দেবাশিস সাহার কবিতা


দু-গাছি কান্না ও জল-আকাশ

দেবাশিস সাহা 

ওয়াশরুম পেরিয়ে 
নদীর দিকে নেমে যাচ্ছে 
সরু রোগা লিকলিকে
হাড় জিরজিরে দু-গাছি কান্না

নদীর পা নেই
মানুষের কান্নাগুলো দিয়ে গয়না করে
ভর্তি করেছে শরীর 
শরীর ভর্তি অলংকার আর অহংকার নিয়ে
ছুটে যাচ্ছে মহাসাগরের দিকে

মহামানবের মহামিলন ক্ষেত্র এই জল-আকাশ


ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ


 কাঠকয়লা 

দেবাশিস সাহা 

তুমি তো কাঠকয়লা 
শুধু অপেক্ষা করো

আগুনের জন্য 

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ


না-বলা কথা
দেবাশিস সাহা 

জিভ ছিঁড়ে নেবার পর
পিছু পিছু কিছুটা পথ
তেড়ে গিয়েছিল 
ফোঁটা ফোঁটা রক্তবিন্দু

শালিখের ঠোঁটে ঠোঁটে 
আমার কথা
ফিরে এসেছে মানুষ সমাজে

আমার না-বলা কথা
শীতকাল হয়ে জমে থাকে
মেহনতী মানুষের রক্তে

কোনো  কোনো কথা
বারবার বলবার জন্যে
জন্ম নেয় পাখি 

সুরে তালে ছন্দে 
সবার মুখের কথা

শোষণের বিপরীতে 
মুখর হোক মানুষ।

:::::::::::::::;::::::;;;;:::::::..

ছায়াঘর

ঝন ঝন করে ঝরে গেলো সিঁদুর 
টুকরো টুকরো সিঁথিতে
খেলে বেড়াবে যৌনতা 

রাত ডিঙিয়ে পার হচ্ছে মেয়ে
শরীরে অমাবস্যা নেই
জোৎস্না দিয়ে রঙ করে বিছানা 

শরীর আজ অনলাইন 
ডিজিটাল দুনিয়ায় 
ভদকা মেশার জন্য খোঁজে সুন্দরী জল

জীবনের প্রতিটি পিরিয়ড বিজ্ঞাপন 
বিজ্ঞান আর অংক নিয়ে
বসে থাকে ছায়াঘর। 

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ


রোদচশমা 
দেবাশিস সাহা 

ঘরের কোনো ব্যাপারে 
নাক গলায় না রোদ
অভিমান হলে
জ্যোৎস্না ডেকে আনে

ভাঙা আয়নায় বাসা বাঁধে
শোক দুঃখ আর সংকট 
রোদ হাতে বের হই
কাজের খোঁজে 

জানালা খোলা পেয়ে
রাত ঘরে ঢোকে
রোদে ঝলসে যাওয়া মনে
লাগিয়ে দেয় ঝিঁ ঝিঁ পোকার গান

ভালোবাসার ছাদবাগানে 
পাহারাদার প্রিয় রোদচশমা। 

ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃ

চাকা+চাকা=দাম্পত্য 

দুটো চাকার যোগফল দাম্পত্য 
চাকা বসে গেলে
শুরু হয় দাম্পত্যকলহ

প্রতিটি দাম্পত্যের 
একটি ওপেন জানালা থাকে

জানালার এপাশে ঘর
চাকার ঘর্ষণে 
ঘর ভরে যায় অভিমানে

ওপাশে নদীর শয়নকক্ষ
নানা রঙের বাতাসের যাতায়াত 

কখনো-সখনো 
রাস্তা ভুল করে মুক্ত বাতাস
এসে পড়ে জানালার এপাশে
যেভাবে সুগন্ধি ভালোবাসা 
গড়িয়ে যায়

গতি বেড়ে যায় চাকার
দুটো চাকার এলোমেলো গতিপথে 
এসে পড়ে বালি

অনেকগুলো চাকার যোগফল 
মেনে নেওয়া
মানিয়ে নেওয়া 

চাকা বিয়োগ হলে
ঘরে ঝুল পড়ে
ঝুল সরাতে
এসে যায় ছোট বড়ো 
নানা সাইজের চাকা 

ঃঃঃ;;;;;;;ঃঃঃঃঃঃঃঃঃ


 মেয়ে ভারতবর্ষ 
দেবাশিস সাহা 

মেয়ে ভারতবর্ষ জানে
আগুনের কোনো দোষ নেই

ওদের কয়লাজন্ম
পিঠে সারি সারি শলাকায়
বয়ে নিয়ে বেড়ায় আগুন

মেয়েভারতের গুহাপথ
ইন্ডিয়ান রেলওয়ে 

মালগাড়ি, লোকাল, এক্সপ্রেস 
সবার অবাধ যাতায়াত 

যোনীদেশ ছিঁড়ে গেলেও
রক্ত ঝরেনা
মুষলধারে ঝরতে থাকে অন্ধকার 

মেয়ে ভারতবর্ষের কয়লাজন্ম
আগুনের কোনো দোষ থাকতে পারেনা। 

০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০

হত্যাতন্ত্র
দেবাশিস সাহা

১.
হাওয়া ধারণ করেছে ধর্ম
ধর্ম জমে জমে মেঘ
মেঘ ফেটে গেলে 
রক্তে ভিজে যায় মানুষ 

২.
পাথর জানেনা কার হাতে আছে
কার দিকে ছুটে যাচ্ছে আঘাত নিয়ে
হৃদয় পাথর হলেই
সে চলে আসে হাতে
দিগবিদিক ভুলে ছুটে যায়
ভাইজান বা মা-বোনের দিকে

৩.দেশের ভিতর দিয়ে 
ছুটে যাচ্ছে অগ্রন্থিত বিড়াল
অপমান পাড়া বলে যাকে ডাকো
সেই তো তোমার আমার বোনেদের আশ্রয় 
লালটুকু তুলে রাখো
আমাদের স্নেহজ ভেসে ভেসে
চলে গে ছে লাশের সংগে
আত্মীয়তা থাক শিমূলে পলাশে
মনকে মরতে দিওনা
একান্ত বাউল রাত ওর দখলে 

৪.কোনো কোনো কান্না 
একা একা ছুটে যায়
গাছহীন এক অরণ্যের কাছে
সেখানে মা'কে খোঁজে 

সবার কি মা হয় 

সবার কি মা থাকতে আছে 

কান্নাগুলো পরিত্যক্ত কামরার ভিতর 
কাকে খোঁজে 
বিন্দু বিন্দু রক্তে ভেজা 
একটা ছেঁড়া ভারতবর্ষ 
শুষে নিচ্ছে কান্নাগুলোর মা'কে। 

******----------***----*-**************-------


লাশফুল
দেবাশিস সাহা 

রক্তের পাশে ফুল রেখো না
ফুল ভিজে গেলে
সংক্রামিত হবে গন্ধ

গন্ধের গভীরে 
জীবনের কুয়ো

লজ্জা পেয়ে
আমার মা আমার বোন
আমার বারবণিতা
ঝাঁপ দিচ্ছে কুয়োয়
নতজানু হচ্ছে মৃত্যুর কাছে

তুমি ফুল রেখো না
ওদের পাশে
জল্লাদের উল্লাসে
ওদের যেন ঘুম না ভেঙে যায়

যারা জেগে আছে 
তাদের ঘুম ভাঙাও
জেগে উঠুক
তাদের আগুন

ফুলের গন্ধ সংক্রামিত হলে
এই দেশ ভরে যাবে লাশফুলে

***--*----------------********----

চোতক্ষ্যাপা

দেবাশিস সাহা 

দারুচিনির দেশে 
কেউ কেউ নেমেছে দারুর খোঁজে 
চিনি নিয়ে আগ্রহ নেই মধুমেহ প্রেমিকের

স্লেট থেকে ভাগ্যরেখা মুছে
দারিদ্র্যরেখা এঁকে দিলো অমাবস্যা 
উড়ালপুল ধরে হেঁটে যায় ভাত
পিছু পিছু ভাই ও আমরা 
সিঁড়ি কাকে কি শেখায় জানিনা
সেই একই পড়া প্রতিদিন
ফুটপাত টকভাত বমি আর
অন্ধকার ঘরে ভ্যপসা গন্ধ

নিজের বুকে ভর করে
ব্রিজের নীচে ফিরেছে কামিজ
লতিয়ে লতিয়ে 
 এ বাড়ি সে বাড়ি
চলে যায় আলো রঙের আনন্দ 
সাবান জলে হাত ধুয়ে রাত ঘুমাতে যায়
সাবান জলে ধোয়া ভোর 
দিদিমণির চাল আলুর দিকে বাড়িয়ে দেয় হাত
মাস্ক গ্লাভসের কাছে 
আরো কিছুটা সময় চেয়ে নেয় জীবন 
পুলিশের ইশারার অপেক্ষায় 
নরম নরম আলোগুলো বসে থাকে 
পাতার আড়ালে 
চোতক্ষ্যাপার দল কাদা করছে রেশন দোকান 

মানুষ আজ সংখ্যা
পরিসংখ্যানের আড়ালে চলছে অন্য এক খেলা
লাঠির তাড়া খেয়ে 
গরম ভাত খুঁজে চলেছে 
এক নিরুপদ্রব ঠেক

<>>>>>>>>>>><<<<<<>>>>>>>>>

জাগতে রহো
(উৎসর্গঃ শঙ্খ ঘোষ) 

দেবাশিস সাহা 

হামাগুড়ি দিয়ে শিরদাঁড়া
 খোঁজাখুঁজি করতে ব্যস্ত বাঙালি 

ঋজু সবল শিরদাঁড়া হাতে রেখে
বাংলার ঘরে ঘরে 
হেঁকে যায় এক প্রৌঢ় বিকেল
     জাগো  জাগো
                             জাগতে রহো

নানা রঙের কলম
        ঋতুর ঢঙে রঙ বদলায় 

এক অবিচল বিবেক
           সদর্পে বলে ওঠেন

 'দেখ খুলে তোর তিন নয়ন 
রাস্তা জুড়ে খড়্গ হাতে 
দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন '

৷৷৷৷৷৷৷  ---------৷৷৷৷৷৷৷৷


ইটভাটা
দেবাশিস সাহা 

নরম হাড়ের উপর
মাথা রাখে ইটভাটা

এই ভাবে শক্ত হয় খুলি

পাঁজা পাঁজা শ্রম
আলোর সংগে পাল্লা দিয়ে
নামে আর ওঠে 

পছন্দ না হলে
শক্ত খুলি বল ভেবে
পাঠিয়ে দি মাঠের বাইরে 

নরম মনের উপর 
পা রাখে পিশাচ
লতিয়ে লতিয়ে 
ধোঁয়ার সংগে সংগে
বড়ো হতে থাকে ইটভাটা

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ