অস্তিত্বের খোঁজে
বিমান দাম
ঘুম ভেঙে গেল ভয়াল দুঃস্বপ্নে। গলা শুকিয়ে কাঠ। ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এক ঢোকে জল খেলেন বিশ্বজিৎ বাবু। হাত বাড়িয়ে তড়িঘড়ি একটা সিগারেট ধরালেন। বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটার মতো ধকধকানি। স্বপ্নে তিনি নিজেকে দেখছিলেন এক অন্ধকার ডিটেনশন ক্যাম্পের ঘেরাটোপে। চারপাশের অসংখ্য অসহায় মুখের সাথে তিনি ভিড়ে আছেন এক অনিশ্চিত গহ্বরে। একসময় এক সেপাই এসে জামার কলার ধরে হেঁচকা টানে তাঁকে নিয়ে চলল কাঁটাতারের দিকে। সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন রক্ত ঝরছিল, আর বুকফাটা আর্তনাদে তিনি চিৎকার করছিলেন—"আমি এ দেশের মাটিতে জন্মেছি গো, আমি এ দেশেরই মানুষ!" ওপাশ থেকে ভেসে এসেছিল এক নির্মম গর্জন—"শালা বিদেশি! যা ওপারে!" চোখের সামনে কাঁটাতার, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল তাঁর। সেই রুদ্ধশ্বাস আতঙ্কের মুখেই ঘুমটা ভেঙে গিয়েছিল।
বছর দশেক আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বিশ্বজিৎ। বাজারহাট করা, চায়ের দোকানে সমবয়সীদের সাথে দেশ-দুনিয়ার আড্ডা আর নাতি-নাতনিদের খুনসুটিতে জীবনটা মন্দ কাটছিল না। কিন্তু মাসখানেক ধরে সেই শান্ত জীবনে আছড়ে পড়েছে এসআইআর /এন আর সি কালবৈশাখী। শুরু হয়েছে কাগজ খোঁজার অন্তহীন দৌড়ঝাঁপ। বিশ বছর আগে, ২০০৫ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল কি না, তা নিয়ে এক আধিকারিকের নোটিশ। বুক ধড়ফড় নিয়ে ছুটলেন নির্বাচন আধিকারিকের দপ্তরে। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটে নাম তো মিলল, কিন্তু যে বুথে তিনি ভোট দিয়েছিলেন, সেই নির্দিষ্ট পাতার অংশটুকু নিখোঁজ। আতঙ্কে দিন কাটল কয়েকটা। অবশেষে বহু ঘাটের জল খেয়ে সেই অংশ জোগাড় হলো।
ভাবলেন, এবার বুঝি রেহাই মিলল। কিন্তু শান্তি যে বড় দূর অস্ত। চারদিকে শুরু হলো লিংকের হিড়িক। ভোটার তালিকা মিলল তো কী হয়েছে, জন্মের প্রমাণপত্র কোথায়? বিশ্বজিৎ বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, "কেন? আমার তো মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ডেই জন্মতারিখ লেখা আছে!" উল্টো দিক থেকে শান্ত উত্তর এল, "না স্যার , ওতে তো প্রমাণ হয় না আপনি কোন সালে এ দেশের মাটিতে জন্মেছেন। সরকারি বার্থ সার্টিফিকেট চাই।"
হতাশ, দিশাহারা হয়ে গতকাল ভোরে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরের এক চা বাগানে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। যেখানে কেটেছিল তাঁর শৈশব, যেখানে ধুলোবালি মেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়েছিলেন। স্কুলের কাঠের আলমারির ধুলোঝাড়া ফাইলে হেড মাস্টার মশাই উইপোকা-কাটা হলদে খাতার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে অনেক চেষ্টায় একটা জীর্ণ নথি বের করেছিলেন বটে, কিন্তু তাতেও মনের সংশয় মেটেনি।
বাড়ি ফিরে টেবিলের ওপর ফাইলের পর ফাইল সাজাতে বসলেন বিশ্বজিৎ। বাবার আমলের জমিজমার খতিয়ান, ট্যাক্সের রসিদ, নিজের মাধ্যমিকের অ্যাডমিট, চাকরির নিয়োগপত্র, অবসরকালীন পেনশনের কাগজ—টেবিল জুড়ে স্তূপ হয়ে থাকা নথিপত্র। কাগজের খসখসে শব্দে হাত বোলাতে বোলাতে সত্তর বছরের বৃদ্ধের মনে হলো, জলজ্যান্ত একটা রক্ত-মাংসের মানুষ হঠাৎ করেই কতগুলো নড়বড়ে কাগজের টুকরোয় বদলে গেছে। নিজের ভিটেমাটি, বাগানের চেনা বকুল গাছ, জীবনের দীর্ঘ সাতটি দশক—সব যেন অর্থহীন হয়ে গেছে একটা নির্মম প্রশ্নের সামনে: "আপনি কে? আপনার প্রমাণ দিন।"
সিগারেটের শেষ অংশটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। কাপের চা কখন জুড়িয়ে বরফ হয়ে গেছে, খেয়াল নেই। জানলার পাল্লাটা খুলতেই দূরের আকাশে ভোরের ফিকে আলো চোখে পড়ল। সেই আলোর দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার সেই গানের সুর—"রাস্তাঘাটে চলতে গেলে পাসপোর্ট লাগে বারেবার, ইআলা মুর দেখছেনি কেউর বাপ-দাদায়..."। পঞ্চাশ-ষাট বছর আগে মানুষের মুখে মুখে ফেরা ফজলুর সেই গান যেন আজ নতুন এক পরিহাসের রূপ ধরে তাঁর সামনে দাঁড়িয়েছে। কাঁটাতারের দুঃস্বপ্ন মিলিয়ে গেলেও জেগে থাকার আতঙ্কটা বুকে পাথর হয়ে চেপে রইল—নিজের দেশেই নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ খোঁজার এক অন্তহীন ক্লান্তি।
0 মন্তব্যসমূহ