পদ্মশ্রী মজুমদারের ‘দেও নদীর জল’|| শুভ্রশংকর দাশ

পদ্মশ্রী মজুমদারের ‘দেও নদীর জল’ 

শুভ্রশংকর দাশ 

পদ্মশ্রী মজুমদারের ‘দেও নদীর জল’ উত্তর ত্রিপুরার সিলেটি জনজীবনের এক অনবদ্য ও মহিমান্বিত আখ্যান । তাদের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগ, তাদের লোকগাঁথা, উৎসব, আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ ও যন্ত্রণা,  তাদের অন্তর ও বহির্জগতে নগরায়নের প্রভাব, মূল্য বোধের অবক্ষয় —সবকিছুই ঔপন্যাসিক দারুনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন । 

লেখিকা এখানে দেও নদীকে কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা বা প্রাকৃতিক সত্তা হিসেবে ব্যবহার করেননি; বরং নদীটি এখানে স্মৃতি ও মহাকালের প্রতীক এবং সামাজিক বিবর্তনের এক নীরব সাক্ষী । সাধারণ মানুষের ভাগ্য যেন কোনো এক অমোঘ বন্ধনে এই নদীর সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে । 
নদীর এই সর্বব্যাপী উপস্থিতি টমাস হার্ডির উপন্যাসের সেই উদাসীন ও আদিম প্রকৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়, যা মানুষের ক্ষুদ্রতা ও লালসাকে ছাপিয়ে নিজের গতিতে বয়ে চলে । দেও নদী একই সাথে ঐশ্বরিক এবং দানবীয় । নদীই বাঁচায়, ভাসায় বা ডোবায় ।

খনার বচন দিয়ে শুরু এই উপন্যাসের সূচনায় দেও–লঙ্গাই–মনুর লোককাহিনি কেবল একটি প্রেমের আখ্যান নয়; এটি এই উপন্যাসের দার্শনিক ভিত । মনুর দুই প্রেমিকের দ্বন্দ্ব ও শেষপর্যন্ত নদীরূপে মিলনের কাহিনি, ব্যক্তিসত্তার বিলোপ ও বৃহত্তর ঐক্যের রূপক হয়ে উঠে । এখানে প্রেম সামাজিক বিধিনিষেধ অতিক্রম করে প্রকৃতির অনন্ত স্রোতে মিশে যায় । 

 উদ্বাস্তুদের জীবনচিত্র এই উপন্যাসের অবিচ্ছেদ্য আভুষণ । লেখিকা দেখিয়েছেন যে, রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে গেলেও মানুষের সংস্কৃতি ও গানের সুর কোনো কৃত্রিম সীমারেখা মানে না । উলুধ্বনি ও বারো মাসে তেরো পার্বণের  মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন ভূখণ্ডে নতুন জীবন শুরু করে । দেও নদী এখানে আশ্রয়দাত্রী মাতৃসত্তা । অমিতাভ ঘোষের 'দ্য শ্যাডো লাইনস'এ যেমন স্মৃতি ও সীমানার দ্বন্দ্ব দেখা যায়, এই উপন্যাসেও কাঁটাতারের ওপারে ফেলে আসা ভিটেমাটির জন্য অনেকটা তেমনি হাহাকার অনুভূত হয় । 

উপন্যাসে, ‘অবন্তী’ চরিত্রটি  নারীর আত্মসচেতনতার প্রতীক । অনিরুদ্ধের সঙ্গে তার মতপার্থক্য কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি মধ্যবিত্ত সমাজে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন উত্থাপন করে । অবন্তীর অন্তর্মুখী ভাবনা, প্রকৃতির সঙ্গে তার সংলাপ এবং স্মৃতির রোমন্থন চরিত্রটিকে মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা দিয়েছে ।  অনিরুদ্ধকে ভালোবাসলেও সে আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন বিসর্জন দিতে চায় না । তার দ্বিধা, স্মৃতি, বৃষ্টিভেজা একাকিত্ব তার মনোজগত পাল্টে দিয়েছে । প্রেম এখানে অধিকার নয়; বরং পারস্পরিক সম্মান ও স্বাধীনতারক্ষার পরীক্ষা । ক্যামেরা দিয়ে অবন্তী যেন অধরা’কেও ধরতে চায় ।

'কমলা' নামের চরিত্রটি প্রান্তিক নারীর বেদনাকে ধারণ করে । স্বামীর নির্যাতন, শ্বশুরবাড়ির অপমান এবং সমাজ প্রদত্ত কুৎসা তার মধ্যে এক বিদ্রোহী সত্তার জন্ম দেয় । লাউ গোঁসাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক সামাজিক বিধির বাইরে এক মানবিক আশ্রয়ের ইঙ্গিত বহন করে । ‘গোঁসাই’ চরিত্রটি এই উপন্যাসের আত্মার খুব কাছাকাছি ।  সে সংসারবিমুখ, অথচ গভীর সহমর্মিতায় উজ্জ্বল । কমলা ও গোঁসাইয়ের  সম্পর্ক, উপন্যাসে, প্রেমের এক বিকল্প ভাষ্য নির্মাণ করে, যেখানে শরীর ও আত্মা মিলেমিশে এক হয়ে যায় ।

রানীবালা ও পাপুর মায়ের পর্ব কুসংস্কার ও ধর্মব্যবসার স্পর্শকাতর দিক উন্মোচন করে । তন্ত্র-মন্ত্র, ব্রত ও অলৌকিকতার আড়ালে যে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও মানসিক শোষণ সূক্ষ্মভাবে কাজ করে, লেখিকা তা চিত্রিত করেছেন সুনিপুণ ভাবে । পাপুর মায়ের চরিত্র একমাত্রিক নয় । তার অতীত ও বঞ্চনা তাকে জটিল ও কুটিল করে তুলেছে । 

শ্রাবণী–কল্লোলের প্রেম বর্ণভেদপ্রথা ও পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের সমস্যাকে সামনে আনে । অন্যদিকে, সীতাংশুর কন্যার করুণ পরিণতি, পণপ্রথা ও বিচারব্যবস্থার অসারতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে । নদীর জলে কন্যার স্মৃতি খোঁজার অংশটি, উপন্যাসের হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ।

উপন্যাসের ভাষা কাব্যময় হয়ে উঠেছে বহু জায়গায় । লোকগান, কীর্তন, আঞ্চলিক শব্দচয়ন, ইতিহাস ও মিথের ব্যবহার এই আখ্যানকে গভীর ও তাৎপর্যময় করে তুলেছে । 

উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্য দিয়ে আমরা সম্পর্কের টানাপোড়েন, মানবমনের বিচিত্র প্রবৃত্তি, কুসংস্কারের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিজ্ঞান ও  অন্ধবিশ্বাস, এবং রাজনীতি ও যৌতুক প্রথার দংশন প্রত্যক্ষ করি । প্রকৃতির গূঢ় রহস্য আমাদের অভিভূত করে । আমাদের অন্তরে জেগে ওঠে— সুখ,দুঃখ, দ্বিধা ও মায়াজাল ছিন্ন করে, কর্মফলের এই চক্রকে অতিক্রম করার এক তীব্র আকুতি । আমরা আমাদের হৃদয়ের গহীনে দেও নদীর নিরন্তর বহমানতা অনুভব করি ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ