চোরের কান্ড (ছোট গল্প) || রীতা ঘোষ
পাবলিশার্স
কী আজব কান্ডরে বাবা! রাতের আঁধারে আজ এর বাড়ি, কাল ওর বাড়ি থেকে বাইরে রাখা বাসনপত্তর চুরি হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু চোরের টিকিরও নাগাল পাচ্ছেনা কেউ। গ্রামের লোকেরা খোলামনের মানুষ, অত প্যাঁচপোঁচ নেই মনের ভেতর। রাতে ঘরের বাইরে ঘটিটা, বাটিটা, টুকটাক বহু জিনিস পরে থাকে। কোনোদিন চুরি টুরি হয়নি। তাই সতর্কতার প্রশ্নই নেই।
প্রথমদিন চুরিটা হলো ভটচাজ্ বাড়ির কুয়োপাড় থেকে। সদাগর ভটচাজের মেজোপুত্রের বন্ধু এক কায়েতেরপো ভটচাজ্ বাড়িতে সেদিন আহার করেছিল। আহার সমাপ্ত হবার পর ভটচাজ্ গিন্নী এই কায়েতেরপোকে বলে —'বাছা, একটু কষ্ট করো, তোমার এঁটো থালাখানা কুয়োপাড়ে রেখে এসো। তোমার এঁটোবাসন ছোঁয়ে কে চান করবে রাতেরবেলা। বিনুরে, তোর বন্ধুকে কুয়োপাড়ে নিয়ে যা, একপাশে রেখে দেবে। বাতি নিয়ে যা। পেছনে অন্ধকার।'
সে নিমন্ত্রিত হয়ে আসেনি। দুবন্ধু সন্ধ্যেয় স্যারের কাছে পড়া শেষ করে আরেক বন্ধুর বাড়ি গিয়েছিল। ওরা মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তিনজনে মিলে পড়ার বিষয় নিয়ে আলোচনায় অনেকক্ষন সময় কাটালো। সহসা টেবিল ঘড়ির দিকে চোখ গেলো। রাত ন' টা বেজে গেছে।
জয়রাম ও বিনোদের বাড়ি একই দিকে। ওরা বাড়ির পথে রওনা দিলো। কি মনে হলো, বিনোদ জয়রামকে বলে—' চল্, আজ আমাদের বাড়িতে খেয়ে যাবি।'
সে জয়রামের বাড়িতে গেলে জয়রামের মা ওকে খুব আদর আপ্যায়ন করে। শুধু জাতে বামুন বলে ভাত খাওয়ার কথা বলেনা। মনে মনে ভাবলো জয়রামকে নিয়ে গেলে মা অখুশি হবেনা।
জয়রাম মৃদু আপত্তি করেছিলো—'না না আজ না, আরেকদিন যাবো'।
—' আরে চল তো'। জোর করেই ওকে নিয়ে গেলো।
খুব তৃপ্তি করেই আহার করেছিলো জয়রাম। কিন্তু বন্ধুর মায়ের এই কথায়, বলা যাক্ নির্দেশে সে অপমানিত বোধ করলো। এর চেয়েও বেশি লজ্জিত হলো বিনোদ। সে বলে ওঠে - 'মা, আমি নিয়ে যাই ওর থালাটা? '
ভটচাজ্ গিন্নী আঁতকে ওঠে-'ওরে না না, এই রাতের বেলা তোকে ওর এঁটো থালা ছোঁয়ে চান করতে হবেনা।'
জয়রাম বলে - 'জেঠিমা, আমিই রেখে আসছি। বিনু, তুই আমাকে দেখিয়ে দে জায়গাটা চল্'।
বিনু মরমে মরে যায়। ভাবছে—এমন জানলে কক্ষনো বন্ধুকে খাওয়ার কথা বলতো না। দাদার এক বন্ধু মাঝে মাঝে এসে খাওয়া দাওয়া করে। সে অবশ্য তাদের স্বজাতি। তবে এই বয়সে বিনুর জাতপাতের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম। ছোঁয়াছুঁয়ি জিনিসটা কি, তাও জানতোনা। সে মনে মনে স্হির করে বড় হয়ে জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ি এসব মানবেনা। এখনতো বড়দের সঙ্গে তর্ক করা যায়না। ওদের পাঠ্যবইয়ে কাজী নজরুল ইসলামের 'জাতের নামে বজ্জাতি' কবিতাটি স্মরণে আসে। কোনোদিন মানুষের মন থেকে জাতপাতের বিভেদ দূর হবে?
একটু পর জয়রাম বাড়ির পথ ধরলো। কাছেই ওর বাড়ি। গ্রামদেশে আঁধারটা যেনো বেশি ঘন হয়। আঁধারে চলার অভ্যেস তার আছে। জোনাকির মিটমিটে আলো আঁধার দূর করে পথিককে আলো দেখায়। হাওয়াতে ফুলের সুবাস।
পথে আরেক বন্ধু বাঞ্ছার সঙ্গে দেখা। বাঞ্ছা জিজ্ঞেস করে—' এতো রাতে কোথায় গেছিলি?'
জয়রাম হাসতে হাসতে বিবরণ দেয়। সে জানে জাতপাত নিয়ে অনেকের মনেই বিধিনিষেধ আছে। জাতের কারণেই মাঝে মাঝে ঘটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তাই তখন মনে মনে রাগ হলেও বিনুদের দোষ দিতে পারেনা।
বাঞ্ছা ক্রুদ্ধ হয় —' বামুন হয়েছে তো মাথা কিনে রেখেছে! গেছিলি কেনো? বিনু কেনো তোকে নিয়ে গেলো?'
জয়রাম হাসে - 'মিছিমিছি বিনুকে দোষ দিসনা, ও কি জানতো বাড়িতে অত ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপার আছে?'
ঠিক তখন এক সিঁধেল চোর আঁধারে গা মিশিয়ে চুপি চুপি ওদের পেছন পেছন হাঁটছিলো। এ গাঁয়ে তার নতুন আগমন। গাঁয়ের হালচাল, গেরস্হের হাঁড়ির খবর সংগ্রহ করে চলেছে গোপনে, আঁটসাঁট বেঁধে কাজে লাগবে।
দুই বন্ধুর কথোপকথন কান খাড়া করে শুনছে। চকিতে মাথায় বুদ্ধি খেললো, ঘুঁটঘুটে আঁধারে আজই কাজের বনি হোক। নতুন হলেও সদাগর ভট্চাজের বাড়ি সে চেনে। গত পরশুই ভিখিরি সেজে ভিক্ষে করতে গিয়েছিলো সে বাড়িতে। যাক্, আজ থেকেই শুরু করে দেবে তার শিল্পকর্ম। চুরি করাকে সে শিল্পকর্ম বলেই ভাবে। একর্ম যেকোন মানুষের কর্ম নয়। যে যত নিপুণ ভাবে করতে পারবে, তার কদর তত বেশি। যে গুরুদেব ওকে এ গাঁয়ে পাঠিয়েছে, তাকে স্মরণ করে সে চললো তার কর্মস্থলে। গুরুদেব বলেছিলো - 'ঐ গাঁয়ে এখনো কারো হাত পরেনি, বুদ্ধি খরচ করে কাজ কর, কপাল খুলে যাবে।'
ভালো কাজ দেখাতে পারলে প্রমোশন হবে, তখন শহরে পোষ্টিং হবে। তখন অবশ্য ট্রেনিং নিতে হবে আবার।
পরদিন সকালের ঘটনা।
বিনোদের মায়ের সকালে উঠেই চান করা অভ্যেস। চান করে ঠাকুরঘর পরিষ্কার করে, পূজো দিয়ে তারপর অন্য কাজ। আজও ঘুম থেকে উঠে কুয়োপাড়ে এলো। এসে দেখে কুয়োপাড়ে বালতিও নেই, গতরাতের ছেলের বন্ধুর রেখে যাওয়া এঁটো কাঁসার থালাটাও নেই!
সেই শুরু। এরপর থেকে প্রায়ই এর বাড়ি ওর বাড়ির বাসন কোসন মনের ভুলে কেউ যদি বাইরে ফেলে রাখে রাতের বেলা, পরদিন সেটার আর খোঁজ পাওয়া যায়না। এমন কান্ডতো এতোদিন হয়নি! কিন্তু চোর ধরতে কেউ সক্ষম হচ্ছেনা।
তো সেই গাঁয়ে ছিল একটা সরকারি পাকা কুয়ো। বেশ গভীর, নীচে কালো জল টলটল করছে। জল তোলার জন্য যার যার বাড়ি থেকে দড়ি বালতি নিয়ে আসে। যাদের বাড়িতে কুয়ো বা পুকুর নেই, তারাই আসে। খাওয়ার জল, চানের জল, বাসন ধোয়া, কাপড় কাচা—সব এই কুয়োর জলেই করতে হয়। কুয়োতে জলের অভাব নেই। অফুরান জল। গরমকালে স্নান করে শরীরের অবসাদ দূর করে লোকেরা। মহিলারা কলসী ভরে জল নিয়ে ঘরে ঠান্ডা জায়গায় রেখে দেয়।
একদিন জল তোলার সময় একজনের বালতি দড়ি ছিঁড়ে পরে গেলো কুয়োতে। মাঝে মধ্যে এরকম হয়। তখন দড়িতে আঁকশি বেঁধে বালতি তোলা হয়। কিন্তু এবারতো বহু চেষ্টা করেও তোলা যাচ্ছেনা। অনেকেই চেষ্টা করে দেখলো, কিন্তু কেউই পারলোনা।
ও পাড়ার নাড়ু কুয়োয় নামতে ওস্তাদ। ডাকো নাড়ুকে।
কালো শক্তপোক্ত লিকলিকে দেহ সদ্য যুবক নাড়ু। তড়তড়িয়ে নারকেল গাছ, সুপারি গাছ, তালগাছে উঠতে তার জুড়ি নেই। তেমনি গভীর কুয়োতে নামতেও সে পারদর্শী।
নাড়ু গামছাটা শক্ত করে পেঁচিয়ে পরে নেয়। আংটা ধরে তড়তড়িয়ে নেমে গেলো কুয়োর গভীরে। যারা উপরে ছিল, উঁকি মেরে দেখছে।
নাড়ু ভোঁস করে ডুব দিলো, একটু পরে মাথা তুলে। দুহাত উপরে। কিন্তু বালতির বদলে ওটা কি? একটা কাঁসার থালা। একজন একটা দড়ি নামিয়ে দিলো, নাড়ু দড়িতে থালাটা বেঁধে দেয়। আবার ডুব, এবার পেতলের ঘটি। আবার ডুব —আবার ডুব। উঠছে বালতি, ঘটি বাটি আরও কতোকি! এতোদিন যাবৎ যাদের বাড়ি থেকে জিনিস চুরি হয়েছিল, সব কুয়োর ভেতর!
সবাই বলাবলি করছে, কে করলো এমন কান্ড? তাজ্জব ব্যাপার! তবে চুরি যাওয়া জিনিসগুলো পেয়ে সবাই খুশি। এমন মজার খবর মুহূর্তেই এলাকায় ছড়িয়ে পরলো। দলে দলে মানুষ আসছে দেখতে। ভটচাজের ছেলেরাও এলো, ওদেরও কাঁসারথালা চুরি হয়েছিল।
ভিড়ের পেছন থেকে কে একজন খিকখিক করে হাসতে হাসতে বলে —'বামুন কায়েতের জাতপাত, কুয়োর জলে নিপাত যাক।'
চুরির মাল বেহাত হয়ে গেলো। মানে মানে সঁটকে পরাই ভালো।
বক্তাকে কেউ দেখতে পেলোনা।
0 মন্তব্যসমূহ