজের মতো করে কিছু বলার থাকে। সেটাকেই কেউ কবিতায়, কেউ গদ্যে, কেউ গানে, কেউ চিত্রকলায়, কেউ কেউ বিবিধ বৃত্তির ভেতর ফুটিয়ে তোলে। পারেনা বলে কোন কথা নেই- পারেন, কেউ সাহিত্য, কেউ শিল্পকর্মে, কেউ কেউ গৃহকর্মে, কেউ চৌর্যবৃত্তিতে, কেউ রাজনীতিতে, কেউ আমলাগিরীতে, কেউ বা ব্যবসায়। নিজের ভেতরের চিন্তা চেতনার সুকুমার বৃত্তি ফুটিয়ে তোলার সবচেয়ে কঠিন মাধ্যমটি হচ্ছে- সাহিত্যে। আর সাহিত্যের সবচেয়ে সূক্ষ্মতম, তীক্ষ্মতম বুদ্ধিদীপ্ত মাধ্যমটি হচ্ছে কবিতা। আমার ধারণা, একজন লেখক লেখালেখির প্রথম পর্বে পরের কথা, পরের ভাষায় লেখেন। মধ্যে পর্বে এসে পরের কথা নিজের ভাষায় বলেন। আর পরিণত পর্বে এসে-নিজের কথা নিজের ভাষায় লেখার চেষ্টা করেন। 

খ. লেখকের দায়িত্ববোধ নিয়ে এযাবৎ অনেক তর্ক হয়েছে, লেখালেখি হয়েছে। আমি মনে করি শুধু রাজনীতি নয় মানুষের জীবন ও সমাজ বদলে দেবার ক্ষেত্রে শিল্প ও সংস্কৃতির ভূমিকাও কম নয়। তাই একজন লেখককেও সমাজসচেতন ও রাজনীতি সচেতন থেকে মানুষের জীবন বদলে দেবার দায়িত্ব নিতে হবে। একজন আদর্শ লেখক চিরকালই মানুষ ও সমাজের বিবেকের ভূূমিকা গ্রহণ করেন। মানুষের কল্যাণকে উপেক্ষা করে যে লেখা তা বিবেকহীন বিভ্রান্ত। লেখালেখির আদিকাল থেকে যে লেখায় মানুষের জয়গান এবং মানুষকে জাগানোর প্রেরণা শক্তি নিহিত আছে- তা চিরায়ত সাহিত্য হিসাবেই গণ্য হয়ে আসছে। হোক তা ইংরেজি ভাষায়, হোক তা ফরাসী ভাষায়, হোক তা জাপানী বা অন্য ভাষায়। মানুষই সাহিত্যের প্রধানতম বিষয়। মানুষের কল্যাণেই সাহিত্যের কাজ।

গ. ‘কেন লিখি’ এসম্পর্কে প্রশ্নের অবতারণা অতি সাম্প্রতিককালের। এ সম্পর্কে বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। সকল মতামতগুলোকে এক জায়গায় দাঁড় করালে এভাবে সাজানো যায়:
১. মানব জন্মের ঋণ শোধের জন্য লেখা, কারণ জীবনের আনন্দ বেদনার যাবতীয় আস্বাদ তো মানুষেরই কাছ থেকে পাওয়া। 
২. নিজেকে আস্বাদন করা, নিজেকে পরখ করার তাগিদ- একটা ছোট আমি থেকে ক্রমশ বড় আমির দিকে যাত্রায় লেখা সহায়ক- তাই লিখি। 
৩. লেখা আমার কাছে নিবেদন, পুজো, ঈশ্বর সেবা। লেখা আমার জীবিকা নয়, জীবনের গন্তব্যও নয়। 
৪. লেখার মাধ্যমে জীবন ও সৃষ্টির সম্পর্ক নির্ণয়ের চেষ্টা করে যাওয়া। 
৫. লেখার মধ্য দিয়ে আমি সৃষ্টিকর্তার করুণার স্পর্শ পাই, প্রতিটি অক্ষরই তাঁর প্রসাদের কণা। 
৬.  জীবনের সঙ্গে অন্বয়ই লেখা, সেই চেষ্টাতেই লিখি। 
৭. লিখতে ভাল লাগে তাই নিজের জন্যই লিখি। এর কোন ব্যাখ্যা নেই। অস্তিত্ব ও সৃষ্টির কারণের মতই উত্তরহীন এক সমস্যা। 
৮. জীবন পুনঃনির্মাণের জন্য লিখি। 
৯. লেখাই জীবন, লেখাই জীবিকা। 
১০. লিখি ভেতরের তাগিদে। 
১১. লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে যে সব কথা জানানো যায় না- সে সব  
কথাগুলো জানাবার জন্যই আমি লিখি।
১২. নিজেকে এবং মানুষকে ভালবাসি বলে লিখি। একটা দায়বদ্ধতা আমাকে প্ররোচিত করছে এবং সেই দায়বদ্ধতা সমাজ বা রাষ্ট্রের কাছে না। একান্তভাবেই আমারই দায়বদ্ধতা। আমি লিখি, কারণ আমি কিঞ্চিত সুখানুভব করেছি জীবনে। দুঃখ পেয়েছি গভীর। আমি লিখি, কারণ আমার মধ্যে বিশ্ব নিখিলের এক আনন্দময় সত্তা ভর করে। আমি নিজেকে নানারূপে ভাঙ্গাগড়া করে দেখি। আমি লিখি কারণ লেখা আমার জীবন চর্চা-আমি না লিখে থাকতে পারি না।
১৩. কবিতা লিখলে আমার আনন্দ হয়। যা ছিলো না, তাকে আনলাম বলে মনে হয়। একটা না থাকাকে যেন থাকায় পরিণত করলাম।
১৪. লিখে বিস্মিত হই বলে লেখা আমার আনন্দ, লেখা আমার বিষাদ।
১৫. পাঠকের কাছে পৌঁছাতে চাই, তাই লিখি।
১৬. সৎ আত্ম উন্মোচনের জন্য লিখি।

ঘ. 
একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। আমার শৈশবের প্রথম পর্ব কেটেছে সুন্দরদির স্নেহ ছায়ায়। সুন্দরদি দেশান্তরিত হওয়ার পর মায়ের শিশু আবার মায়ের কোলে ফিরে আসি। শৈশব থেকে বহু মানুষের দুঃখ-কষ্ট অভাব অনটন, অত্যাচার-নিপীড়ন আর তাদের হৃদয়দীর্ণ আর্তনাদ শুনে আসছি। পারিবারিক বিবিধ দুর্যোগ এবং আত্মীয় স্বজনদের কাছ থেকে বহু ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক ব্যবহার পেয়ে ক্রমে ক্রমে বড় হয়েছি। তাই শৈশবেই জেনেছি দারিদ্রই জীবনের সঙ্গে যোগ করে জীবনের বহু মাত্রিকতা। এই সূত্র ধরেই নির্বাক ও অক্ষম হয়ে মানুষকে চিনতে শিখেছি। আমার এই পক্ষপাত অজান্তে আমাকে সমাজের দুর্বল মানুষদের পক্ষে দাঁড় করিয়েছে। মনে হয়েছে, ততটা স্পষ্ট ভাবে না হলেও আমি কোথায় যেন ওদের প্রতি একটা দায়বদ্ধতা অনুভব করি। কোন রাজনৈতিক দল বা সম্প্রদায় নয়, কোন বিশেষ মতবাদ নয় নিজের অন্তর তাগিদে নিরস্ত্র ও হাতিয়ারহীন মানুষগুলোর প্রতিবাদ আমার কবিতা হয়ে ফুটে উঠে। মানুষের এই পীড়াদায়ক অবস্থা এবং শ্রেণী বিভক্ত সমাজের বিবিধ শোষণ বৈষম্য বঞ্চনা দূর করতে তাদের হয়ে আমার পক্ষে সংগ্রাম করা সম্ভব না হলেও লেখাকেই আমি অপ্রত্যক্ষ সংগ্রাম বলে মনে করি। এখানে দৃশ্যত রক্তক্ষরণ নেই ঠিকই, কিন্তু অসহায় মানুষের জীবন এবং বৈচিত্রপূর্ণ বিস্ময়কর লড়াই মাঝে মাঝে রক্তক্ষরণের চাইতে মহৎ হয়ে দাঁড়ায়। আর এই সব ভূখা নাঙ্গা মানুষের জীবনে জয় গান গাওয়াটাই আমার কবিতার মূলসুর।

ঙ. 
ছেলেবেলা থেকেই একটা প্রতিবাদী চেতনা আমার ভেতর তৈরী হয়। আমার প্রতিবেশি শিক্ষক আবুল হোসেন স্যার ছিলেন আমার আদর্শ। শান্ত সৌম্য এবং সন্ন্যাস জীবনের আরেক আদর্শ ছিলেন আমার অন্য প্রিয় শিক্ষক দেবেন্দ্রনাথ ঘোষ। এ দু’আদর্শ শিক্ষকের প্রভাব আমার পরবর্তী জীবনে সুদূরপ্রসারী এবং গভীর তাৎপর্য বয়ে এনেছে। ভাষা আন্দোলনের উপর রচিত মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটক ১৯৬৪ সালে পর পর বেশ কয়েকবার দৌলতখাঁন হাইস্কুলে মঞ্চস্থ হয়। কেন জানিনে পড়া ফাঁকি দিয়ে এবং মায়ের বকুনি খেয়েও বারবার ঐ নাটক দেখার জন্য দৌলতখাঁন স্কুল মাঠে উপস্থিত হই।
১৯৬৯ সনে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েই চলে আসি চট্টগ্রামে। ভর্তি হই চট্টগ্রামের নিজামপুর কলেজে। ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতা মৃণাল সরকারের সাথে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠ হবার পরপরই ঝুঁকে পড়ি ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি। কলেজে ভর্তির সাথে সাথেই কলেজ ম্যাগাজিন বের করার উদ্যোগ নেন- ছাত্র সংসদ। দীর্ঘদিন রাফ খাতায় আঁকিবুঁকি করতে করতে কবিতার খাতা ভরে উঠে এক সময়। ছন্দোবদ্ধ সে কবিতার খাতাগুলো থেকেই বাছাই করে ‘ওরাও মানুষ’ নামের একটা কবিতা ছাপতে দেই মৃণালদার হাতে। সেটাই বোধ হয় ছাপার অক্ষরে আমার প্রথম কবিতা। এরপর সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের গণআন্দোলন, স্বাধীনতার সংগ্রাম ইত্যাদির ভেতর দিয়ে কবিতা সুন্দরীর হাত ধরে আমার যে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ যাত্রা- যা আজও অব্যাহত আছে। 
===============
অরণি’র ২০তম সংখ্যায় (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৪) প্রকাশিত

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ