ছড়াকার অমলকান্তি চন্দ
মুখোমুখি
কবি গোবিন্দ ধর
ত্রিপুরার ছড়ায় অন্যমাত্র এনেছে অমলকান্তি চন্দ
গোবিন্দ ধর
কবি ও ছড়াকার অমলকান্তি চন্দ
মুখে মুখে লেগে থাকে তার কত ছন্দ।
"অদ্বৈত স্মৃতি স্মারক সম্মান ২০১৭"
পাচ্ছেন রসমালাই সম্পাদক তরুণ ছড়াকার
অমলকান্তি চন্দ।তার "ছড়ায় ছন্দে বিজ্ঞান "বইটির জন্য এই সন্মান পান তিনি।
স্রোত প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত,"আয়না উড়ি" ছড়া সংকলনও ত্রিপুরার ছড়ার জগতে একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন।আমাদের স্রোত পরিবারের শুভেচ্ছা তার আরো সমৃদ্ধি হোক।
তার কাছে কয়েকটি প্রশ্ন ছুঁড়ে ছিলাম। সেও আমার কৌতুহল নিবারণের চেষ্টা করেছে।এগুলো ছড়াপ্রিয়দের জন্য সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো।
গোবিন্দ :
কবে থেকে লেখালেখি শুরু?
অমলকান্তি :নব্বইয়ের দশক থেকেই আমার লেখালেখি শুরু। আমার খুব মনে পড়ে, তখন আমি ক্লাস নাইনের ছাত্র। ত্রিপুরার দৈনিক পত্রিকারগুলোতে প্রচুর ছোটদের গল্প এবং ছড়া বেরিয়েছিল।
গোবিন্দ :২
লেখতে গিয়ে কেন মনে হলো ছড়া তোমার লেখা দরকার?
অমলকান্তি :আপনি যে ভাবে বলেছেন, ছড়া নিয়ে আমি ঠিক সেভাবে ভাবিনি। কিন্তু এটাও ঠিক যে, লেখার শুরু থেকেই আমি ছড়াকে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছি। আমি মনে করি সরল শিশুরা মায়ের মুখে শুনা ছন্দের পাঠ দারুণ ভাবে উপভোগ করে ।আর শিশু মনকে আনন্দ দেওয়াই আমার লক্ষ্য ছিল।
গোবিন্দ:৩
ছড়ার ছন্দ কিরকম আয়ত্বে আনলে?
অমলকান্তি :আমি মনে করি, ছন্দটা সকলের সহজাত প্রবৃত্তি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে রাত ঘুমানো পর্যন্ত আমার সকলে ছন্দেই চলি। এইভাবে চলতে চলতে সময় কেমন তালে তালে ছুটে যায় অক্ষরের ভেতর, শব্দের ভেতর, তিলে তিলে শুরু হয় আমার ছন্দ শিক্ষা। স্বরবৃত্তে দোলনা দোলা।
গোবিন্দ :৪
ছড়ায় কি শুধু আবোলতাবোল লিখো?
অমলকান্তি :আমি আপনার কথায় একমত নই। ছড়ায় যেমন গাছ ,পাখী,ফুল, প্রজাপতিরা হাসতে থাকে, খেলতে থাকে, ঠিক তেমনি রোমাঞ্চকর কোন দৃশ্যপটও শিশুরা ভালবাসে। নিজকে নায়ক ভাবে তারা। ছড়ায় শিশুদের উপযোগী সরল ছবি আঁকা হয় কল্পনার সাগর পাড়ি দিতে দিতে। আপনি যে বললেন, তার মাঝেও দৃশ্যমান হাস্যরস থাকতে হবে।
গোবিন্দ :৫
ত্রিপুরার ছড়ার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখো?
অমিলকান্তি:ত্রিপুরার শিশু সাহিত্যের আঙ্গিনায় পা রাখলে দেখা যায় অবিভক্ত ত্রিপুরা এবং আজকের ত্রিপুরায় অনেক শিশু সাহিত্যিক শিশুদের মনোজগতে বিচরণ করছেন। বিভিন্ন রসাত্মক কাহিনী এমনকি লোক মুখে প্রচলিত কাহিনী গুলো গল্পের আকারে কিংবা ছড়া কমিকসের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়ে আসছিল। ত্রিপুরার শিশু সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে সত্তরের দশক থেকে শিশুদের সঙ্গে বড়োদের ছেলে খেলা বেশ জমে উঠেছিল। চুনী দাশ, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, অপরাজিতা রায়, অনিল সরকার, অনিল কুমার নাথ থেকে শুরু করে গোবিন্দ ধর, অপাংশু দেবনাথ, পদ্মশ্রী মজুমদার, অমলকান্তি চন্দ, জোর্তিময় দাস,গৈরিকা ধর সহ আরো অনেক শিশু সাহিত্যিক ত্রিপুরার শিশু সাহিত্যকে এক উচ্চতার শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন।
গোবিন্দ :৬
তোমার ছড়ায় কারো প্রভাব আছে মনে করো?
অমলকান্তি :আমি বরাবরই তা মানি না। আমি মনে করি সকলের নিজস্বতা থাকা দরকার। আর তা না হলে অমলকান্তির ছড়া আলাদা করে পড়বে কেন পাঠক।
গোবিন্দ :৭
ছন্দ শেখার সহজপাঠ কি হতে পারে?
অমলকান্তি:আমি মনে করি অনুশীলনই একমাত্র ছন্দ শিক্ষার সহজ পাঠ হতে পারে।
গোবিন্দ :৮
শিশুতোষ ছড়া বলতে ঠিক বুঝায়?
অমলকান্তি :ছোটদের উপযোগী করে লিখা ছড়া বলতেই আমরা শিশুতোষ ছড়া বুঝি। সরল শব্দ দ্যোতনায় স্বর বৃও ছন্দের দারুণ চলন ভঙ্গিমা। যা গাছ, পাখীদের কথা বলবে। রসাত্মক আমেজের মধ্যে দিয়ে শিশুদের কল্পনার জগতে বিচরণ করতে উৎসাহী করবে।
গোবিন্দ :৯
আমাদের রাজ্যে শিশুদের বয়স অনুসারে ছড়া কিংবা অন্য কিছু লেখা হয়?না হলে কেন?
অমলকান্তি :মোটেই হয় না। আমরা বুড়োরা যারা শিশুদের সঙ্গে ছেলে খেলা খেলতে আসি, আমদের মধ্যেই এই অক্ষমতা প্রকাশ পায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের মত আমাদের রাজ্যে বয়স অনুসারে শিশু সাহিত্য রচনা মোটেই হয়ে উঠে না।
গোবিন্দ :১০
শিশুদের পাঠ্য তালিকায় কি ত্রিপুরার সাহিত্য ছড়া কবিতা নাটক রাখা দরকার?
অমলকান্তি :নিশ্চয়ই রাখা দরকার। হাতে গুণা দু একজনের ছড়া পাঠ্য তালিকায় আছে। আমরা ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি।
গোবিন্দ :১১
তুমি তো কবিতাও লেখো?কবিতা বলতে কি বুঝো?
অমলকান্তি :
কবিতা আমার সংসার। সংসারের প্রতিটি মানুষের সাথে যেমন মায়া মায়া খেলা চলে কবিতার সাথে ঠিক তেমনি। রোজ সকালে রান্নার পসরা সাজিয়ে বসেন আমার স্ত্রী। কটু কথায় মাঝে মাঝে আমার কবিতার শরীরে আগুনের আঁচ লাগে ।আরেকটু দূরে সরে বসি। সংসারী হওয়ার চেষ্টা করি। আগুনের তাপে তাপে সংযমী হওয়ার চেষ্টা করি। কবিতাকে ভালোবাসি বলে আমিও রান্নার পসরা সাজাই। শব্দেরা কখনো হলুদের রং-এ, কখনো রাঙ্গা মরিচের রং-এ পুরণ দিলেই সুস্বাদু গন্ধ ছড়ায়। ভবঘুরে আমি, আমার মাঝে তিলে তিলে জেগে উঠে মোহ। এক সমুদ্র ঘোরের মাঝে পাল তোলা জীবন ডিঙ্গিটা টলতে টলতে ছুটতে থাকে নিলাচলে। আমি আমার মাঝে বাঁচতে শিখি, আমি কবিতাকে ভালোবেসে বাঁচতে শিখি। জীবনের পাঁচমিশালী রং-এ সাজতে থাকে আমার কবিতা।
গোবিন্দ:১২
তোমার কবিতা বইয়ের নাম বলো?কেমন হয়েছে বলে মনে হয়?পাঠক কিরকম নিয়েছে বইটি?
অমলকান্তি :আমার দুটো কবিতার বই এখন পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছে। প্রত্নমুহূর্ত আর ভালোবাসা পাথর কুচি।
সব সৃষ্টিতো সন্তানের মত। সন্তানকে যারা ভালোবাসেন তারা ঠিকই বুকে টেনে নিয়েছেন।
গোবিন্দ :১৩
ইদানিং ত্রিপুরায় অনুগল্প চর্চা চলছে।তুমিও লিখছো।তা কেমন লাগছে?
অমলকান্তি :ছড়ার মত অণু গল্প লিখতে আমার খুব ভালো লাগে। আমি মনে করি অণু গল্পের শারীরিক গঠন ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও জীবনের কথা বলে।
গোবিন্দ :১৪
ছড়া কবিতা অনুগল্প কোনটিতে তুমি সাবলীল?
অমলকান্তি :যেহেতু আমার ছড়া লেখা দিয়ে লেখালেখি শুরু, তাই ছড়াতে আমি সাবলীল।
গোবিন্দ :১৫
ভবিষ্যত পরিকল্পনা বলো?
অমলকান্তি :শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই।
গোবিন্দ :১৬
তুমি লিটল ম্যাগাজিন "রসমালাই" সম্পাদনাও করছো।কেমন লাগে।উল্লেখযোগ্য সংখ্যা কি রসমালাইয়ের?সামনে কি কোন পরিকল্পনা আছে?
অমলকান্তি :.আমি রসমালাইয়ের প্রতিটি সংখ্যাকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যা মনে করি কারণ রসমালাই বরাবর নবীনদের জায়গা করে দিচ্ছে। আর এভাবে কাজ করতে ভীষণ ভালো লাগে। ত্রিপুরার ছড়াকারদের নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে আছে।
গোবিন্দ :তোমার বইগুলোর নাম বলো?
অমলকান্তি :.১)আয়না উড়ি (ছড়া) ২)হাসির ছড়া পোস্ত বড়া (ছড়া) ৩)ছন্দ ছড়ায় বিঞ্জান ৪)চচ্চড়ি (ছড়াযৌথ) ৫)প্রত্নমুহুর্ত (কবিতা) ৬)ভালোবাসার পাথরকুচি (কবিতা)।।
গোবিন্দ :১৭
সম্মান ও পুরস্কার বলো?
অমলকান্তি :অদ্বৈত মল্ল বর্মন পুরস্কার, ও স্রোত পুরস্কার।
গোবিন্দ :১৮
ত্রিপুরার সাহিত্যের ভবিষ্যত কি হবে বলে মনে করো?
অমলকান্তি :আমি মনে করি ভালো। উত্তর পূর্বাঞ্চলে ত্রিপুরার লেখালেখি আলাদা ভাবে সনাক্ত করা যায়। লেখালেখিতে নবীন প্রবীনদের সমন্বয় সাধন ঘটছে। এটা সবচেয়ে ভালো দিক।
গোবিন্দ :১৯
ত্রিপুরার ছড়া কি আলাদা করা যায়?
অমলকান্তি :বর্তমানে ত্রিপুরার ছড়াকে আলাদা করা যায়।
গোবিন্দ :২০
এখন অব্দি তোমার উল্লেখযোগ্য কাজ কি?
অমলকান্তি :রসমালাইয়ের সম্পাদনা।
গোবিন্দ :২১
কিসে আনন্দ পাও?
অমলকান্তি:ছড়া ও কবিতা লিখতে।
গোবিন্দ :তোমার সাহিত্য জীবনে সাফল্য আসুক।শুভেচ্ছা।
০৪:০৪:২০১৯
1 মন্তব্যসমূহ
গুণী ব্যক্তিত্ব তথা ছড়াকার অমল কান্তি চন্দ সম্পর্কে অনেক তথ্য পেয়ে ঋদ্ধ হলাম। এভাবে আরো ব্যক্তিত্বের কথোপকথন চলতে থাকবে ভালো হবে। অমলবাবু একটা কথা ভালো বলেছেন,,, নবীন ও প্রবীণ কবি লেখকদের সমন্বয়ে সাহিত্য চর্চা এগিয়ে যাচ্ছে। এটা ঠিক ও বাস্তব।
উত্তরমুছুন