ছোটবেলায় যখন বড় হচ্ছিলাম শিলং পাহাড়ে , তখন, কিভাবে এবং কেন জানি না, কিন্তু ঠিক জেনে গিয়েছিলাম এক্সমাস কাকে বলে, কাকে বলে
সান্টাক্লজ, ক্যারল গান, ক্রিসমাস কার্ড আর ক্রিসমাস ট্রি। জেনে গিয়েছিলাম ক্যান্ডল, পিয়ানো, অর্গান, কেক, পেস্ট্রি ।এসব জানায় কোনও বাধা ছিল না ।বরং মনে হত বড়রাও যেন এগিয়ে দিতেন এসব জানার দিকে ।মনে হত এসব না জানলে বোধহয় শিলংকেই ঠিক জানা যাবে না ।
অথচ, মনেপ্রাণে এটাও জানতাম, এগুলো ঠিক আমার নয় । আমার তো হল দুর্গাপূজা, কলাবউ, চালের প্রসাদ, দর্পণ বিসর্জন, মহালয়ার ভোর , ইত্যাদি ইত্যাদি । আত্মজ্ঞান ঠিকই হচ্ছিল । তার সঙ্গে কুটুম জ্ঞানও হচ্ছিল ।
ছোটবেলায় যখন বড় হচ্ছিলাম জোয়াই পাহাড়ে, তখনও, স্যান্টা আর ক্যারল গান সঙ্গ ছাড়ল না , মেরি ক্রিসমাস আর মা মেরির কোলের সন্তানটি আমারও নিত্যদিনের গল্প শোনার অঙ্গ হয়ে গেলেন ।ততদিনে কনভেন্ট স্কুলের সৌজন্যে জেনে গেছি লর্ড দ্য ফাদার, লর্ড দ্য সন,হোলি গোস্ট আর আমেন । জোয়াইতে দুর্গা পূজাও হত । পূজা শেষের বঙ্গীয় জলসার শেষ আকর্ষণ একটি নাটকে আমার পোস্টমাস্টার বাবা দারোগা হয়েছিলেন, নেপথ্যে গান বেজেছিল : নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা । আত্মজ্ঞান ঠিকই হচ্ছিল। কুটুমজ্ঞানও ।
ওদিকে বাড়িটাও চলছিল, ফিরছিল । জোয়াইর পর হাফলং পাহাড়ে এলাম । হাফলং এসে সেই কনভেন্ট স্কুল , নেপালি বাহাদুরের হাত ধরে যাওয়া, জানলাম পাদ্রিরা শাদা ক্যাসক পরেন, গলায় ঝোলে ক্রস, বড় হয়ে পাদ্রি হব বলে বকা খেলাম । বুঝলাম পাদ্রিদের দূর থেকে দেখতে হয় । পাদ্রি হওয়া যায় না । আত্মজ্ঞান আর কুটুমজ্ঞানে বিবাদ বাঁধলো ।
বাড়িটা আবার সচল হল । এবার শিলঙে এসে বুঝলাম গুড ফ্রাইডে ।দেখলাম কফিন। শুনলাম রেজারেকশন । ওদিকে এরকম কথাও শুনতে হল: হোয়াই ডোঞ্চ ইউ লিভ আস ? বুঝলাম আমরা হলাম ডখার বা খার, বঙাল ।
সচলবাড়ি এবার এসে বাসা বাঁধলো শিলচরে । ব্রাহ্মণ আর কুলীন হিন্দুদের একটা পাড়া । এ পাড়া পেরোলেই দীর্ঘ বসতি । মুসলমানদের । আমাদের ঠিক পাশের বাড়িটাই ফৈজুদের । একসঙ্গে খেলতাম । কিন্তু যেতাম খুবই কম ওদের বাড়ি । আমার কমিউনিস্ট কাকা অনন্ত দেব প্রতি ঈদে ওদের বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসতেন । আমাদের বাড়িতে দুর্গাপূজা হত । ফৈজুরা বিকেলে এসে প্রসাদ খেয়ে যেত । কিন্তু ওই পর্যন্তই । কোথাও যেন একটা লক্ষ্মণরেখা অলক্ষ্যে বেড়ে উঠছিল । কোথাও যেন একটা ট্যাবু কাজ করত ।দেশভাগের পাঁচিল যেন নীরবে বেড়ে উঠছিল আত্ম আর পরে । পর আর কিছুতেই কুটুম হয়ে উঠত না ।
আমাদের বয়সে বড় হওয়ার পেছনে মনের ছোট হয়ে ওঠার একটা ব্যাপার ছিল । হয়ত দু'তরফেরই । তাই কিছুতেই জানতে পারি নি কাকে বলে ফজরের আজান, কাকে বলে জোহরের আজান, কাকে বলে মাগরিবের আজান, জানিনি দোয়া আর মোনাজাতের মধ্যে পার্থক্য কোথায়, ওজু কী, জায়নামাজ কী, শবেবরাতের মানে কী, এমনকী ঈদ-উল-ফিতর আর ঈদ-উল-আজহা যে আলাদা তাও জানিনি ।
আমরা বড়বেলায় ছোট হতে হতে এগোচ্ছিলাম । দু'তরফেই । বাসের ওই পেছনদিকে এগিয়ে যাওয়ার মত । ইতিমধ্যে বাংলাদেশের যুদ্ধ বাঁধলো ।সেই ডামাডোলে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের কলকাতায়, দিল্লিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন মুক্তিযোদ্ধা কেউকেউ । উদারহৃদয় কাছাড়-করিমগঞ্জেও সাময়িকভাবে
আশ্রয় নিলেন কেউকেউ । আমাদের বাড়িতে এলেন অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী । অবাক হয়ে দেখতাম আমার কাকা একই টেবিলে বসে তাঁর সঙ্গে আমাদের পক্ষে দুর্বোধ্য সব প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে বলতে খাচ্ছেন । আমাদের সেখানে প্রবেশাধিকার ছিল না । কিন্তু প্রবেশাধিকার ছিল সন্ধ্যার মহিলা মজলিসে । বিছানায় ঠাকুমার পাশে উপুড় হয়ে আমরা , পাশে চেয়ারে বসে ঠাম্মার মতিয়া আপা একটানা বলে যেতেন পাকবাহিনীর অত্যাচারের কথা, রাজাকারদের বিশ্বাসঘাতকতার কথা ।আমরা কতক বুঝতাম, কতক বুঝতে অসুবিধা হত । কিন্তু মনটা ভারী হয়ে উঠত পাকবাহিনীর প্রতি অবরুদ্ধ ঘৃণা আর রাগে , মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অনিয়ন্ত্রিত ব্যথা আর ভালোবাসায় ।
আমি বড় হয়ে উঠছিলাম । যে চৌধুরী উপাধিকে বাবা-কাকারা বর্জন করেছিলেন বাড়িতে মার্ক্সবাদ এসে ঢোকার প্রথম ধাপে ––বিগতজীবন জমিদারিপ্রথার অর্থহীন উদ্বৃত্ত বলে, তাকেই আমি লালন করে চললাম নিজের নামে । আমাদের মুসলমানি ইতিহাসের এক স্মারক হিসেবে ।
বড় হয়ে উঠছিলাম । বাড়ি আবার সচল হল । আবার শিলং । এবার রীতিমত কান পেতে শুনতে হল : হোহাই ডু ইউ পলিউট আওয়ার ল্যান্ড উইথ ইওর ফিলদি প্রেজেন্স ? শীতের ছুটিতে শিলচর । শিলচরে তখন ইলেকশন । আমাদের বাড়ির ঠিক উল্টোদিকে পোলিং সেন্টার । সেখানে দুই কংগ্রেসের মারপিট শেষমেশ ছড়িয়ে পড়ল বাইরে । একদিকে বন্দে মাতরম আরেক দিকে আল্লাহু আকবর । মাঝখানে আমাদের বাড়ি । দু'দিকেই লাঠিসোটা, দা, বর্শা, বল্লম । যুদ্ধ লাগে লাগে । হঠাৎ দেখলাম কাকা অনন্ত দেব তাঁর বন্ধু সুভাষ চৌধুরীকে নিয়ে দু'পক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে গেছেন : , 'আমাদের না মেরে আপনারা নিজেদের মধ্যে মারপিট করতে পারবেন না ।'
জনতা থমকে গেল । আশ্চর্য, প্রথমে পিছু হটলেন কিন্তু মুসলিমরা । কাকাদের প্রতি সম্ভ্রমবশত । অপরপক্ষ গজগজ করতে করতে ছত্রভঙ্গ হলেন । রাতে মদের বোতল ছোড়া হল বাড়ির দেয়ালে । সঙ্গে অশালীন মন্তব্য ।'বাঙ্গালোর সাপোর্টার সিপিএম অত্যন্ত দেব...' ইত্যাদি ।যতদূর জানি, 'অত্যন্ত দেব' সারাজীবন সিপিআই-র সাপোর্টার ছিলেন । মাঝে অল্প কিছু দিনের জন্য বন্ধুদল সিপিএমের সমর্থক হয়েছিলেন । তখন নুরুল হুদা প্রায় ই আসতেন বাড়িতে ।
আমি বড় হতে হতে আর ছোট হয়ে যাচ্ছিলাম না । বুঝতে পারছিলাম, যাহা জল তাহাই যদি পানি হয় , তাহলে হিন্দুর আচমন হচ্ছে মুসলমানের ওজু, হিন্দুর পূজার আসন হচ্ছে মুসলমানের জায়নামাজ । বুঝতে পারছিলাম আমি সারাজীবন হিন্দুই থাকব, কিন্তু সারাজীবন মুসলমানের পাশেই থাকব । মুসলমানরাও কখনও হিন্দু হবে না । কিন্তু হিন্দুদের পাশে থাকবে ।
এই নশ্বর, ধূলিমলিন পৃথিবীতে মানুষ বাঁচে আর কতদিন ? টেনেটুনে খুব বেশি হলেও বড়জোর আশি বছর ? তা তো মহাসময়ের নিরিখে চোখের একটি পলক মাত্র । এর মধ্যে সুখ, আনন্দ এসবের ভাগ তো কৃপণ সময়দেবতা বেশিরভাগ মানুষের জন্য খুব কমই বরাদ্দ করে রাখেন ।
তাই মানুষের অনাবিল সম্মিলিত খুশিতে আমি কখনও প্রশ্নবিদ্ধ হই না । আর অনাবিল সম্মিলিত আনন্দের নামই তো উৎসব ।ঈদ এলে , অন্য ধর্মের মানুষ হয়েও , আমার মনে খুশির ছোঁয়া লাগে ।
এত এত কষ্টের এই মানবজীবনে অন্যের খুশিতে খুশি হতে না-পারাটা যে অপরাধ !

0 মন্তব্যসমূহ