গতকাল একজায়গায় উপস্থিত হলাম হঠাৎ। বন্ধুরা অনেকদিন পর দেখে আমার সাথে মোলাকাত করছে আর কেউ কেউ সাইলেন্ট আমায় দেখে! জায়গায়টা বলতে একটা অনুষ্ঠান। ইদানিং মৃত্যুদিবস জন্মদিবস বিবাহদিবস আর বিভিন্ন মার্কাদিবস বেশ দেখা যায় দেশে। ‘খুব ভালো’ কথাটা বন্ধু নারায়ণ কবির বললো।
আমি পূর্ব পশ্চিম কিছু না বুঝে নারায়ণ কবিরকে ভালোমতো প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা তুই যে যেখানে সেখানে যখন তখন শেয়ার বাজার বিজ্ঞাপনের মতো একটা দুইটা এরকম উক্তি ছাড়িস—মা কালীর দিব্যিরে আমি একদম বুঝি না তোর এই বোবা কথার হিসাব!
বন্ধু নারায়ণ কবিরের হাসিটা আমার খু উ ব ভালো লাগে। যতটা ভালো লাগে না তার বউয়েরও। অনুষ্ঠানের বাইরে এসে ফুটপাতেই দাঁড়িয়ে আছি দুজন। ঠিক দাঁড়িয়ে নয়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি আমরা। নয়াদিল্লির সামরিক বাহিনীর সকালবেলার ট্রেনিংয়ের মতো একটা ফাটাইয়া আওয়াজ করে বলতে লাগলো নারায়ণ কবির, ‘খুব ভালো, কথাটা তুই বুঝলি না আমার! খুব ভালো মানে আমার দেশ এখন খুব ভালো অবস্থানে আছে। আরে বেটা দেশে তো টাকা আছেই! টাকা আছে বলেই তো মৃত্যুদিবস জন্মদিবস বিবাহদিবস আর বিভিন্ন মার্কাদিবসগুলো আমাগো দেশে দারুণভাবে পালন হয়, হচ্ছে রাতবিরাত!’
নারায়ণ কবির নিষেধ করে দেশের নাম না মুখে আনতে! সে বলে তার নাকি সব দেশই তার। সে আরো বলে, মানুষের নামেরও কোনো জাতপাত থাকতে নেই। সব নামই এক থাকা যৌক্তিক। নামে আবার কিসের জাত! এই যে আমার অর্ধেক নাম হিন্দু, আর অর্ধেক নাম মুসলিম মুসলিম শোনায়—এতেকি আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে? হচ্ছে না। বরং মানুষের 'নাম' এবং 'দেশ'কে ছোট না করে—দেশের নাগরিক পরিচয়ে আমাদের উচিত এই দু'টি শব্দকে বড়োকরে রাখা।
শহরের গাড়িগুলার শব্দ ইদানিং ভালা লাগে না। মনে হয় গাড়িগুলার ইঞ্জিনে তেল আর গ্যাসের বদলে ফরমালিন ঢুকায়! আচ্ছা নারায়ণ কবির, তোর পুরো নামটি আর কেউ মুখে না নিলেও আমি কিন্তু প্রতিবারই তোর গোটা নামটি ধরে তোকে ডাকি। তুই কি সত্যি করে একটা সঠিক উত্তর দিবি? সত্যি বলছি বন্ধু, আমি তোর অর্ধেক অর্ধেক কথাগুলো শুনে মুহূর্তে মিস্টার বিনের দর্শক হয়ে যাই। কিচ্ছু বুঝি না তোর আঁকার ইকারের লাইনগুলো।
বন্ধু নারায়ণ কবির আমার সিনায় হাত রেখে এবার উল্টো আমাকে প্রশ্ন একটা করলো মাওবাদীদের মতো, ‘অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে অনুষ্ঠানে আসা আমার দেশের এক সদ্য অতিথি মন্ত্রীর সাথে সিরিয়াল দিয়ে সেলফি তুলছে। কিন্তু তোর সুযোগ থাকার পরও কেনো তুই একটা ছবি মন্ত্রীর সাথে তুললি না? এমন সুযোগ আর কি কখনো পাবি তুই...?'
বন্ধু নারায়ণ কবিরের বলা শেষ হয় না। তার আগেই তাকে থামিয়ে দিলাম। কারণ তার এমন হাসিমার্কা প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বেশি সময় নিলাম না। তাকে বলেই দিলাম আজ আমার সকাল সকাল সকালবেলার কাহিনিটা। কাহিনি বলতে ঠিক কাহিনি নয়, এই সামান্য ত্রিশ মিনিটের কথা। ঘর থেকে বের হবো এমন সময় বউ আমাকে ফরমায়েশ দিলো চাল নিতে। চালের সঙ্গে আরো দুয়েকটা নামও বললো বউ। বউয়ের এমন ফরমায়েশে আমি চমকে উঠলেও বিরক্ত হইনি। আমার গায়ের পোশাকে কখনো টাকার পকেট না থাকায় চমকে উঠি। আর কবুল বলেছি বলে বউয়ের কথায় কখনো বিরক্ত হই না। যেমন গতরাতে আমার পোলাটা নাকি ভাতের ক্ষুধায় কানতে কানতে ঘুমাই গেছে। বউয়ের মুখে পুত্রের কথা শুনে আমি আর ঠিক থাকিনি। কয়েকমিনিটের মধ্যে চলে গেলাম দোকানদার দেলু কাকুর দোকানে। দেলু কাকুর পায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললাম, কাকু আমারে তুমি দুই কেজি চাউল দাও। না কইরো না কাকু। দেশ স্বাভাবিক হলেই আমি তোমার সব টেকা দিয়া দিমু। বাকি আর করুম না কখনো...।
মিনিট ত্রিশ ধরে আরাধনা করার পর দেলু কাকু দাড়িপাল্লার দিকে চোখ ফিরালো। এখন যে তোর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, এটাও দেলু কাকুর আশীর্বাদ। তার দেয়া চাউলের ভাত পেটে ভরেই তো পাঞ্জাবি গায়ে এই অনুষ্ঠানে আসার শক্তি পাইছি। এবার তুই বল বন্ধু, আমার সুযোগ থাকার পরও মন্ত্রীর লগে ছবি তোলাটা জরুরি মনে করুম? নাকি দোকানদার দেলু কাকু আমাকে কখন ত্রিশ মিনিটের শান্তির আশ্রয় দিবে—সে সুযোগটি খোঁজুম?
বন্ধু নারায়ণ কবির আর কিছুই বললো না। মনে হলো মুহূর্তে সে মন্ত্রীর চেহারাটাই ভুলে গেছে। তা না হলে বন্ধু বয়সের উনত্রিশ বছর পর এই প্রথম নারায়ণ কবিরকে আমি নিশ্চুপ থাকতে দেখলাম! আর নিশ্চুপেই সে আমার সামনে থেকে চলে গেলো ধীর পা’য়ে।
আমি পূর্ব পশ্চিম কিছু না বুঝে নারায়ণ কবিরকে ভালোমতো প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা তুই যে যেখানে সেখানে যখন তখন শেয়ার বাজার বিজ্ঞাপনের মতো একটা দুইটা এরকম উক্তি ছাড়িস—মা কালীর দিব্যিরে আমি একদম বুঝি না তোর এই বোবা কথার হিসাব!
বন্ধু নারায়ণ কবিরের হাসিটা আমার খু উ ব ভালো লাগে। যতটা ভালো লাগে না তার বউয়েরও। অনুষ্ঠানের বাইরে এসে ফুটপাতেই দাঁড়িয়ে আছি দুজন। ঠিক দাঁড়িয়ে নয়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছি আমরা। নয়াদিল্লির সামরিক বাহিনীর সকালবেলার ট্রেনিংয়ের মতো একটা ফাটাইয়া আওয়াজ করে বলতে লাগলো নারায়ণ কবির, ‘খুব ভালো, কথাটা তুই বুঝলি না আমার! খুব ভালো মানে আমার দেশ এখন খুব ভালো অবস্থানে আছে। আরে বেটা দেশে তো টাকা আছেই! টাকা আছে বলেই তো মৃত্যুদিবস জন্মদিবস বিবাহদিবস আর বিভিন্ন মার্কাদিবসগুলো আমাগো দেশে দারুণভাবে পালন হয়, হচ্ছে রাতবিরাত!’
নারায়ণ কবির নিষেধ করে দেশের নাম না মুখে আনতে! সে বলে তার নাকি সব দেশই তার। সে আরো বলে, মানুষের নামেরও কোনো জাতপাত থাকতে নেই। সব নামই এক থাকা যৌক্তিক। নামে আবার কিসের জাত! এই যে আমার অর্ধেক নাম হিন্দু, আর অর্ধেক নাম মুসলিম মুসলিম শোনায়—এতেকি আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে? হচ্ছে না। বরং মানুষের 'নাম' এবং 'দেশ'কে ছোট না করে—দেশের নাগরিক পরিচয়ে আমাদের উচিত এই দু'টি শব্দকে বড়োকরে রাখা।
শহরের গাড়িগুলার শব্দ ইদানিং ভালা লাগে না। মনে হয় গাড়িগুলার ইঞ্জিনে তেল আর গ্যাসের বদলে ফরমালিন ঢুকায়! আচ্ছা নারায়ণ কবির, তোর পুরো নামটি আর কেউ মুখে না নিলেও আমি কিন্তু প্রতিবারই তোর গোটা নামটি ধরে তোকে ডাকি। তুই কি সত্যি করে একটা সঠিক উত্তর দিবি? সত্যি বলছি বন্ধু, আমি তোর অর্ধেক অর্ধেক কথাগুলো শুনে মুহূর্তে মিস্টার বিনের দর্শক হয়ে যাই। কিচ্ছু বুঝি না তোর আঁকার ইকারের লাইনগুলো।
বন্ধু নারায়ণ কবির আমার সিনায় হাত রেখে এবার উল্টো আমাকে প্রশ্ন একটা করলো মাওবাদীদের মতো, ‘অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকে অনুষ্ঠানে আসা আমার দেশের এক সদ্য অতিথি মন্ত্রীর সাথে সিরিয়াল দিয়ে সেলফি তুলছে। কিন্তু তোর সুযোগ থাকার পরও কেনো তুই একটা ছবি মন্ত্রীর সাথে তুললি না? এমন সুযোগ আর কি কখনো পাবি তুই...?'
বন্ধু নারায়ণ কবিরের বলা শেষ হয় না। তার আগেই তাকে থামিয়ে দিলাম। কারণ তার এমন হাসিমার্কা প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বেশি সময় নিলাম না। তাকে বলেই দিলাম আজ আমার সকাল সকাল সকালবেলার কাহিনিটা। কাহিনি বলতে ঠিক কাহিনি নয়, এই সামান্য ত্রিশ মিনিটের কথা। ঘর থেকে বের হবো এমন সময় বউ আমাকে ফরমায়েশ দিলো চাল নিতে। চালের সঙ্গে আরো দুয়েকটা নামও বললো বউ। বউয়ের এমন ফরমায়েশে আমি চমকে উঠলেও বিরক্ত হইনি। আমার গায়ের পোশাকে কখনো টাকার পকেট না থাকায় চমকে উঠি। আর কবুল বলেছি বলে বউয়ের কথায় কখনো বিরক্ত হই না। যেমন গতরাতে আমার পোলাটা নাকি ভাতের ক্ষুধায় কানতে কানতে ঘুমাই গেছে। বউয়ের মুখে পুত্রের কথা শুনে আমি আর ঠিক থাকিনি। কয়েকমিনিটের মধ্যে চলে গেলাম দোকানদার দেলু কাকুর দোকানে। দেলু কাকুর পায়ের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে বললাম, কাকু আমারে তুমি দুই কেজি চাউল দাও। না কইরো না কাকু। দেশ স্বাভাবিক হলেই আমি তোমার সব টেকা দিয়া দিমু। বাকি আর করুম না কখনো...।
মিনিট ত্রিশ ধরে আরাধনা করার পর দেলু কাকু দাড়িপাল্লার দিকে চোখ ফিরালো। এখন যে তোর সাথে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছি, এটাও দেলু কাকুর আশীর্বাদ। তার দেয়া চাউলের ভাত পেটে ভরেই তো পাঞ্জাবি গায়ে এই অনুষ্ঠানে আসার শক্তি পাইছি। এবার তুই বল বন্ধু, আমার সুযোগ থাকার পরও মন্ত্রীর লগে ছবি তোলাটা জরুরি মনে করুম? নাকি দোকানদার দেলু কাকু আমাকে কখন ত্রিশ মিনিটের শান্তির আশ্রয় দিবে—সে সুযোগটি খোঁজুম?
বন্ধু নারায়ণ কবির আর কিছুই বললো না। মনে হলো মুহূর্তে সে মন্ত্রীর চেহারাটাই ভুলে গেছে। তা না হলে বন্ধু বয়সের উনত্রিশ বছর পর এই প্রথম নারায়ণ কবিরকে আমি নিশ্চুপ থাকতে দেখলাম! আর নিশ্চুপেই সে আমার সামনে থেকে চলে গেলো ধীর পা’য়ে।

0 মন্তব্যসমূহ