ইতিহাস,লোকজীবন আর সংস্কৃতির সমন্বয়
পান্নালাল রায়
বর্তমানে দেশের যে অঞ্চলটিকে উত্তর পূর্বাঞ্চল বলে চিহ্নিত করা হয় আগে সেই অঞ্চলে নৃপতি শাসিত কয়েকটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো কালক্রমে এই অঞ্চলেও কায়েম হয়েছিল ব্রিটিশ আধিপত্য।১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় আসাম,জয়ন্তিয়া,কাছাড় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণাধীন। মণিপুর ও পার্বত্য ত্রিপুরা নৃপতি শাসিত স্বাধীন রাজ্য হলেও সেই 'স্বাধীনতা' ছিল প্রশ্ন কন্টকিত,কিছুটা যেন ইংরেজদের অনুকম্পা নির্ভর।কারণ সেই 'স্বাধীন' রাজ্যের রাজাকেও সিংহাসনে বসার জন্য ইংরেজ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল,এ জন্য নজরানাও দিতে হতো তাদের।যাইহোক,বর্তমানে উত্তর পূর্বাঞ্চল বলে পরিচিত এই অঞ্চলে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ বা মহাবিদ্রোহের ছোঁয়া লেগেছিল।চট্টগ্রামের ৩৪ নং ইনফ্যান্ট্রির সিপাহিরা বিদ্রোহ করে সেদিন ত্রিপুরার দিকে ধাবিত হয়েছিল।কিন্তু ত্রিপুরার রাজার কাছ থেকে আশ্রয় প্রশ্রয় না পেয়ে তারা শ্রীহট্ট-কাছাড় হয়ে মণিপুর যাবার চেষ্টা করে।শেষপর্যন্ত অবশ্য বিদ্রোহী সিপাহিদের আর মণিপুর যাওয়া হয়নি।কাছাড়েই ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে অসম লড়াইয়ে বেশিরভাগ বিদ্রোহী সিপাহির মৃত্যু ঘটে,কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।এ ভাবে কাছাড়েই নির্বাপিত হয় চট্টগ্রাম থেকে বয়ে আনা বিদ্রোহের মশাল।
১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহ নিঃসন্দেহে দেশের ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।কিন্তু উত্তর পূর্বাঞ্চলেও যে এর ছোঁয়া লেগেছিল তা যেন দীর্ঘদিন অন্তরালে ছিল। ১৯৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে তা নিয়ে দেশব্যাপী আলাপ-আলোচনা,গবেষণা,অনুসন্ধান নতুন মাত্রা পায়। উত্তর পূর্বাঞ্চলে সেদিন চট্টগ্রামের বিদ্রোহীদের তৎপরতার বিষয়টিও আলোচনায় আসে বৃহত্তর পরিসরে। পরবর্তী সময়েও এ নিয়ে লেখালেখি হতে থাকে।কাছাড়ের যে সব অঞ্চলে চট্টগ্রামের বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইংরেজ বাহিনীর লড়াই হয়েছিল সে সব চিহ্নিত করে স্মারক সৌধ গড়ে তোলা হয়।যেমন করিমগঞ্জের মালেগড়,হাইলাকান্দির রণটিলা ইত্যাদি।কিন্তু সেদিন চট্টগ্রামের বিদ্রোহী সিপাহিরা কোন পথে ত্রিপুরায় প্রবেশ করেছিল? Sir Edward Gait তাঁর A History of Assam গ্রন্হে উল্লেখ করেছেন
In November 1857,three companies of the 34th Native Infantry stationed at Chittagong mutinied and after burning their lines,breaking open the jail and plundering the treasury, marched in the direction of comilla,then they turned off into the jungles of Hill Tippera, whence they subsequently emerged in the south-east of the Sylhet district.Their intention was to push on, through the South of Cachar,into Manipur.
এদিকে Hunter সাহেবের Statistical Account of the State of Hill Tipperah-তে রয়েছে
The sepoys of the 34th Native Infantry who mutinied at Chittagong on the night of the 18th November 1857,plundered the treasury and then marched to Agartala, the capital of Hill Tipperah....
ত্রিপুরা থেকে কোন পথ ধরে তারা শ্রীহট্টে পৌঁছেছিল তা নিয়ে অবশ্য অনেক আলোচনা,গবেষণা হয়েছে।শেষপর্যন্ত অবশ্য বিভিন্ন বিবরণ থেকে এটা মোটামুটি স্পষ্ট যে,বিদ্রোহীরা ত্রিপুরার পার্বত্য অঞ্চলের ভেতর দিয়েই শ্রীহট্ট-কাছাড়ে পৌঁছেছিল।কিন্তু ত্রিপুরায় প্রবেশ করেছিল ঠিক কোন পথে? সে সময় চট্টগ্রামে ৩৪ নং ইনফ্যান্ট্রির প্রধান ছিলেন P H K Dewool। তিনি তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিদ্রোহের কয়েক দিন পর এক চিঠিতে জানিয়েছিলেন যে,বিদ্রোহীরা ফেনী নদী অতিক্রম করে ত্রিপুরার রাজার অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল। এই চিঠির অংশ বিশেষ উল্লেখ করে অশোকানন্দ রায়বর্ধন তাঁর একটি প্রবন্ধে বলেছেন বিদ্রোহীরা সেদিন সাব্রুম সীমান্ত দিয়েই নৃপতি শাসিত পার্বত্য ত্রিপুরায় প্রবেশ করেছিল এবং পরে শ্রীহট্টের দিকে চলে গিয়েছিল তারা।এই ভাবেই প্রবন্ধটিতে সাব্রুমে ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের ছোঁয়া থেকে শুরু করে ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত সমতল ত্রিপুরার ব্রিটিশ বিরোধী তৎপরতার প্রভাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।অশোকানন্দবাবু তাঁর ''ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অবিভক্ত দক্ষিণ ত্রিপুরা ও সাব্রুমের বিপ্লবী কেন্দ্র'' প্রবন্ধটিতে বিলোনীয়া ও সাব্রুম অঞ্চলে সেদিনের বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ডের কথাও তুলে ধরেছেন। পার্বত্য ত্রিপুরা নৃপতি শাসিত স্বাধীন রাজ্য।এই রাজ্যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠার কথা নয়।কিন্তু পার্শ্ববর্তী ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত চাকলা রোশনাবাদ বা সমতল ত্রিপুরার স্বাধীনতা আন্দোলনের ভালো প্রভাব পড়েছিল সেদিন পার্বত্য ত্রিপুরায়।অরণ্যে গড়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।বিলোনীয়ার বোকাফা এবং মাইছড়াতে গড়ে উঠেছিল এই ধরণের কেন্দ্র, দৃশ্যত যা ছিল কৃষি খামার।দিনে ছিল কৃষি কাজ,রাতে চলতো অস্ত্র প্রশিক্ষণ।সাব্রুমের পশ্চিমদিকে হার্বাতলী-বেতাগার গভীর অরণ্যে এ রকম কৃষি খামার গড়ে উঠেছিল।দিনের বেলায় স্হানীয় মানুষ সেখানে কৃষি শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন, রাতে বিপ্লবীরা সেখানে রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ দিতেন।বিপ্লবীরা বেতাগার জঙ্গলে একটি চানমারিও গড়ে তুলেছিলেন। উল্লেখ করা যায় যে,ড.রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর History of Freedom Movement in India গ্রন্হে পার্বত্য ত্রিপুরার বিলোনীয়া ও উদয়পুরে অনুশীলন সমিতির তৎপরতা সম্পর্কে লিখেছেন-
For the purpose of training it's members, the Anushilan Samiti had two farms at Belonia and Udaipur in Hill Tipperah. These were outwardly, and in part really agricultural farms, but they served mainly as centers for training. During day time the members worked as labourers in the fields but at night they were given training in the use of different kinds of arms,and practiced shooting in the neighboring hills.They had to work hard and lived under strict military discipline.
এই সব তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে এটা স্পষ্ট যে,নৃপতি শাসিত রাজ্য হলেও পার্বত্য ত্রিপুরা অগ্নিযুগে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল দেশের স্বাধীনতার লড়াই'র ক্ষেত্রে।কিন্তু তা যেন এক উপেক্ষিত উপাখ্যান হয়েই আছে।প্রবন্ধকার অশোকানন্দবাবু যথার্থই আক্ষেপ করে লিখেছেন,'ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী এই নীরব বিপ্লবীদের কথা ইতিহাসে আজও তেমন ভাবে লেখা হয়ে ওঠেনি।'
স্রোত থেকে প্রকাশিত অশোকানন্দ রায়বর্ধনের "সাব্রুমের ইতিহাস ও সংস্কৃতি" গ্রন্হে তাঁর এ রকম সতেরোটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে।সাব্রুমের ইতিহাস, প্রত্নকথা,স্হান নামের উৎস সন্ধান,নদী ও মানুষের উপাখ্যান, লোক সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয় সমূহ সহ সাব্রুমে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ছোঁয়া এবং একাত্তরে বাংলাদেশ সৃষ্টির মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুমের অনালোকিত অধ্যায়ও উঠে এসেছে সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ সমূহে।গ্রন্হে সন্নিবিষ্ট প্রথম প্রবন্ধটিতে লেখক চমৎকার ভাবে স্হান নামের আলোকে সাব্রুমের উদ্ভব ইতিহাস খোঁজার চেষ্টা করেছেন। এতে উঠে এসেছে আদি জনবসতি থেকে সমকালীন সমাজের কথা।স্হান নামের ক্ষীণ সূত্র ধরে একটি জাতিগোষ্ঠীর কৃষ্টি-সংস্কৃতির অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে পড়ার কথাও উল্লেখ করেছেন লেখক। বলেছেন সাব্রুম মহকুমার স্হান নামে উপজাতীয় ভাষার প্রভাবের কথা।টাক্কা তুলসী পাহাড় প্রসঙ্গে আলোচনায় ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব উল্লেখ করে লেখক এই উপমহাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ প্রসার লাভের কথা বলেছেন। আবার প্রাচীন কাল থেকেই ত্রিপুরাকে শক্তি সাধনার ক্ষেত্র এবং শক্তিপীঠ উদয়পুরের মাতাবাড়ির কথা উল্লেখ করে তিনি সাব্রুমের দৈত্যেশ্বরী কালী মন্দিরের লোকশ্রুতি ও ইতিহাস তুলে ধরেছেন। দেবী এখানে 'দক্ষিণা কালী' নামে পূজিতা হন।লেখক বলেছেন রাজ্যের দক্ষিণ প্রান্তে মন্দির হওয়াতে সম্ভবত মন্দিরের দেবী কালিকার নাম 'দক্ষিণা কালী' হয়েছে।
একাত্তরে ওপারের মুক্তিযুদ্ধে সাব্রুমের অবদান প্রসঙ্গে অশোকানন্দবাবু দুটি প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আগামী দিনে সেই মুক্তিযুদ্ধে সামগ্রিক ভাবে ত্রিপুরার ভূমিকা নিয়ে তথ্যনিষ্ঠ ইতিহাস রচনায় সূত্র হিসেবে তা বিবেচিত হবে বলে আশা করা যায়।গ্রন্হে সন্নিবিষ্ট "ফেনী নদীর প্রত্নকথা ও মানুষের উপাখ্যান'' শিরোনামের এক দীর্ঘ প্রবন্ধে লেখক চমৎকার ভাবে নদীর উৎস,গতিপথ,জনজীবন থেকে ইতিহাসের কিছু অজ্ঞাত অথবা অনালোকিত অধ্যায়ের অবতারণা ঘটিয়েছেন। ফেনী নদীর নাম প্রসঙ্গে তিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের 'ছুটি খানী মহাভারতে'র কবি শ্রীকর নন্দীর কাব্যে ফেনী নদীর কথা উল্লেখ করেছেন। পরাগলপুর বা লস্করপুরের বর্ণনা প্রসঙ্গে কবি লিখেছেন-
"...ফেনী নদী নামে এ বেষ্টিত চারিধার
পূর্বদিকে মহাগিরি পার নাহি তার।।..."
মীর্জা নাথান-এর 'বহারিস্তান-ই-গায়েবী'-তেও এই নদীর উল্লেখের কথা বলেছেন লেখক।মোগল সেনাপতি মীর্জা নাথান-এর 'বহারিস্তান-ই-গায়েবী'তে সপ্তদশ শতকের শুরুতে ত্রিপুরার বিরুদ্ধে মোগলদের যুদ্ধের বিবরণ লিপিবদ্ধ আছে।
লেখক ফেনী নদীর নাম প্রসঙ্গে বলেছেন 'গাজিনামা'র কথাও।'গাজিনামা'তেও সমসের গাজির গড় জগন্নাথ-সোনাপুর গ্রামের বর্ণনায় ফেনী নদীর উল্লেখ রয়েছে।
নদী কেন্দ্রিক জীবন যাপনের কথা বলতে গিয়ে অশোকানন্দবাবু সেকাল-একালে ফেনী নদী ও অর্থনৈতিক জীবন, সংস্কৃতি,নদীর পাড়ে লোকমেলা,একাত্তরের যুদ্ধে এই অঞ্চলের ভূমিকা সব কিছু তুলে এনেছেন পরম মমতায়। সব মিলিয়ে গ্রন্হটি হয়ে উঠেছে সাব্রুম তথা ত্রিপুরার দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে চর্চার এক অনবদ্য দলিল।অশোকানন্দ রায়বর্ধন এ রাজ্যের একজন বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক-লেখক।তাই তাঁর গ্রন্হে লোকসংস্কৃতির আলোকে কিছু কিছু বিষয়ের বিশ্লেষণ পাঠকদের যেমন তৃপ্ত করবে,তেমনই অনেকের জন্য আবার নতুন চিন্তা চেতনার দুয়ারও খুলে দেবে।সাম্প্রতিক কালে আঞ্চলিক ইতিহাসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।সবাই তার নিজের এলাকার কথা জানতে চায়।জানতে চায় তার গ্রাম-শহর সহ বিভিন্ন জনপদের সৃষ্টি,নামের উদ্ভব আর তার ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা।আলোচ্য গ্রন্হটি এ ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এক উল্লেখযোগ্য সংযোজন।ইতিহাস,ঐতিহ্য,লোকজীবন আর সংস্কৃতির এক চমকপ্রদ সমন্বয় ঘটেছে গ্রন্হটিতে।
সাব্রুমের ইতিহাস ও সংস্কৃতি,অশোকানন্দ রায়বর্ধন, স্রোত, হালাইমুড়া,কুমারঘাট।
0 মন্তব্যসমূহ