♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (১৮) ♦ রহস্যময় ও ঔ ♦মানবর্ন্ধন পাল

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                    (১৮)
        ♦ রহস্যময় ও ঔ ♦

    স্বরগুলো নানান রূপে নতুন বউ
    চিনে রাখি রহস্যময় ও এবং ঔ।

ড্রইংরুমের দরজা খোলাই ছিল। মেঘ ও রোদকে ডাকতে-ডাকতে ঐশী এবং হিয়া ঘরে ঢুকল। সুযোগ পেলেই ওরা মেঘ-রোদের সঙ্গে গল্প করে। আজ আর সেই সুবিধা পেল না। দাদুভাই ড্রইংরুমে ঢুকতেই হিয়া জিজ্ঞেস করল, 
---- আচ্ছা দাদুভাই, আজ নিশ্চয়ই শেষ দুটি স্বরবর্ণ ও এবং ঔ-এর গল্প করবে। তারপর শুরু করবে ব্যঞ্জনবর্ণের কথা তাই না? কিন্তু গতকাল-যে এতবার 'বিভক্তি-বিভক্তি' বললে-- এই বিভক্তিটা কী? কী কাজে লাগে এই বিভক্তি?
একথায় ঐশীও সায় দিল। দাদুভাই মুচকি হেসে ঠাট্টাচ্ছলে বললেন,
---- ভক্তিশ্রদ্ধা কি তোমাদের মনে আছে? রাস্তাঘাটে বড়দের কি আদাব নমস্কার দাও? তা না-হলে বিভক্তি বুঝবে কী করে?
এবার আসল কথাটি শোন। শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে এভাবে : বি+√ভজ্+ ক্ত+ই = বিভক্তি। সামনের 'বি' হল উপসর্গ, 'ভজ্' ক্রিয়ার মূল, 'ক্ত' এবং 'ই' হল প্রত্যয়। শব্দটির সাধারণ অর্থ হল "বিশেষভাবে ভক্তি"। এর আরও একটি অর্থ হল 'ভাগ/টুকরো/অংশ'। কিন্তু বাংলা ব্যাকরণে এর বিশেষ অর্থ আছে-- যা সাধারণ বা প্রচলিত অর্থ নয়। 
বাংলা ব্যাকরণে বিভক্তি হল কতগুলো শব্দ বা শব্দের অংশ। এগুলো অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় বা পাশে বসে। এগুলোর কখনও অর্থ থাকে কখনও থাকে না। শব্দের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হয়ে 'পদ' হয়। বিভক্তি ছাড়া শব্দকে ব্যাকরণে 'প্রাতিপদিক' বলে আর বিভক্তি যুক্ত হলে তা 'পদ'। বাক্যের বাইরে আলাদাভাবে থাকলে তা শব্দ। এই শব্দ যখন বাক্যের অংশ হিসেবে যুক্ত থাকে তখন তাকে 'পদ' বলে।  মনে রাখতে হবে, এক বা একাধিক 'শব্দ' দিয়ে কখনও বাক্য হয় না। 'পদ' দিয়ে বাক্য তৈরি হয়। তাই বাক্যের প্রতিটি অংশ একেকটি পদ-- শব্দ নয়।
স্মরণ রাখতে হবে, শব্দের সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত হলে তা পদে পরিণত হয়। এজন্য বিভক্তি যুক্ত শব্দকে পদ বলে। বিভক্তিহীন শব্দ বা প্রাতিপদিক দিয়ে বাক্য হয় না বা সঠিক অর্থ প্রকাশ করে না। একটা উদাহরণ দিই :
হিয়ার চেয়ে ঐশী লম্বা। কিন্তু ওরা বয়সে কাছাকাছি। মাত্র কয়েক মাসের ছোটবড়। মায়ের কাছে ওদের সব আবদার। দুজনে বাবাকে ভয় পায়।
এই বাক্যগুলো যদি এভাবে লেখা হয় : " হিয়া ঐশী লম্বা। কিন্তু ও বয়স কাছাকাছি। মাত্র কয়েক মাস ছোটবড়। মা কাছ ও সব আবদার। দুজন বাবা ভয় পায়।"
এই বাক্যগুলো প্রথমটি থেকে বাদ গেছে : র, চেয়ে। দ্বিতীয়টি থেকে :  দের। তৃতীয়টি থেকে : এর। চতুর্থটি থেকে : এর, এ, দের। পঞ্চমটি থেকে : এ, কে। এগুলোই বিভক্তির চিহ্ন। তাহলে বোঝা গেল, বিভক্তির চিহ্ন বাদ দিলে বাক্যের অর্থ ঠিকমত বোঝা যায় না। 

বিভক্তির চিহ্ন দুরকম-- শব্দবিভক্তি ও ক্রিয়াবিভক্তি। শব্দবিভক্তি সাত প্রকার। ক্রিয়াবিভক্তি অনেক রকম । তোমাদের ব্যাকরণ বইয়ে এগুলোর বিবরণ আছে। কারকের ক্ষেত্রে সাত প্রকার শব্দবিভক্তির খুব প্রয়োজন। বিভক্তি হল মসলার মত। তেল লবণ হলুদ মরিচ আদা এলাচ দারুচিনি ইত্যাদি ছাড়া খাবার স্বাদু হয় না। তেমনি বিভক্ত ছাড়াও বাক্যের সঠিক অর্থ বজায় থাকে না। তাই রান্নায় মসলার যে গুণ বাক্যে বিভক্তিরও সেই গুণ।
একথা বলে দাদুভাই ফ্লাস্ক থেকে কাপে রঙ-চা ঢাললেন। চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
---- এবার আসল কথায় আসি-- যে প্রসঙ্গ আজ বলতে চেয়েছিলাম। 
# ও #
স্বরবর্ণের দশ নম্বর বর্ণ হল 'ও'। ও-ধ্বনির লিখিত রূপ। এর মাত্রা নেই কিন্তু 'কার' আছে। ও-তে ও-কার (ো) হয়। এর উচ্চারণের স্থান কণ্ঠ। উচ্চারণকালে ঠোঁট থাকে গোলাকার।  এসব কথা তোমরা সবাই জান। তবু একটু মনে করিয়ে দিলাম।
'ও' একটি সংযোজক অব্যয়।
---- আচ্ছা দাদুভাই, অব্যয় পদ তো চিনি। ও এবং আর বা কিংবা অথবা অথচ এগুলো অব্যয়। কিন্তু সংযোজক অব্যয় আবার কী?
মুখচোরা ঐশী প্রশ্নবাণ ছুঁড়ে দিল দাদুভাইয়ের প্রতি।
---- অনেক প্রকার অব্যয় আছে। উপসর্গও এক প্রকার অব্যয়। বাহ, আহা, ছি-ছি, উহ্, মারহাবা ইত্যাদিও অব্যয় পদ। সংযোজক অব্যয়ও এক প্রকার অব্যয় পদ। যে অব্যয় দুটি শব্দ বা বাক্যাংশের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে তাকে সংযোজক অব্যয় বলে। যেমন--  হিয়া ও ঐশী একই ক্লাসে পড়ে। আমি ঢাকায় যাব এবং তুমি যাবে চট্টগ্রাম। 
এখানে প্রথম উদাহরণে দুটি পদের মধ্যে আর পরেরটিতে দুটি বাক্যের মধ্যে 'ও' 'এবং' দ্বারা সংযুক্ত করা হয়েছে। মোটকথা, সংযোজক অব্যয় হল সেতু বা সাঁকোর মত। সেতু যেমন নদীর দুই তীরের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে, সংযোজক অব্যয়ও তেমনই। যাক এবার আমরা আজকের মূল কথায় ফিরে আসি।

'ও' অব্যয়টি বিভিন্ন অর্থে আমরা ব্যবহার করি। যেমন--
★ পর্যন্ত অর্থে : "এখনও গেল না আঁধার, এখনও রহিল বাধা।"  (রবীন্দ্রনাথ)
★ সামান্য অর্থে : "পাঠশালায় যাইবার নামও করিত না।" (প্যারিচাঁদ মিত্র)
★ মাত্রাধিক্য অর্থে : "তোমার তূণে আছে  আরও কি বাণ?" (রবীন্দ্রনাথ)
★ সম্ভাবনা অর্থে : গেলেও যেতে পার।
★ অধিকন্তু অর্থে : আমরা তো খাবই, তোমাকেও খেতে হবে।
সর্বনাম পদ হিসেবেও 'ও' বর্ণটি প্রয়োগ হয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তি বস্তু বা বিষয় বোঝাতেও 'ও' ব্যবহার হয়। 
★ ব্যক্তি : "ও কে? চণ্ডাল? চমকাও কেন?" (নজরুল)
★ বস্তু : ওটি ধোরো না।
★ অন্য/অপর : "হৃদয়ের একূল-ওকূল দুকূল ভেসে যায়।" (রবীন্দ্রনাথ)
★ সম্বোধন : "ওলো সই,আমার ইচ্ছা করে তোদের মত মনের কথা কই।" (রবীন্দ্রনাথ)
 ★ উচ্চারণ-নির্ভর বানানের ক্ষেত্রে ও-কার হিসেবে ব্যবহার হয়। ভালো, মতো, যতো।
★ বাংলায় মধ্যম পুরুষে (তুমি/ তোমরা) ক্রিয়াবিভক্তি রূপে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালে আদেশ/নির্দেশ বা অনুরোধের ক্ষেত্রে 'ও' বা ও-কার (ও/ো) প্রয়োগ হয়। তোমরা যাও। তুমি গাও।(বর্তমান কাল) তুমি বোলো। তোমরা কোরো। (ভবিষ্যৎ কাল)
# ঔ #
স্বরবর্ণমালার এগারো নম্বর ও শেষ বর্ণ। এটি ঔ স্বরধ্বনির লিখিত রূপ। ঔ যৌগিক বা যুগ্ম স্বরবর্ণ (অই/ওই)। এর কারের রূপ ঔ-কার (ৌ)। ঔ-কার ব্যঞ্জনবর্ণের উভয় পাশে যুক্ত থাকে।
বাংলা ব্যাকরণে 'বৃদ্ধি' নামে একটি নিয়ম আছে। এই নিয়ম অনুসারে যেসব শব্দের শুরুতে 'উ' বা উ-কার  আছে তার শেষে 'ইক' বা 'ষ্ণিক' এবং 'ষ্ণ্য' বা 'য'  প্রত্যয় যুক্ত হলে 'ঔ' বা ঔ-কার হয় (উ/ঊ/ও>ঔ/ু/ূ/ো>ৌ)। যেমন--
উপন্যাস+ষ্ণিক/ইক= ঔপন্যাসিক 
উপনিবেশ+ষ্ণিক/ইক= ঔপনিবেশিক 
পুরুষ+ষ্ণিক/ইক= পৌরুষিক
মূল+ষ্ণিক/ইক=মৌলিক 
যোগ+ষ্ণিক/ইক= যৌগিক।
এমন আরও কিছু উদাহরণ খুঁজে বের করে তোমরা খাতায় লিখবে এবং আগামি দিন আমাকে দেখাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

1 মন্তব্যসমূহ