প্রতিদিন বাংলাভাষা স্রোত :২৬:১২:২০২০♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥ (২৪) ♦ বর্গহীন ব্যঞ্জনের কথা♦/ মানবর্দ্ধন পাল

প্রতিদিন বাংলাভাষা  স্রোত :২৬:১২:২০২০

♥#ব্যাকরণের_বিন্দুবিসর্গ♥
                        (২৪)
       ♦ বর্গহীন ব্যঞ্জনের কথা♦/ মানবর্দ্ধন পাল

   ব্যঞ্জনের বাকি কথা রইল যা-কিছু 
       তা জানিতে নাতি-নাতনি                            
             আসে পিছুপিছু।

এবার পঞ্চাশতম বিজয় দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। দাদুভাই ডাইনিংরুম থেকে শুনতে পাচ্ছেন শুক্রবারের নিয়মিত অতিথিরা বিগত বছরের বিজয় দিবসের গল্প করছে। সেই কাকডাকা ভোরে স্কুলে যাওয়া, সকালে মিছিল করে শহীদমিনারে ফুল দেওয়া, গার্লস গাইডের মার্চপাস্ট, স্ংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, হৈচৈ-- আরও কত কী! আর এবার গৃহবন্দী বিজয় দিবস!
এসব কথা শুনে দাদুভাইয়ের মনে রক্তক্ষরণ হলেও মুখে অভিনযের হাসি এনে বললেন, 
---- তোমরা মন খারাপ কোরো না। ভ্যকসিন অল্প দিনের মধ্যেই আমাদের দেশে এসে যাচ্ছে। আর দুশ্চিন্তা নেই! "আবার জমবে মেলা বটতলা-হাটতলা অঘ্রানে নবান্নের উৎসবে।" যাক, আমরা আসল কথায়  ফিরে আসি। বর্গের ভেতরের পঁচিশটি বর্ণ ছাড়াও ব্যঞ্জনবর্ণমালায় আরও চোদ্দটি বর্ণ আছে। সেগুলোর কথা কিছুই বলা হয়নি! তাছাড়া পাঁচটি বর্গের শেষ পাঁচটি বর্ণ-- ঙ ঞ ণ ন ম-- নিয়ে কয়েকটি কথা না-বললেই নয়। এই বর্ণগুলোর ভিন্ন রকম বৈশিষ্ট্য আছে।

 ভাষাবিজ্ঞানীরা এগুলোকে বলেছেন, নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি। তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই পাঁচটি ধ্বনি উচ্চারণের সময় ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাস মুখ ও নাক দুই দিক দিয়েই বেরোয়। এগুলো ছাড়া অন্য কোনও ধ্বনির বাতাস শুধু মুখ দিয়ে বেরোয়--  নাক দিয়ে বের হয় না। এজন্য একত্রে এই পাঁচটি ধ্বনির নাম নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি। অনেকে এগুলোকে অনুনাসিক বা সানুনাসিক ধ্বনিও বলেন। তবে যে-নামেই ডাকি না কেন সবার সঙ্গেই নাসিকা বা নাক যুক্ত আছে। নাক দিয়ে বাতাস না-বেরুতে পারলে নাসিক্য ধ্বনি ঠিকমত উচ্চারিত হয় না। এজন্য সর্দিতে নাক বন্ধ থাকলে নানার কাছে ননী (মাখন) দিয়ে নানরুটি খাওয়ার আবদার করা সহজ হয় না কিংবা মায়ের কাছে মামাবাড়িতে মাংসের কোরমা দিয়ে খাওয়ার গল্পও স্পষ্ট করে  বলা যায় না! তোমরা নাকে চাপ দিয়ে ধরে নাসিক্য ধ্বনিগুলো উচ্চারণ করলেই তা বুঝতে পারবে। নাসিক্য ধ্বনিগুলো অনেক সময়ই তদ্ভব শব্দের বানানে চন্দ্রবিন্দুতে  (ঁ) পরিণত হয়। যেমন চন্দ্র>চাঁদ, পঞ্চ>পাঁচ, অঙ্ক>আঁক, বন্ধ>বাঁধ, অঞ্চল>আঁচল।

করাল করোনাকালের সেই লকডাউনের সময় থেকে আমরা বর্ণমালার গল্পের আসর শুরু করেছিলাম। সেসব কথামালার একটি সংক্ষিপ্তসার আজ তোমাদের কাছে তুলে ধরব। আজ যা বলব তা সবই তোমাদের জানা। তবু কেউ যদি কিছু ভুলে গিয়ে থাক তবে এখন তা আবার মনে হবে এবং প্রয়োজনে বুঝেও নিতে পারবে। তাছাড়া বর্গহীন বর্ণগুলোর কথাও বলব।
---- সেটাই খুব ভাল হবে দাদুভাই। 
হিয়া একথা বলে নড়েচড়ে বসল। ঐশী শুভ ও কাব্যকে সাবধান করে আঙুলের ইশারায় চুপ থাকতে ইঙ্গিত করল। দাদুভাই আজকের প্রসঙ্গ শুরু করলেন। 

---- সব মিলিয়ে বাংলা বর্ণমালার সংখ্যা পঞ্চাশটি। এর মধ্যে স্বরবর্ণ ১১টি, ব্যঞ্জন ৩৯টি।
★ হ্রস্বস্বর ৪টি-- অ ই উ ঋ। বাকি ৭টি দীর্ঘস্বর।
★ কার আছে এমন স্বরবর্ণ ১০টি। একমাত্র অ ছাড়া সকল স্বরবর্ণের কার আছে।
★ ৩৯টি ব্যঞ্জনের মতো ৪টি অপ্রকৃত বা অপূর্ণ ব্যঞ্জনবর্ণ-- ৎ ং ঃ ঁ। বাকিগুলো প্রকৃত ব্যঞ্জন।
★ মৌলিক স্বরধ্বনি ৭টি-- অ আ ই উ  এ ও অ্যা।
★ যৌগিক স্বরধ্বনি ২টি-- ঐ ঔ।
★ লিখিত রূপহীন যৌগিক স্বর ২৫টি।
★ বর্গ ৫টি-- ক চ ট ত প।
★ নাসিক্য ব্যঞ্জনধ্বনি ৭টি-- ঙ ঞ ণ ন ম ং ঁ।
★ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ১৩টি। বর্গের প্রথম ও তৃতীয় ধ্বনি এবং শ ষ স অল্পপ্রাণ।
★মহাপ্রাণ ধ্বনি ১১টি। বর্গের দ্বিতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি এবং হ মহাপ্রাণ। 
★অঘোষ ধ্বনি ১৪টি। বর্গের প্রথম ও দ্বিতীয় ধ্বনি এবং শ ষ স ঃ অঘোষ।
★ঘোষধ্বনি ১১টি। বর্গের তৃতীয় ও চতুর্থ ধ্বনি এবং হ ঘোষ।
★মাত্রাহীন বর্ণ ১০টি। স্বরবর্ণ ৪টি-- এ ঐ ও ঔ। ব্যঞ্জনবর্ণ ৬টি-- ঞ ঙ ৎ ং ঃ ঁ।
★ অর্ধমাত্রাযুক্ত বর্ণ ৮টি। স্বরবর্ণ ১টি-- ঋ। ব্যঞ্জনবর্ণ ৭টি-- খ গ ণ থ ধ প শ।
★ পূর্ণমাত্রাযুক্ত বর্ণ ৩২টি। স্বরবর্ণ ৬টি-- অ আ ই ঈ উ ঊ। ব্যঞ্জনবর্ণ ২৬টি-- ক ঘ চ ছ জ ঝ ট ঠ ড ঢ ত দ ন ফ ব ভ ম য র ল ষ স হ ড় ঢ় য়।
★ স্পর্শবর্ণ বা বর্গীয় বর্ণ ২৫টি-- ক থেকে ম পর্যন্ত।
★ বর্গহীন বর্ণ ১৪টি-- য র ল শ ষ স হ ড় ঢ় য় ৎ ং ঃ ঁ।
★ ফলাযুক্ত বর্ণ ৬টি-- ব ম য র ন ল। এই বর্ণগুলো অন্য ব্যঞ্জনের সঙ্গে যুক্ত হলে ফলা বলে।
★ উষ্ম বা শিস্ ধ্বনি ৪টি-- শ ষ স হ। দুষ্ট ও মাস্তান ছেলেরা ঠোঁট গোলাকার করে শিস্ দেয়-- শিস্ দিয়ে গান গায়। তোমরা স্কুলে যাওয়ার পথে তা লক্ষ কর। সেই শব্দতরঙ্গের সঙ্গে এই ধ্বনিগুলোর উচ্চারণে মিল আছে বলে নাম শিস্ ধ্বনি। 
★ পার্শ্বিক ধ্বনি ১টি-- ল। জিহ্বা তালুতে লেগে-থাকা অবস্থায় জিহ্বার দুপাশ দিয়ে মুখের বাতাস বেরিয়ে এই ধ্বনিটি উচ্চারিত হয় বলে এই নাম।
★ কম্পনজাত ধ্বনি ১টি-- র। একতারা-দোতারা কিংবা কোনও তারযন্ত্রে টোকা দিলে কম্পনের ফলে  যে শব্দের সৃষ্টি হয় তেমনই র-ধ্বনি উচ্চারণের সময় জিহ্বা কাঁপে। তাই এগুলোকে কম্পনজাত ধ্বনি বলে। 
★ তাড়নজাত বা তাড়িত ধ্বনি ২টি-- ড় ঢ়। দাঁতের গোড়ার সঙ্গে জিহ্বার লেগে দ্রুত কম্পনের মাধ্যমে এই ধ্বনি উচ্চারিত হয়। শিশুকালে আমরা সবাই খেলাচ্ছলে ড়ড়ড়ড়ড়ড় উচ্চারণ করে মুখে ফেনা তুলেছি। তাড়নজাত ধ্বনি অনেকটা সেরকম। কিংবা গ্রামের কৃষকের গোরু দিয়ে চাষ করে, ধানের মলন দেয় এবং  গোরু হাঁটিয়ে নিয়ে যাবার সময় মুখে যেধরনের শব্দ করে তা-ই তাড়নজাত ধ্বনি। গৃহপালিত পশু তাড়ানোর শব্দের অনুকরণে এই ধ্বনি বলেই এর নাম তাড়িত ধ্বনি।
★ পরাশ্রয়ী বর্ণ ৪টি-- ৎ ং ঃ ঁ। নামটি শুনলেই বোঝা যায়,এগুলো স্বাধীন বা পূর্ণ বর্ণ নয়। এগুলো অন্য বর্ণের ওপর নির্ভরশীল। পরগাছা যেমন অন্য গাছের ওপর ভর করে থাকে কিংবা লতানো গাছ যেমন মরা ডালে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে সেরকম। তাই ব্যাকরণবিদরা বলেন, যে বর্ণের সঙ্গে কার যুক্ত হতে পারে না সেগুলোই পরাশ্রয়ী বর্ণ। নামেই বোঝা যায়, খণ্ড-ত্ হল ত-য়ের খণ্ডাংশ। অনুস্বরও তেমনই। তাই 'ভবিষ্যৎ' ও 'রং' বানান খণ্ড-ত্ (ৎ) এবং অনুস্বর (ং) দিয়ে লেখা গেলেও 'ভবিষ্যতে' ও 'রঙিন' লেখতে পূর্ণ বর্ণ 'ত' এবং 'ঙ' ব্যবহার করতে হয়। 'কার' যুক্ত হলে তা আর 'ভবিষ্যৎে' ও 'রংিন'-- এরকম বানানে লেখা যায় না। 'কার' যুক্ত হওয়ার ফলেই পরাশ্রয়ী বর্ণ প্রকৃত বর্ণে পরিণত হয়েছে। 

এতক্ষণ ঐশী ও হিয়া মনোযোগ দিয়ে  শুনছিল-- যাকে বলে "কথা-গেলা", সেরকমভাবেই! অনেকক্ষণ পর ঐশী মুখ খুলল।
---- আচ্ছা দাদুভাই অন্তস্থ-ব নিয়ে তো  কিছু বললে না!
---- অন্তঃস্থ বর্ণ আছে ৫টি-- য র য় ল ব। এই বর্ণগুলো উচ্চারণ-বিচারে স্বর বা ব্যঞ্জন-- কোনোটাই বলা যায় না। এগুলো উচ্চারণের সময় শ্বাসবায়ু সম্পূর্ণ বাধামুক্ত বা বাধাযুক্ত থাকে না। তাই এদের নাম অন্তঃস্থ ধ্বনি। অন্তঃস্থ-য় এবং অন্তঃস্থ-ব-কে ধ্বনিবিজ্ঞানীরা অর্ধস্বর বলেন। অর্থাৎ এদুটো বর্ণ স্বর ও ব্যঞ্জনের মাঝামাঝি। না-পুরুষ, না-নারী-- বৃহন্নলার মত। 
---- আচ্ছা দাদুভাই, 'বৃহন্নলা' মানে কী? হিয়া জানতে চাইল। 
---- বৃহন্নলা অর্থ 'হিজরা'। একথা শুনেই ঐশী ও হিয়া মুচকি হাসি দিয়ে ওড়নায় মুখ লুকালো। দাদুভাই আবার বলতে শুরু করলেন। 
---- আগে অন্তঃস্থ-ব বর্ণমালায় ছিল কিন্তু এখন নেই। ওটির আকৃতি ছিল মাত্রাহীন ব। উচ্চারণ 'ওয়' ধ্বনির মত। এজন্য অন্তঃস্থ-ব-এর বদলে ইংরেজি বর্ণে W লেখা হয়। তাই 'স্বপ্না' বানান আমরা ইংরেজিতে লেখি-- SWAPNA. বাংলায় অন্তঃস্থ-ব-এর আলাদা উচ্চারণ নেই। বর্গীয় ব-এর মতই উচ্চারণ-- যুক্ত বর্ণে কখনও হয়, কখনও হয় না! তাই বলি : ডিম্ব (ডিমবো), কম্বল (কমবোল্) আবার অশ্ব (অশশো), বিশ্ব (বিশশো)।

আজ তোমাদের অনেক সময় আটকে রাখলাম। সকাল গড়িয়েছে দুপুরের দিকে। এবার ঘরে যাও।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ