চলো সই পাতি || সুমিতা দেব

চলো সই পাতি || সুমিতা দেব 

"ওলো সই, ওলো সই আমার ইচ্ছে করে তোদের মতো মনের কথা কই".......
আজ প্রায় পঁচিশ বছর পর সকাল সকাল এসে মার উঠোনে দাঁড়িয়ে "সই সই" ডাক শুনে  ছোটোবেলার কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে গেল। বর্তমানে উত্তর আধুনিক যুগে এই ডাক শোনা বড্ড কঠিন। আর শহর বা শহরাঞ্চলে তো প্রশ্নই উঠে না। গ্রামাঞ্চলেও আছে কিনা জানা নেই আমার। সে যাই হোক, আমি ঘর থেকে বেরিয়েই দেখি মার সই কুলাই থেকে এসেছেন মাকে দেখতে। আমি মাসি বলেই ডাকি। ভীষণ ভালো একজন মানুষ। এই কথাটা বলার একটাই কারণ। কারণ গল্পের শিরোনাম এটাই "সই"কে নিয়েই।
আমি তখন খুবই ছোট সম্ভবত  বালোয়াড়ি স্কুলে পড়ি। আষাঢ় মাসের শেষ দিন।মা আজ ছুটি নিয়েছে কারণ আজ "সই পাতা"র অনুষ্ঠান আমাদের বাড়িতে। এই অনুষ্ঠান আমি আর কোথাও শুনিনি। হয় কিনা তাও বলতে পারবোনা। 
এই "সই পাতা"র অনুষ্ঠানটি গ্রাম বাংলার এক ঐতিহ্যবাহী ও একটি সামাজিক প্রথা হিসেবেই জেনেছি। আষাঢ় মাসের সংক্রান্তিতে এই অনুষ্ঠান পালন করা হতো। সই পাতার নির্দিষ্ট কোন বয়স ছিল না। যতটুকু দেখেছি একটু বড় হওয়ার পরে আগের দিন নতুন জামা, আলতা, চুলের ফিতা, চিরুণী, নেইলপলিশ, পাউডার আরো কিছু সাজগোজের জিনিস, সাথে মাকে দেখতাম যে কোনো একটা বইও দিত দিদিকে। যেহেতু সেদিন আমাদের "সাত্যাই" ব্রত পালন থাকে মাদের তাই থালায় ছাতু ও দেয়া হতো। এই সময়টা আম কাঁঠালের সময় তখন ফল- মিষ্টি সহ আমরা ৪-৫ টা থালায় সাজিয়ে নিয়ে যেতাম সই পাতার সব উপকরণ । বর্তমান যুগ হলে তত্ত্ব সাজিয়ে নিয়ে যেতাম। এইযে সই পাতা এটা কিন্তু নিজের ইচ্ছেমত যেদিন খুশি পাতা যেত না। আগে কোনো একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে ঠিক করত বাড়ির মা দিদিমারা মিলে কবে সই পাতা হবে। সেই অনুযায়ী মানসিক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। দুই বাড়ির সবাই তুলসী গাছের সামনে বাড়ির সবার উপস্থিতিতে নিজেরা নিজেদের সই বলে স্বীকার করে নিতে। সেই মূহুর্ত থেকে নিজেদের ওরা সই বলে ডাকা শুরু করত। দুজন দুজনের সাথে কোনোদিন ঝগড়া না করার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতো। সুখে দু:খে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিত। যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে আমরা পরস্পর পরস্পরের বাড়িতে খাওয়া দাওয়া আদানপ্রদান করতাম। 
এই সই পাতানোর প্রথা হয়ত বর্তমানে বিলুপ্ত। একটা হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি হওয়াই মুখ্য উদ্দেশ্য। আমাদের এই যান্ত্রিক যুগে এসব এখন অতীত। দুই বাড়ির সবাই মিলে বিকাল থেকে রাত অবধি খাওয়া দাওয়া, গল্প গান চলত। আমার দিদিমা আবার এই অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু কথা বলতেন।  জিজ্ঞেস করলে দিদিমা বলতেন "এডি কথা না, ইডিরে  পরস্তাব কয়"। কিছুতো বুঝতাম না। এখন ভাবি কেন যে ঠিক করে শুনে রাখিনি? সইকে আমরা বন্ধু বলেও জানি। গ্রাম বাংলার এই যে ছোট ছোট আচার, অনুষ্ঠানগুলো জানতাম না বুঝতাম না কেন করত সবাই। একটু বড় হওয়ার পর বুঝতে পারলাম এই সমস্ত অনুষ্ঠানগুলো পালন করার একটাই উদ্দেশ্য সবার মধ্যে আন্তরিকতা গড়ে তোলা। আজকালকার যান্ত্রিক যুগে আমরা ফেইসবুক, ইনস্ট্রাগ্রাম ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি বলতে পারি করে ফেলেছি অভ্যস্ত নিজেদের। ঘুম থেকে উঠা থেকে আবার ঘুমানো পর্যন্ত আমরা নিজেদের মুঠোফোনে বন্দি করে রাখি।  আমার ছোটোবেলায় এমন  নানান  অনুষ্ঠানগুলিকে সাথে নিয়ে আমার বেড়ে উঠা। যদিও এই অনুষ্ঠান আর এখন আর নেই তবুও এখনও আষাঢ় সংক্রান্তি আসলে ঘুরে ফিরে সেই দিনের সব স্মৃতি জল করে উঠে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ