কী লিখি কেন লিখি মিলনকান্তি বিশ্বাস

কী লিখি কেন লিখি 
মিলনকান্তি বিশ্বাস

কী লিখি কেন লিখি 
মিলনকান্তি বিশ্বাস

কবি-প্রাবন্ধিক-ফোকলোরবিদ

লেখকের আত্নকথন



আমার মধ্যে যে অনেকগুলি সত্তা রয়েছে তারা মাঝে মাঝে আমাকে প্রশ্ন করে, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার প্রয়াস করা হয়েছে এই লেখায়। সবসময় সব প্রশ্নের উত্তর যে পাওয় গেছে এমন নয়। যেটুকু পাওয়া গেছে তা পাঠকের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ইচ্ছে হল। প্রথমেই আমার সত্তা আমাকে যে প্রশ্ন করে তা হল আমি কেন লিখি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি নিরুপায় হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মার স্মরণাপন্ন হলাম। এক্ষেত্রে প্রজাপতি ব্রহ্মাই আমাকে ত্রাণ করতে পারেন। প্রজাপতি ব্রহ্মাকে একসময় এরকম একটি প্রশ্ন করা হয়, প্রশ্নটি হল তিনি জগত সৃষ্টি করেছিলেন কেন? এর উত্তরে তিনি জানান যে অহেতুক আনন্দ লাভের জন্য পৃথিবী সৃষ্টি করেছিলেন। তবে এর মধ্যে কিছু না বলা কথা আছে। কথাটি হল প্রজাপতি ব্রহ্মার জগত সৃষ্টির মধ্যে নিজেকে অমর করে রাখার একটা প্রচ্ছন্ন বাসনা যে ছিল ছিলা না একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায় না। সৃষ্টির মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার বাসনা সব স্রষ্টারই থাকে, সবার মতো আমারও যে সে বাসনা নেই তা জোর দিয়ে বলা যাবে না।   
  এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে না খুঁজতেই অন্য আর একটি প্রশ্ন আমার সত্তা আমাকে করে বসে, প্রশ্নটি হল আমি কী লিখি? এর উত্তর খুঁজতে বেরিয়ে আমকে পূর্ববর্তী সাহিতিকদের দ্বারস্থ হতে হয়। তাঁরা সৃষ্টির যে যে কক্ষপথে ঘুরে বেড়িয়েছেন আমার মতো আরও অনেকেই সেই একই কক্ষপথে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেই কক্ষপথগুলির মধ্যে আমার আহ্নিকগতি ও বার্ষিক গতি সবই প্রায় প্রবন্ধের কক্ষপথে। এটাই আমার স্বক্ষেত্র বলা যেতে পারে। এখানে আমি স্বচ্ছন্দে বিচরণ করেছি। প্রবন্ধগুলি মূলত গবেষণাধর্মী। সংখ্যা সত্তরে অধিক। তবে প্রবন্ধ ছাড়াও, অণুগল্প, কবিতার কক্ষপথেও যে মাঝে মাঝে প্রবেশ করিনি এমন নয়। জীবনের কক্ষপথে ঘুরতে ঘুরতে দেখা না দেখার নানা অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটেছে এই সব  গল্প ও কবিতায়। আদেও এগুলি সৃষ্টি হয়ে উঠেছে কীনা সে বিচারের দায়ভার পাঠকের ওপর ন্যস্ত করেছে মহাকাল। সেখানে স্রষ্ঠা নীরব দর্শক মাত্র এবং সম্পূর্ণ অসহায়। 
   ২
   এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে আমার এই লেখা-লেখির প্রেরণা কে ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বের হলে প্রথমেই যাঁর কথা আমার মাথায় আসে তিনি হলেন অধ্যাপক ড. শেখ মকবুল ইসলাম। তিনিই আমার গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখার প্রেরণা বলা যেতে পারে। তাঁর কাছেই আমার লোকসংস্কৃতি চর্চার হাতেখড়ি। আর সৃজনমূলক সাহিত্য সৃষ্টির প্রেরণা হল ছাত্র-ছাত্রীরা। তদের তাগিদেই আমার সৃজনমূলক লেখালেখির জগতে পদার্পণ এবং লেখালেখির সূচনা। জগতে যতকিছু ভালো সম্পর্ক আছে তার মধ্যে অন্যতম হল ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক। তারা অকপটে মনের কথা জানায়। হতে পারে তাদের বিচার-বুদ্ধির একটা সীমাবদ্ধতা আছে, তবুও তাদের প্রশংসা মূল্যায়ন আমাকে অনুপ্রাণিত করে।   
  লেখালেখির ক্ষেত্রে কোনো একজন বা কয়েকজন সাহিত্যিককে কিংবা তাঁদের সাহিত্যকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা কোনো লেখকের পক্ষে সম্ভব নয় বলে আমার ধারণা। কারণ যত সাহিতিকের সাহিত্য আমরা পড়ি, সেই সকল সাহিত্য থেকে কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা লাভ করি, যেটা পরবর্তীকালে চলার পথে এবং লেখালেখির ক্ষেত্রে কাজে লাগে। রবীন্দ্রনাথের, কাজী নজরুল ইসলাম, অদ্বৈত মল্লবর্মণ প্রমুখের জীবন আমকে অনুপ্রাণিত করে। মৃত্যু, অভাব, দারিদ্র্য এঁদের জীবনকে কীভাবে আঘাত হেনেছিল এবং সেই আঘাত উপেক্ষা করে এঁরা কীভাবে জীবনে পথ চলেছিলেন সেটা আমাকে ভাবায়। প্রত্যেকেই জীবনের প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে অগ্রসর হয়ে অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। একারণেই আমার কাছে এঁরা নমস্য। 
    কীভাবে লিখি এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বড়ই কঠিন। আমার গবেষণার ক্ষেত্র যেহেতু লোকজীবন। সেইজন্য ক্ষেত্রসমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলি রচিত হয়েছে।এছাড়াও অদ্বৈত মল্লবর্মণ, মধ্যযুগের বাংল সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, লোকভাষা প্রভৃতি বিষয় আমার গবেষণায় উঠে এসেছে। এগুলির ওপর কয়েকটি গ্রন্থ নির্মিত হয়েছে। যেমন ‘প্রসঙ্গ : লোকসংস্কৃতি’, ‘অদ্বৈত মল্লবর্মণ ও বাংলার লোকসংস্কৃতি’, ‘অগ্রন্থিত অদ্বৈত মল্লবর্মণ’, অদ্বৈত মল্লবর্মণ : স্রস্টা ও সৃষ্টি’ ‘শ্রীগুরবে নমঃ’ প্রভৃতি।
    বেশ কয়েক বছর ধরে অণুগল্প লিখছি। খুব শীঘ্রই সংকলন গন্থ প্রকাশ করার ইচ্ছে রয়েছে। এছাড়াও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের সংকলন গ্রন্থের ভুমিকা রচনা করতে পেরে নিজে সম্মানিত হয়েছি। কীভাবে লিখি এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় দেওয়া মুশকিল। তার কারণ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লেখার ধরন একরকম, অণুগল্প লেখার ধরন আর এক রকম, কবিতা লেখার ধরন অন্যরকম। মনের মধ্যে যখন যে ঘটনা রেখাপাত করে তখন তা তবৎ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে ইচ্ছে হয়। তাই এই প্রয়াস, এই লেখালেখি।   
   ৩
    এবার খুবই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে কোথায় লিখি? এই প্রশ্নেরও এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। গবেষণামূলক প্রবন্ধগুলি বিভিন্ন সাময়িক পত্র-পত্রিকায় এবং সংকলন গ্রন্থে  প্রকাশিত হয়েছে। পত্র-পত্রিকার মধ্যে ‘লোকসংস্কৃতি গবেষণা’, ‘স্বদেশ্চর্চা লোক’, অভিযাত্রী ফেরী’ ‘অন্তর্বাহ’, ‘ভাসমান’, ‘কোরক’, ‘রবীন্দ্রভারতী সোসাইটি পত্রিকা’, ‘আত্মশক্তি’, ‘রবীন্দ্র বীক্ষা’, ’শ্রীময়ী’, ‘কলেজস্ট্রীট’ প্রভৃতি পত্রিকায়। অণুগল্প, কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ‘এষণা’, ‘অচিন পাখি’, ‘স্বপ্ননীড়’, ‘শব্দমূল’ প্রভৃতি পত্রিকায়। 
  সবশেষে যে কথাটি না বললেই নয়, তা হল এই পথপরিক্রমায় কী অর্জিত হল? উত্তরে বলা চলে ভাল-মন্দ দুইই। লেখালেখির জগতে কেউ কাউকে প্রশংসা করতে চায় না। কেউ কাউকে জায়গা ছাড়তেও চায় না। প্রশংসা বা সমালোচনা দুইই একজন লেখকের প্রাপ্য হওয়া উচিত। অর্থাৎ লেখালেখি থেকে অমৃত বা গরল দুইই উঠতে পারে। একজন লেখককে দুইই পানের জন্য তৈরি থাকতে হয়। শুধু অমৃত পান করবো, গরল বর্জন করে - এটা হয় না। কিন্তু আমাদের সমাজে যাঁরা বুদ্ধিজীবী, তাঁদের আশ্চর্যরকম নীরবতা পালন করতে দেখে আশ্চর্য হয়েছি কখনও কখনও। তবে ছাত্রছাত্রী ও বন্ধুবান্ধবদের অকপট প্রশংসা আর ভালোবাসা পরম প্রাপ্তি ও একমাত্র সম্বল এই ক্ষুদ্র জীবনে। 

মিলনকান্তি বিশ্বাস: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন। প্রাক্তন সভাপতি, পশ্চিমবঙ্গ বাউল আকাদেমি, পশ্চিমবঙ্গ সরকার

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

2 মন্তব্যসমূহ