কথাসাহিত্যিক হারাধন বৈরাগী মুাখোমুখি কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর

কথাসাহিত্যিক হারাধন বৈরাগী 
মুাখোমুখি
কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর 



কথাসাহিত্যিক হারাধন বৈরাগী 
মুাখোমুখি
কথাশ্রমিক গোবিন্দ ধর 


পেশায় শিক্ষক। কবিতা,গল্প ও গদ্যে সাবলীল বিচরণ। 'হাসমতি ত্রিপুরা', 'হৃদি চম্প্রেঙ', 'খুমপুই পাড়ায়'(কাব্যগ্রন্থ)। 'খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই'-ত্রিপুরার জনজাতি জীবনের আদি হৃদিমালা;একটি ব্যতিক্রমী গদ্যগ্রন্থ।।'বুরাসা'(গল্পগ্রন্থ),'সমকালীন ত্রিপুরার পনেরোজন কবির কবিতা (যৌথসংকলন),'ব্যাটিং জোন'(অখণ্ড বাংলার নির্বাচিত অণুগল্প সংখ্যা/ যৌথসংকলন ),'নীহারিকা নির্বাচিত ত্রিপুরার তরুণ কবিদের কবিতা'(যৌথসংকলন)।'৫৪জন গল্পকারের ২১৬টি অণুগল্প' (যৌথসংকলন)।'ত্রিপুরার সাহিত্যে নদ-নদী ও গোবিন্দ ধর'(যন্ত্রস্থ),ছায়াতরু(ত্রিপুরার সাম্প্রতিক ছোটগল্প/যৌথসংকলন),'তবু ভালোবেসে যাবো'(একটি প্রেমের গল্প সংকলন /যৌথ)।নিয়মিত লিখে চলেছেন এপার ওপারের সমসাময়িক বিবিধ পত্রসাহিত্য ও লিটলম‍্যাগাজিনে। অসম্ভব জঙ্গলআউলিয়া।ভালোবাসা জঙ্গল,জনজাতি,জুমজীবন-জীবননিকষ।

গোবিন্দ ধর :১

সাম্প্রতিক আত্মোউপন্যাস হৃদয়ে রাইমা।তাতে হারাধন বৈরাগী নিজেকে মেলে দিয়েছেন অন্যমাত্রায়।
আপনার জঙ্গল মাদকতার ঘোরলাগা মুহূর্ত বিষদে বলুন।

হারাধন বৈরাগী :১

মাদকতা কিংবা মদালসা,যাই বলুন,এ আমার জীবনে এক অসম্ভব ঘোরই বলতে পারেন।এই ঘোর আমার সেই শৈশব থেকেই।এ আমি এড়াতে পারি না। জন্মসূত্রে যদিও শ্রীভূমিসন্তান কিন্তু বাস্তুসূত্রে উত্তরজেলার উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টের মাটি জল হাওয়ায় লালিত এক অসূর্যস্পর্শা কিরাতপুত্র আমি।চারদিক ঘিরে থাকা বিশালবপুর আকাশ ফুঁড়ে ওঠা গর্জন বৃক্ষ,সুন্দি,নাগেশ্বর, গামাই করই,চামল,জারুল ,রাতা,গেউয়া, রঙ্গিয়া,আওয়াল গুটগুটি,কদম,বান্দরলাঠি,চালিতা,ছাতিম,বিচিত্র প্রজাতির বট বাঁশগাছ --ইত্যাদি অসংখ্য নামগোত্রহীন বৃক্ষের ঘনঘোরজঙ্গলে‌র মাঝে বড় হয়েছি।উঁচু নীচু ঢেউখেলানো ভূমিরূপের শরীর জুড়ে অসংখ্য টিলা,লুঙ্গা ও জলাভূমি বিচিত্রবিধ তৃণ-লতা-বেত-গুল্ম,নল-খাগড়া বুঠাং প্রভৃতি দ্বারা আচ্ছাদিত,দিনেও কোথাও  সূর্যালোক প্রবেশ করত না।পুবের দিকে তাকালেই চোখে ভাসত,উত্তুঙ্গ নীলাভ জম্পুই এক কুহকময় পিলে চমকানো দেওলাপাহাড়।জম্পুই মানেই লুসাই বা নৃমুণ্ডশিকারীর আবাসস্থল। এই পাহাড়ের পাদদেশের জঙ্গলেই ছনবাঁশ বেতের ঘর করেছিলেন আমার বাবা।ঘনঘোর জঙ্গলের মাঝে আমাদের ঘরের উপর ছাতামেলে দাঁড়িয়ে থাকত বিশাল এক কালবৃক্ষ বট।সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বটফলের লোভে কিংবা আশ্রয়ের খোঁজে ময়না হরিয়াল রাজকবুতর বৃঙ্গরাজ,মথুরা,ধনেশ--প্রভৃতি হরেকরকম পাখির ছিল আনাগোনা ও কলরব।চোখ মেললেই দেখতাম  চারপাশের জঙ্গল যেন একটা প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানা।দিনেরাতে শোনতাম শুধু বন্য জীবজন্তুর বিচিত্র কলস্বর,চিৎকার,শিৎকার, বৃংহনধ্বণি যা থেকে গা শিহরিত হয়ে উঠতো।আর যখনই কোন পশুপাখির শব্দ শুনতাম ,আমার অকুতভয় দিদিমনিকে (ঠাকুমা) বলতাম সেই প্রাণীটাকে দেখাতে,নাম বলতে।যতটুকু সম্ভব তিনি আমাকে সেই প্রাণী সম্পর্কে ধারণা দিতেন।না জানলে সেই প্রাণীটা সম্পর্কে একটা অতিরঞ্জিত পিলে চমকানো গল্প বলতেন।আর জঙ্গল সম্পর্কে আমার অসম্ভব উৎসুক্য বেড়ে উঠত।যখন বাল্যশিক্ষার বয়েস হয়েছে দাদার সাথে স্কুলে যেতাম।তখন পথ অতিক্রম করতো কখনো হাতি,বিলাইখাঙ,হাঁসখাঙ,শজারু,বনরুই,উদবিড়াল,খাটাস,নেউল,গন্ধগকুল,উল্লুক,বিবিধ প্রজাতির সর্প,উরন্তকাঠবিড়ালি,শৃগাল,শূকর, খরগোশ,বিবিধ প্রজাতির সর্প,বাঘ,ভল্লুক হরিণ--প্রভৃতি-প্রাণী!মাথার উপর চড়ত টিয়া,তুতা,ময়না,হরিয়াল,বনমোরগ,মথুরা,ধনেশ,রাজকবুতর,শকুন--প্রভৃতি পাখি। আমাদের বাড়ি থেকে কিছু দূরে আরও দুটি টিলায় ছিল আরও দুটি শ্রীহট্টীয় বাঙালি পরিবার।কিন্তু জঙ্গলের জন্য তাদের সাথে আমাদের ছোটদের যোগাযোগ হতো না।তাই আমার খেলার সাথী আমার দাদা, দিদিমনি ,কাজলাদিদি(বাবার মামী) ছাড়া আর কেউ ছিল না। আমার দাদা সেই স্কুলবয়সেই ছিল অকুতভয়।দাদা প্রায়ই পাহাড়িবাড়িতে বেড়াতে যেত।রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তার কাছে শোনতাম তাদের জীবনে গল্প।আর পাহাড়িদের সম্পর্কে জানার আগ্রহ অসম্ভব তাড়িত করত।দাদা অনেকসময় রাতে কোথাও হাওয়া হয়ে যেত।পথে নাকি মাঝেমধ্যে তার সাথে দেখা হত অশরীরীদের।আর বাড়ি এসে আমাকে শোনাত পেত্নি,ব্রহ্মদস্যি,বুরাসা --প্রভৃতি অশরীরীর গল্প।দিদিমনি কিংবা কাজলাদিদির(বাবার মামী) সাথে আমি বাড়ির চারপাশে সর্বদা ঘুরঘুর করতাম।পশুপাখি শ্বাপদ কীটপতঙ্গ যখন যা দেখতাম,নাম ও স্বভাব জানার জন্য তাঁদের জর্জরিত করতাম।একটা প্রাণী যখন অন্য একটা প্রাণীকে খেয়ে ফেলতো কিংবা একটা কীট-পতঙ্গ আরেকটাকে জড়িয়ে ধরত,তখন নানা প্রশ্নবাণে তাদের বিব্রত করতাম।দিদিমনি বলতেন,এ অইল জঙ্গলের নিয়ম।একজন আরেকজনকে খাইয়া বাঁচব।একজন আরেকজনকে আদর করবো।যেমন মানুষও করে।এরাও মাইনষের মতোই,তারার ও ঘর গিরস্থি আমরার মতোই আছে।আর আমিও তাদের সংসার দেখতে উদগ্রীব হয়ে উঠতাম। জঙ্গলের আরও গভীরে কি আছে জানা ও দেখার আগ্রহে সর্বদা এক ঘোরের মধ্যে থাকতাম।এই থেকে মাঝেমধ্যে আমি জঙ্গলপথ ধরে বেরিয়ে পড়তাম।এই থেকে আমাকে সর্বদা পাহাড়ায় রাখা হত।এই পাহারাদার ছিলেন আমার কাজলাদিদি।একটি ঘটনা আমাকে জঙ্গল জংলী মানুষ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসা অসম্ভব বাড়িয়ে তুলেছিল।একদিন দেখি বাবা জঙ্গল কেটে ভূমি আবাদ করছেন সকালবেলা।আর বাবার সমবয়স্ক এক পাহাড়ি এসে বাবার সাথে কথা বলছে,তাঁর হাতে একটি পোড়ানো সাপ।বাবার সাথে কথা বলতে বলতে হাত দিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো করে খাচ্ছে।আমি অবাক হয়ে শুধু দেখছিলাম।এই থেকে তাদের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আমার জানার আগ্রহ তুঙ্গে উঠেছিল।পরে জেনেছিলাম তিনি আমার বাবার বন্ধু হয়ে উঠেছেন।তাদের বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির পুবে একটি উচুঁ টিলায়।সেই থেকে ওই বাড়ি সম্পর্কে আমার চরম আগ্রহ জেগে ওঠেছিল,আর আমি একদিন কাউকে না বলেই তাদের বাড়িমুখি হলাম।জঙ্গলের তলে তলে ঝুঁকে ঝুঁকে  হাঁটছি,সহসা একটি অচেনা হলুদবালক আমার মুখোমুখি হল,সেও এদিকে আসছিল।সামনা সামনি হতেই একজন আরেকজনকে দেখে ভয়ে পেছন ফিরে উভয়ই বাড়িমুখো দৌড়। কিন্তু পরে এই বালকটি কোথায় দৌঁড়ে গেল,এই নিয়ে আমার আগ্রহ বেড়ে গেল।একদিন ফের আমি এইপথ ধরে এগিয়ে যাই।গিয়ে দেখি জঙ্গলের মাঝে একটি টিলার উপর দুটি বিশাল টংঘর।বাবার বন্ধু সেই সাপখাওয়া লোকটির বাড়ি।তিনি বেত দিয়ে মাছধরার একটি যন্ত্র তৈরি করছেন।আমাকে দেখে ঘরে উঠে বসতে বললেন।আমি সংকোচ করছিলাম। কয়েকটি ছেলেমেয়ে একসাথে উঠোনে খেলাধূলা করছে।আমাকে দেখে তারা খেলা বন্ধ করল।কাছে এসে অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগল এবং আমিও।দেখি সেদিনের পালানো ছেলেটিও এখানে,সবকটি কিশোর কিশোরী নাগা।বড়দের পড়নে গামছা ও পাছড়া।সবার গায়ের রঙ হলুদমাখা,খুব রহস্যময় মনে হল।তাদের এইভাবে দেখে একটা ঘোরের মাঝে চলে গেলাম।সহসা একটি হলুদযুবতীমেয়ে এসে  আমাকে হাতে ধরে টেনে নিয়ে গেল তাদের টংঘরে।আমার নাম জিজ্ঞেস করল,বললাম।দিদিকে খুব মায়াবিনী মনে হল।আমিও নাম জানতে চাইলাম বলল,পারি।টংঘরের অদূরেই একটি লুঙ্গা ।নীলাভজল।মাচাঙ থেকে সেদিকে তাকিয়ে দেখি কয়েকজন মহিলা জলে সাঁতার কাটছে।শরীরের উর্ধাংশে কোন বস্ত্র নেই।এক একজন জলদেবী যেন।শশা চিনার এনে দিদি আমার গা-ঘেষে বসে টাক্কল দিয়ে কেটে কেটে আমাকে খেতে দিচ্ছিল অসম্ভব মমতায়।আর ভাঙা বাংলায় কথা বলছিল।দিদির শরীর থেকে একটা বুনোফুলের ঘ্রাণ যেন আমার নাকে এসে লাগছিল।এই ঘ্রাণ আমাকে যে কি মোহিত করে তুলছিল-এটা ভাষায় বলা যাবে না।এই দিদিই পরে আমি ও আমার দাদার স্কুলে যাওয়ার সাথী হয়েছিল।জঙ্গল পথে তিনকিমি গেলেই ছিল আমাদের স্কুল। পিসন্ডির দিনে যখন স্কুলে যেতাম তখন দাদা দিদি গাছে চড়ে পিসন্ডি পাড়ত।আমাকে গাছে উঠতে দিত না।তারা মগডালে উঠে আমাকে ছুড়ে দিত আর নীচে বসে আমি খেতাম।দেখতাম মগডালে উঠার জন্য তাদের একটা প্রতিযোগীতা চলত।মাঝে মধ্যে দাদার সাথে পারিদিদি অভিমান করত,কথা বলতো না।তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত দিদি।আর আমি দিদির গায়ের সেই বুনোঘ্রাণে মোহিত হয়ে যেতাম। একদিন দাদার সাথে অভিমান করে আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে গেল।আমাকে আর আসতে দিল না।দিদির সাথে সারারাত রইলাম।দিদির চুলে মাথা গুঁজেই সারারাত ঘুমালাম।সেই ঘ্রাণের রহস্য আজও খুঁজে পেলাম না।জঙ্গলে গেলেই সেই ঘ্রাণ আজও এসে নাকে লাগে।এই থেকেই আমি মদালসা হয়ে উঠেছি।আজ দাদা নেই ।পারিদিদি কোথায় জানিনা। কিন্তু যখ‌নই জঙ্গলে যাই আর সেই ঘ্রাণ এসে আমার নাকে লাগে,তখন টের পাই আমার পারিদিদিই যেন,আমার কাছে এসে মাথায়  হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।আর আমি জঙ্গলময় হয়ে উঠছি।তবে যতদিন যাচ্ছে,জঙ্গল হারিয়ে যাচ্ছে।সেই ঘ্রাণ ক্রমশ ফিঁকে হয়ে আসছে।এই থেকে আমি হাঁপিয়ে উঠছি। ইদানিং জঙ্গল ছেড়ে মঙ্গলে যাওয়ার একটা প্রতিযোগীতা চলছে।আমি মঙ্গলে যেতে চাই না। কিন্তু ক্রমে বুঝতে পারছি একদিন আমাকেও বুঝি মঙ্গলে যেতে হবে।কারণ তখন এখানে আর জঙ্গল থাকবে না,প্রাণ থাকবে না।মঙ্গলে গিয়ে এই ঘ্রাণ পাব তো?

গোবিন্দ ধর :২

হারাধন বৈরাগীর হৃদয়ে রাইমায় উপন্যাসের রূপ এরকমই দিয়েছেন কথাকার,এই চরাচর বিস্তৃত পর্বতসঙ্কুল মহীরুহ, সলিলধারা ও শস্যেভরপুর হরিৎভূমি ভ্রামনিকের নন্দনপট। একইসাথে প্রেমিকের হৃদয়নিকেতন। এই বনভূমি- মনোভূমিও।  কোন সরকারী বাধকতায় নয়, শিব্রাইপ্রতিম প্রিয়জনদের ভালবাসায় আহিত হয়েই জন্ম জন্মান্তরে ফিরে আসতে চাই এই কিরাতভূমে। যেখানে সাহেব, কেশরি, সাম্পাইতি, রোয়াং, রামজয়, কাজরী,  রাইমা, হৃদিতার মতো স্বর্গের নিভৃতচারীদের গাইরিঙহৃদয় গহনের অতল স্পর্শ। গামাই, গর্জন, সুন্দি, চামল, বাঁশ, উদালের ছায়ায়। কাকলু, চাকুমারা আর চুয়াকের মায়ায়।  রাইমা সাইমার অবিন্যস্ত তটরেখায়, জুড়িনারী তৈংতুইয়ার উষ্ণ বুক থেকেই যেন দেখতে পাই পৃথিবীর প্রথম আলো। আমি তো নিমিত্তই। এই স্মৃতিচারণ জগবন্ধুরই মহিমা।
আপনি কিছু বলুন।


হারাধন বৈরাগী :২

আমার প্রথম কথাটাই হল,'হৃদয়ে রাইমা' উপন্যাস নয়,এ আমার খণ্ডযাপনের হৃদয় নিকষ বলতে পারেন।তবে আপনার কথাও উড়িয়ে দেওয়া  যাবে না।যদিও এটি একটি অঞ্চলে কয়েকবছর যাপিতজীবনের স্মৃতিচারণ,কিন্তু এই যাপনের হৃদয়ে লুকিয়ে আছে একটি উপন্যাস।অবশ্য এ পাঠকের ব্যাক্তিগত বোধের বিষয়।এ রাজ্যে অনেকেই পাহাড়ি লোকসংস্কৃতি নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন,এখনও লিখছেন।এই সকল উপন্যাসে উঠে এসেছে তাদের জীবন ও সংস্কৃতির রূপ।আমি এই গ্রন্থে ইচ্ছে করেই পাহাড়ি জীবনের সেই শিল্পীতমুখটি এড়িয়ে গেছি ।আমি একজন ভিন্নসংস্কৃতির মানুষ হয়ে তাদের কিভাবে দেখেছি,কিংবা তারা ভিন্নসংস্কৃতির মানুষ জনকে কিভাবে দেখছেন।পাশাপাশি জঙ্গলের ভেতর যে মদালসা ঘোর,সেই আমার পারিদিদির ঘ্রাণ যা যেকোন জঙ্গলে গেলেই হন্যে হয়ে খুঁজি, এই তৃমাত্রিক রসায়নই আমার এ গ্রন্থের উপজীব্য বিষয়।আগেই বলেছি, দিন দিন সেই ঘ্রাণ ফিকে  লাগছে আমার নাকে। তবুও আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি,আমার নাকের সেই ঘ্রাণে মোহিত করে তুলতে পাঠকের নাসারন্ধ্র ও ‌হৃদয়। কতটুকু সফল কিংবা বিফল তা অবশ্যই বিচার করবেন পাঠক ও সময়।

গোবিন্দ ধর :৩
জগবন্ধু পাড়ায় আমরা তিনজন কেমন লাগছিলি?

-জগবন্ধু পাড়া !এ পাড়া আমার জীবনের মলুইমা। কর্মসূত্রে সেখানে না গেলে  তার দর্শন পেতাম কিনা সন্দেহ। এখানেই আমার রূপান্তরকামিতায় আবাহন,বঙ্কিমদেবনাথ থেকে হারাধন বৈরাগীর জন্মগ্রহন।আর এতে অনুঘটককের ভূমিকা নিতে আমার মলুইমা-ই বুঝি সুকবি অপাংশু দেবনাথ ও শব্দশ্রমিক গোবিন্দ ধরকে আমার  আবাসস্থল জগবন্ধুপাড়ায় চুম্বকের মতো টেনে  এনেছেন।সেদিন রাইমার বোন সাইমার জলে অবগাহন শেষে ঈশ্বরাইপাড়ার ঈশ্বরীদের হৃদয় ছুঁয়ে  পিছলিঘাটের মৎসকন্যাদের বৃষ্টিজলে আপনাদের সাথে আমার পরিভ্রমণ।মনে হয়েছে, এরপর আর কোন ভ্রমণ থাকে না।তারপর বিবাগীব্যারাকে আমার ভার্য্যা রত্না নাথের উপস্থিতিতে কবিতাপাঠ ও আপনাদের আমার হাসমতি ত্রিপুরার মুখদর্শণ,মনে হয়েছে এরপর বুঝি আর কোন দর্শন থাকে না।

হারাধন বৈরাগী :৩
শর্মানদী কিংবা সাইমা আপনার কাছেই ছিলো।ব্যারাক থেকে তার কলকল প্রবাহধ্বনি আজও কানে ভাসে।অথচ আপনার কবিতায় জঙ্গল যতখানি ধরা দিলো কুহকমায়ায় ততখানি নদী নেই। কারণ কি?

-শর্মাকে তো লোকে সাইমাও বলে।আর এই নদীর উৎস তো সেই কুহকময় জঙ্গল আচ্ছাদিত পাহাড়ই।আর আমি তো কিনা বিশ্বাসে বৈরাগী।তাই ছেলেবেলা যে পাহাড়জঙ্গলকে ভালোবেসেছি,যার ভালোবাসায় আমি আবাল্যজারিত,যার নাম আমার চিদাত্মায় গেঁথে গেছে;জগবন্ধু পাড়ায় শর্মার মতো নদীকে বুকের কাছে পেলেও,সমুদ্র পরিভ্রাজন শেষে আর নদী পরিভ্রাজনের প্রয়োজন আছে বলে মনে করিনি।কিংবা বলতে পারেন, নদী আমাকে টানের মতো টানতে পারেনি।তাই বলে সাইমাকে উপেক্ষাও করিনি।যখনই একাকিত্ব অনুভব করেছি,সাইমা কিংবা রাইমার কাছেই নিজেকে সাময়িক হলেও সমর্পণ করেছি।

গোবিন্দ ধর :৪
কাঞ্চনপুর নামের ইতিহাস বলুন?

হারাধন বৈরাগী :৪
-কাঞ্চনপুর নামটি অর্বাচিন নয়,প্রাচীনও নয়।কাঞ্চনপুর নামের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক আছে। পাহাড়িদের দাবী দেওনদীর পশ্চিম তীরবর্তী কাঞ্চনছড়া থেকেই কাঞ্চনপুর নামের উৎপত্তি।তাদের দাবী বাঙালিরা গতশতকের পাঁচের দশকের শুরুতে এখানে আসার আগেই কাঞ্চনছড়ার পাড়ে দেওতীর ঘেঁষে একটি হাট বসত। অপরদিকে বাঙালিদের দাবী সস্তিসমিতি নামক একটি সমবায় সংস্থাকে মহারাণী কাঞ্চনপ্রভাদেবী দেওউপত্যকায় ১০০০দোন ভূমিদান করেন।আর কাঞ্চনপ্রভার নাম অনুসারেই এই জায়গার নাম হয় কাঞ্চনপুর।আবার ত্রিপুরা রাজসরকারের একটি প্রসিডিংমতে ১৯৪৬ইং কৈলাসহর বিভাগের অধীন মহারানী কাঞ্চনপ্রভাদেবীর নামানুসারে "কাঞ্চনপুর"নামে একটি মহকুমা গঠন করা হয়। আমার মনে হয় কাঞ্চনছড়া ও কাঞ্চনপ্রভা উভয় নামই এই স্থান নাম উৎপত্তিতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছে।

গোবিন্দ ধর :৫
কাঞ্চনপুরের সাহিত্য চর্চা নিয়ে বিস্তারিত লিখুন।

-বিংশ-শতকের সাতের দশক থেকে পরিযায়ী কবিরা  বিভিন্ন সময়ে কর্মসূত্রে  কাঞ্চনপুরে এসেছেন। এসেছেন কথাসাহিত্যিক শ‍্যামাচরন ত্রিপুরা(হাথাইবুরাসা) ,গল্পকার ননী কর,কবি সেলিম মুস্তাফা,গল্পকার দেবব্রত দেব,কবি সত্যেন্দ্র দেবনাথ,কবি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং,গল্পকার বলাই দে,কবি মনিকা বড়ুয়া,প্রাবন্ধিক শ্যামলকৃষ্ণ বনিক,কবি কবি চিত্রামল্লিকা চাকমা,কবি ও ছড়াকার অমলকান্তি চন্দ,কবি শেখর ভট্টাচার্য ,কবি বিকাশরাই দেববর্মা  প্রমুখ। 

সাতের দশকের মাঝামাঝি কবিতাপূরুষ  সত্যেন্দ্র দেবনাথ কাঞ্চনপুরে ছিলেন। সংসার বিবাগী এই মানুষটি কোথাও বেশীদিন থিতু হতে পারেননি। মূলবাড়ি ছিলো বাংলাদেশের সমসেরনগরে। পারিবারিক কোনো কারনে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন এখানে, সেই যৌবনে। বাড়ি ঘরে আর ফিরে যাননি।হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার। কাঞ্চনপুর এসে প্রথম পূর্তদপ্তরের অফিসের  কাছে বাড়ি করে ফার্মেসি খুলে ডাক্তারি করতে থাকেন। তাকে লোকে জয়বাংলা ডাক্তার বলে ডাকতো। সেখানে কয়েক বছর থেকে কাঞ্চনপুরের বৌদ্ধমন্দির রোডে চলে আসেন।  ১৯৮০এর নভেম্বরে আরেক কবিতাপূরুষ সেলিমমুস্তাফা ধর্মনগর থেকে  কাঞ্চনপুর এসে  গ্রামীন ব্যাংকে প্রথম চাকুরীতে যোগদান করেন।তিনি কাঞ্চনপুর থানার পুকুরের উল্টো দিকে সতীশ চাকমার বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। ।১৯৮৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এখানে ছিলেন।ইতিমধ্যে আগরতলা থেকে  এখানে এসে গ্রামীন ব্যাংকে চাকুরিতে যোগদান করেন আরেক প্রতিভাবান যুবক দেবব্রত দেব। এখানে এসে কবি সেলিম মুস্তাফার সাথে একই ঘরে ভাড়াটে উঠেন। ফলে তাদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে।আর  সেলিম মুস্তাফার মাধ্যমে কবি সত্যেন্দ্র দেবনাথের সাথে তার পরিচয় হয়। 

মহাকাল  বুঝি তাই চেয়েছিল। এখানেই সত্যেন্দ্র আর সেলিমের সাহিত্যচিদাত্মায়  অসম্ভব জারিত হোন দেবব্রত । লিখতে থাকেন কবিতা ও গল্প।আসলে সত্যেন্দ্র দেবনাথ ও সেলিমমুস্তাফার সাথে দেবব্রত দেবের দেখা হওয়াটা ছিল সময়ের অপেক্ষা। এর অন্তরালে সূচিত হয়ে যায়  ত্রিপুরার গল্পের এক অন্যভূবনের রচয়িতার সময়ের বালিজলে শাণিত হওয়ার পালা। ।সেলিমের সাথে দেবব্রতের  দেখা না হলে আজ ত্রিপুরার গল্পভূবনের ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হত। 
সত্যেন্দ্র কাঞ্চনপুর পুরে কবিতার যে অক্ষর খোদাইয়ের সূচনা করলেন,সেলিম ও দেবব্রত তাতে আগুন প্রজ্জ্বলন করলেন ।শুরু হল,কাঞ্চনপুরসাহিত্যের এক নুতন অধ্যায়। সত্যেন্দ্র দেবনাথের ফার্মেসীর পেছনে একটি কক্ষে প্রতিদিন  তাদের সাহিত্যে আড্ডা বসতো। দেশ পত্রিকার কবিতার পৃষ্ঠা ছিঁড়ে সারা দেয়ালে আঁঠা দিয়ে লাগিয়ে সত্যেন্দ্র দেবনাথ তার ফার্মেসির পেছনের রুমটা সাজিয়েছিলেন আড্ডার জন্য ।এই আড্ডায় ধীরে ধীরে যোগ দিতে থাকে এই অঞ্চলের কিছুসংখ্যক স্থানীয় যুবক।দাশু দেবনাথ, চন্দ্রলাল নাথ(চন্দ্র নাথ ছদ্মনামে লিখতেন) বিশ্বজিৎ সাহা, সুজিত সিংহবড়ুয়া(সাক্যসিংহ বড়ুয়া ছদ্মনামে লিখতেন) অতুল নাথ, সীতেশ চৌধুরী, অজিত সাহা, বাবুলবিকাশ বড়ুয়া, কর্ণমনি রিয়াং, কৌশিক ভট্টাচার্য, বিমলেন্দু দেব, গোপেন্দ্র নাথ, জনেশ আয়ন চাকমা সুকুমার চাকমা, মিনা চাকমা প্রমুখ।এই সাহিত্যচক্রের প্রভাবে দেওভ‍্যালির কাঞ্চনপুর, দশদা ও তৎসংলগ্ন  মাছমারা পেঁচারতল নিয়ে একটা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে ওঠে। 

তাদের লেখা ও ত্রিপুরার অন্যান্য অঞ্চলের কবি ও গল্পকারদের লেখা নিয়ে কাঞ্চনপুর থেকে বেরোতে থাকে  একে একে ওই সময়ের শক্তিশালী কয়েকটি লিটলম্যাগ-মন্বন্তর, এই বনভূমি, ছায়াপথ।ওই সংখ্যাগুলিতে কবি অরুন বণিক, নকুল রায়, কিশোররঞ্জন দে, সুবিনয় দাশ, রীতা ঘোষ প্রমুখ কবি ও গল্পকারদের লেখাও ছাপা হত।সত্যেন্দ্র দেবনাথের  সম্পাদনায় এই বনভূমি,মন্বন্তর ছায়াপথ সাইক্লো করে বের হত।দেবব্রত দেব ও সত্যেন্দ্র দেবনাথের যৌথ সম্পাদনায় মন্বন্তরের বের হয়েছিল একটি ছাপা সংখ্যা।এই কাগজগুলি কাঞ্চনপুরে এই প্রথম সাহিত্য সংস্কৃতির মননজমিন কর্ষণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিল। এই আড্ডাখানা ছাত্রযুবাদের মনে সৃষ্টি করেছিল অসম্ভব আলোড়ন।

সত্যেন্দ্রদার সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিল বিশ্বজিৎ সাহার মাধ্যমে। বিশ্বজিতের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল।কবিতা লিখে সত্যেন্দ্রদাকে দেখতাম। সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফিরতে হত বলে তাদের সান্ধ্যআড্ডায় যোগ দিতে পারতাম না।আমার এক বন্ধু বিমল চাকমা খুবই সাহিত্যপ্রেমী ছিল।ইচ্ছে করলেই লিখতে পারতো। কিন্তু রাজনীতির চোরাস্রোতে একদিন সে হারিয়ে গেল।

এই ত্রয়ী ছোটোদের জন্য তিনটি দেওয়াল পত্রিকাও করেছিলেন। । একটা খুব সুন্দর হওয়াতে  কাঞ্চনপুর স্কুল (মর্নিং সেকশন) দেওয়ালে টাঙানোর জন্য নিয়ে যায় ।  অজিত সাহার ভাইয়ের চায়ের দোকানে ১৫ দিন পর পর আরও  দুটো দেয়াল পত্রিকা টাঙানো হত । এমন  একটার নাম ছিল দেও ।এটি একবার  টানানো হয় কাঞ্চনপুর থানার দক্ষিণ পশ্চিম কোণে পোস্ট অফিসের বারান্দায়।।আর এই 'দেও'য়েই আমার প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল। কবিতাটির দুটি লাইন এরকম-'আমি চলেছি কোন মরাপ্রান্তর দিয়ে /জীবনের স্বপ্নগুলো ডুবে যায় অতল গহ্বরে।' সেদিন কি আমার মাঝে উন্মাদনা, আজ ভাষায় প্রকাশ করার নয়। 

একবার দেবব্রত দেব সেলিম মুস্তাফা শিবেন্দ্র দাশগুপ্ত মাছমারায়  গৌতম চাকমার বাড়িতে গিয়ে সারারাত কাজ করে একটা দেয়াল পত্রিকা লেখেন ।এটার নাম ছিল 'মনোবীজ' । সেটা সমীরণ বড়ুয়ার 'নীলাচল' নামে চায়ের দোকানে টানানো হয়েছিলো। "এই বনভূমি" হাতে লিখে দিতেন শিবেন্দ্র দাশগুপ্ত ।তিনি কাঞ্চনপুর গ্রামীন ব্যাংকের আরেক কর্মচারী। কমলপুর  ছিলো তার বাড়ি । 

ব্লক থেকে সাইক্লোতে ছেপে এনে দিতো সত্যেন্দ্র শুক্লবৈদ্য নামে ব্যাঙ্কের একজন পিওন । সমরেশ দেব  তখন কাঞ্চনপুর ব্লকের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। তিনি ব্লকের  সাইক্লোমেশিনে ছাপার সুবিধা দিতেন।বেশ কিছু সংখ্যা বেরিয়েছিল । তবে ছাপা হয়ে  বেরোয় একমাত্র ''মন্বন্তর' । ফার্মেসীর বরদাকান্ত শর্মা( শ্যামাসঙ্গীত গাইতেন ) তাঁদের সংবর্ধনা দেন এই কাগজের জন্য । সেটাই ছিল কাঞ্চনপুর থেকে প্রকাশিত প্রথম কোনো মুদ্রিত কাগজ । এখানে বলা দরকার-কাঞ্চনপুরে ১৯৮১তে প্রথম প্রকাশিত সাহিত্যপত্র হলো-এইবনভূমি।দ্বিতীয় মন্বন্তর। তৃতীয় ছায়াপথ।
।ছায়াপথে লিখতাম।ছায়া পথে ছাপা আমার প্রথম কবিতা 'জলজ'।কবিতাটি এরকম-পাহাড়ের ভেতর আরেক পাহাড়/গন্ধহরিণের পিছু পিছু অসংখ্য ব্যাধ--/।এই থেকে উৎসাহিত হয়ে আরেকটি লিটলম্যাগ 'সমিধ'কাঞ্চনপুরের স্থানীয় দুই যুবক কৌশিক ভট্টাচার্য ও বিমলেন্দু দেব  যগ্মভাবে সম্পাদনা করতেন।এই কাগজের সাথে স্থানীয় আরেক যুবক জড়িত ছিল নাম দেবাশীষ নাথ।এটির কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশের পর আর বের হয়নি।

কাঞ্চনপুর কবিতা উপত্যকা ।সেলিম মুস্তাফার দুটি কাব্যগ্রন্থ - ছোরার বদলে একদিন, ইতি জঙ্গল কাহিনী, বিশ্বজিৎ দেবের নিরিবিলি সেন্ট আইটেম, ডাঃ শ্যামলকৃষ্ণ বণিকের আনন্দ বাজারের ডায়েরি ও কথাকার শ্যামল বৈদ্যের-করপুটে নাইসিংপাড়া উপন্যাসের সৃষ্টি এই উপত্যকার জল হাওয়া ও মাটিতেই।

১৯৮৩তে সেলিম চলে গেলেন পানিসাগর দেবব্রত ফিরে গেলেন আগরতলায়। সত্যেন্দ্র আরও কিছুদিন রইলেন। তারপর  সত্যেন্দ্রও চলে গেলেন কৈলাশহরে। গ্রামীণ ব্যাংকে এলেন আরেক কবি  চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং । তিনি ও সুব্রত সাহা নামে একজন, সত্যেন্দ্র দেবনাথের ছায়াপথ সম্পাদনা করেছিলেন। চন্দ্রকান্তদার সাথে বিশ্বজিৎই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল।এতে লিখতেন মনিকা বড়ুয়া, সমরেন্দ্র রায়সরকার, অপরাজিতা ঘোষাল, বিশ্বজিৎ সাহা প্রমুখ।বিশ্বজিৎ ছাড়া বাকী তিনজন ছিলেন বহিরাগত। অবশেষে তারাও চলে গেলেন। নির্বাপিত হল এখানে সাহিত্যের আগুন। এই আগুন দাউদাউ জ্বালাবার জন্য কেউ আর রইল না।

আমার বাড়ি ছিল কাঞ্চনপুর থেকে ১২কিমি উত্তরে উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টে। আমি ছায়াপথের সম্পাদকের সাথে আড্ডা দিতে বিশ্বজিৎ সাহার ডাকে পায়ে হেঁটে কাঞ্চনপুর আসতাম।তখন এখানে গাড়িরও যথেষ্ট অভাব ছিল।ছায়াপথ  ছাপা হত বিশ্বজিতের দাদা সুজিত সাহার ছাপাখানায়।বিশ্বজিৎ ও আমি মাঝেমধ্যে ছাপার হরফগুলি সেটিং করতাম। প্রুফ দেখতাম।হরফে ছেপে ম্যাগাজিন বের করা সহজ কাজ ছিল না। যখন কাজ চলত, আমি উন্মুখ হয়ে থাকতাম কবে ম্যাগ বের হবে।নির্ধারিত দিনে উজানমাছমারা থেকে এসে বিশ্বজিতের সাথে দেখা করতাম।দেখতাম ছাপার কাজ তখনও শেষ হয়নি।এত পথ হেঁটে এসে কাঞ্চনপুর থেকে মনখারাপ করে আবার হেঁটে বাড়ি ফিরে যেতাম।এরকম অনেকবার হতো। কিন্তু যখন ম্যাগ বের হতো সকল দূঃখ ভূলে যেতাম। 

নব্বইয়ের দশকে বিশ্বজিৎ সাহার সম্পাদনায় কাঞ্চনপুর থেকে' দেওভ্যালী সংবাদ' ও দশদা থেকে 'দেও' নামে আমার সম্পাদনায় আরও দুটি লিটলম্যাগ  প্রকাশিত হয়।দেওভ্যালী সংবাদের সাথে শুরুতে স্থানীয় তিন যুবক দেবাশীষ নাথ, অনুপম নাথ ও রূপক নাথ জড়িত ছিল।আমি তখন দশদাতে চাকরি করতাম। 

শূন্য দশকে আলোর ফুলকির মতো"দেও" এর আরও দুটি সংখ্যা খুব কাঁচা লেখা নিয়েই  বের হয়েছিল। আমি তখন দশদা থেকে  কাঞ্চনপুর চলে আসি। তাই কাঞ্চনপুর থেকে 'দেও' এর আরও দুটি সংখ্যা বের করি।এই সংখ্যা দুটির একটির আমন্ত্রিত সম্পাদক ছিলেন উজানমাছমারার আরেক যুবক দেবাশীষ নাথ। তাকে কম্পিউটার দেবাশীষ বলে লোকে চিনত। কারণ সেই প্রথম  কম্পিউটার শিখে এসে কাঞ্চনপুর বাজারে প্রথম সত্য নাথের হোটেলের একটি কক্ষে সিল্কস্ক্রিনে ছাপাখানা খুলে।এই ছাপাখানা  থেকেই ওই দুটি সংখ্যা বের হয়।আমি ও স্থানীয় লেখকরা ছাপার পর নিজেরাই বাঁধাইয়ের কাজ করেছি।এই কাগজ গুলিতে তখন  লিখেছেন,চন্দ্র লাল নাথ, দেবাশীষ নাথ,রূপক নাথ, অনুপমা নাথ, রোজি নাথ, লাকি চন্দ, দেবাশীষ নাথ(অহল্যাপূর),লক্ষণ নাথ,কৃপাময় নাথ, সীতেশ চৌধুরী, বাবুল বিকাশ বড়ুয়া, সজারু (সজারু আমার ছদ্মনাম) প্রমুখ।

২০০৮এর সেপ্টেম্বর এ 'এই বনভূমি'র রজত সংখ্যা বের হয়। সম্পাদনা করি আমি নিজে।এই সংখ্যার উপদেষ্টা মণ্ডলীতে ছিলেন সীতেশ চৌধুরী, বিশ্বজিৎ সাহা ও বিশ্বজিৎ দেব।এটি বিশ্বজিৎ সাহার ছাপাখানা (পূরাতন সরকারী মার্কেট) থেকে বের হয়েছিল। এতে লিখেছিলেন বিশ্বজিৎ দেব, সেলিম মুস্তাফা, সন্তোষ রায়, গোবিন্দ ধর, পদ্মশ্রী মজুমদার, লক্ষন নাথ, সজারু, দেবাশীষ নাথ, কৃপাময় নাথ, নীলিমা দেবনাথ, অরুণ চাকমা, চিত্রামল্লিকা চাকমা, শৈলেন্দ্র শর্মা, অনুপমা নাথ, সীতেশ চৌধুরী বিশ্বজিৎ সাহা, সুজিত চন্দ্র দাস, লালমোহন নাথ, দেবব্রত দেব, কিশোর রঞ্জন দে। এখান থেকেই ২০১১তে- দেওভ্যালি সংবাদের দুটি সংখ্যা বের হয়। এতেও স্থানীয়রাই লেখেন। দীপক নাথ, মৃত্যুঞ্জয় শর্মা, মনিলাল নাথ, বঙ্কিম দেবনাথ প্রমুখ।

২০১৪,২২অক্টোবর দেওমুখ নামে আরেকটি সাহিত্যপত্র প্রকাশিত হয়।এটি কাঞ্চনপুরের একটি ক্লাব নেতাজী ক্রীড়াসংঘের মুখপত্র।আমিও এর সম্পাদক হিসাবে ছিলাম।এর দ্বিতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয় ২০১৫, ২৩ জানুয়ারি। এই সংখ্যাগুলিতে লিখেছিলেন নিরঞ্জন চাকমা, মালবিকা চাকমা, চিত্রামল্লিকা চাকমা, বঙ্কিম দেবনাথ, মনিলাল নাথ, অতুল চন্দ্র নাথ, সুজিত চক্রবর্তী দেবাশীষ রায়, সধাকর নাথ, বিশ্বজিৎ সাহা, মৃত্যুঞ্জয় শর্মা প্রমুখ।ত্রিপুরা রাজ্য মাতৃভাষা মিশনের মুখপত্র কাঞ্চনশ্রীর প্রথম সংখ্যা ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ এ প্রকাশিত হয়।এটির সম্পাদক ছিলেন অমলকান্তি চন্দ।১৮ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ বড়হলদি রাধামাধবপুর হাইস্কুলের হীরকজয়ন্তীপালন উপলক্ষে একটি স্মরণীকা প্রকাশিত হয়। আমি এটিরও সম্পাদক মণ্ডলীতে ছিলাম। 

বর্তমানে ত্রিপুরার অন্যতম ছড়াপূরুষ অমলকান্তি চন্দ আছেন আমাদের মাঝে।তিনি ছোটদের কাগজ 'রসমালাই' র সম্পাদক ।এর প্রথম প্রকাশ ২০০৯ এ।তিনি  কদমতলা (ধর্মনগর) থেকে(১-১-২০০৯) কর্ম সূত্রে বদলি হয়ে   কাঞ্চনপুরে আসেন।অমলকান্তি এখানে এসেই আত্মীয়  অমিতাভ সিংহ বড়ুয়ার সাথে মিলে 'রসমালাই' নামে একটি শিশু কাগজ বের করার পরিকল্পনা করেন।আর কিছুদিনের মধ্যেই  কাঞ্চনপুরের কৃষিবিভাগের  অফিসে দুজনে মিলে এক রাতে ডিটিপি আর প্রুপ দেখা শেষ করেন। পরদিনই দেবাশীষ নাথের ছাপাখানা থেকে এটি ছেপে বের করা হয়। রসমালাইয়ের  নামাকরণ করেছিলেন ত্রিপুরার বিখ্যাত ছড়াকার বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী।১২জানুয়ারী ২০২০ এ প্রকাশিত রসমালাইর নামলিপি করেছেন কবি মিলনকান্তি দত্ত।রসমালাই এখন শিশু সাহিত্যের কাগজ হিসেবে এপার অপার বাংলায় উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তা অর্জন করে চলেছে।কাঞ্চনপুররের মাটি ও মানুষকে নিয়ে লেখা তার বইগুলি হল: ১)আয়না উড়ি -ছড়ার বই। 
২)প্রত্ন মুহূর্ত 
৩)ভালোবাসার পাথরকুচি -কবিতার বই 
৪)চচ্চড়ি -যৌথ ছড়ার বই 
৫)ছন্দছড়ায় বিজ্ঞান -বিজ্ঞানের ছড়ার বই। এই বইটি অদ্বৈত পুরস্কার প্রাপ্ত। 
অমলকান্তির মূল বাড়ি  কমলপুর হলেও জন্ম কাঞ্চনপুরের দশদায়।তার বাবা  তখন দশদাতে চাকরি করতেন ।তার মামার বাড়ি দশদায় ও শ্বশুরবাড়ি কাঞ্চনপুরে। ।দেওভ‍্যালকেই নিজের মাতৃভূমি ভাবেন। ভালোবাসেন।কাঞ্চনপুর সাংস্কৃতিক বিকাশে আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

কাঞ্চনপুর থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হচ্ছে লিটলম্যাগ বনতট। সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে এর যাত্রা শুরু হয়েছে।নামকরণ করেছেন কবি সেলিম মুস্তাফা।মূলত এটি কবিতার কাগজ হলেও অনুগল্প, প্রবন্ধও ছাপা হয়। 

আমাদের মাঝে মধ্যমনি হয়ে আছেন আরেকজন-কথাকার দিব্যেন্দু নাথ।স্থানীয় যুবক। বাড়ি  শান্তিপুরে।দোপাতা নামে তার একটি লিটলম্যাগ আছে। ২০১৮ অক্টোবর  থেকে এর যাত্রা শুরু হয়েছে। কলেবর ধীরে ধীরে বাড়ছে।ইতিমধ্যে সে  কাঞ্চনপুরের জল হাওয়া মাটি ও মানুষ নিয়ে  "আইলাইনার" নামে একটি উপন্যাস লিখেছে। আরো লেখা চলছে। 

আমাদের একটি সাহিত্য আড্ডা আছে। এর নাম - দো-বন-রস।এর শুরু হয়েছে ২০১৭এর গোড়ার দিকে।এখানে আছেন কবি রুজি নাথ, কবি চিত্রামল্লিকা চাকমা,মালবিকা চাকমা, সুলেখক নিরঞ্জন চাকমা, বিজয়া চাকমা, পঙ্কজ দেবনাথ অনুপমা নাথ,কবি শ্যামল রিয়াং,অনিরুদ্ধ চাকমা, গোপেশ সূত্রধর প্রমুখ। 

কা‌ঞ্চনপুরে বইমেলা ও মাতৃভাষা মিশন ও নেতাজী মেলা উপলক্ষে এখানে কবিতা পাঠ হয়েছে।সামর্থ্য মতো কবিদের আমন্ত্রণ করা হয়েছে। তাছাড়া কখনো জম্পুইর টানে, আমাদের টানে দূর দূর থেকে উড়ে এসেছেন স্বনামধন্য কবি ও কথাকারগন।কবি সন্তোষ রায়,মিলনকান্তি দত্ত, কথাকার শ্যামল বৈদ্য,কবি ও কলামিস্ট তমালশেখর দে, কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী বাপ্পা চক্রবর্তী, উমা মজুমদার অপাংশু দেবনাথ,গোবিন্দ ধর, পদ্মশ্রী মজুমদার গৈরিকা ধর, গোপালচন্দ্র দাস, অভীককুমার দে, সঞ্জীব দে, অনুরাগ ভৌমিক, বিপুলকান্তি চক্রবর্তী, রাজেস চন্দ্র দেবনাথ, পার্থ ঘোষ, সুমিতা পালধর,উত্তরবঙ্গের ইসলামপুর থেকে সুশান্ত নন্দী,কলকাতা থেকে কবি হাসমত জালাল,দিল্লি থেকে নাট্যকার ত্বরিৎ মিত্র,ছত্রিশঘর থেকে কথাকার আরতি চন্দ প্রমুখ কাঞ্চনপুরকে ভালোবেসে এখানে বেড়াতে এসেছেন।জম্পুই ঘুরে গেছেন।

সম্প্রতি স্রোত সাহিত্য সংস্কৃতি পরিবার কাঞ্চনপুর শাখা গঠিত হয়েছে( ৯/৫/২০১৯ইং) ।

প্রধান উপদেষ্টা :নিরঞ্জন চাকমা
যুগ্ম উপদেষ্টা -হারাধন বৈরাগী
মুখ্য সম্পাদক -অমলকান্তি চন্দ
সভাপতি -রোজী নাথ
সাহিত্য সম্পাদক -অনুপমা নাথ
মুখপত্র সম্পাদক -দিব্যেন্দু নাথ
সংগীত সম্পাদক -অর্পনা বড়ুয়া
নৃত্য সম্পাদক -কৃষ্ণা নাথ
প্রচার সম্পাদক -অভিজিৎ সিংহ  বড়ুয়া
কোষাধ্যক্ষ -অমিতাভ সিংহ বড়ুয়া

সদস্য /সদস্যা

গোপেশ সুএধর, পঙ্কজ দেবনাথ, মালবিকা চাকমা, রাজ নাথ, শ্যামল রিয়াং, বিজয়া চাকমা, শিলু চন্দ, সুব্রত দেবনাথ, জয়ব্রত নাথ।

১৯শে মে ২০১৯ ' রেইঙ' নামে চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের একটি লিটলম্যাগের আন্তর্জাতিক সংখ্যা কাঞ্চনপুর পাবলিক লাইব্রেরীতে প্রকাশিত হয়।অনুষ্ঠানে মোড়ক উন্মোচন করেন কাঞ্চনপুর দ্বাদশমান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  কবি  ভারতভূষণ চাকমা , উপস্থিত ছিলেন আগরতলা বীরচন্দ্র স্টেট লাইব্রেরীর  সিনিয়র লাইব্রেরীয়ান শ্রী মনোরঞ্জন দেববর্মা,কবি মালবিকা চাকমা, রেইঙ এর সাধারণ সম্পাদক কবি  অরুণ চাকমা।

গত ১২ জানুয়ারি ২০২০ অনুষ্ঠিত হয়েছে অনুভাবনায় কাঞ্চনপুর সাহিত্য উৎসব ।কাঞ্চনপুরের তিনটি লিটলম‍্যাগাজিন দোপাতা, বনতট ও রসমালাইর যৌথ উদ্যোগে।কবিতা উপত্যকা কাঞ্চনপুরে এই নান্দনিক সাহিত্য উৎসবটি সম্পন্ন হয়েছে আনন্দঘন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। 

ত্রিপুরা, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের খ্যাতনামা কবি, কথাকার ও ছড়াকারদের নিয়ে এদিন চাঁদের হাট বসে কাঞ্চনপুরের রেভিনিউ ডাকবাংলোর কনফারেন্স হলে।সকাল ১১টা থেকে অনুষ্ঠান শুরু হয়,আর শেষ হয় বিকাল ৪টায়।এই উৎসবে যোগদান করেন এ রাজ্যের কবি ও প্রাবন্ধিক বিমল চক্রবর্তী,গল্পকার দেবব্রত দেব, কবি সেলিম মুস্তাফা, কবি সন্তোষ রায়, কবি সমর চক্রবর্তী,কবি ও লোকগবেষক অশোকানন্দ রায়বর্ধন, কবি অপাংশু দেবনাথ, কবি গোবিন্দ ধর, কবি পদ্মশ্রী মজুমদার, কথাকার জহর দেবনাথ, কবি জ্যোতির্ময় রায়, শ্যামল বৈদ্য প্রমুখ। ।বাংলাদেশ থেকে কবি জাকির আহম্মদ, পশ্চিমবঙ্গ থেকে কবি সুশান্ত নন্দী ও সন্দীপ সাউ  এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই উৎসব উপলক্ষ্যে আটজন কবি ও সাহিত্যিককে দোপাতা, বনতট ও রসমালাই  সম্মাননা প্রদান করা হয়। এরা হলেন অশোকানন্দ রায়বর্ধন, অপাংশু দেবনাথ, জ্যোতির্ময় রায়, জহর দেবনাথ, পদ্মশ্রী মজুমদার, সুশান্ত নন্দী, জাকির আহম্মদ, শ্যামল বৈদ্য।অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন  কবি নিশিথ রঞ্জন পাল, কবি সাঁচিরাম মানিক, কবি তমাল শেখর দে,  কবি পার্থ ঘোষ, বাপ্পা চক্রবর্তী , কবি অভিজিৎ চক্রবর্তী , কবি অভীক কুমার দে ও তরুণ কথাশিল্পী জয় দেবনাথ , কবি বিজন বোস , তরুণকবি দেবাশীস চৌধুরী, নীলিমা দাশগুপ্ত, রাজীব মজুমদার, সাচিরাম মানিক, পাপিয়া ভৌমিক, মাম্পি চন্দ, রোজি নাথ, রণিতা নাথ, চন্দন পাল, গোপাল চন্দ্র দাস, গৈরিকা ধর প্রমুখ।এই অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন অশোকানন্দ রায়বর্ধন। সঞ্চালক কবি অভীককুমার দে।উদ্বোধক মণ্ডলীতে ছিলেন এপার অপারের খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকগন। ওই দিন সন্ধ্যারাতে স্রোত পরিবার কাঞ্চনপুর শাখার একটি মনজ্ঞ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর মুখপত্র - খারাঙ প্রকাশিত হয়। 

কাঞ্চনপুর সাহিত্য উৎসবে সম্মাননা গ্রহণের পর এই  মনজ্ঞ অনুষ্ঠানের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে কবি অপাংশু দেবনাথ বলেন, - জানি সে যোগ্যতা আমার নেই তবু কেউ যখন ভালোবেসে হাতে তুলে দেয় এমন আলোাছটা। ঋণ বেড়ে যায় ভালোবাসার মানুষদের প্রতি।সাহিত্যের প্রতি। সাহিত্য কখনোই বিলাস নয়। আত্মবিলাপও নয় । সাহিত্যের একজন অতি সাধারণ ছাত্র হিসেবে এতোটুকু বুঝি, যে কবিতা আপনাকে অনেক কিছু দেয় সে আপনার থেকে কেড়েও নেয় অনেক কিছুই। কবিতা এক অপূর্ব প্রেমিকা। তার সাথে যার প্রেম হয়, তাকে ভাবা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। সে কোনভাবেই তার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারে না। সে চায় তার প্রেমিক মানুষটি শুধু তাকে ঘিরে মনোনিবেশ করবে। তার ভাবনায় মগ্ন থাকবে অহোরাত।অথচ এ সময়ে আমরা অনেকেই দু'কলম লিখে নিজেকে কবি বলে ভাবতে থাকি।আমি শুধু ভাবি সমস্ত জীবন ধরে যদি একটি পংক্তি লিখতে পারতাম তাহলে জীবন হয়তো সার্থক হত। আমি সেই পংক্তির জন্য অফুরান সময়  জেগে থাকতে রাজি। 
       
সত্যেন্দ্র সেলিম দেবব্রত- এই ত্রয়ী কাঞ্চনপুরে প্রথম সাহিত্যের চারাগাছ রোপণ করে যে  আন্দোলন তৈরী করেছিলেন,আজ অণুভাবনায় কাঞ্চনপুর সাহিত্য উৎসব তাদের আন্দোলনকে অন্যমাত্রা এনে দিল।১৯৮৪এর পর প্রায় তিনদশকেরও বেশী সময় ধরে ঘুমিয়ে থাকা উপত্যকাকে  ঘুম ভাঙ্গিয়ে যেন বলিয়ান করে তুলেছে নববলে। সাহিত্যের পালে নুতন হাওয়া বইতে শুরু করেছে। ।এই প্রথম ত্রিপুরা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের কবি ও কথাকারদের দোপাতা বনতট রসমালাই এক  সূত্রে গ্রন্থিত করে কাঞ্চনপুর তথা কবিতা উপত্যকার সাহিত্য চর্চায় একটি নুতন পালক সংযোজন করেছে।আর পাহাড় থেকে সমতলের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে ঘন্টাপাখির ঘন্টার শব্দ।

গোবিন্দ ধর :৬
কাঞ্চনপুরের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন মন্বন্তর। সেই সময় কবি সেলিম মুস্তাফা, দেবব্রত দেব সত্যেন্দ্র দেবনাথের ভাড়া ঘরে দেশ পত্রিকার কাটিং দেওয়ালে পেস্টিং থেকে আজকের হয়ে উঠার পরিক্রমা সাহিত্য জার্নি বলুন।

হারাধন বৈরাগী :৬
মন্বন্তরে আমার কোন কবিতা ছাপা হয়নি।হওয়ার যোগ্যতা তখনও অর্জন করতে পারিনি।শুধু একটি কবিতা সম্ভবত সেলিম মুস্তাফার দেওয়াল পত্রিকা "দেও"এ ছাপা (১৯৮৩-৮৪)হয়েছিল।আরও দুটি কবিতা ছাপা হয়েছিল'ছায়াপথে'।একটি সত্যেন্দ্র দেবনাথের সম্পাদনায়,আরেকটি চন্দ্রকান্ত মুড়াসিং এর সম্পাদনায়।একটা কথা বলতে হয়,আমি কাঞ্চনপুর পড়াশোনা করিনি,করেছি ধর্মনগর বিবিআইতে।তখন একটি দূর্গাপূজার স্মরণীতে কবি পিযূষ রাউতের সাথে আমার একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল।তারপর কৈলাশহর রামকৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ে পড়াশুনা করি।তখন কবি বিশ্বজিৎ দেব ও কবি হিমাদ্রী দেব,চারুকৃষ্ণ কর,কবি চঞ্চল কর-- প্রমুখের সাথে আমার পরিচয় হয়। হিমাদ্রী দা বিশ্বজিৎ দেব আমরা অনেকদিন কৈলাশহর বাঁধের উপর দিয়ে সন্ধ্যায় কবিতা নিয়ে কথা বলতে বলতে হাঁটতাম। হিমাদ্রী দা আমাদের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন।এই পরিমণ্ডলে আমি কবিতা লিখতে থাকি। ত্রিপুরা দর্পণে এক সপ্তাহ গ্যাপ দিয়ে আমার কবিতা ছাপা হত।এই সময়ের অনেক নামী কবিদের পাশে আমার কবিতা স্থান পেত।কবি বিশ্বজিৎ দেবের বাড়ি রাতের পর রাত জেগেছি। বিশ্বজিৎ তখন প্রেমের আগুনে জ্বলতে জ্বলতে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল।তখন রাতের পর রাত আমিই ছিলাম তার শান্তনা।এই নিয়ে তার একটি কবিতা আজও মনে পড়ে-"সেদিন কখন /হাত থেকে ফুলগুলি পড়ে গিয়ে/ ঝড় উঠেছিল সুতুনুকা।"। বিশ্বজিৎ তখন "ক"নামক একটি ম্যাগ করত।এর একটি সংখ্যায় আমার লেখা ছাপা হয়েছিল। কবিতাটি এরকম-"কে তুমি ঘুমের মতো
শুয়ে আছ এপাশ ওপাশ/কল্পতরুর দহন এদিকওদিক/তবুও নির্বিকার জলজ ভেলায়"

কৈলাশহর শেষ করে বাড়ি এলে লেখালেখি আর তেমন হয়ে উঠেনি।চাকুরিতে যোগ দেই দশদায়।সেখানে স্থানীয় পূজাস্মরণীকায় প্রথম একটি গল্প লিখি।তারপর আমি নিজেই একটি ম্যাগাজিন 'দেও' করি।ছাড়াভাঙা লেখালেখি চলে।তারপর ১৯৯৭ বদলি হয়ে কাঞ্চনপুর আসি। এখানেও আমরা মাঝে মধ্যে পূজা উপলক্ষে 'দেও' এর দুটি সংখ্যা বের করি।পরে সত্যেন্দ্রদার "এই বনভূমি'র" রজতজয়ন্তী সংখ্যা বের করি,যা আগে বলেছি।তারপর ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারি বদলি হই গন্ডাছড়ার জগবন্ধুপাড়ায়।সেখানে গিয়ে জীবনকে অন্যচোখে দেখতে থাকি।আর এখানেই আমার আবাল্য জঙ্গলভালোবাসা শিরায় শিরায় রেঙ তুলে। আমার মাঝে এক মদালসা এসে ভিড় করে।লিখতে থাকি একের পর এক কবিতা।আর এই সব কবিতা আমি ফেবুতে পোস্ট করতে থাকি।এই থেকেই একদিন জাঙ্গালিয়ার সুকবি অপাংশু দেবনাথের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।আর একদিন আপনাকে নিয়ে হাজির হলেন আমার জগবন্ধুর বিবাগী ব্যারাকে।আর এখানেই আপনি বলেন, আমার প্রথম কবিতার বই হোক হাসমতি ত্রিপুরা।এই থেকে আজ অবধি আর পিছু তাকাইনি।একে একে লিখেছি আমার -হাসমতি ত্রিপুরা,হৃদিচমপ্রেং,খুমপুইপাড়ায়(কাব্যগ্রন্থ),খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই (গদ্যগ্রন্থ)।এবার ২০২১ এর বইমেলায় ,হৃদয়ে রাইমা(স্মৃতি আখ্যান),বুরাসা(গল্পগ্রন্থ)।লেখা চলছে।লিখে চলেছি ত্রিপুরা বাংলাদেশ,কাছাড়, পশ্চিমবঙ্গের বিবিধ লিটলম্যাগ ও সংকলনে। কতটুকু কি হয়েছে জানিনা,এ বিচারের দায়িত্ব পাঠক ও সময়ের কাছে ছেড়ে দিয়েছি।

গোবিন্দ ধর :৭
এই বনভূমি থেকে বনতট বঙ্কিম দেবনাথ থেকে হারাধন বৈরাগীর পথ পরিক্রমা বিস্তৃত বলুন।

হারাধন বৈরাগী :৭
-"এই বনভূমি "সত্যেন্দ্র দেবনাথের একটি সাহিত্য পত্র ছিল।আগেই বলেছি এটার রজতবর্ষ সংখ্যা আমি করেছি।অনেক ভুলভ্রান্তি হয়েছিল।সত্যেন্দ্রদা এ দেখে মনখারাপ করেছিলেন।সত্যেন্দ্রদার এই ম্যাগটির নামের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি।যখন জগবন্ধুপাড়া বদলি হই,আর আবার নুতন উদ্যমে লিখতে শুরু করি।তখনই মনে মনে স্থির করি,একটি মনের মতো ম্যাগ নুতন করে করব।এই থেকেই আমি আপনার সাথে কথাবলি।কি নাম দেব-এই নিয়ে আপনি সহ অনেকের সাথেই কথা বলি।পরে সুকবি সেলিম মুস্তাফা প্রদত্ত 'বনতট' নামটিতে সীলমোহর দেই।প্রথম সংখ্যাটি আপনার ও কবি পদ্মশ্রী মজুমদারের তত্ত্বাবধানে বের হয়। খুব সুন্দর প্রচ্ছদ করেছিল-শিল্পী গৌরব ধর।এই থেকে এই অবধি এটির জার্নি চলছে। লিটলম্যাগ নিয়মিত প্রকাশ করা সাধারণ কথা নয়, আমার বিশ্বাস এবিষয়ে সকল সম্পাদকরাই কমবেশি একমত।তবে এখনও এটি নিয়মিত করতে পারিনি।কবে পারব তা এখনও বলতে পারছি না।তবে আপ্রাণ চেষ্টায় আছি,ছোট করে হলেও যদি নিয়মিত বার করতে পারি। নিজের জীবনকে অসম্ভব ধন্য মনে করব।আর একটা কথা বলার বাকী রয়ে গেছে।বঙ্কিম দেবনাথ থেকে হারাধন বৈরাগী এ আমার জীবনে একটি বাক বলতে পারেন,যেমন বাক  আমন্ত্রিত বঙ্কিম দেবনাথের সম্পাদনায় 'এই বনভূমি'র রজতজয়ন্তী সংখ্যা থেকে হারাধন বৈরাগীর  'বনতট' লিটলম্যাগটি।

গোবিন্দ ধর :৮
শিক্ষকতা আপনার কেমন লাগে।

হারাধন বৈরাগী :৮
শিক্ষক কিংবা শিক্ষকতা শব্দটা অনেক গুরুগম্ভীর শব্দ। শিক্ষক হতে গেলে যে অধ্যবসায় থাকা দরকার সেই যোগ্যতা এখনও অর্জন করতে পারিনি। আমার সর্বদা মনে হয় আমি এখনও ছাত্র। আমার মনে হয়  প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের ঠকছি।আমি মনে করি এর জন্য আমি যতটুকু দায়ী ,তারচেয়ে দায়ী আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক পরিকাঠামো,পরিকল্পনা, চিন্তা ধারা। শিক্ষক কোনদিন হতে চাইনি।চেয়েছিলাম বনবিভাগে চাকরি করব।আর জঙ্গলের আনাচে কানাচে ঘুরব।দুচোখকে দোনলা করে  দেখব।বাস্তব্যতন্ত্র রক্ষায় আমি হব এক নিরলস সৈনিক।এ আমার অসম্ভব ভালোবাসার ক্ষেত্র কিন্তু আমরা যা চাই তা তো সর্বদা পাইনা। তবুও শিক্ষকতা আমার বাঁচা বাড়া।আপ্রাণ চেষ্টা করছি,ছাত্রদের কিছু দিতে কিছু নিতে।আমি জানি শিক্ষা দেওয়া যায় না ভেতর থেকে জাগ্রত করতে হয়,এও জানি জগতের সব কিছুরই জন্ম ভালোবাসা থেকে ।তাই শিক্ষিত হতে গেলে শিক্ষার প্রতি ভালবাসা চাই। তাই  শিক্ষার্থীদের কখনও জ্ঞান দিতে যাই না, সর্বদা তাদের পড়াশুনাকে ভালো বাসতে উৎসাহিত করি।তাদেরকে চারপাশের পরিবেশ পরিস্থিতি সর্বদা পর্যবেক্ষণ করতে উ‌ৎসাহিত করি।আমি মনে করি একজন শিক্ষার্থীর পরিবেশই তার শিক্ষক।তার গৃহ‌-ই প্রথম পাঠশালা।তার পরিবারের সদস্যরাই প্রথম শিক্ষক।যদিও আমি সেই অর্থে শিক্ষক হতে পারিনি,এখন শিক্ষকতায় ছাত্রই রয়ে গেছি, সেই দিক থেকে শিক্ষকতাকে ভালোবাসি।কেননা আমি মনে করি,যদি লেখাপড়াকে হৃদয় থেকে কেউ ভালোবাসতে পারে তবেই তার মাঝে শিক্ষা জাগ্রত হতে বাধ্য।সেও শিক্ষক হতে পারবে।আর এই ভালোবাসা থেকে যারা শিক্ষাক্ষেত্রে আসবে তারাই আমাদের বদ্ধ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোকে মুক্ত ও গতিশীল করবে।তবে একটা কথা বলতেই হয়,আমি আমার ভালোবাসাতেই বেঁচে থাকতে চাই।যদি আগামী জন্মে মানুষ হই।আর পৃথিবীতে জঙ্গল থাকে তবে আমি ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার হতে চাই,একটা আফ্রিকা হতে চাই,একটা আমাজান হতে চাই --

গোবিন্দ ধর :৯
আপনি শিক্ষক না হলে কি আজকের কথাসাহিত্যিক হতে সহজ হতো?

হারাধন বৈরাগী :৯
আপনি বলছেন আমি কথা সাহিত্যিক। কিন্তু আমি তো মনেপ্রাণ বিশ্বাস করি এখনও‌ আমি কথাসাহিত্যিকের 'ক'ও হতে পারিনি। কথাসাহিত্যিক হওয়াকি চাট্টিখানি কথা। কথাসাহিত্যিক হতে গেলে পরিবেশ পরিস্থিতি আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে যে মিতস্ক্রিয়া প্রয়োজন,মানবচরিত্র সম্পর্কে অনুধাবন প্রয়োজন,এই ক্ষেত্রগুলিতে আমি এখনও শিশুমাত্র।এই যে আপনি আমার ক্ষেত্রে 'কথাসাহিত্যিক'শব্দটা উচ্চারণ করেছেন,অসম্ভব সংকোচবোধ করছি।আমি জানি আমি কি,আমি কতটুকু!আমি আমার জানা লেখক কবি যাঁদের আমি চিনি। তাঁরা তাদের স্ব স্ব ক্ষেত্রে যে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন বা বলতে পারেন তপস্যাপরিগ্রহ করেছেন,তাঁরাতো নিজ নিজ ক্ষেত্রে লেখক, কথাকার কিংবা কবি।যেমন ধরুন আপনি নিজেকে শব্দশ্রমিক মনে করেন।এ আপনার ক্ষেত্রে অসম্ভব সত্যি।সেই ক্ষেত্রে আমি না-কবি না-কথাকার না-গল্পকার-এমন একটা অর্ধনারীশ্বর আমি।তবে চেষ্টা করছি,ভালবেসে চলেছি কথাজীবন,দেখি কি করতে পারি।আর শিক্ষক না হলে যেটুকু কথাকার তা হতে কতটুকু সহজ হতো,হয়তো এই ক্ষেত্রে নয়,অন্যক্ষেত্রে হতে পারতাম অবশ্যই।আগেই বলছি আমি নিজেকে কখনও  কিরাত ছাড়া কিছু ভাবতে পারিনি, পাহাড় জঙ্গল আমার ভালোবাসা,আমার ঘর,আমার গোরস্থান।জঙ্গলে গেলে আমার নিশি লেগে যায়,কেউ যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে আয় আয় বুকে আয়।জঙ্গলের লতায়পাতায় ধূলিতে তখন গড়াগড়ি দিতে ইচ্ছে করে।জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে।আমি মদালসা হয়ে উঠি।জঙ্গলে থেকে যেতে ইচ্ছে করে।যদি আমার অসম্ভব ভালবাসা বনবিভাগে চাকরি করতাম,ধরুন ফরেস্টার হতে পারতাম তবে এই জঙ্গলই হত আমার বাস্তুভূমি।জঙ্গলকে আরও গভীরভাবে জানতে পারতাম,সারাটা জীবন জঙ্গলেই কাটাতাম,শৈশব কৈশোরের মতো চোখ মেলেই দেখতাম জঙ্গল,জঙ্গল আমার ঘর। কিন্তু শিক্ষকতা পেশায় এসে তো আর পুরোটা জংলী হওয়া যায় না।সর্বধর্মসমন্বয়ের মতো থাকতে হয়।এই দেখুন না,শৈশব আমার জঙ্গল কিন্তু লেখালেখির যে কিছু একটা জগৎ আছে তা জানতাম না।তাই কিছু লিখতে পারিনি।শহরে থেকে কিছু শহুরে লেখা লিখেছি। কেউ মনে রাখেনি।প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়নি।খাপছাড়া জীবন কাটিয়েছি।কিন্তু যখনই আমার ভালোবাসার সমাধিতে গিয়েছি,জেগে উঠেছে আমার অতীত আমার ভালবাসা।আমি লিখতে শুরু করেছি। কিন্তু আমি কপালকে বিশ্বাস করি।একটা জীবনে যৌবনই তো সৃষ্টির মরশুমি সময়।এই সময়টুকু আমি কাজে লাগাতে পারিনি। ভালবাসার সমাধিক্ষেত্রে যেতে পারিনি।বা যাওয়া হয়নি।আর যখন গেছি,তখন আমার অনুভূতি ভোঁতা হয়ে গেছে। নতুবা আরও জঙ্গলের গভীরে যেতে পারতাম।আমি মনে করি একজন পূর্ণাঙ্গ লেখকের জীবনে নদী থাকা চাই।নদীহীন জীবন হয় না।নদীহীন সভ্যতা হয় না।আমি মনে করি,একজন লেখকের জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি জীবন তার লেখালেখির লেখচিত্র বিশেষ।তার জীবনই নদী।এই অর্থে আমার জীবনে শুরুতে খরঝর্ণা।তারপর বালি চড়া, অন্তঃসলীলা।পরিশেষে সাইমা রাইমা ।কিন্তু গোমতীর বাঁধের কারণে তারাও পাহাড় বাহিনী।এখন শোনছি পতনের শব্দ। টারবাইন টারবাইন।তারপর সল্পবিদ্যুৎ।ক্ষীণালোক ঘরে ঘরে।

গোবিন্দ ধর :১০
শিক্ষকতার চাকুরী বদলির চাকুরী।যদিও বদলীর চাকুরীর কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নীতি নেই। তবুও জগবন্ধু পাড়ায় আপনি না বদলি হলে কবি অপাংশু দেবনাথ গোবিন্দ ধর কি যেতেন সে সময়? সেই চিংড়ি মাছের বড়া কিংবা ঘুরঘুর করতাম ডুম্বুর টংঘর সেসব কি আমরাও দেখতাম?

হারাধন বৈরাগী :১০
-যেহেতু এ রাজ্যে শিক্ষকতার চাকরিতে বদলীর কোন নিয়মনীতি নেই, সেইহেতু সকল শিক্ষককে,বদলি হতে হয় না।কেউ কেউ সারাজীবন একই বিদ্যালয়ে বাড়িঘরে কাটিয়ে দেন।তারা কেউ কেউ প্রধানশিক্ষককে উপদেশ নির্দেশ লালচক্ষু দেখিয়ে কখনও বা ছাত্রদের ক্লাস না নিয়ে প্রধান শিক্ষকের চেম্বার কিংবা ঝুলাব্যাগ কাঁধে নিয়ে সকল শিক্ষকের ব্যাক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন,তার বাঁচাবাড়ায় প্রভাবিত করেন।এ নিয়মনীতিহীনতার কুফল বলেই মনে করি।যদি নিয়মনীতি থাকতো তবে সকল শিক্ষককেই কমবেশি মঙ্গলজঙ্গল কিংবা জঙ্গল মঙ্গল করতে হত।আর এই মন্ত্রে আমাকেও অনেক আগেই হয়তো যেতে হত,রাইমাভ্যালির স্যুচ্যেং জঙ্গলে,জনজাতির আঁতুরঘর রহস্যাবাড়ির ডুঙ্গুরে,রাধামন-ধনপুদির রাজবাড়ী কিংবা রাজন্যস্মৃতিবিজড়িত রাণীর পুকুরে,আমার ভালবাসার শরসয্যায়।আর আমিও টগবগিয়ে ফুটতাম অপার ভালোবাসায়।আর আপনি শব্দকর গোবিন্দ ধর,সুকবি অপাংশু দেবনাথ,অনেক আগেই দেখা হয়ে যেত আমার আপনাদের সাথে।আমার মনে আছে, জগবন্ধুপাড়ায় থাকতে একদিন এরাজ্যের আরেক প্রবীণ কবি আমাকে বলেছিলেন,কবিদের প্রতি পাঁচবছর পরপর বদলি হওয়া প্রয়োজন।আজ ভাবি সত্যি বদলিনীতি যদি শিক্ষা বিভাগে চালু থাকতো তবে অন্যবিভাগের মতো বদলি হয়ে আমি এই ত্রিপুরা রাজ্যটাকে চোখ ভরে দেখতে পারতাম,জানতে পারতাম কিরাতদেশের জাতিজনজাতি মানুষের হৃদয়জলের উষ্ণ প্রশ্রবন কোন মাত্রায় বাঁধা।

গোবিন্দ ধর :১১
ত্রিপুরার কবিতা চর্চায় আপনি জঙ্গলের মাদকতায় নতুন শব্দ চিত্রকল্পে নতুন বয়নে তুলে এনেছেন মাটির ভাষা।এই কুহকজালে কিরকম আপনি এত আপন করে জড়িয়ে গেলেন?

হারাধন বৈরাগী :১১
-আসলে কবিতাচর্চার কথা যদি বলুন তবে আমি বলব,এ রাজ্যের অনেকেই লেখালেখি করেছেন,করছেন, আগামী দিনেও করবেন। বেশীরভাগ লেখালেখিই শহরজীবন আধারিত।কেউ কেউ কবিতা লিখেছেন পাহাড়িজীবন আধারিত।তবে শহরজীবনকেন্দ্রিক যত কবিতা লেখা হয়েছে,সেগুলি অবশ্যই জীবন ছোঁয়া। কিন্তু অনেকলেখা যেগুলি পাহাড়ীমানুষের জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে বলে আমরা দাবীকরি,তা অনেক্ষেত্রেই নয়।এই কবিতাগুলি লিখতে গিয়ে আঙ্গিকে শহুরেজীবনের স্মার্টন্যাস আরোপিত করা হয়েছে। কিন্তু আমার দেখা পাহাড়িজীবন মন্থর,তাদের চলনবলন,জীবনচর্যায় অলসতার ঘুম জড়ানো।এই দিকটি আমার নজরে এসেছে।কেননা আমি ওদের জীবন ও চর্যার সাথে শৈশব থেকেই মিলেমিশে একাকার।আমি নিজেকে সমতলবাসি কখনও ভাবতে পারি না।আমি সর্বদাই পাহাড়ি।যদি জন্মান্তর বলে কিছু থাকে ফের পাহাড়েই জন্ম নিতে চাই।এই থেকেই আমার মনে হয়েছে,পাহাড়ি মানুষের জীবন ও যন্ত্রণা তথা পাহাড়িকুহক নিয়ে কলমধরতে হয় তবে লেখায় আসতে হবে মন্তরতা,তাদের বুকের ভাষা। তাই চেতনা রূপায়নেরই পরীক্ষা নিরীক্ষার পর্যায়ভুক্ত বলতে পারেন আমার হাসমতি ত্রিপুরা'র মতো কাব্যগ্রন্থগুলি।তবে এতসবের পরেও আমি বুঝতে পারি সারাজীবন জঙ্গলের
ফাঁসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থেকেও পাহাড়কে ঠিকঠাক তুলে ধরতে পারিনি,কেবল চেষ্টা করেছি মাত্র। কতটুকু ছুঁতে পেরেছি তা সময়ই বলবে ।শহরে বসে পাহাড়ি জীবনকে নাকসিটকিয়ে কি পাহাড় আঁকা যায়?আপনিই বলুন।আর আগেই বলেছি,আমি সেই শৈশব থেকেই পাহাড়ি ঘরে পাহাড়ি বাল্যবন্ধুবান্ধবীদের প্রশ্রয়ে বড় হয়েছি।আজও কোথাও গেলে,বাঙ্গালী নয় পাহাড়ি ঘর দেখলেই বুকটা অসম্ভব নড়ে উঠে।আর এমন মনের মরম থেকেই পাহাড়িকুহকজালে আপনকরে জড়িয়ে নিয়েছি নিজেকে।

গোবিন্দ ধর :১২
আপনার প্রথম কবিতা সংকলন হাসমতি ত্রিপুরা। এর আগে আপনি কিরকম ভাবতেন।

হারাধন বৈরাগী :১২
-হাসমতি ত্রিপুরার আগে আমার মন মানসিকতা ছিল এই রাজ্যের প্রথিতযশা কবিদের কবিতার মতো কিছু একটা ধ্যানধারণা,যদি এই আঙ্গিকে আমার পাহাড়ি রাইকে সাজাতে পারি কিংবা জড়িয়ে ধরতে পারি তবে কিছু একটা হতে পারে!আর আচমকা একদিন কবি পার্থ ঘোষের টাইমলাইনে নজরে আসে একটি কবিতা-” প্রিয় কণিকাদিকে” কবিতাটি এরকম----

“কণিকাদি, আজ আমার বড়ো দুঃখের দিন
আজ মনের চোখে জল ;
মড়কের সব পাখি নিরুদ্দেশ উড়ে গেলে
দাউ দাউ জ্বলে বিগত ফসল । 

কণিকাদি,হাতে আমার লাল সুতোর লাছি
বেঁধেছিল কেউ একদিন ;
ওই ঘন সবুজে শুয়েছিল সাতজন্মের সাথি
আমলকী ভালবাসতো খুব - 
টকঝাল সুখ,আজ অশোকের শিলালিপি।

পথের পাশে যত পাওয়া আর যত খোয়া
মায়ালোক সব একই লন্ঠনের ,
তবু এই লন্ঠন হাতে নিয়ে ঘুরি ; হাওরের ধারে
নৌকা যদি ভিড়ে একদিন, অনধীত রাত্তিরে !

কণিকাদি - আর জন্মে আমার, মা হবে তুমি ?

কবিতাটি পড়ে  খানিকক্ষণ বাকশূন্য হয়ে রইলাম। পার্থকে যতই পড়ছি ততই তার কবিসত্ত্বা সম্পর্কে  একটি ধারনা গড়ে উঠছিল। আর আমার ভেতরও বইতে শুরু করল কবেকার এক পশলাবৃষ্টি ঝড়ের মতো।আমার স্কুলবেলা কলেজবেলা  ভেসে উঠতে লাগল চোখের সামনে ।ত্রিপুরাদর্পনে একদা আমার কবিতার কলম। আমার কলেজবেলার কবি বিশ্বজিৎ দেব,স্কুলবেলার কবি সেলিম মুস্তাফা। কবির লেখা আমার মনে খুব দাগ কেটেছিল। তিনি আমার প্রিয়কবি। তার কবিতা যেখানেই পেয়েছি নীরবে গোগ্রাসে গিলেছি। বারদুয়েক তার কবিতা পড়লেই আমার মুখস্থ হয়ে যেত। সেই কবে পড়েছি তার “ছোরার বদলে একদিন” ।আজও কিছু লাইন মুখস্থ বলতে পারি! 

ফেবুতে পার্থ ঘোষের কবিতা পড়ে আমার মনে ভীষণ ঝিঁকা এল। জগবন্ধু পাড়ার মতো জঙ্গলে এসে আমি কবিতার মাঝে নুতন ভাবে বেঁচে থাকার ক্ষীণালোক দেখতে পেলাম। ইচ্ছে করলেই তো আর কবিতা লেখা যায় না! লেখার চেষ্টা করতে গিয়ে তা বুঝতে পারছি বিলক্ষণ।একটি কবিতাও হয়ে উঠছে না। আচকা একদিন অত্যন্ত খেদের সাথে লিখে ফেলেছি-একটি অকবিতা-কিংবা কবিতা। 

“শব্দেরা কানামাছি খেলতে খেলতে শুধায়
বিগত ঋতুতে কোথায় ছিলে বাপু? 
অসময়ে এসেছো খেলতে আমায়! 

আমি শব্দ তাই ব্রহ্ম
থিতু হতে গেলে সাধনা কোথায়? 

তবু তৃষ্ণায় মরীচিকার মতো
শব্দের পিছু পিছু যাই
পেছনে ফেলে যাই পান্থপাদপ 
সরোদয় -মরুসাহারায়।”

এই থেকে একে একে কবি রীতা শিব, গোবিন্দ ধর, অপাংশু দেবনাথ, সুমিতা ধরবসুঠাকুর, চিরশ্রী দেবনাথ, সন্তোষ রায়, সেলিম মুস্তাফা, বিপুলকান্তি চক্রবর্তী, বাপ্পা চক্রবর্তী, মৃনালকান্তি দেবনাথ, রামেশ্বর ভট্টাচার্য্য,অরিন্দম নাথ, অমলকান্তি চন্দ সঞ্জীব দে,বিল্লাল হোসেন, অভীককুমার দে-------প্রমুখ গুণীজনের ফেবুবন্ধু হয়ে গেছি।

তবুও কেউ আমার কবিতা পড়েন কিনা বুঝতে পারছিলাম না। যন্ত্রণায় নীল হতে হতে চলছিল আমার ব্যারাকজীবন। এই থেকে একদিন নিজের অজান্তেই লিখে ফেলেছি আমার  হাসমতি সিরিজের একটি কবিতা কিংবা অকবিতা। কবিতাটি ছিল এরকম-

“অন্ধকার জুড়ে রাত্রির মাদকথা
বরাহেরা কুড়ে কুড়ে তুলে
রাতের লেদাপোকা

মধ্যরাতে তাই
তুমি গানরেঞ্জে চলে আসো
হাসমতি ত্রিপুরা।"

এর পরেই একদিন বিশালগড় থেকে আমাকে দূরভাষ করেছিলেন  জাঙ্গালিয়ার কবি অপাংশু দেবনাথ--------!আর তারপরই তো আপনি ও অপাংশু দেবনাথ আমার কাছে গিয়ে আমার ধ্যান ধারণার উপর স্যুচ্যেং টাক্কল দিয়ে ঘাই দিলেন,আর তারপরই আমি হাসমতি ত্রিপুরা আকঁতে থাকি,হৃদি চমপ্রেং আকঁতে থাকি,খুমপুই পাড়ায় আঁকতে থাকি, আকঁতে থাকি,খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই, হৃদয়ে রাইমা,জঙ্গলের কুহক-বুরাসা।

গোবিন্দ ধর :১৩
হৃদি চম্প্রেং দ্বিতীয় সংকলন।প্রতিটি সংকলনের কবিতাই এক ঘুরের মাঝে লেখা। এই ঘোরলাগ কুহকমাদকতায় আপনার এত তৃপ্তি কেন?

হারাধন বৈরাগী :১৩
শৈশব থেকে কৈশোরের বোধন পর্বে দমবন্ধ করে হত্যা করতে চেয়েছিল আমার এক সম্পর্কিত নির্রমলাদিদি ।সে তার মা-বাবার সাথে পূর্ববাংলা থেকে এসে আমাদের বাড়িতে মাসছয়েক ঠাঁই নিয়েছিল।সে আমাকে মাঝেমধ্যে বাড়ির কলাবাগানে নিয়ে গিয়ে বুকের মাঝে চেপে ধরত আর শুধু কাঁপত।আমাকে পাগলের মতো আদর করত,আর আমার দম বন্ধ হয়ে যেত।তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসত এক অদ্ভুতগন্ধ।আমার বমির ভাব হত।এ যে ক্ষার গন্ধের সাথে তুল্য তখন তা অনুভব করতে পারতাম না।বড় হয়ে বুঝেছি এ যেন ক্ষারপানির গন্ধ।
আমি কান্নাকাটি করতাম।এসব চলতেই থাকত।দিদির প্রতি তখন ভীষণ রাগ হত।আমি কাঁদতে কাঁদতে বলতাম,দিদিমনিকে(ঠাকুমা) গিয়ে বলব।তখন সে আমাকে চোখ রাঙাত।আর আমি ভয়ে  কিছু বলতে পারতাম না।আমি বুঝে উঠতে পারতাম না,দিদি এভাবে আমার দম বন্ধ করছে কেন।তারপর যে দিদি আমার জীবনে এসেছিল।আগেই বলছি,এই দিদির শরীর থেকে অসম্ভব মায়াঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ত।আমি এক ঘোরের মধ্যে চলে যেতাম।আমার কুহক লেগে যেতো।আজও সেই দিদির কথা মনে হলে আমার কুহক লেগে যায়।জগবন্ধু গিয়ে একদিন যখন খুমপুইথানে গেলাম,তখন সহসা টের পেলাম বাতাসে সেই দিদির ঘ্রাণ।মনে হল আমার পারিদিদি বুঝি এই জঙ্গলে কোথাও আছে।আমার কুহক লেগে গেল । চারপাশে হন্যে হয়ে দিদিকে খুঁজতে লাগলাম।কাউকে দেখতে পেলাম না।গাইড এক পাহাড়ি ছেলে,তাকে যখন এই অসম্ভব ঘ্রাণের কথা বললাম,সে একটি ফুল দেখিয়ে দিল;নাকের কাছে নিতেই চমকে উঠলাম ।মনে হল পারিদিদিই বুঝি অভিমান করে খুমপুই হয়ে আছে।নির্মলা দিদি আমার জীবনে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছিল,পারিদিদি সেই আতঙ্কে চেতুয়াং হয়ে এল।এই থেকেই বাঙালি নয় পাহাড়িদের  ভালো বাসতে শিখেছি।ভালোবাসা কাকে বলে জীবনে পারিদিদিদের সাথে দেখা না হলে কেউ অনুভব করতে পারবে না।সত্যি বলতে কি আমি জঙ্গল ছাড়া কিছুই লিখতে পারি না।আর জঙ্গল নিয়ে লিখতে গেলেই দিদির ঘ্রাণ এসে আমাকে ঘিরে ধরে;আর সব লেখাই আমার ঘোরলাগা হয়ে যায়। জীবনে দিদিকে অনেক খুজেছি। কোথাও তাকে পাইনি।জীবনের শেষ পর্বে এসে তাকে এখন আর খুঁজতে চাইনা।দিদি যেখানেই থাকুক আমার মানসপ্রতিমার মতোই থাকুক।আর আমাকে শুধু ঘোর দিয়ে যাক।

গোবিন্দ ধর :১৪
খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই আপনার প্রথম গদ্য সংকলন।তাতেও জঙ্গলের কুহক।মায়া।প্রকৃতি।রূপকথার কবিতা।সংক্ষিপ্ত রকম যদি বলি আপনি দুপাতায় খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই লিখুন।কীরকম আঁকবেন?

হারাধন বৈরাগী :১৪
-খুমপুই বর্তমান ধলাইজেলার অবস্থিত।গন্ডাছড়ার উত্তর-পূর্ব কোণে  পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত সংলগ্ন জনজাতিদের একটি পবিত্র-থান, রাইমা-সাইমা নামক দোবোনের যৌবনের উপবন।রাইমার ভালবাসার সমাধিস্থল।সিকামনুকতাই পার্বত্যচট্টগ্রামের কুহকময় মিয়ানী বা মায়ানীরিজার্ভ সংলগ্ন এক উত্তুঙ্গ পাহাড়।এই দুই পাহাড়র বুকজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আদিম জনজাতিদের বাসভূমি।এই দুটি স্থানের বৃক্ষ পাতা গুল্ম লতা ও মৃত্তিকায় কানপাতলে আজও শোনা যায় ক্রমশ সময়ের পাতায় পাতায় ঝরে পড়া  ব্রু-বরক জমাতিয়াদের জীবনের আদিহৃদিমালতী।"খুমপুই থেকে সিকামনুকতাই"গ্রন্থটি এইসব লতাপাতা থেকে কুড়িয়ে আনা জনজাতি হৃদয়ের রজমাখা মাটির কথা।খুমপুই বনপথে এখানকার বৃক্ষ-লতা-পাতা-মৃত্তিকায় আজও চোখমেলে থাকায় রাইমার ভালোবাসা দঙগয় রাজার হৃদয়বিদারক সমাধিস্থল।কল্যানসিংছড়ার শরীরজুড়ে কুহকময় পরাঅপরার গা-শিহরিত উপখ্যানমঞ্জুরী।বরক ও বনবিবির বিচূর্ণ ভালোবাসার পুড়ে যাওয়া ছাই।এখানেই কোন পথহারা অয়াইংচাকে পথ দেখিয়ে দিতে গিয়ে কোন বুনোচিকলীর চোখ বেয়ে নেমে আসে কুহক মায়া।এখানেই কোন কাঠুরে গল্প বলে কি করে  মায়ানীরিজার্ভ থেকে মানুষ হত্যাকারী কিডনি পাচারচক্রের  দালাল ডাক্তাররের হাত থেকে রক্ষা প্রাণ নিয়ে ফিরে এসেছিল ভগীরথপাড়া। এখানেই শোনা যায় ,কি করে কল্যানসিংছড়ার নাগাটুয়ারীর ভিতর থেকে শ্বাসফেলতো অতীতের কুবের এক সর্প যক্ষ। এখানকার জনজাতিরা আজও বলতে পারে না ভগীরথপাড়ার বয়স কত! এখানকার বরককে কোন অয়াইংচা যদি প্রশ্ন করে ওরা শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায়, প্রাচীন ব্রুইফাঙের দিকে ।এখানেই রামজয়ের গল্পদিদা পদ্মাবতীর শৈশব ও যৌবন কাটে,আর তার দেখা ও জীবনছোঁয়া রোমহর্ষক ঘটনাগুলি কোন অয়াইংচা'র খাড়া করে তুলে শরীরের লোমকূপ । এই ভূখণ্ডের গর্ভফোঁড়ে উঠে আসে লংতরাই দেবতার হাতি ও দুষ্ট আচলং-চিকলার শাস্তির গল্প।তার নামের মতোই  অদৃষ্ট ত্রিপুরার অদৃষ্টের গল্প। অদৃষ্ট ও মেসেন্তির ভালবাসার আগুনসমাধি। লংতরাই ও শঙ্খতারিনীর প্রেমের গল্প।বুরাসার বরকিনী ধর্ষণের মতো লোমহর্ষক কাহিনী।বুরাসার সন্তান যামিনী ত্রিপুরার সাথে বনংবরক,বাঘ,শূকর,মিছিপ কাহিনী।বাদরের  বরকিনী ধর্ষণ ও তার করুণ পরিণতি।নৃমুণ্ডশিকারীর নৃমুণ্ডশিকার কাহিনী,বরক ও চাকমা গাবুরী কালাবির প্রেমের করুণ পরিণতি।ডাইনি,ডাকিনী ও বুরাসার  মতো পর-অপরা,দৈবিক ও আদিভৌতিক গল্প।ব্ল্যাকম্যাজিক বলে,পেটে হরিণশাবক,বাটকারা,বোতল,মাংস,শামুক ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো লোমহর্ষক ঘটনার অসম্ভব মায়াজাল।রামজয় নামক ত্রিপুরী যুবকের জীবনের কুহকময় ও করুণ অদৃষ্ট নিয়ত্রিত জীবনের গল্প।কুহুলক্ষীর জীবনের ভাগ্যবিরম্বিত গল্প।খোয়াশ্রী সরকুমারের গল্প।দেবী মলুইমাকে দুষ্টু এক ত্রিপুরী যুবকের ধর্ষণের অকথিত কাহিনী।জমাতিয়া ও আচলং উপজাতী গোষ্ঠীর সৃষ্টি তত্ত্ব।দা-নন্দ ডেকে সরল সোজা চিকলাকে চিকলিদের ফুসলানোর গল্প,আসরিফা ও জঙ্গলকুহকিনী বুনোদেবীর শরীর হিম করা গল্প। অসম্ভব শরীরিকশক্তির অধিকারিনী রামসিংমার ডাকাত ও ধর্ষক সায়েস্থা করার কাহিনী।মাঙ্গাইতুঙ্গ বা রোয়াজাদের রাজকীয় দাহপ্রথা।বরকিনী কঙ্কিলা বৌদির জীবনের করুন পরিণতির কাহিনী।ভাগ্যবিরম্ভিত পৌদের জীবনের হৃদয় হরণকরা গল্প। রাধামাধব বৈষ্ণবের লোভের পরিণতি,জুমের তবক কিংবা বাদুর গর্তের বিভিষিকা।পবন্তি ও বসিদা-শ্যালিকা ও কুমইয়ের দেহসম্ভোগের করুণ পরিণতি।এই গ্রন্থে কোন লেখক এই প্রথম জনজাতীজীবনের একটি খণ্ডজীবনকে স্পর্শ করে  পাঠকের দরবারে তুলে আনেন সম্পূর্ণ তাজা অখণ্ড জঙ্গলজীবনের অকথিত রোমহর্ষক কাহিনী।এমন চিদস্পর্শী পরা-অপরা-ই এই গ্রন্থের অন্তরজল,লেখক হিসাবে আমি বিশ্বাস করি।

গোবিন্দ ধর :১৫
পরের কাব্যগ্রন্থ খুমপুই। বলুন।ভাষা এক।অথচ সংকলিত কবিতা আলাদা আলাদা এক মাদকতায় আমাদের ত্রিপুরাকে সমৃদ্ধ করছে।কেমন করে এই মায়াজাল রপ্ত হলো আপনার?

হারাধন বৈরাগী :১৫
দেখুন আপনার কাছে যা মায়াজাল মনে হয়েছে, অন্যজনের কাছে  তো তা নাও হতে পারে।এর কারণ হয়তো এক একজনের আলাদা আলাদা অবস্থান থেকে দেখা কিংবা অনুধাবনের কারনে। স্বাভাবিক ভাবেই  দেখা ও অনুভবের মাঝে পার্থক্য এসে যায় ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান থেকে আলো ফেলার কারণে। আবার সময়ও এর মাঝে একটা অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে,অর্থাৎ ভিন্ন অবস্থান থেকে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে‌ দেখা। ঠিক একই কারণেই হয়তো আমার কাব্যগ্রন্থগুলির কবিতায় শব্দ বা ভাষা এক হলেও জঙ্গল ও জঙ্গলের মানুষ কে ভিন ভিন্ন সময়ে বিভিন্ন  অবস্থান থেকে পাঠকের দেখার কারণেই অনুভবে পার্থক্য এসে যেতে পারে।আর এও তো ঠিক যে একজন জীবন্ত লেখক বা কবিকে তার লেখার মধ্যে নদীর মতো দেখা যায়।নদীর বাঁক যেমন আছে, তেমনি লেখার মাঝেও বাঁক নির্ণিত হয়।তাই উজানের নদী আর ভাটীর নদীর মাঝে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য এসে যায়।এই কারণেই আপনার কাছে এক একটি কাব্যগ্রন্থকে ভিন্ন ভিন্ন মাদক মনে হলেও অন্য কোন তন্নাত্রের‌ কাছে তা মোদক বলেও প্রতিভাত হতে পারে।

গোবিন্দ ধর :১৬
৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে আপনি ছোট।অথচ আপনার সেই যুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সবই এক ঘোরলাগা অতিক্রম। বলুন।

হারাধন বৈরাগী :১৬
-১৯৭১!আমার বয়স সাতবছর।আমি তখন বাস করছি উজানমাছমারার প্রাকৃতিক চিড়িয়াখানায় ।আমার চারপাশে যা কিছু দেখছি মানুষ-পশু-পাখি-কীট-পতঙ্গ-লার্ভা,সবই ঘোরলাগা।এইসব আমার জীবনের পিদিমে তখন জ্বালানি ঢালছে।আমার খেলার সাথী নির্মলা দিদি।দিদিমনি(ঠাকুমা)আমার দাদা বংকেশ ও  আমার কাজলিদিদি(বাবার মামী)।যাদের কথা আগেই বলেছি।তখন আমার দিদিমনিই ছিল বন ও বন্যজগৎ সম্পর্কে আমার জ্ঞান জাগরণের শিক্ষাগুরু।নির্মলাদিদি (সম্পর্কিত দিদি)ছিল আমার মূলাধারে যেন সুপ্ত শঙ্খিনী কিংবা কালভৈরবী ।কাজলাদিদি ছিল শৈশবের শ্রীহট্টীয় গ্রাম্য ছড়া‌ যেন।এই দিদা সন্ধ্যা হলেই আমাকে শোলক বলে আনন্দ দিত।যেমন,সন্ধ্যার পর চিৎহয়ে বিছানায় শুয়ে হাটুর ভাঁজে আমাকে উঠিয়ে ঝুলনের মতো দোলাতে দোলাতে দিদা বলত-"বারই বারই কই যাইতায়?"আমি দোল খেতে খেতে বলতাম,-"মামার বাড়ি।দিদা,-"মামার বাড়ি গিয়া কিতা খাইতায়"-আমি,-" দুধকলা"।দিদা-,"আয় চান আয়,আমার বারই'র কপালে আইয়া একটা ঠুক্কুৎ দিয়া যা"।আমি হাসতে হাসতে ফেটে পড়তাম।আর দিদা তখন কাত হয়ে আমাকে হাঁটু থেকে বিছানায় ফেলে দিত।আর আমার দুঃসাহসী দাদা তখন আমাকে শোনাত জঙ্গল কুহক ভূত পেত্নীর কথা।

ইত্যবৎসরে  দিদিমনি একদিন চলে গেলেন পূর্ব পাকিস্তান,আত্মীয় স্বজনকে দেখতে।যে দিদিমনি ছিল আমার প্রাণ।তাকে হারিয়ে আমার প্রাণ আকুল হয়ে উঠল।মাস চলে যাচ্ছে দিদিমনি ফিরছেন না।তখন আমাদের জন্য তিন বেন্ডের একটা ফিলিপস্ ট্রানজিস্টার কিনে আনলেন বাবা। আমাদেরটা মিলিয়ে তখন গায়ে তিনটি রেডিও হয়েছে। আমার বাবার বন্ধুর ছিল এরিয়েল লাগানো একটি বড় রেডিও।ওটা আমরা মাঝেমধ্যে দেখতে যেতাম।আমার দাদার বন্ধু তাদের ট্রানজিস্টার নিয়ে মাঝেমধ্যে আসতো আমাদের বাড়িতে।সন্ধ্যায় দূর দূর থেকে আত্মীয়  ও দুচার জন প্রতিবেশী এসে জড়ো হত আমাদের বাড়িতে। উদ্দেশ্য একটাই পূর্ববঙ্গের খবর শোনা।।ইতিমধ্যে কানাঘোসা শোনা গেল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবিদের মধ্যে  গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে।বাঙ্গালী ও পাকিস্তানিদের মাঝে নাকি কি কি অধিকার দাবীর প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে জগড়া চলছিল।যুদ্ধ শুনে আমি দিদিমনির জন্য বাড়ির নৈঋৎকোনের দিকে আকাশপানে তাকিয়ে শুধু চোখের জল ফেলতাম,আমার দিদিমনি কবে আসবে এই প্রতিক্ষায়। হঠাৎ শুনি একদিন ঢাকার ছাত্রছাত্রীদের মেরে ফেলেছে পাঞ্জাবি।ছাত্রীদের আরও কিকি করেছে। সেদিন আমি দিদিমনির জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েছি।আর সন্ধ্যা হলেই রেডিওর সামনে বসে থাকতে শুরু করেছি।আমার শুধু টেনশন হত আমার দিদিমনি ঘরে ফিরে আসতে পারবে তো!আর একদিন সন্ধ্যাবেলা আমরা রেডিওর সামনে বসেছি। হঠাৎ আমাদের ভুলু গেউ গেউ করে ডেকে দৌড়ে গেল বাড়ির উত্তরের পথের দিকে। হঠাৎ দেখি ভুলু দিদিমনির পায়ে বেরি দিয়ে লেহন করতে করতে  আসছে,সাথে অমরচান টাউট।সাথে সাথেই আমার রেডিও শোনা বন্ধ।আমার আনন্দ আর ধরে কে।

এরপরই যুদ্ধ বেঁধে যায়।আমরা শোনতে থাকি হিন্দুদের পাড়ায় পাড়ায় ঢুকে পাঞ্জাবিরা মানুষকে সারিতে দাঁড় করিয়ে হত্যা করছে । সুন্দরীনারীদের ধরে ধরে নিয়ে যাচ্ছে ভাঙ্কারে।কেউ কেউ চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাচ্ছে।কারুর কারুর পেটে সন্তান দিয়ে ছেড়ে দিচ্ছে পাঞ্জাবিরা।তারা পরিবার পরিজন হারিয়ে মুখে-শরীরে কালসিটে দাগ নিয়ে পথে পথে আচরণ করছে পাগলের মতো।কত কথা কানে কানে উড়ে আসছে। একদিন শোনতে পাই,এক হিন্দু যুবতীনারীকে নাকি পাঞ্জাবী ভাঙ্কারে নিয়ে গিয়ে সন্তান ঢুকিয়ে দিয়েছে তার পেটে,আর পরে যখন তাকে তারা মুক্তি দিয়েছে;ওই নারী স্বামীকে খুজঁতে খুঁজতে বের করেছে। কিন্তু হায়!তার স্বামী ও পরিবার মিলে তাকে গাছে ঝুলিয়ে দিয়েছে।

তখন এরকম কত ফুয়েরি উড়ছে বাতাসে।মায়ের কোলে বসিয়ে সন্তানের বুকে গুলি করছে পাঞ্জাবি।রাতে কারোর চোখে ঘুম নেই ।যে যেদিকে পারছে, পালাচ্ছে।সহসা জানতে পারলাম।পাকিস্থানের যুবক দু'দলে ভাগ হয়ে গেছে।একদল মুক্তিফৌজ, আরেকদল রেজাকার।মুক্তিফৌজ দেশের মানুষকে রক্ষা করে দেশ স্বাধীন করতে চায়।তাদের নেতা মুজিবুর রহমান।তিনি নাকি দেশের এক দেবতা।যেখানে তিনি যান লক্ষ লক্ষ মানুষ এসে জড়ো হয় , তিনি ভাষণ দেন ।আর ঢেউএর মতো মানুষের মাঝে ঢেউ উঠে।তাঁর একটা ভাষণের কথা আজও মনে আসে-"তোমাদের যা কিছু আছে।তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক।মনে রাখবা,রক্ত যখন দিয়েছি,রক্ত আরো দেব।এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।"এই কথাগুলি তখন আমার মতো কিশোরদের মুখে যাত্রাগানের মতো ডায়লগে পরিণত হয়েছিল। 

জেনারেল ভুট্টো,যিনি পাকিস্তানের প্রধান তখন মুজিবুরকে নাকি মেরে ফেলতে চায়। যারা রেজাকার তারা নাকি পাঞ্জাবীদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতো মানুষের গাঁয়ে। রেজাকার ও মুক্তিযোদ্ধার মাঝে তখন নাকি কত সংঘর্ষ ঘটছে।খবর শোনছি মুখে মুখে।এক রেজাকারকে মুক্তিফৌজ ধরতে পেরে জীবন্ত তার শরীরের চামড়া তুলে লবন নাকি লাগিয়ে মেরেছিল।রেজাকারা তখন আমার কি যে দূষমন আজ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না।মনে আছে, আমার সমবয়সী দুই প্রতিবেশী বান্ধবীদের সাথে মিলে আমরা রেজাকার ,মুক্তিযোদ্ধা ও মুজিবুরের পুতুল বানিয়েছিলাম। মুজিবকে সিংহাসনে বসিয়ে তাঁর সামনে মুক্তিফৌজ দিয়ে রেজাকারের শাস্তির মহড়া দিতাম। মাঝে মাঝে শোনতাম মুক্তিফৌজের কেউ মাঝি সেজে পাঞ্জাবিদের নদী পার করে দেবে অজুহাতে মাঝগাঙে গিয়ে নৌকা ডুবিয়ে দিয়েছে। পাঞ্জাবিরা নাকি সাঁতার জানে না।তাই তাদের সলীলসমাধি হত।

আমাদের সকলের স্বজনেরা তখন পূর্ববাংলায় কেউ না কেউ আছেন।তাই আমাদের মাঝে তাদের জন্য সর্বদা আতংক বিরাজ করতো।আর সন্ধ্যা হলে গায়ের অনেকেই এসে আমাদের রেডিওর সামনে বসে খবর শোনত।খবর শোনত অমুখ গায়ের পুরুষদের লাইন করে মেরে ফেলা হয়েছে।নারীদের ধরে নিয়ে গেছে।শিশুদেরও রেওয়াত করা হচ্ছে না।তখন বড়দের চোখেমুখে দেখতাম উচাটন ও বিমর্ষতা।গল্প শোনতাম দলে দলে মানুষ ওপার থেকে এপারে পালিয়ে আসছে।আমাদের পরিবারের কাকা জেঠারা তখনও পূর্ববঙ্গে।তাদের কোন খবর নেই।কে কোথায় কেউ বলতে পারছে না।তখন আমাদের একমাত্র ভরসা অমরচান টাইট।সে লোক পারাপার করত।সেই মাঝেমধ্যে আমাদের স্বজনদের সম্পর্কে সত্যমিথ্যা খবর এনে দিত ও ভরসা দিত।

আকাশে যুদ্ধবিমান দিনরাত ঘুরঘুর করত।তখন আমার বুকের ভেতর ঘুরঘুর করত ভয় ।আমি কাঁপতে কাঁপতে আকাশের দিকে তাকাতাম।সহসা একদিন শোনা গেল ইণ্ডিয়া পাকিস্তান যুদ্ধ বেঁধে গেছে।কেননা হঠাৎ একদিন মেঘগর্জনের মতো থেকে থেকে ভয়ঙ্কর গর্জন উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে আমরা শোনতে পাচ্ছিলাম।বড়রা বলছেন এ গোলা,শেল ও মাইনের শব্দ।ভয়ানক কত খবর আসতে লাগল।পাঞ্জাবিরা ইন্ডিয়া আক্রমণ করতে পারে।এই জন্য আমাদের গ্রামে ঢুকে এস এস বি সৈন্যরা যুবাদের প্রাথমিক আত্মরক্ষার ট্রেনিং করাতে লাগল। ইতিমধ্যে ভারত পূর্ব পাকিস্তানের উপর ঝাপিয়ে পড়েছে।গুজব শোনা যেতে লাগলো মুজিবর ইন্দিরা গান্ধীকে নাকি ধর্মমা বলে ডেকেছে।
ইন্দিরাও আমেরিকার রক্তচোখ উপেক্ষা করে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা আনতে সিলেট সেক্টরে জে  এন রায়কে কমাডেন্ট করে রেখেছেন।ইনি নাকি আমার বন্ধু সুবোধের পিসা।সে এই নিয়ে আমার সাথে বলাবলি করত।আর নিজেকে জাহির করত। হঠাৎ একদিন শুনি, ধর্মনগর হয়ে বিশাল বিশাল ভারতীয় ফৌজের গাড়ি বাংলাদেশে যুদ্ধে যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের ফুল দিয়ে ,কচিকাঁচা হাত নাড়িয়ে তাদের সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করছে।এই জেনে আমারও বুক ফুলে উঠছে।এর মধ্যে শুনি ভারতের নাগা নামে নাকি এক রাক্ষুসে ফৌজ আছে।তারা মাটির নীচে থাকে।নারীর মুখ তাদের দেখানো হয় না।ওরা জ্যান্তমানুষ খেয়ে ফেলে।ভারত নাকি শেষ অবধি এই ফোজকে নিয়ে সেখানে ছেড়ে দেবে।এতে পাঞ্জাবির বিপদের কথা ভেবে আমার আনন্দ আর ধরে না।আমি তখন ভয় পেতে থাকি যদি এই রাক্ষসরা কোন নারীকে পায় তো খেয়ে ফেলতে পারে।এর মাঝে শুনতে পাই,ধর্মনগর শহরে বানর সেনা এসেছে।এরা এক চাস্টলে চা খেতে গেলে মালিক বানর ভেবে খারাপ চা পরিবেশন করে ,এতে বানরসেনারা গলায় বাঁধা বন্দুক মালিকের দিকে তাক করে।এরা নাকি গাছের ডালে ডালে লুকিয়ে যুদ্ধ করতে উস্তাদ।এরকম কত কথার ঘোর উড়ছে তখন বাতাসে।

দেখতে দেখতে উজানমাছমারা রিজার্ভ ফরেস্টের আকাশে বিমানের সংখ্যা অসম্ভব বেড়ে গেল।আমি আকাশপানে তাকিয়ে  দেখতে লাগলাম বিমানের উড়ার দৃশ্য।আমার ভয় বেড়ে যেতে লাগল। ইতিমধ্যে আমাদের দূরসম্পর্কের আত্মীয়রা কয়েক পরিবার এসে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিল।তাদের চোখমুখে আতঙ্কের ছাপ দেখে আমারও ভয় করতে লাগলো।তারা বলল, পাঞ্জাবিরা ভয়ঙ্কর।এদের বিশাল শরীর ।নারী দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।অল্পের জন্য এই পরিবারের নারীরা বেঁচে ফিরেছে।এদের একজন মহিলার যুবতি দুই বোনকে পাঞ্জাবিরা ধরে নিয়ে গেছে।তাদের আর কোন খবর নেই। মহিলা দিনরাত কাঁদছে।এর মধ্যে খবর এলো আমার পরিবারের কাকা জেঠা দাদুরা ডাউকির দিকে বালাটক্যাম্পে এসে উঠেছে।এই শোনে বাবা ছুটে যান শিলং হয়ে বালাটে।আমার ভয় করতে লাগলো বাবা ফিরে আসতে পারবে তো।বাবা যাবার পর খবর আসল,ক্যাম্পে ওলাওঠা মানুষ কে মেরে‌ ফেলছে।সে এক ভয়ঙ্কর রোগ।একজন থেকে আরেক জনে ছড়িয়ে পড়ে।এক ভয়ঙ্কর করালবদনা দেবী নাকি এই রোগের কারণ।আরেক দেবী আছেন শীতলা,যার সারাশরীরে চোখ।এই শীতলাদেবীর সাথে তুলনা করে কাজলাদিদি ও দিদিমনি আমাদের ওলাওটা দেবীর ভয়ঙ্করীরূপের গল্প শোনাতে লাগলেন। পূর্ববাংলায় থাকতে এই দুই দেবীর দেখাও নাকি কেউ কেউ পেত।এইসব কত গা-শিহরিত গল্পে আমার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠত।আজ তা বলে শেষ করা যাবে না।আর বাবার কথা ভেবে আমার কান্না পেত।

ওলাওঠায় বালাটক্যাম্পের মৃতদের দেহ নদীর চড়ে বালুর মাঝে‌ গেঁথে রাখা হচ্ছে।কোন উপায় নেই।কারণ সৎকারের পরস্থিতি নেই।যদি তাড়াতাড়ি ক্যাম্প ছেড়ে আমাদের পরিবারের লোক আসতে না পারে তবে তাঁরাও মরে যাবে।এইসব যখন চলছে।তখন একদিন আমি দাদার সাথে আমাদের বাড়ির উত্তরের জঙ্গলেএকটি টিলার মাঝে গরু বাঁধতে গিয়েছি।গাছে গাছে উল্লুক ও বানর লাফাচ্ছে।সহসা মাথার উপর শোনা গেল বিশাল মৌচাকের আওয়াজ।চকিতে তাকিয়ে দেখি দুটো যুদ্ধবিমান পাশাপাশি তীব্র বেগে ছুটতে গিয়ে আমাদের সামনের একটি বিশাল গর্জন গাছে ধাক্কা লাগতে লাগতে  পাশকাটিয়ে গিয়ে অল্পের জন্যে‌ রক্ষা পেয়েছে।আমাদের গরুগুলো তখন ভয়ে লেজ উঁচিয়ে সে কি দৌঁড়।আমি ও দাদা ততক্ষণে ভয়ে ঘাসের উপর লম্বা হয়ে পড়েছি।ভাবছি তবে কি পাঞ্জাবিরা এখানেও এসে গেছে।পরে শোনেছি এই দুটি বিমান পার্বত্য চাটগাঁয়ে পাকিস্তানী ফৌজঘাটিতে আক্রমন করে এসেছে। কেউ আবার বলেছে,একটি ইণ্ডিয়ার বিমান পাকিস্তানের বিমানকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

শোনতে পাচ্ছি,মুক্তিবাহিনী জোরকদমে ভারতীয় ফোজকে সাহায্য করছে।তাদের বীরত্বগাঁথা উড়ছে বাতাসে।একদিন শুনি আমাদের প্রিয় সিলেট বেতার কেন্দ্র পাঞ্জাবি বম মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।আর কোন খবর শোনতে পারা যাবে না।মন আমাদের সবার খারাপ হয়ে গেল।সবাই আমরা হতাশ হয়ে গেলাম,স্বজনদের কি হচ্ছে ,খবর জানতে পারব না ভেবে।বিবিসির সংবাদ শোনতে আমরা তখন পাগল ছিলাম।এর মাঝে একদিন শুনতে পাই, সিলেটের মেখলিছড়া চা-বাগানের ম্যানাজারকে মেরে তার পরিবারকে পাঞ্জাবিরা তুলে নিয়ে গেছে।এ শুনে আমার শ্বাস উঠতে লাগলো রয়ে রয়ে। হঠাৎ একদিন শুনতে পারি, পাঞ্জাবিদের একটি যুদ্ধপোত ধংস করতে ভারতীয় এক পাইলট বিমান নিয়ে জাহাজের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে জীবন দিয়ে সেটিকে ধ্বংস করেছে।আমার মনটা পাইলটের জন্য খারাপ হয়ে গেল,তার মা-বাবার কান্নার কথা ভেবে আমারও কান্না পেয়ে গেল।এর মাঝে একদিন সন্ধ্যা রাতে বাবা কাকা দাদু দাদিমা(বাবার কাকা কাকি), গোষ্ঠী জেঠার পরিবার অমরচান টাউটসহ এসে উপস্থিত হলেন বাড়িতে।তাদের একমাত্র সম্বল লোঠাবাটিঘটিথালা ও কয়েকটি সেলাইনের নল ও খালিবোতল।আর আমাদের ভুলু ঘেউ ঘেউ করতে করতে নাচতে লাগলো সারা উঠোন জুড়ে।কান্নার রোল উঠল রাতের বাতাসে।স্বজনরা একে ওপরকে জড়িয়ে সে কি কান্না।আমার খুড়তুতো ভাইবোন কাদঁছে।তার মা নাকি ওলাওঠায় মারা গেছে।আমার মনটা বিষাদে ডুবে গেল।এই কাকীর সৌন্দর্যের কত গল্প শোনেছি।আর জীবনে দেখতে পারলাম না। তিনি হারিয়ে গেলেন অকালে ,অবুঝ সন্তানদের রেখে।ভেতরে ভেতরে কানাঘুষো চলতে লাগল,কাকিকে নাকি পাঞ্জাবি ধরে নিয়ে গেছে।এ শোনে আমার ভেতরের কান্না দেখে কে।একদিন পাঞ্জাবীরা ভারতের কাছে পরাজিত হল।হাজার হাজার পাঞ্জাবি সৈন্যেরা নাকি হাত তুলে সারেণ্ডার করেছে।তারপর তাদের বন্দী করেছে ভারতীয় ফৌজ।এই খবরে আমার বুকে সেকি উন্মাদনা। কিন্তু বারবার আমার মনের মাঝে উঠতো সেই কাকির কথা।আর গোপনে দীর্ঘ শ্বাস ফেলতাম।

আমার এক বর-বাবা যুধিষ্ঠির নাথের কথা,উঠলো এরই মাঝে।যিনি নাকি আমার নাম রেখেছিলেন হরিবল,সন্তানহীন যুধিষ্ঠির যাতে মৃত্যুর আগে ও মৃত্যুর সময় হরিবল নাম নিতে পারেন ,এই নাকি ছিল তার উদ্দেশ্য। তিনি নাকি আমাকে দেখার জন্য সর্বদা ছটপট করতেন। কিন্তু তাকে ওলাওঠা ছাড়েনি।কিন্তু বর্ডার পেরোনোর আগেই উলাউঠা তাকে ছিনিয়ে নিল।আর হরিবল বলতে বলতেই নাকি প্রাণ ত্যাগ করেছিলেন।

এমন এক ঘোরলাগা যুদ্ধের ছবি আজো  আমার অন্তরে ভাসে আর আমি মাঝেমধ্যে কেমন যেন হয়ে যাই।

গোবিন্দ ধর :১৭
হৃদয়ে রাইমা একটি আত্ম উপন্যাস। পরবর্তী উপন্যাস বিষয়ে বলুন।

হারাধন বৈরাগী :১৭
-হৃদয়ে রাইমাকে আপনিই কেবল উপন্যাস বললেন।আমি এটাকে উপন্যাস বলার ঘোর বিরোধী।আসলে আমি সচেতনভাবেই এটাকে উপন্যাস করতে চাইনি।অবশ্য কথা প্রসঙ্গে কবি পদ্মশ্রী মজুমদার আমাকে একদিন বলে বসলেন,'হৃদয়ে রাইমা'কে আমি উপন্যাস না বললেও এর ভেতরে একটি উপন্যাস লুকিয়ে আছে।অবশ্য এতে উত্তম পুরুষে আমি আমার ব্যক্তিগত কালখণ্ডকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।যেমন একজন লোকগবেষক যখন ব্যাক্তিগত জীবন আকঁতে গিয়ে অজান্তেই লোকজীবন এঁকে ফেলেন।আমিও তেমনি নিজের কথা বলতে বলতে এঁকে ফেলেছি একটি পাহাড় খণ্ড ও তার সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবন জীবিকা বোধ-অবোধ, সুখ-দুঃখ, প্রেম-পয়ার,বিশ্বাস-বিরোধ,সংগ্রাম-সংঘর্ষ,সংস্কার--। সর্বোপরি জঙ্গলের ভেতরের রূপ-অরূপ।আমার বিশ্বাস আমার আগে আর কেউ জঙ্গলের এমন রূপ-অরূপ-কুহক-কথা লেখেননি।হ্যা।আমার পরবর্তী উপন্যাসের পরিকল্পনা আছে।লেখা চলছে। সম্পূর্ণ হলেই বিষয় বলব।তবে এইটুকু বলতে পারি, আমার পরবর্তী উপন্যাসের আধারও জনজাতি মানুষকে নিয়েই।কোন একটি জাতিসত্তার অভিবাসন কেন্দ্রিক।দেখি কি হয়।সত্যি বলতে কি তাদের ছেড়ে আমার কোনকিছু লেখা বুঝি কোনদিন আর হবে বলে মনে হয় না।তবে এ নিয়ে আমার কোন আক্ষেপও নেই।

গোবিন্দ ধর :১৮
আপনি কবি।কথাকর্মী।কিন্তু পৃথিবীতে এত কর্ম থাকতে কেন লিখতে এলেন?কেন লেখেন।

হারাধন বৈরাগী :১৮
-হ্যাঁ ঠিকই বলেছেন আপনি। পৃথিবীতে এত কর্ম থাকতে লিখতে এলাম কেন?-এটাই বড় প্রশ্ন।আসলে কেন লিখি,এমন প্রশ্নের উত্তরে বলবো,প্রাণের দায় থেকেই লিখি।নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যই লিখি। সত্যি বলতে কি, ছেলেবেলা থেকেই আমার ভেতরে ভেতরে কেউ যেন সূতো কাটতো,কিছু লিখিয়ে নিতে চাইত।আর যখনই তা হত,তখন কিছু লিখে ফেলতাম।তারপর যৌবন এল, কেউ যেন ভেতর থেকে কিছু লেখাতে চাইল,লিখলাম।মাঝে একটা বড়সময় ভেতরের তাড়না সত্ত্বেও লিখিনি, নিজেকেই নিজে কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছি।এই সময়টা আমার খুব কষ্টে কেটে ছিল।তখন কত কর্মে নিজেকে জড়িয়ে ফেললাম।কাম অর্থ মোক্ষ-কত পথ ঘুরে দেখলাম  কিন্তু কোথাও শান্তি পেলাম না। আপনি জানলে অবাক হবেন,আমি যোগগুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে বেশ একটা সময় অধ্যাত্ম যোগেও বিচরণ করেছি। কিন্তু কোন মার্গেই নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। ভালো বাসতে পারলাম না।কারণ একটাই,ওই সব মার্গে যখনই ডুবতে গেছি, কেউ যেন ভেতর থেকে এসে অসম্ভব বাদ সাধত।বুঝতাম এ অন্য কেউ নয় আমার লেখিকা।আমার ঘোরলাগা ভালোবাসা।

আসলে ভালোবাসাই আসল,আর সব মেকি।ভেতর থেকে ভালোবাসা ছাড়া পৃথিবীর কোন কাজই হয় না।এও ঠিক জগতের যেকোন মার্গ বা পথই সমুদ্র।কার কোন‌ মার্গের সাথে আত্মার যোগ,নাড়ির যোগ, কোথায় তার ঘোর, সেটাই আসল কথা।

তাই সকল মার্গ ছেড়ে, সকল কর্মের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে আমার ভেতরের কেউ যেন‌ আমাকে বাধ্য করল,ফের লিখতে।আর আমি ফের লিখতে লাগলাম।আর এখন, আমার অন্তরজগৎ ও বহির্জগতের মাঝে সর্বদা যেন মিতস্ক্রিয়া চলেছে।আর একটা ঘোরের ভেতর চলেছি।এ থেকে বেরোতে পারি না।এই থেকে ভেতরে সর্বদা কে যেন উচাটন করে, না লিখে থাকতে পারি না।সত্যি বলতে কি এখন যতোই জীবনের শেষের পাতার দিকে যাচ্ছি ততই আমি ঘোরের মাঝে ডুবে যাচ্ছি।এখন বুঝি না কেন লিখি কিজন্য লিখি।লিখলেই কি না লিখলেই কি?
(ক্রমশঃ)

গোবিন্দ ধরের নদী নদীর গোবিন্দ :হারাধন বৈরাগী:স্রোত প্রকাশনা
হৃদয়ে রাইমা:হারাধন বৈরাগী:স্রোত প্রকাশনা

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ