হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতা
অভিমুখহীন
যে আলো গিয়েছে নিভে যে আলো আঁধার অতীত
মুখে তার অপমান ক্ষত
অশ্রুহীন হয়েছে সতত
দারুণ প্রদাহ, ছায়াহীন অলীক শপথে
জল দিয়ে ধুয়ে দিলে মুছে যায় যত
যেতে যেতে ডাকে
বারবার কৈশোরের কলতান শৈশবের স্মৃতি লাল নীল পুরনো সাইকেল
যৌবনের পুরনো গীটার, কেউ কি ফিরিয়ে দে য় তাকে
জন্ম ও মৃত্যু র মাঝে ভালবাসা আসে,ভালবাসা যায়
যেতে যেতে নিয়ে যায় স্বর্ণলতা
জাদুদন্ড হাড়মাস পৃথিবীর আদিম সম্ভার
তবু বিষ প্রলোভনে ঘুরে ফিরে
মানুষ বাড়িতে এসে দেখে
ঝুঁকে আছে মহাকাল শত শত অভিমুখ তার ...
নীল সালোয়ার
ক্রমশ ছয়াফেলি ছবি হয়
নিঃশব্দে নিভে যাচ্ছি নীল সালোয়ার
ক্রমশ হেরে যাচ্ছি তোমার কাছে
কী আর করার আছে বলো,কোথায় ভাসালে নৌকো
কোথায় রেখেছো পঞ্চমুখী জবা
মেঘ বৃষ্টি স্নায়ুর সংলাপ ...
এখনো মলাট খোলার পর সেই দাহ
অবিনাশী উগরে দেওয়া রক্তবীজ
কুসুমিত মশারির ভাঁজে ঘুমের পালক
রসিক চাঁদের হাটে এ বছর জাঁকিয়ে পড়েছে শীত
তাই রস এলো গাছে
নীল সালোয়ার আর কিছু ভাবতে পারিনা আমি
শুধু তুমি আছো তুমি আছো তুমি আছো
বলেই এই জিরেনকাটের রস চিরদিন ...
উৎসব
এই অন্ধকার গলিতে এসে উৎসব বানিয়েছি
অতল মিলনের জন্য বাক্যহারা
যে যার অঞ্জলি দিয়ে ফিরে যাবো
মুদ্রিত হরফে রক্তবিন্দু যুগযুগান্তর
যত দিন যায় অক্ষর প্রবাহে কেন এত অন্ধকার
আমার এ রত্নাকর জন্মের আগে কেউ কি বসেছিল সব সাধনায়
জলে ডুবে থেকেছি ইজলি মাছের সাথে
এবার জলের গভীরে যেতে হবে
দেখবো জলঝাঝিদের প্রার্থনা
বনশ্যাওলার কান্না
শ্বাস প্রশ্বাস বন্ধ করে এ প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা
যদিও বড়ো মর্মান্তিক...
যে যার আপন সুখে
ঘরবাড়ি ভিজে যায় শিকড়ের টানে
রাত্রি শুধু জেগে থাকে অন্ধ অভিমানে
সীমান্ত পেরিয়ে যায় খুঁটে খায় দানা
চিৎকার করে বলে নো নো। না না ...
তার মধ্যে খুঁজে পাবে কৃপণ আঙুলে
বীজ ধরে থাকে জল জীবনের মূলে
সফল কীর্তি ভেবে এতো যে শরীরপাত
এসব কিছুই নয় ভেবেছো নির্ঘাত
এখনো রয়েছে তাই অবুঝের টান
সমস্ত ব্যসন কাম স্রোতের উজান
যে যার আপন সুখে চলে যায়
সময় এগিয়ে শুধু বলে, আয় আয়...
বিশ্বাস করি না
কে যে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি আমরা কেউ জানি না
কে যে কোথায় ভেসে যাচ্ছি কেউ আমরা জানি না
কে যে কোথায় নীল যমুনায় কুহু গান গেয়েছি জানি না,আমাদের মাঝখানে রজনীগন্ধা হরিয়াল বসেছিল সেদিন, উড়ন্ত তাস আর সলমাজরি নিয়ে আমাদের মাঝখানে এসে দেখা দিয়েছিল কৃষ্ণগোপাল. ..
একদিন মনের সুখে বাঁশি বাজিয়েছিল কেমন যেন
অহেতুক কৌতুক ছিল তার মুখে. ..
আমাদের মাঝখানে ক্ষণকালের জন্য পরীরা কি যত্নসহকারে ঝড়ের বৃষ্টির হাত থেকে আড়াল করেছিল একদিন. ..
একটা আমগাছের কথা অনেকবার তোমাদের বলেছি তোমরা বিশ্বাস করো নি
একটা বুড়ো অশ্বথ গাছের কথা ,বটগাছটি থেকে সে কীভাবে আলাদা হয়ে গিয়েছিল একদিন
সেই গল্প তোমরা বিশ্বাস করো নি. ...
পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটা কিন্তু তেমনি আছে
মরুভুমিকে সামনে রেখে সে এগিয়ে যাচ্ছে এখনো সাগরের দিকে ,কান্নাকাটি যাদের লুকিয়ে রাখতে হয়
মনের গভীরে তারা এখানে এসে হাহাকার করে ওঠে
তখন পাহাড় থেকে গড়িয়ে আসা নুড়িপাথর আগ্নেয়গিরির মতো নড়ে ওঠে,নিমেষে তখন পাথরের তলায় আর বেজে ওঠা কান্না একাকার হয়ে যায়. ..
মানতে চাওনি কোনোদিন,শুধু মুচকি হেসে বলেছো
বিশ্বাস করি না,আমরা বিশ্বাস করি না .......
গভীর জলের মতো বিপন্নতা
মেঘ চিরকাল মনুষ্যসৃষ্ট গতিপথ ঘুরিয়ে দিতে ভালবাসে ,যখন সব ঝাপসা হয়ে আসে পরিচিত অপরিচিত মুখ পাখিরা বাসায় ফেরে তখন বৃষ্টি এসে ধুইয়ে দেয় গান তবুও যে রক্তস্রোতে ভেসে যায় সমাজ সংসার সংস্কার তাই দিয়ে লিখতে হয় সাদা পাতার উপর কালো অক্ষর উপমা যেমন নতুন বেদনা এলে বিষাদে ভাস্বর, নিমেষে পুরনো বেদনা ভুলিয়ে দেয় রাষ্ট্রহীন মানুষের অস্ত্রহীন নীলিমায় ভয়াবহ থেঁতলে যাওয়া মুখ, তবু কেন ,কেন এখনো চৌরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকো ,খবর জানতে চাও
সবুজ স্বপ্নের সারি একদিন আদিম অস্তিত্বের নীরবতা ভেঙে দেবে সম্ভাবনা সব অলৌকিক ক্ষতস্থানে এসে ভেসে বেড়াবে আমাদের প্রায় পিয়ানো, তখন কাউকে খবর দেওয়ার মতো কিছু থাকবে না. ..
চক্রাকারে আবর্তিত হবে যোগবিয়োগের রাশিফল
কপিলেশ্বরের অক্ষরনাচ
নাচছে নন্দী ভৃঙ্গী
তখনো গভীর জলের মতো আলো আঁধারি তোমার ঠোঁট বিপন্নতায় ভরা ........
হীরক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরিচিতি
বাংলা কবিতার আশির দশকের অন্যতম প্রধান কবি হীরক বন্দ্যোপাধ্যায় মনে করেন নিঃসঙ্গ মানুষের অনন্ত জিজ্ঞাসাই হল কবিতা ।পরিচয় দেশ থেকে শুরু করে নন্দন অনুষ্টুপ চতুরঙ্গ এবং মুশায়েরা ইত্যাদি ছোট বড়ো সকল শ্রেণির পত্রিকা তার লেখনভূমি ।সাদা রঙের ট্রাপিজ , নীল আলোর গল্প
,বসন্ত অপেরা,নিরালম্ব ঘুঙুর,অসহনীয়, ছায়া ফেলি ছবি হয়, গাগরি ভরে না,বিধিবদ্ধ উপত্যকা ইত্যাদি
তার সৃষ্ট কয়েকটি ধ্রুপদী কাব্য ।তিনি প্রতিশ্রুতি, ঢেউ, অরণি, চিলার ইত্যাদি পত্রিকা সম্পাদনা করেন।তার নিরলস সাহিত্য সাধনার ফসল হিসেবে ইতিমধ্যেই পঞ্চাশটিরও বেশি পুরস্কারে পুরস্কৃত ও সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন ।
0 মন্তব্যসমূহ