কবিতার ভবিষ্যত, ভবিষ্যতের কবিতা :অলোক বিশ্বাস

কবিতার ভবিষ্যত, ভবিষ্যতের কবিতা :
অলোক বিশ্বাস
'মানসী' কবিতা গ্রন্থে 'মেঘের খেলা' কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন : 'কখনো ধীরে ধীরে ভেসে যায়,/কখনো মিশে যায় ভাঙিয়া---/কখনো ঘননীল/
বিজুলি-ঝিলিমিল,/কখনো ঊষারাগে রাঙিয়া।' প্রকৃতির খেলার যে ছবিটা আমরা পেলাম এখানে, সেই খেলা কবিতাতেও চলছে, সুদূর অতীত থেকে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। শব্দ--- কবিতায় খেলা করে বহু বিচিত্র ভঙ্গিমায়, শব্দের আচরণকে যে কবি যতোটা আবিষ্কার করতে পেরেছেন, তাঁর কবিতা ততোই বহু মাত্রিকতার দিকে গেছে। মেঘের খেলার মধ্যে কী কী দেখছি আমরা এখানে শুধুমাত্র একটি স্তবকে? ১. মেঘ কখনো ধীরে ধীরে ভেসে যায়। ২. কখনো মিশে যায় ভেঙে ভেঙে। আমরা যদি সম্ভাবনার কথা ভাবি, তাহলে মেঘের এই ভেঙে ভেঙে মিশে যাওয়াকে পৃথিবীর হাজার হাজার বস্তু জগতের ও প্রাণী জগতের মধ্যে মিশে যাওয়াকে কল্পনা করতে পারি। মেঘের ভেঙে যাওয়ার প্রকৃতি স্বতঃপ্রণোদিত, যদিও সেখানে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণও বর্তমান। এবার, এই এ্যানালজিকে যদি শব্দ বাক্য তথা সিনট্যাক্স এর ক্ষেত্রে, সেমান্টিক্সের ক্ষেত্রে সচেতনভাবে প্রয়োগ করি, তাহলে অণু পরমাণুর মতো শব্দের ভেঙে যাওয়া, অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাওয়া থেকে শুরু ক'রে বহুঅর্থময় এবং বহুইঙ্গিতময় হয়ে ওঠার অবস্থা তৈরি হবেই। বাংলা কবিতার আধুনিক পর্বের আগে সেটা যেমন হয়েছে, আধুনিক পর্বেও হয়েছে, উত্তর আধুনিক পর্বেও দেখছি আমরা। ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে শব্দের বহুমাত্রিক প্রয়োগের খেলা। কবিতার পংক্তিতে শব্দের আচরণ বিন্যাসের কোনো চরম সীমায় আমরা কোনোদিন পৌঁছতে পারবো না, এই কারণেই যে কবির কল্পনার নিরীক্ষায় কোনোদিন কোনো বর্ডার ছিলো না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। কল্পবাস্তব প্রসবিত শব্দ বিন্যাসের আচরণ শাশ্বত পরিবর্তনশীল এক আচরণ। একই শ্রেণিস্তরে যাপিত দুজন মানুষের কবিতার ভাষা তাদের মানসিক অবস্থানের ভিন্নতার কারণে ভবিষ্যতেও পৃথক পথে চালিত হবে। আবার একই ভাষার মানুষ হয়েও ভিন্নতর ভৌগলিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও শ্রেণিগত বিপরীত অবস্থানের কারণে কবিতার সামগ্রিক লিখন প্রক্রিয়াটির ক্ষেত্রেও স্বভাবগত ডাইভারসিটিও ১০০০ পরেও থেকে যাবে। ফ্যান্সি আর ইমাজিনেশনকে এক করে দেখেছিলেন উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ। কিন্তু কোলরিজ ডিফার করলেন। কোলরিজ বিস্তারিত বলেছিলেন প্রাইমারি এবং সেকেন্ডারি ইমাজিনেশন সম্পর্কে যা রোমান্টিক কবিতার ট্র্যাডিশন বদলে দিয়েছিলো।    মানুষের প্রযুক্তি ও সমস্ত জাগতিক পরাজাগতিক অঞ্চল তথা স্পেস আজ থেকে ১০০ বছর পরে নিশ্চিতভাবেই যে আজকের জায়গা থেকে বহুদূরে শিফ্ট করে যাবে, সেকথা একটি শিশুও ভালো ক'রে বোঝে। রবীন্দ্রনাথ আর কী লিখলেন ওই স্তবকে মেঘের খেলা প্রসঙ্গে ? লিখলেন, ৩. মেঘ কখনো ঘননীল। 
৪. বিজুলি-ঝিলিমিল। ৫. কখনো ঊষারাগে রাঙিয়া। এছাড়া মেঘের খেলা প্রসঙ্গে ওই কবিতাটিতে আরও বিস্তারে চলে গেছেন কবি, ওই বিশেষ স্তবকের আগে ও পরে। লিখেছেন, 'মেঘের খেলা-সম হ'ত সব/মধুর মায়াময় ছায়াময়।' আরও লিখছেন, 'যেমন প্রাণপণ বাসনা/তেমনি বাধা তার সুকঠিন---/সকলই লঘু হয়ে/কোথায় যেত বয়ে,/ছায়ার মতো হ'ত কায়াহীন।' কল্পনার কারিগরিতে বস্তুজগৎ, প্রকৃতি জগৎ আর মানব জগতের স্থির অস্থির সত্তার আদল তথা মোডাস অপারেন্ডি বদলে বদলে যায় কবিতায়। যে ভাষায় চর্যাপদ লেখা হয়েছে, যেভাবে শব্দকে ও তার মুডকে ধরা হয়েছে পারিপার্শ্বিকতার ও সহজিয়া বৌদ্ধধর্মের দর্শন ভাবনায়, সেভাবে তো আর লিখলেন না বৈষ্ণব পদকর্তারা। কবিতা যে আপামর মানুষের জন্য নয়, কোনো শিল্পই হয়তো আপামরের জন্য কোনোদিন ছিলো না, সেই বিচারে উপনীত হওয়াটাও তো চর্যা পদকর্তা ঢেন্টন পা-এরও ছিলো বলেই তিনি লিখেছিলেন, 'ঢেন্টন পা-এর গীত বিরলে বুঝঅ'। সমগ্র চর্যাপদের ভাষা বৈষ্ণব পদাবলীর কালখণ্ডে আর দেখা গেলো না। কেন ? সামাজিক রাষ্ট্রিক অর্থনৈতিক আর মানব পরিচয়গত জাতি সত্তার পালাবদল। রাধা-কৃষ্ণ ভাবনা চর্যায় ছিলো কি ? অথচ বৈষ্ণব পদাবলীতে সেটারই জয় জয়কার। রবার্ট ফ্রস্টের, 
টি. এস. এলিয়টের, সময়ের বাস্তবতা আর আজকের ২০২১ এর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। ক্রিসটিনা রসেটি যে ন্যারেটিভ ব্যবহার করলেন The Goblin Market কবিতায়, সেই ন্যারেটিভিটি আজকের কবিরা ব্যবহার করছেন না। যদিও শব্দের প্রচুর খেলা ছিলো ক্রিসটিনা রসেটির 'দ্য গবলিন মার্কেট' কবিতায়। একটু উল্লেখ করা যাক :
"Evening by evening/Among the brookside rushes/Laura bow'd her head to hear,/Lizzie veil'd her blushes/Crouching close together/In the cooling weather/With clasping arms and cautioning lips,/With tingling cheeks and finger tips./'Lie close,' Laura said,/Pricking up her golden head :/'We must look at goblin men,/We must not buy their fruits :/Who knows upon what soil they fed/Their hungry thirsty roots?'/'Come buy,' call the goblins/Hobbling down the glen./'Oh', cried Lizzie, 'Laura, Laura,/We should not peep at goblin men." শব্দের ধ্বনিগত স্বয়ং প্রকাশ এখানে শুনতে পাচ্ছি আমরা। ন্যারেটিভকে নিংড়ে ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। কিন্তু এখন এমন কবিতার পাঠক থাকলেও, এ্যাকাডেমিক্যালি এইসব কবিতা  পাঠকেরা পড়তে উন্মুখ হলেও, এরকম কবিতা এখন একবিংশ শতকে কেউ লিখতে চাইবেন না।
##
কবিতার কালান্তর(১৯৭৬) গ্রন্থে 'কবিতার ভাষা' প্রবন্ধে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় আমাদের জানিয়েছিলেন : 'একালের কবির কাছে শব্দ শুধু বাক্যকে সম্পূর্ণ করার উপাদান নয়। শব্দের ভিতরেই রয়েছে কবির ভাবনার অভিজ্ঞান। শব্দেরা মৃত--- কবিই তাকে উজ্জীবিত করেন, তখন সেই জীবন্ত শব্দেরা হয় মান্ত্রিক। কবি শব্দকে খুঁজতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতাকে, স্মৃতিকে অস্তিত্বের স্তরগুলিকেই খোঁজেন। তাই এক-একটি শব্দের ভিতরে কবির সমগ্র সত্তার আলোড়নকে, সংক্ষোভ এবং শান্তিকে সংহত ক'রে তোলাই কবির লক্ষ্য।'
সভ্যতার পরিবর্তিত অবস্থার সঙ্গে শিল্পের অনিবার্য সম্পর্কের কথা অস্বীকৃত হয়নি। টি এস এলিয়টের কালখণ্ডের সঙ্গে মঙ্গল কাব্যের কালখণ্ডের ও জীবনধারার অনেক পার্থক্য জেনেছি আমরা। ইউরোপের, বিশেষ ক'রে ইংল্যান্ডের পেগান ন্যারেটিভ কবিতার কালখণ্ডের সঙ্গে একাদশ দ্বাদশ শতকের চর্যার পদ কর্তাদের মনস্তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ভাবনার বৈসাদৃশ্য দেখেছি আমরা। বৈষ্ণব পদাবলীর যে রূপতাত্ত্বিক প্রকৃতি, যে আকুতি ও বেদনাবোধ, যে আনন্দ ও শৃঙ্গার, মাথুর চেতনা তার সঙ্গে মঙ্গল কাব্যের প্রভেদ অনেক, গঠনে, বিষয়ে ও দৃষ্টিভঙ্গিতে। গীতিময়তা আর অলঙ্কার একসময় ছিলো কাব্যের প্রধান প্রকরণ। মেটাফিজিক্যাল আর রোমান্টিক কবিতার তো একটা ক'রে বিশেষ যুগই তৈরি হয়ে গেছিলো। সেই অধ্যায় পেরিয়ে আমরা ঢুকে পড়লাম গদ্যময় কবিতার পৃথিবীতে। কঠিন নীরস চাঁছাছোলা গদ্যেও লেখা হলো কবিতা। একদল কবি বললেন, লিরিককে রাখতেই হবে। চিত্রকল্পকে রাখতেই হবে। আর একদল বললেন, চিত্রকল্প নয়, কল্পচিত্র ব্যবহার হবে কবিতায় এবার থেকে। জীবনানন্দের কবিতার ভাষা টুকটাক কেউ প্রভাবিত হয়ে আপন কবিতায় মেশালেও, নতুন কবিরা সেটা মেনে নিতেই পারলেন না, বিংশ শতাব্দীর শেষে। বুদ্ধদেব বসুকে কেন্দ্র ক'রে কবিতার যে বিশাল বলয় নির্মিত হলো, তা সত্ত্বেও পঞ্চাশ এবং ষাট দশকের কবিরা উপলব্ধি করতে দেরি করলেন না, তিরিশ চল্লিশের কাব্য শৈলি উত্তর স্বাধীনতা কালখণ্ডে অচল।
##
ঈশ্বর বলতে যা বোঝায় তা সম্পূর্ণভাবে কল্পনা ও ধারণা মাত্র, যার বাস্তব ভিত্তি একেবারে নড়বড়ে এবং মিথ্যা। মিথ্যা আর গুজব আর অপরিণত লৌকিক বিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে, প্রকৃতিক শক্তির ভয়ংকরতাকে বৈজ্ঞানিক সত্যের দ্বারা বুঝতে না পারার অক্ষমতা থেকে ঐশ্বরিক সত্তার কল্পনা ও কাহিনি নির্মাণ। ফলত, ঐশ্বরিক ধারণা বা বিশ্বাস চিরকাল লোগোসেন্ট্রিক হয়েই থেকেছে। এর কোনো নতুনতর অগ্রগতি ঘটেনি, বিকাশ ঘটেনি বরং প্রবলভাবে একমাত্রিক, হুজুগে ও সহনশীলতাহীন হওয়ায় এক লোগোসেন্ট্রিজমের সঙ্গে অন্য লোগোসেন্ট্রিজমের প্রতিমুহূর্তে বিরোধ বাঁধতে বাঁধতে জটিলতা আর মারমুখিনতা তৈরি হয়েছে। কেবলমাত্র অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। ঐশ্বরিক কল্পনার এক লোগোসেন্ট্রিজম অন্য লোগোসেন্ট্রিজমের বিনাশ চেয়েছে। এবং এর মঙ্গলসংক্রাত প্রয়াসটি সম্পূর্ণ ভান আর প্রহসনে ভরা। আর এখানেই কবিতা কল্পলতার সঙ্গে ঐশ্বরিক কল্পনার পার্থক্য। কবিতা যুগে যুগে এগিয়েছে। ঐশ্বরিক কল্পনা একই স্থানে দন্ডায়মান। বরং তার চেতনাহীনতার ও কুসংস্কারের জায়গাটা এতোটাই ভিত্তিহীন যে আপাত সার্বিকভাবে ছড়িয়ে পড়া ঘটলেও তার মঙ্গল ক্রিয়াশীলতার স্থানটি একেবারেই ফাঁপা। কবিতা কল্পনার ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ঐশ্বরিক কল্পনা। একটি লোগোসেন্ট্রিক আর অন্যটি লোগোসেন্ট্রিসিটিকে ছাড়িয়ে। ফলত, প্রথমটির ক্ষেত্রে যদি স্থিত থেকে বিভেদ আর চোখ রাঙানি তো দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আর আন্তর্জাতিক সদ্ভাব। সেকারণে এক দেশের কবিতা অন্য দেশের মানুষেরা পাঠ ক'রে এসেছে, স্বেচ্ছায় অনুবাদ ক'রে এসেছে। অথচ, এক ধর্ম অন্য ধর্মকে গ্রহণ করছে, সেটা বিরল ঘটনা। ধর্মের চরিত্র দেখা গেছে অন্য ধর্মকে সন্দেহ করা এবং সংহার করা। প্রতিদিন আমরা এর নমুনা খুঁজে পাচ্ছি প্রত্যক্ষভাবে দেশে দেশে। ভবিষ্যতে ধর্মের বিকল্প হবে কবিতা। যে বিভেদ ধর্মে আছে, কবিতায় সেই বিভেদ নেই। কবিতা শিল্পই হবে মানসিকভাবে বেগবান থাকার অন্যতম রসদ। অতিমারীর সময় ধর্ম মানুষকে নতুন করে বাঁচার কোনো রসদ বা মুক্তির ঠিকানা দিতে পারেনি। বিভিন্ন ধর্মস্থানে গিয়ে অতিমারী নিরসনে যৌথ প্রার্থনার ফল হয়েছে উল্টো। তাতে ক'রে অতিমারী আরো ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু, এই অতিমারীর সময় মাত্র দু'বছরে কবিতা শিল্পের ক্ষেত্রে নীরবে সরবে ঘটে গেছে বিপ্লব, নেট দুনিয়ার মাধ্যমে। নেট দুনিয়াকে সার্থকভাবে কাজে লাগিয়েছেন কবিরা। বিশ্বের এক দেশের কবিদের সঙ্গে, অন্যভাষী কবিদের সঙ্গে, আর এক দেশের কবিদের নিরন্তর বন্ধুত্বপূর্ণ কনফারেন্স চলেছে নেট প্রযুক্তির সাহায্যে যা ভবিষ্যতেও এ্যাতোটাই বিস্তৃত হবে, যা হয়তো, নেট দুনিয়াকে ইতিবাচকভাবে যেসব কবিরা ব্যবহার করতে পারছেন, তাঁরাই গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। নেট দুনিয়ার বিকাশ কবিতার আন্তর্জাতিক বিকাশে অকল্পনীয়ভাবে ছড়িয়ে দেবে অদূর ভবিষ্যতে। ভবিষ্যতে এই আন্তর্জাল প্রযুক্তি একজন কবিকে খুব কম সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছে দেবে। এক ভাষার কবিতা বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ভুল অনূদিত হয়ে যাবে প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নতিতে।
##
ইতিহাস, পরম্পরা, ট্র্যাডিশন ভবিষ্যতকে সমৃদ্ধ করে। যা কিছু ট্র্যাডিশনে ছিলো না, তাকে আবিষ্কারে, নতুনতর খোঁজে সাহায্য করে অতীত। Tradition and the Individual Talent প্রবন্ধে টি. এস. এলিয়ট প্রায় গ্রাফিক্যালি দেখিয়েছেন কিভবে অতীত ইতিহাস বর্তমানের সমৃদ্ধ উপলব্ধিতে সাহায্য করে। আজকের কবিরা যতো বেশি পূর্বজদের লেখা পাঠ করবেন, ততোই তাঁরা বর্তমানের বহুরৈখিক চেতনার ব্যঞ্জনা আপন আত্মসত্তায় বিশ্লিষ্ট করতে পারবেন। আমি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, যাঁদের পূর্বসূরিদের কবিতার ধারণা নেই বা খুবই কম, তাঁরা অত্যন্ত দুর্বল কবিতা লেখেন। এবং তাঁরা যে অতি দুর্বল এবং ট্র্যাশ লেখেন, সে সম্পর্কে তাঁরা আদৌ বুঝতেই পারেন না। পূর্বসূরিদের কবিতা বারবার পাঠ করতে বলতেন বিনয় মজুমদার। সেখানেও আবার সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজীয়তা আছে, তা না হলে টুকলিবাজি হয়ে যাবে কিভাবে, সেই কবি, পাঠক নিজেও বুঝতে পারবেন না। পূর্বসূরি কবিদের হাতে বিষয়ের ব্যবহারের পদ্ধতি এবং কবিতা লেখার প্রক্রিয়া ও ফর্ম কিভাবে ক্রিয়াশীল ছিলো, সেটা যতো বেশি জানা যাবে, ততোই ভবিষ্যতের কবিতার সার্বিকতায়, এমনকি ফ্র্যাগমেন্টেশনে কাজ করতে সুবিধা হবে। মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ইউগোস্লাভিয়ার কবি ভাসকো পোপার কবিতার অনুবাদ করেছিলেন সুন্দরভাবে। ভাসকো পোপা জন্মেছিলেন ১৯২২ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে। তো পোপা, ছোটো বাক্স নিয়ে একটা সিরিজ লিখেছিলেন।  সেই সিরিজের কবিতাগুলোর আবার পৃথক পৃথক টাইটেল দিয়েছিলেন। এরকমই একটি কবিতা 'ছোটো বাক্সর বাসিন্দারা'। পুরো কবিতাটা রেফার করছি--- 'ছোটো বাক্সর মধ্যে ছুঁড়ে দাও/এক পাথর/তুমি বার ক'রে আনবে এক পাখি/ছুঁড়ে দাও তোমার ছায়া/তুমি বার ক'রে আনবে সুখের ছায়া/ছুঁড়ে দাও তোমার বাবার শেকড়/তুমি বার ক'রে আনবে ব্রহ্মাণ্ডের চক্রনেমি/ছোটো বাক্স তোমার জন্য কাজ করে/ছোটো বাক্সর মধ্যে ছুঁড়ে দাও/এক ইঁদুর/তুমি বার ক'রে আনবে এক থরথর পাহাড়/ছুঁড়ে দাও তোমার জননী মুক্তো/তুমি বার ক'রে আনবে শাশ্বত প্রাণের পেয়ালা/ছুঁড়ে দাও তোমার মাথাটা/তুমি বার ক'রে আনবে দুটো/ছোটো বাক্স তোমার জন্যই কাজ করে।' 'ছোটো বাক্স'--- এই সামান্য বিষয়কে ব্যবহার করে কী অসামান্য কবিতা। এই কবিতা ভবিষ্যত প্রজন্ম বারবার পাঠ করবেন নিশ্চয়ই। কিন্তু ধরা যাক, এই কবিতাটি ভবিষ্যতের একজন কবি বহুবার পড়লেন। তারপর তাঁকে একদিন বলা হলো, ছোটো কিছু বিষয়ে একটা কবিতা লিখতে। তো সেই কবি ঠিক করলেন, ছোটো বাক্স সম্পর্কেই তিনি একটা কবিতা লিখবেন। এবার প্রশ্ন হলো, তিনি ছোটো বাক্স সম্পর্কে কেমন কবিতা লিখবেন, কিভাবে লিখবেন ? তিনি কি ভবিষ্যতের কবিতাটা লিখবেন নাকি ভাসকো পোপার এই কবিতাটি হুবহু বা সামান্য পাল্টে কপি মেরে দেবেন ? কপি করলে তাঁর কবিসত্তার পুরোটাই জলে গেলো। অর্থাৎ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ঈশ্বর গুপ্ত থেকে রবীন্দ্রনাথ পড়বে ভবিষ্যতে। জীবনানন্দ থেকে মলয় রায়চৌধুরী পর্যন্ত এবং মৃদুল দাশগুপ্ত বা উমাপদ কর থেকে প্রদীপ চক্রবর্তী এবং দেবযানী বসু থেকে রত্নদীপা দে ঘোষ বা বুদ্ধদেব হালদার পর্যন্ত কবিতা পড়তেই থাকবে ভবিষ্যত প্রজন্ম। কিন্তু তাঁদের এইসব কবিতা ১০০ বছর পরে আর লেখা হবে না। রবীন্দ্রনাথের কবিতা দ্বিতীয় বার লেখা যায় না। জীবনানন্দের কবিতা আর কেউ লিখতে চাইলেও লিখবেন না। যদি কেউ লেখেন, তাহলে বিপর্যয় ঘটবে।  'conformity between the old and the new'-এর মধ্যে দিয়ে ভবিষ্যত খুঁজে পাবে কবিতার অপর+অপর+অপর+অপরোত্তর ভাষাগ্যালাক্সি। কবিতায় ব্যবহৃত হবে মহাবিশ্ববোধের ভাবনা, কবিতায় ব্যবহৃত হবে depersonalised objectivity-র নানা রূপ, ভবিষ্যতের কবিতায়। গ্যালাক্সির অসাধারণ খেলাকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে যেমন বিজ্ঞানীরা মহাবিশ্বের নতুন নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার করেছেন, কবিতায় চলতে থাকবে সেই কাজ অনন্ত কাল ধ'রে। বাংলা কবিতার ভবিষ্যত নির্ধারণ ক'রে দিয়েছে জাতীয় আন্তর্জাতিক অসংখ্য ঘটনা। মার্ক্সবাদ এবং তার বিকাশ, পরাবাস্তববাদ তথা সুররিয়ালিজম, অস্তিবাদী দর্শন তথা একজিসটেনশিয়ালিজম, ব্রিটিশ বিরোধী বা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন, লেনিনবাদ তথা রাশিয়া ও চিনের সমাজ তান্ত্রিকবিপ্লব, চিনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব, প্রগতি লেখক শিল্পী সংঘ গঠন, তার আগে ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, উত্তর ঔপনিবেশিকতার তত্ব, গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাকসহ অন্যদের সাবঅলটার্ন বিষয়ক বিভিন্ন ধারণা, মিশেল ফুকো, জাক দেরিদা,  সস্যুর-এর ভাষাতত্ত্বের এবং পোস্টস্ট্রাকচারাল বিষয়ক নতুন ধারণা, ভাষা কবিতা, পোস্টমডার্নিস্ট মুভমেন্ট, ফেমিনিজম চিন্তার নতুন বিকাশ, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের অভূতপূর্ব চিন্তাসূত্র, লেসবিয়ানিজম ও হোমোসেক্সচুয়ালিটির মুক্ত হাওয়ার প্রবণতা, ইউরোপের ইমেজিস্ট আন্দোলন, ইমপ্রেশনিজম, মূর্ত বিমূর্ত শিল্পের চিন্তাসূত্র ইত্যাদি অতীতে যেমন বাংলা কবিতার গতিপ্রকৃতিকে সম্প্রসারিত করেছে, তেমনি ভবিষ্যতেও এগুলোর পুনরাবৃত্তি না হলেও, এইসব দর্শনতত্ত্ব ও সন্দর্ভ থেকে কবিতা বিষয়ক এমন চিন্তাক্ষেত্র নির্মিত হবে যখন সেইসময়কার কবি ও কাব্য সমালোচকরা একবিংশ শতকের কাব্যকলার সঙ্গে ত্রয়োবিংশ শতকের কাব্য নির্মাণের স্পষ্ট পার্থক্য দেখাতে পারবেন।
##
ভাষার ডায়াস্পোরা এবং হাইব্রিটিকে ব্যবহার করেছেন পোস্টমডার্ন কবিরা। গত দুই শতাব্দীকাল ধরে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের দর্শন থেকে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। তেমনি বিংশ শতকের প্রথমার্ধে প্রলেতারিয়েত বা শ্রমিক কৃষকের জীবন দর্শন চেতনাকে ভিত্তি ক'রে অজস্র কবিতা লেখা হয়েছে পৃথিবী জুড়ে। মায়াকোভোস্কি, ডিল্যান টমাস বা সিলভিয়া প্ল্যাথের মতো কবিতা কি লেখা হবে ১০০/২০০ বছর পরে ? বিংশ শতকে কবিতার ফর্ম নিয়ে আমরা জানি প্রায় গোটা বিশ্বেই এ্যান্টিপোয়েট্রি থেকে শুরু ক'রে কংক্রিট কবিতার ব্যাপক নিরীক্ষা চলেছিলো। পাখির উড়ে যাওয়ার দৃশ্যাবয়বে শব্দ বসিয়ে, জানলা বা দরজার গঠনকাঠামো চিত্রে শব্দ বসিয়ে, অদ্ভুত মদের গ্লাসের অবয়বে শব্দ বসিয়ে, নৃত্যরত নারীর দেহদৃশ্যে শব্দ বিন্যাসে কবিতার নিরীক্ষার ব্যাপক পাগলামি চলেছিলো। শ্রুতি আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তি পরেশ মণ্ডল মানমন্দিরের আদলে কবিতা লিখলেন। নামও দিলেন 'মানমন্দির'। মানচিত্রে ছড়িয়ে থাকা মহাদেশের আদলে কবিতা লিখলেন। নামও দিলেন 'মহাদেশ'। তাঁর কবিতার বইয়ের নাম দিলেন '৪৪৪'। লিখলেন পিরামিডের আদলে কবিতা। স্কেচ পেনে মুখের রেখাচিত্র টেনে, তার ওপর রাউন্ড করে শব্দ বসিয়ে নাম দিলেন 'কম্পোজিশন'। কবিতার ফর্মে শ্রুতি আন্দোলনের কবিরা, প্রকল্পনা সাহিত্যের কবিরা ব্যাপক গ্রাফিকের কাজ ক'রে গেছেন। হাংরি কবিদের যে দেহগত ভায়োলেন্স, স্ল্যাং-এর যে ব্যবহার,  কবিতা ভাষার যে হুলিগানিস্টিক, রুড মারদাঙ্গা, যা চল্লিশ পঞ্চাশের দশকের কবিদের লেখায় ছিলো না। বিনয় মজুমদার 'ভুট্টা সিরিজ' লিখেছিলেন অনেক পরে। ভুট্টা সিরিজের কবিতাগুলোকে অনেকেই মেলাতে পারেননি বিনয়ের পূর্ববর্তী কবিতার সঙ্গে, কবিতা হিসেবে সেইসব কবিতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। তথাপি, এসবই বাংলা কবিতার পরম্পরা। এই পরম্পরাকে মস্তিষ্কে নিয়েই নতুন কবিতা আন্দোলন শুরু করেছিলো কবিতা ক্যাম্পাস পত্রিকা নয়ের দশকের শুরু থেকে। নয়ের দশক থেকে পরবর্তী দশকগুলোতে বাংলা কবিতার ভাষায় আবারও একটা ভাঙচুর দেখা গেলো মূলত কবিতা ক্যাম্পাসের কবিদের নতুন কবিতা, প্রথাবিমুক্ত কবিতা লেখার প্রবণতায়।
##
কবিতা লেখার পাশাপাশি প্রথাবিমুক্ত কবিরাই পরবর্তী কবিতার রূপ-রীতি বিষয়ক থিওরাইজেশন ক'রে গেছেন। কবিতার নতুন তত্ত্ব নিশ্চিতভাবেই ভবিষ্যতের কবিতার নির্মাণে আরো রাস্তা খুলে দেবে। ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছি ছোটো কবিতা বা অণু কবিতা নিয়ে কবিদের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। অণু কবিতার বেশকিছু সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। কিছু কিছু পত্রিকা শুধু মাত্র অণু কবিতা নিয়েই কাজ ক'রে চলেছে। যেমন, সঞ্জয় ঋষির 'ধ্রুবতারা', 'সুতরাং' পত্রিকা।  নয়ের দশকের কবি অনিন্দ্য রায় অণু কবিতা বিষয়ে গবেষণামূলক কাজ করেছেন। একেবারে টানাগদ্য ভাষায় কবিতা লেখার প্রবণতা আটের দশকের পর থেকে আরো বেশি ক'রে দ্যাখা গেছে। কবিতার কার্ডিনাল পয়েন্টস কী কী, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে স্যামুয়েল টেলর কোলরিজকে লিখতে হয়েছিলো 'বায়োগ্রাফিয়া লিটেরারিয়া'। জীবনানন্দকে লিখতে হয়েছিলো 'কবিতার কথা'। বারীন ঘোষালকে লিখতে হয়েছিলো 'অতিচেতনার কথা'। বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে সেমিনার এবং বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছিলো কবিতা ক্যাম্পাস।  শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী এবং হাংরি সাহিত্য আন্দোলন নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন কবি ও গবেষক উত্তম দাশ। হাংরি সাহিত্য আন্দোলন সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা ও ভাবনার কথা লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরী এবং শৈলেশ্বর ঘোষ। পোস্টমডার্ন কবিতা কী এবং কেন সে সম্পর্কে সমীর রায়চৌধুরী, প্রভাত চৌধুরী প্রমুখেরা লিখেছেন অনেক যা ভবিষ্যতের বাংলা কবিতাকে পথের অপর ঠিকানা খুঁজে নিতে সাহায্য করবে। সাম্প্রতিক কালে কবি উমাপদ কর বাংলা কবিতার পরম্পরা এবং বাংলা কবিতার বর্তমান গতিপ্রকৃতি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার কাজ ক'রে চলেছেন। কবি অনিন্দ্য রায় হাইকু কবিতা থেকে শুরু ক'রে পরমাণু কবিতা সম্পর্কে যে বিস্তারিত ইতিহাস ও ব্যাখ্যা লিখেছেন, সেটা ভবিষ্যতের বাংলা কবিতায় ছোটো কবিতা বা অণু কবিতার ভবিষ্যত স্বরূপ আবিষ্কারে সাহায্য করবে। আমরা সকলেই জানি যে, বাংলা আধুনিক কবিতার সম্প্রসারণে ও বিকাশে লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বুদ্ধদেব বসুর প্রগতি, কবিতা পত্রিকা থেকে শুরু ক'রে শতভিষা, অনুক্ত, কৃত্তিবাস, লা পয়েজি, পরমা, হাংরি কবিতা আন্দোলনের বুলেটিন, শ্রুতি, উত্তরসূরি, দরগা রোড, সংবেদ, অজ্ঞাতবাস, ভাইরাস, রৌরব, ক্লেদজ কুসুম, ঘোড়সওয়ার, চান্দ্রমাস, কৌরব, কালিমাটি, কবিতাপাক্ষিক, কবিতা ক্যাম্পাস, কবিতার কাগজ, নৌকো, আদম, নিনি, কবি সম্মেলন, বাংলা কবিতার উপকরণ, আকরণ, প্রকরণ সম্পর্কে যে কাজগুলো ক'রে গেলো, ভবিষ্যত কবিতার গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হবে সেই ইতিহাস পাঠ থেকেই। মানুষের মুখের ভাষায় কবিতা লেখা হবে, আর হলেও কোন স্তরের মানুষের মুখের ভাষায় কবিতা লেখা হবে, নাকি মনুষ্য ভাষার উর্ধ্বে কবিতার নিজস্ব ডিক্সন বিরাজিত রাখা হবে, এইসব প্রশ্নের সমাধান অনেকদিন আগেই হয়ে গেছে। মানুষের জন্য কবিতা নাকি কবিতার জন্য কবিতা, এই প্রশ্ন আর কোনো বুদ্ধু পাঠকও এখন তোলে না। অন্তমিল ছন্দে নাকি ফ্রি ভার্স লেখা হবে, 'মতো' 'যেন' ইত্যাদি আর লেখা হবে কিনা, নিসর্গ, রাজনীতি প্রেম, আকুতি, বিভেদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, বাস্তব, পরাবাস্তব, মূর্ত, বিমূর্ত লেখা হবে কিনা, জাদুবাস্তবতা থাকবে কিনা, এইসব হাজারো কবিতাকেন্দ্রিক প্রশ্নের সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু লেখা হবে কবিতার বিস্ময় আর বিস্ময় এবং কিভাবে লেখা হবে সেই বিস্ময়ভাষা, তা নিয়ে চুলচেরা বিচার চলতেই থাকবে ভবিষ্যতে। পৃথিবীতে অন্যতর বিষয়ের উদ্ভব হবে। প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশে দেশে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী বৈপ্লবিক সংগ্রাম নতুন বিষয়ের জন্ম দিয়েছিলো। রোমান্টিক কবিতা, নাটক যেমন লেখা হয়েছে, এ্যান্টি-রোমান্টিক কবিতা, গল্প ও নাটক লেখা হয়েছে প্রচুর। বিশ্বমানচিত্রের পরিবর্তন কবিতার জন্য ভবিষ্যতে অপর বিষয়ের জন্ম দিতেই থাকবে। প্রেম থেকেই পরকীয়ার জন্ম, যা কবিতা ও গল্পের নতুন বিষয়। আবার, গ্লোবালাইজেশন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং নতুন বিষয়।
##
বাংলা কবিতার জগতে লিটল ম্যাগাজিনের সংখ্যা কতো ? ভারত ও বাংলাদেশ মিলে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার তো হবেই। আমার ধারণা প্রিন্ট ব্যবস্থার উন্নতি ঘটলেও ব্যয় সাপেক্ষ হওয়ায় ভবিষ্যতে প্রিন্টেড লিটল ম্যাগাজিন কমতেই থাকবে। হয়তো যৌথ খামারের মতো কিছু ঘটতে পারে। বাড়বে ওয়েবজিনের সংখ্যা, সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট, একদম স্পষ্ট, এটা শুধু কোরোনা অতিমারীর কারণে নয়। নেট দুনিয়ার পরিচালনায় বেসিক কিছু সমস্যা থাকলেও সাহিত্যের ওয়েবজিনের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকবেই অনেক ইতিবাচক কারণে। আমি সেইসব কারণ ব্যাখ্যায় এখন যাচ্ছি না। ইতিমধ্যে শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কয়েক শো ওয়েবজিন সাহিত্য দুনিয়ায় সক্রিয়। বাংলা কবিতার একটি ওয়েবজিন সারা বিশ্বের বাংলাভাষী এবং অন্য ভাষার মানুষেরা পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে।  ভবিষ্যতে এর জনপ্রিয়তা চরম আকার ধারণ করবে। কবি ও সম্পাদক সৌমিত্র রায় অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে জানিয়েছেন ভবিষ্যতের যুগ হবে i-চিন্তনের যুগ। তথ্য প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে কবিতার প্রকাশ মাধ্যম বদলে যাবে। ইতিমধ্যে সৌমিত্র রায় সম্পাদিত 'দৈনিক বাংলা' ওয়েবজিনে চ্যাট মোডের কবিতা, শব্দ ব্রাউজ কবিতা, আটপৌরে কবিতা ইত্যাদি বিভিন্ন ফর্মের কবিতায়  অনেক পাঠক ও কবি আগ্রহ দ্যাখাচ্ছেন। অভিজিৎ দাস কর্মকার সম্পাদিত 'সাপ্তাহিক ব্ল্যাকহোল' সারা বিশ্বের বাঙালিরা পড়ছেন। কবি অনুপম মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত 'বাক', কবি পীযুষ বিশ্বাস সম্পাদিত 'দেহলিজ', কবি সন্তোষ দাস সম্পাদিত 'কবিতার সরান', কবি রোশনি ইসলাম সম্পাদিত 'রঙিন ক্যানভাস', কবি বিশ্ব বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত 'অন্য ক্যানভাস', তপন মণ্ডল আলফনি সম্পাদিত 'আমন এক সুধা', কবি দেবাঞ্জন দাস সম্পাদিত 'অপরজন' ইত্যাদি ওয়েবজিন কবিতা সম্পর্কে সুদূপ্রসারী ভূমিকা পালন ক'রে চলেছে। ওয়েবজিনের বিশাল সংখ্যা এবং সম্প্রসারণ ভবিষ্যত কবিতার জগতকে কতো যে পরীক্ষা নিরীক্ষায় ভরিয়ে তুলবে, এটা কেবল অনুমান করা ছাড়া উপায় নেই। 
##
কবিতা কতোটা সাবজেকটিভ হবে, কতোটা এবং কেন অবজেকটিভ হবে, কতোটা উভয়ের মিশ্রণ ঘটালে ভালো হয়, সেসবের উত্তর এখন বাংলা কবিতার পাঠকের জানা। তবুও কবিতা বিষয়ক তত্ত্বের সাধনা ও আয়োজন ভবিষ্যতে চলতেই থাকবে, যা আবার কবিতার প্যারাডাইম পরিবর্তনে সাহায্য করবে। আমি বিশ্বাস করি মেমোরেবল স্পিচের প্রয়োগ ভবিষ্যতেও চলতে থাকবে। হয়তো শায়রির মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করবে ভবিষ্যতের বাংলা কবিতা। তবে বিষয় পূর্বোক্ত ধরণ থেকে সরে যাবে। আজ যেমন পরস্পরের সঙ্গে দ্যাখা হলে মানুষেরা
আগে অন্যদের প্রসঙ্গে নিন্দা করে, ভবিষ্যতে ছোটো ছোটো কবিতা স্মৃতি থেকে বলে কথোপকথন শুরু হবে। আজ যেমন দ্যাখা হলেই, শুভ সকাল, শুভ সন্ধ্যা, সেলামালিকুম ইত্যাদি উচ্চারিত হয়, ভবিষ্যতের মানুষ দ্যাখা হলেই, প্রথমে উচ্চারণ করবে কোনো না কোনো কবিতার পংক্তি। সারা পৃথিবীতে। কবিতার নিরন্তর সাধনা ও গবেষণার জন্য সমস্ত অঞ্চলে গড়ে উঠবে কবিতা এ্যাকাডেমি। ছোটো ছোটো মন্দির মসজিদ ইত্যাদি হয়ে যাবে ইতিহাসের উদাহরণ মাত্র। শ্রোতা পাঠক টিকিট কেটে অডিটোরিয়ামে বসে ২ জন কবির কবিতা ও কবিতা বিষয়ক অভিজ্ঞতার কথা শুনবেন ২ ঘণ্টা ধরে। আর হাততালি দিয়ে যাবেন। কবিদের সঙ্গে মানুষের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নির্মিত হবে। শুধুমাত্র কবিতার ইউটিউব চ্যানেলে ভরে যাবে নেট দুনিয়া। ঘরে বসেই কবিতার উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কবিরা বড়ো স্ক্রিনে। আর কবিতার জন্য ভ্রমণের ব্যবস্থা তো থাকবেই। কবিতাকে কেন্দ্র ক'রে আয়োজিত হবে পার্টি। বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কবিতা আলোচনার ক্লাস করবেন মূলত কবিরাই। অর্থাৎ কবিতার জগতে সাধারণ মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি ঘটতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে। তার ইঙ্গিত এখন থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। আমি অন্তত পেয়েছি।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ