অভিশপ্ত - গৌতম জি সিনহা
আলোচনা : দিব্যেন্দু নাথ
'অভিশপ্ত' কাব্যগ্রন্থে মোট ৪৮টি কবিতার বাস। লিখেছেন কবি গৌতম জি সিনহা। কবিতাগুলোর শিরোনামেই এক ধরনের জীবনবোধের ইঙ্গিত পাওয়া যায়— গোধূলিবেলা, আশা, অনিকেত, আমি পিয়াসী, দিশাহারা, অভাগিনী, পলাতক, নিশীথের কান্না, আত্মঘাতী, কারাগার, আমিও একজন, পিপাসা, মাঝি, বিশ্বাস ও নিঃশ্বাস ইত্যাদি ইত্যাদি...প্রভৃতি। এই শিরোনামগুলিই বুঝিয়ে দেয়, কবি মূলত মানুষের জীবনসংগ্রাম, ব্যর্থতা, প্রেম এবং সামাজি কথা বলতে চেয়েছেন। এক ধরনের আত্মস্বীকারোক্তিমূলক কাব্যযাত্রা। ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা, সমাজদর্শন, হতাশা, প্রেম, মানবিক বোধ, এবং সময়ের নিষ্ঠুরতা—সব মিলিয়ে কবির অন্তর্জগতের এক দীর্ঘ আর্তস্বর ধরা পড়েছে 'অভিশপ্ত' নামক কাব্যগৃহে।
কবি ভূমিকায় বলেছেন - কবি নজরুল আমার প্রিয় কবি। আর আমি সবসময় বাস্তবমুখী ও প্রতিবাদী ধরণের কবিতা লিখতে পছন্দ করি। কবি নজরুলের কবিতার ধরণগুলো আমার খুবই পছন্দ।' এখান থেকে বুঝা যায় কবি কি বলতে চাইছেন।
এই যে আলোচনায় আমরা অগ্রসর হচ্ছি, তা সম্পূর্ণ আমার ব্যাক্তিগত মতামত। অন্য কারো সঙ্গে না-ও মিলতে পারে। গ্রন্থের সব কবিতার আলোচনা এই ক্ষুদ্র পরিসরে করা সম্ভব নয়। বেছে বেছে কয়েকটি কবিতার কিছু লাইন তুলে আমার মতো ব্যাখ্যা করছি। প্রথম কবিতা অভিশপ্ত-এ কবি যেন নিজের জীবনযন্ত্রণার এক আত্মস্বীকারোক্তির বর্ণনা দিয়েছেন -“চাপের মুখেই বাঁচতে শিখেছি এ বিশ্বালয়েকর্তব্যেতে কিন্তু; আমি নয় কখনও পিছিয়ে।”
এই পংক্তিতে স্পষ্ট হয় কবির জীবনের সংগ্রামী অবস্থান। সমাজের ভুল বোঝাবুঝি, মানুষের অবিশ্বাস এবং ব্যক্তিগত হতাশা। সবকিছুই যেন তাঁকে অভিশপ্ত এক চরিত্রে দাঁড় করিয়েছে।
আবার কবিতার আরেক জায়গায় তিনি বলেন, -
“অভিশাপে জড়ালে হৃদয় দিয়ে—
বুঝলি না এতদিন পেরিয়ে।”
এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ব্যর্থতা এবং ভুল বোঝাবুঝির বেদনা তীব্র হয়ে উঠেছে।
'আশা' কবিতায় প্রেম এক দূরবর্তী স্বপ্নের মতো। এখানে LOC-এর প্রতীক ব্যবহার করে কবি বিচ্ছিন্নতার সীমারেখা তুলে ধরেছেন—
“হয়তো পাবো তোমার দেখা
যেখানে ঐ শেষ মাথায় দাঁড়ানো LOC রেখা।” এই প্রতীকী ব্যবহার কবিতাটিকে আধুনিকতার স্পর্শ দিয়েছে।
'দিশাহারা' কবিতায় জীবনের অনিশ্চয়তা ফুটে ওঠে—"উদাসী যাত্রী ভাবে—পথের যাত্রী পথেই থাকে।”
এই লাইনটি মানবজীবনের অন্তহীন যাত্রাকে দার্শনিকভাবে প্রকাশ করে।
'নিশীথের কান্না' কবিতায় কবি ব্যক্তিগত বেদনার কথা বলেছেন—“রোজ নীরব নিশীথ রাতে
শুধু জলই আসে আমার চোখেতে।”
এখানে রাত যেন কবির দুঃখের নীরব সাক্ষী।
গ্রন্থের অন্যতম শক্তিশালী কবিতা 'কারাগার'। এখানে সমাজের ভণ্ডামি ও মূল্যবোধের পতনের চিত্র রয়েছে— “বিশ্বাস বন্দি অবিশ্বাসের খাঁচায়
জগৎ জুড়ে বিশ্বাসঘাতের ছোঁয়া।” - এই পংক্তি আজকের সমাজবাস্তবতার এক নির্মম প্রতিফলন।
'আমিও একজন' কবিতায় কবি অস্তিত্বের প্রশ্ন তুলেছেন—“কোথায় গন্তব্য?
অজান্তে এলোমেলো দৌড় অহঙ্কারের মাঠে।”
এখানে আধুনিক মানুষের লক্ষ্যহীন জীবনযাত্রা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
গ্রন্থের আরেকটি উল্লেখযোগ্য কবিতা 'পিপাসা'। এখানে কবি ভবিষ্যতের পৃথিবী নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন—“পানি বিনে তৃষায় মরেঘুরবে ভুবন পানির খোঁজে।” এই কবিতাটি পরিবেশ বিপর্যয় ও বিশ্বের উষ্ণায়নের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে এক সতর্ক বার্তা। এই ভবিষ্যৎচিন্তা কবির সামাজিক সচেতনতার পরিচয় দেয়।
'মাঝি' কবিতায় জীবনকে সমুদ্রযাত্রার সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে—“ছুটেছি আমি অভিশপ্ত মাঝি
টাকা ব্যয়ে কিনারা খোঁজে।” এখানে ‘মাঝি’ আসলে কবি নিজেই—যিনি জীবনের অর্থ খুঁজে চলেছেন। এভাবে এক এক কবিতায় কবি জীবনবোধের কথা অনর্গল ধারায় বলে গেছেন। ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, হতাশা, সামাজিক অবক্ষয়, পরিবেশ সংকট এবং মানবিক মূল্যবোধ—সবকিছুকে একসঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষা সরল, আবেগপ্রবণ এবং অনেক জায়গায় নাটকীয়তা আছে, যা তাঁর নাট্যকার সত্তার প্রভাব বলে মনে হয়।
ভূমিকার শেষের দিকে স্বীকার করে দিয়েছেন যে, 'এই কাব্যগ্রন্থে সব কয়টি কবিতাই বাস্তবমুখী ও প্রতিবাদী ধরণের কবিতা।'
এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভিজ্ঞতার সত্যতা। কবি নিজের জীবনবোধকে লুকাননি; বরং তা কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। “অভিশপ্ত” মূলত কবির জীবনানুভূতির এক স্বীকারোক্তিমূলক দলিল। এখানে ব্যক্তিগত বেদনা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমাজবাস্তবতার কঠিন সত্য।
তবে সমালোচনার জায়গাও একেবারে অনুপস্থিত নয়। অনেক কবিতায় ভাবের আন্তরিকতা থাকলেও ভাষার সংযম এবং কাব্যিক সংহতি আরও পরিমিত হলে কবিতাগুলো নিঃসন্দেহে অধিক শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারত। কোথাও কোথাও বক্তব্যের সরাসরি-কতা কবিতার অন্তর্লীন সৌন্দর্যকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে এবং কিছু পংক্তিতে কবিতার চেয়ে বক্তব্যই বেশি প্রবল হয়ে উঠেছে। ফলে কাব্যের মেদহীন ঘনত্ব সবসময় বজায় থাকে নি।
এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গ্রন্থটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো অভিজ্ঞতার সত্যতা এবং আবেগের আন্তরিকতা।
সব মিলিয়ে “অভিশপ্ত” কাব্যগ্রন্থটি কবি গৌতম জি সিনহার সাহিত্যজীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন এবং তাঁর অন্তর্লোকের এক গভীর অনুরণন। কিছু মুদ্রণ ত্রুটি থাকলেও সুন্দর প্রচ্ছদে, ৪৮ পৃষ্টার চকচকে মলাটের ভিতর বেশ মানানসই বই।
গ্রন্থ: অভিশপ্ত
কবি: গৌতম জি সিনহা
প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২৬
গ্রন্থস্বত্ব: গৌতম জি সিনহা
বর্ণায়ণ: অরুণকুমার দত্ত
প্রচ্ছদ: গীতশ্রী চ্যাটার্জী
প্রচ্ছদ রূপায়ণ: অরুণকুমার দত্ত
মুদ্রণ:গ্রাফিপ্রিন্টহালাইমুড়া, কুমারঘাট – ৭৯৯২৬৪উনকোটি, ত্রিপুরা
পরিবেশক:স্রোতহালাইমুড়া, কুমারঘাট – ৭৯৯২৬৪উনকোটি, ত্রিপুরা
প্রকাশক: সুমিতা পাল ধর
সার্বিক যোগাযোগ:হালাইমুড়া, কুমারঘাট – ৭৯৯২৬৪উনকোটি, ত্রিপুরা
ফোন:৮৭৮৭৪৩৭৫৫৯ / ৯৪৩৬১৬৭২৩১
ই-মেল:boibari15@gmail.comsrotpublication@gmail.com
ওয়েবসাইট:www.srot.online
ISBN: 978-81-995772-9-9
মূল্য: ২০০ টাকা
0 মন্তব্যসমূহ