কী লিখি কেন লিখি কচি রেজা

কী লিখি কেন লিখি
কচি রেজা 


কী লিখি কেন লিখি

কচি রেজা 

কবিতা কিভাবে লেখা হয় আমি জানিনা। জানিনা কোথা থেকে কেমন করে আসে। একটি কবিতা প্রসব হবে বলে আদৌ কি কোনো আসন ভঙ্গি রয়েছে! 

যেভাবে ধ্যান করার জন্য দীপাবলির আলোয় ধূপ জ্বালিয়ে পট্টবস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে কপালে কপোলে চন্দন এঁকে বসা হয়!

নাকি গাছ তলার নাকি পাঁচ তলার দাবি কবিতার!

আমি যাপনের মধ্যে মাঝে মাঝে বিষন্ন হই--সে কী কবিতা লেখার অনুভব বেদনা? সে কী অসুস্থ সন্তানের আরোগ্যকামনার থর থর ? সন্তান কি কবিতার চেয়ে বেশি বা কম? 

আমি কি কবিতাকেই আশ্রয় ভাবি যখন হতাশ হই অথবা কন্ঠে জড়াই আশালতা ? 

এইসব অবান্তরতায় আমার দেহ কুশবিদ্ধ হয় অথবা আবৃত হই আঁশে। যেনবা আমি মাছ। গাছ । কান্ড খুঁড়ে যাচ্ছে কোনো কাঠঠোকরা। 

কিছুর উন্মোচন হবে বলে কবিতা লিখিনা। আমার সবই উন্মোচিত অথবা সবই গোপন। সেই মোড়োক আমি খুলতে পারিনা। প্রদর্শন করতে পারিনা। 

মাঝে মাঝে হাতে ঠেকে যায় সেই চাবি। তখন ভুল সড়ক দিয়ে হাঁটি। হাঁটতে হাঁটতে পেয়ে যাই কিছু কবিতা। 

যেমন সেদিন খুব ভোরবেলায় দেখি, এক সারি গাছের ঊর্ধশাখার কাঁচা পাতা। মনের ভেতর ঘনিয়ে উঠলো কিযে লাবণ্য! কি তাদের রঙ । কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে উধাও হলো সব। 

ভাবি, 

১।' চলে যাচ্ছে এক একটি শরতকাল'। 

কখনো কখনো যাপনে দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকে কেবল। শ্বাস নিতে গিয়ে অপারগ হয় শ্বাসযন্ত্র। অক্সিজেনের কল্পিত মজুদ যেন তখন মনে হয় অন্য কোথাও। অন্য কোনো নীল দ্বীপের বিজনে। বলতে ইচ্ছে করে আরও কল্পিত কাউকে, 

২। 'কেউ বলেনা , চলো দ্বীপবাসি হই, পাখিতে নিঃশ্বাস নিই'' ।

কিংবা হাঁটতে বেরোলে যে অজস্র ঘ্রাণ ছাতিমের ফুলে ভরা গাছটি পাশ কাটিয়ে যেতে হয়----- 

মনে মনে কে বলে উঠলো, 

৩। কি ঘ্রাণ তোমার দু"হাতে! 'তুমি কি ছাতিম তলা দিয়ে এসেছ! '

কোথাও না কোথাও রোজ কেউ মারা যাচ্ছে নিজের মৃত্যুও তো নির্দিষ্ট।

৪। 'এক আশ্চর্য ভঙ্গিতে আমি মরে যাব।'

এক বসন্তের সন্ধ্যায় ধানমন্ডির রাস্তায় দাঁড়িয়ে জনসমাগম দেখতে দেখতে একটি রিক্সায় দেখি একটি ছেলে ও মেয়ে। কিসুন্দর সেজেছে। হঠাত হাওয়া এসে আধ ঢাকা হয়ে গেল মেয়েটির মুখ। 

মন গুন গুনিয়ে উঠলো, 

৫। 'লোধ্ররেণু, তুমি আজ এত সেজেছ কেনো?'

৬।' প্রার্থনার পর আমি অনুভব করি নিজের ভাংগা কন্ঠস্বর;' লেখা হয়েছিল অসাড় কোনো দিনে ।

৭।'সংসারের নিয়মে আমি এখন জুতোর বাক্সে ঘুমাই' কি জানি এমন চরম সত্য কিভাবে লেখা হয়ে গেছিল।

এইভাব, এই বোধের ক্ষুদ্রাংশ দিয়েই আমি কবিতা বানাই।


এক একটি শরতকাল চলে যাচ্ছে। এভাবেই যায় । জলের রঙে বদলে যাচ্ছে মাছ 

শিকারির ফাতনা একবার দুলে ওঠে বিষন্ন চিরুনির মত। একদিন ভোরে, বহু দূরের 

একসারি গাছের ঊর্ধ শাখার পাতায় পাতায় দেখি অপ্রসুত শরত 

পর পর কয়েকটি খুব ভোরে, আমি, আমার চোখ দেখি, ঝরে পড়ছে একমাত্র কুয়াশাই 

শরত নয় ?

একবারই পরেছিলাম টিপ। কখন যেন পরে !


কেউ বলেনা, চলো, দ্বীপবাসি হই,পাখিতে নিশ্বাস নিই

আবছায়া চোখ, চোখের ড্রপস যেন বিচিত্র হরিণের সাক্ষাত

একদিন স্নান করেছিলাম মহুল নদীতে

ভুল করে রেখে এসেছি যে ক্ষীন কোমর

মাঝে মাঝে দর্পণে দেখি সেই সম্ভাবনা

এখন এই অর্ধজীবন, এ জীবন আমি চুরি করেছি

বাদামঅলার কাছ থেকে ।


কি ঘ্রাণ তোমার দু;হাতে, তুমি কী ছাতিম তলা দিয়ে এসেছ !

রোজ ভিক্ষা পেরিয়ে যেতে যেতে আমিও শিউলি কুড়াই অথবা

ভোরবেলা হই পাখি সামলানো আকাশ !

রোদ্দুর মেখে নিই এত যেন সাঁতারের সময় অক্লান্ত থাকি মাছের

কানকোর মত !

ঠিক তাই ছাতিম গাছটার নীচে তোমার অপেক্ষা ফিরিয়ে

আমি পিঠে জড়িয়ে নিই দুপুর ! বেদনার ওজন নিতে নিতে ভাবি 

আমার সব রকমের বিচ্যুতি , সব রকমের অভিশাপ কেনো এত বেদনামুখী !

লুব্ধ হয়ে উঠি দুপুরের জন্য, এই দুপুর বেদনার চেয়ে কম !


আশ্চর্য এক ভঙ্গিতে আমি মরে যাব।মনে হবে,

এইতো চোখ মেলে চেয়ে হেসে টেনে নিচ্ছি র‌্যাঁবোর বই

যেন আমি আগের মতই

হ্যাঁ, মৃত্যুকেও আমি এই ভঙ্গিতেই পাঠ করব !


লোধ্ররেণু, তুমি আজ এত মেখেছ কেনো? বসন্ত নিয়ে

আমি কোনোদিন লিখিনি। যেন দুঃসময়ের এক পৃষ্ঠা

হঠাত উড়ে আসে কালান্তর থেকে। অপরিমিত চুলে

ঢেকে যায় মুখ। আমি হারাতে হারাতেই বলি, ফুটেছ কেন যে!

আমার ছিলনা রক্তপ্রীতি, তুমি পদ্ম বেছে নিলে। কেটে গেছি ডানায়।


প্রার্থনার পর আমি অনুভব করি নিজের ভাঙ্গা কন্ঠস্বর। প্রার্থনা

অনুমোদিত হয় ভেবে আবার হাঁটু ভেঙ্গে বসি। মাঝে মাঝে

স্ফিংক্সের মত পাথর সময় আসে,। এক ক্যারাভ্যাব বালু দিয়ে

কারা যেন বানায় আমাকে। এ বিষয়ে আমার হাসিই শুদ্ধ যন্ত্রনা।


সংসারের নিয়মে আমি এখন জুতোর বাক্সে ঘুমাই। জুতোর বাক্সে ঘুমাতে আমার ভালো লাগেনা। 

তখন পুতুলগুলোর কথা মনে পড়ে। পুতুলগুলোও রাত্রে জুতোর বাক্সে ঘুমাতো।মাঝে মাঝে বিছানায় 

আমার কাছে নিয়ে আসতাম। দেখতাম,পুতুলগুলোর হাসি মুখ। পুতুলগুলো একদিন এক বাক্স থেকে 

আর এক বাক্সে স্থানান্তরিত হয়েছিল। সেদিন কিন্তু ওদের কান্না আমি শুনেছি। অথচ হঠাত একদিন 

বিসর্জনের বাঁশি বেজে উঠলে আমার মায়ের ভারি আঁচলে দুলে ওঠে ভারি রুপোর চাবি। মন্ডপের 

ছায়ায় নিভে যায় চার পাঁচ হাজার নীল বাতি।প্রতিমার অসহায় কান্না কেউ শুনতে পায়নি সেদিন। 

আমিও পাইনি। বরং কাঁধে আঁচল ঘুরাতে শিখেছিলাম। অনেক প্রস্তুতির পর কিশোরি মাথার চুলে 

শিখেছিলাম খোঁপা বাঁধতে।নতুন শাড়ি, ব্রোকেড ব্লাইজ, কিশোরি চুলগুলো কতটা লম্বা এখন । 

আমিও সেদিন সেজেছিলাম মিথ্যে মা। আসলে সব মা-ই মিথ্যে।

আজ যখন একটি হাত আমার ঘুমন্ত মুখ হাতড়ায়। চুল বেঁধেছি কিনা, চোখ ভিজে কিনা, দম আটকে 

মা যখন বলে, খেলবি? পুতুল বানিয়ে দেব আবার!'আমার ছেঁড়া কাপড়ের পুতুল কি এত কেঁদেছিল 

সেদিন আমার মায়ের ভাঙ্গা পুতুলের মত!

--------------------------------------------------------------------------:কবি:: কচি রেজা, ( নিরোজা কামাল )। জন্ম গোপালগঞ্জ জেলার গোপালগঞ্জ শহরে। ছোটোবেলা থেকে দেশের বাইরে। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাস। জন্ম ৮ এপ্রিল 

কিছু প্রকাশিত বইঃ- অবিশ্বাস বেড়ালের নূপুর 

ভুলের এমন দেবতা স্বভাব 

অন্ধ আয়না যাত্রা- 

-মমিও কাচের গুঞ্জন 

দুই বাংলার যৌথ কবিতা , নাকছাবির ইতিকথা 

মনে করো 

নির্বাচিত কবিতা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ