কী লিখি কেন লিখি রেজাউদ্দিন স্টালিন


কী লিখি কেন লিখি 
রেজাউদ্দিন স্টালিন


কী লিখি কেন লিখি 
রেজাউদ্দিন স্টালিন


কোনো গুরুগৃহ নেই


১০ এপ্রিল রাতে এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলাম। একটা অভিজাত এলাকা। বেশ নীরব। আইল্যান্ডের গাছগুলো ঘন আর সবুজ। গাছে অসংখ্য রঙিন ঠোঁট ওয়ালা পাখি। তারা অবিকল মানুষের মতো সুরেলা গলায় গান গাইছে। আশেপাশে পুরোনো কিন্তু অভিজাত ঘরবাড়ি। দু’একজন মাত্র লোক এদিক ও ওদিক। দেখলাম একটা পাখি অসুস্থ। তাকে সেবা দিচ্ছে এক গৃহিণী। এই অসাধারণ স্বপ্নের কোনো অর্থ আছে কি’না আমি জানি না। প্রোফেট ইউসুফের মতো কেউ থাকলে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে পারতাম। পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত স্বপ্ন আছে কবি লেখকদের। স্বপ্ন-ভাবনা-কল্পনা পরস্পরের সাথে একটা মনস্তাত্তি¡ক সম্পর্ক আছে আমি। আমি যখন ফ্রেজার পড়ি তখন বিশ্বাস করি স্বপ্ন হলো জেগে থাকা জীবনের পাঠ কাহিনী। ফ্রেজার এক গল্প পড়েছিলেন- এক জংলি স্বপ্ন দেখে যে সেও জংগলে প্রবেশ করে এবং একটা শক্তিমান সিংহকে হত্যা করে। যখন সে ঘুম থেকে জাগে তার মনে হতে থাকে তার দেহ থেকে আত্মা বেরিয়ে গিয়ে স্বপ্নের ঘোরে এক সিংহকে হত্যা করেছে। সবকিছু জেগে থাকা আর স্বপ্ন দেখা। একটি সমভূমের ওপরে এই প্রতিক্রিয়া ঘটে। আর আমাদের কাছে নিয়ে আসে রহস্য যার ব্যাখ্যাতা অধিবিদ্বিকগণ। আমরা জীবন নিয়ে কি স্বপ্ন দেখছি তা কি বাস্তব। আমরা তা’ নিশ্চিতভাবে জানি না। আর আমরা চলে যাই অজ্ঞানতাবাদে, অবিশ্বাসে। আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে এরকম এক স্বপ্নপ্রদর্শীর অস্তিত্ব আছে। স্বপ্নের সঙ্গে ভাবনার যে প্রাসঙ্গিক যাত্রা তা’ এক জটিল প্রক্রিয়া। কবিদের জন্য এ এক রহস্যময়। জেগে থাকা এবং জীবনের জন্য স্বপ্ন হয়ে ওঠা। কেল্ডোরেনের এক চমৎকার উক্তি স্মরণ করি- জীবন হলো স্বপ্ন। আমাদের প্রত্যেকের রয়েছে সম্ভবত: দুটো ধারণা- স্বপ্ন হলো জেগে থাকার অংশ। অন্যটি দারুন এবং তা কবিদের বিশ্বাস- সব জেগে থাকাই হলো স্বপ্ন। দুটোর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। গ্রীসাক যেমন বলেন- আমরা জেগে থাকি, ঘুমিয়ে থাকি আর স্বপ্ন দেখি কিন্তু আমাদের কার্যধারা এক। ইউলিসিসে সমুদ্র ভ্রমণের নানা বিপর্যায়কে হোমাদের প্রখর কল্পনা বলে আমরা ভাবি। ওডিসিতে একটি অনুচ্ছেদ যেখানে দুটো তোরণের উল্লেখ রয়েছে। একটি শিং দিয়ে তৈরি আরেকটি হাতির দাঁত দিয়ে মিথ্যে স্বপ্ন যায় মানুষের কাছে। শিংয়ের তোরণের ভেতর দিয়ে ঢোকে সত্য এবং আগামীর স্বপ্ন সম্পর্কিত বিষয়। ঈনিয়াস ট্রয় পতনের পর যে সুকৌশলে সমুদ্র পথে গিয়ে লার্টিয়াম নগর প্রতিষ্ঠা করে। ইনিয়াস হাতির দাঁতের তোরণ দিয়ে ঢুকে সিংয়ের ভেতর দিয়ে ফিরে আসে। এ এক আশ্চর্য জার্নি। স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন দুটোকেই দেখা এবং অনুভব করা। কোলরিক তার স্বপ্ন সম্পর্কে এক চমৎকার অনুভূতি ব্যক্ত করেন। তিনি স্বপ্ন দেখেন এক ভূত। অন্য আরেকজন দেখেন ভূতটি জেগে উঠতে পারে এক সেকেন্ডের মধ্যে। এসবই ভাবনা। কবিতার সব শব্দই কিছু অলৌকিক পরিভাষার ঐতিহ্যবাহী। মানুষের ভাবনাই সে আকাংখা ক্রিয়াশীল। এইসব কিছু উঁচু গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা যা’ মানুষের সংবেদন কে তাড়িত করে তা’ আমাকেও করেছিল কৈশোরে। আমি সিগারেটের অসংখ্য প্যাকেট জোগাড় করতাম। স্টার, ব্রিস্টল, ক্যাপিস্টান, সিজার- এগুলোর মূল্যমান দশহাজার, বিশহাজার টাকা ভেবে আমরা খেলতাম। কৈশোরে এই তাস খেলতে গিয়ে পেলাম খেরোখাতা। দাগটানা। খাতার পেছনে গোল বৃত্তে নজরুলের ছবি ও কবিতা। পাতাল ফেড়ে নামব নিচে/ উঠবো আমি আকাশ ফুঁড়ে/ বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি/ আপন হাতের মুঠোয় পুরে। এই দুদর্শনীয় কবিতায় আমাকে ভাবনায় ফেলে দেয়। কিছুদিন পর আমার ভাবনায় ফেলল সুকান্ত। প্রিয়াকে আমায় কেড়েছিল তোরা/ ভেঙেছিল ঘরবাড়ি/ সে কথা কি আমি জীবনে মরনে কখনও ভুলিতে পারি?
মহা বিস্ফোরণ ঘটল অন্তর্জগতে। এতো হিংস্রশৈলী প্রতিশোধ প্রবণ উচ্চারণ আমি আর কোথাও পাইনি। এরকম কিছু ভাবনা আমারও আছে। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, সামাজিক নৈরাজ্য, নিষ্ঠুরতা, জাতিহত্যা, ধর্মের নামে বাড়াবাড়ি, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, শ্রেণী হিংসা, হত্যা, অন্যায়ভাবে ভূমিভোগ সবকিছুর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। কিভাবে? আমাকে নাড়িয়ে দেয়া সেই ঐন্দ্রজালিক উচ্চারণের ভঙ্গিতে। আমি ভাষা এক নান্দনিক সৃষ্টি। এবং কবিতার মধ্য দিয়ে সেই রূপকে প্রত্যক্ষ করা ক্রোচে  বলেন- কবিতা এক অভিব্যক্ত। প্রতি পংক্তি থেকে স্তবক তৈরি হয় এবং কবির অভিব্যক্তি হয় নিজের ভেতর। কবিতা কোন ম্যাজিক চেম্বারের হারিয়ে যাওয়া খেলা নয় বরং কবিতা হলো গ্রন্থের সাথে পাঠকের সংঘর্ষ। এই ভাবনার ভিতর দিয়ে বইয়ের আবিষ্কার, কবিতার জগতে প্রবেশ। কবিতা খুব ঋণি। কোন পাঠককে মনোযোগী করতে পারছে। কাউকে আবার পারছে না। কিন্তু হঠাৎ একদিন কোন পাঠক আশ্চর্য হয়ে ওই কবিতার কয়েকটি পংক্তি পড়ে চিৎকার করে উঠবে ইউরেকা। আর্কিমিডিসের খাঁটি সোনা আবিষ্কারের মতো। সাহিত্যে একে বলে ইপিফিনি।
কিছু লোক আছে যারা কবিতা অনুভব করে এবং কবিতা শেখাতে চায়। আমি হোর্হে লুইস বোর্হেসের মতো বিশ্বাস করি কবিতা শিক্ষা দেয়াতে নয় কবিতা অনুভবে। আমরা কবিতাকে ভালোবাসার ভেতর দিয়ে ইঙ্গিত ও ইশারা বুঝতে চাই। কবিতার যে ঐতিহ্য তাকে অনুমোদন করি এবং একুশ শতকের সঙ্গে যুক্ত গেঁথে দিই। প্রযুক্তির প্রাগ্রসর বিশে^ পাঠকের রুচির জায়গা নির্ণয় করে বুনতে চাই বীজ। যা’ সংবেদনার বৃষ্টিতে অঙ্কুরিত হবে। পরাস্বপ্ন আর জাদুবাস্তবতায় মিশেলে বিজ্ঞানময় এক জগতের দ্রষ্টা হতে চাই। কোন ধ্বনিই খেলনা নয়, কোন শব্দই অচ্ছুত নয়,  কোনো ভাবনা নয় অনাহূত। নেরুদা যেমন ভাবেন লেখো তা’ যেনো উৎকৃষ্ট হয় সাদা পৃষ্ঠার চেয়ে। এই উত্তেজক ভাবনা প্রশমিত করে দেন পল প্লোদেল। তিনি দান্তের দ্য ডিভাইন কমেদিয়া পড়ে এক খসড়া খাতায় লেখেন ইনফার্নো, পায়গোট্যোরিওএবং প্যারাডিসোতে দান্তে যে দৃশ্য এঁকেছেন হয়তো মৃত্যুর পর সেই রকম জগৎই আমাদের দেখতে হবে। একথা সত্য যে কোন লেখক তার লেখায় যা’ বলেন তা’ প্রমাণের দায়িত্ব তিনি নেন না। দান্তে ও কখনো সে দায়িত্ব নেননি যে তাঁর লেখালেখির ভেতর দিয়ে যা’ তিনি এঁকেছেন তা’ মৃত্যুর পরবর্তী পৃথিবীর চিত্র। সেরকম কিছু নয় তা’ দান্তে ভাবেননি। কোনো কবিও তা’ ভাবেন না। আমিও ভাবি না। কাব্যিক আস্থা হলো অবিশ্বাসকে স্থগিত রাখার ইচ্ছে কিংবা বাধ্য হয়ে বিশ্বাস করা। এজন্য যে কবিতায় যে অবিশ্বাস্য পৃথিবী তা’ এমন কল্পনার প্রতিমা যা স্পর্শ করলে জ্যান্ত হয়ে ওঠে। কোলরিজ এই অভিব্যক্তিতে সাড়া দেন এবং বলেন বিশ্বাস করাতে পারায় যে ক্ষমতা তাই লেখকের ভাবনার শক্তি। ইচমেন পিরানদেল্লো বেকেটের পাত্র-পাত্রীদের আমরা সত্যি ভেবে কখনো কাঁদি কখনো হাসি কখনো উত্তেজিত হই। এক
জাদু আরব্য রজনীর গল্প। অবিশ্বাস্য জীন আর জাদুর জগত। কিন্তু আমরা রূপকথার জগতে গিয়ে ওই লেখাকে ভালোবাসি এবং তা’ বিশ্বাস করি। আমার ভাবতে ভালো লাগে কবিরা সবসময় পাঠকের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। একটা কবিতার যতগুলো পাঠক অর্থ ঠিক ততগুলো। এই প্রলয়ংকারী সত্যের কোন বিপর্যয় নেই কারন কবিতা আমার ভাবনায়, আমার অভিজ্ঞতায়, আমার অনুভবে। এ ভাবনা থেকে সম্প্রতি আমি একটা কবিতা লিখেছি। সেটি তুলে দিচ্ছি বুদ্ধিদীপ্ত পাঠকের জন্য-

কবিতার শিরোনাম ‘প্রতিবিদ্যা’

আমি কোন প্রশিক্ষক নই
যে শিক্ষা দিব-
কিভাবে লিখতে হয় কবিতা

নদীর কল্লোল কিভাবে শুনতে হয়
পর্বতের উচ্চতায় কিভাবে বিস্মিত হতে হয়
তা’ বুঝতে কাউকে বিদ্যালয়ে যেতে হয় না

প্রতিটি মাছ চ্যানেল বিজয়ী ব্রজেন দাস
প্রতিটি পাখি বিখ্যাত বৈমানিক
তাদের কোন গুরুগৃহ নেই


ভূমিষ্ট শিশুকে কেউ বলে দেয় না
কিভাবে কাঁদতে হবে
ভালোবাসার কৃৎ কৌশল শিখতে
যেতে হয়না কুস্তিগীরের কাছে

আর পৃথিবীর সব মহত্তম
মানুষেরা ছিলেন নিরক্ষর

এই কাব্য উপক্রমনিকায় যে ভাবনায় পাঠকের মনোযোগ দাবি করে তা’ ঐতিহাসিক সত্য। সেই সত্যের সাথে স্বপ্নের একটা সম্পর্ক আছে। গৌতম বুদ্ধ ভেবেছিলেন তিনি বৌদ্ধ হবেন। তাঁর জন্মের আগে মা মায়া স্বপ্ন দেখেন তার গর্ভ দিয়ে একটি সাদা হাতি ছয়টি সাদা শাবক নিয়ে ঢুকে যন্ত্রণাহীনভাবে বেরিয়ে গেলো। জ্যোতিষীরা বললেন রাজামশায় আপনার ছেলে যে হবে সে হবে দুনিয়ার রাজা অথবা বৌদ্ধ। সে ছয়টি শাষক নিয়ে জয় করবে ছয়দিগন্ত- উর্ধ, অধঃ সম্মুখ, পশ্চাৎ বাম ও দক্ষিণ সত্যিকার অর্থে বুদ্ধ নৈরজ্ঞনা নদীতে স্মান করে শুচি হলেন। কবি হলেন। তিনি ভাবলেন জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। আমি স্বর্গকে মনে করি গ্রন্থাগার। স্বর্গেতো কোনো ক্ষুধা তৃষ্ণা নেই। সেখানে দাউদ আছে অথৃাৎ ডেভিড মহান কবি তিনি কবিতা পড়বেন। ঈশ্বরকে শোনাবেন। সুযোগপেলে আমিও শুনাবো। কিন্তু এই স্বর্গ কোথায়? এই কবিতা কি স্বর্গে যাবে। আমার কবিতার ভাবনা কি একুশ শতকে?

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ

  1. অনবদ্য লিখনী। খুবই ভালো লেগেছে পড়ে।

    উত্তরমুছুন
  2. ভাবনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ। আর এই বিশ্লেষণ সৃষ্টির
    রহস্যকে ঘিরে ধরছে।
    খুবই ভালো লাগল। কবিতাটিও তাই বলে।

    উত্তরমুছুন