বন্ধুত্ব
(ছোট গল্প) রীতা ঘোষ
আংক্রা হি হি করে হাসে - 'মাস্টরের কাছে পড়াশুনা কইরা তুইঅ মাস্টর হইব নি?'
শ্লেট বই গোছাতে গোছাতে গোলাপি বলে-'মাস্টর কইছে বেশি কইরা পড়াশুনা করলে মানুষ অনেক বড় হয়।'
চন্দ্রমালা সবজান্তার মতো বলে - 'বড় হয় না কচু হয়। আমার বাবা লেখাপড়া জানেনা, কিন্তু মাস্টর থাইকাও লম্বা। '
গোলাপি বলে -' আরে বুকারাম, ঐ রকম বড় নারে, পড়াশুনা শিখলে বুদ্ধি হয়,অনেক গেয়ান গম্যি হয়। মাস্টর অনেক পড়াশুনা জানে, এর লাইগা চাকরি করে। আমি ভালা কইরা পড়াশুনা করলে আমিঅ চাকরি করমু। '
ধলাইয়ের ছোট্ট একটি পাহাড়ি গ্রাম, এই গ্রামে আংক্রা, চন্দ্রমালা, গোলাপিদের বাড়ি। পাহাড়ি বাঙালি সবাই মিলেমিশে আছে। একটা প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এলাকার ছেলেমেয়েরা ইচ্ছে হলে স্কুলে যায়, না গেলেও বাড়ির অভিভাবকরা কিছু বলেনা। আংক্রা, চন্দ্রমালা মাঝেমধ্যে স্কুলে যায়, গোলাপি নিয়মিত যায়।
এলাকাটা অনুচ্চ টিলাভূমি ও সমতল মিশিয়ে। স্কুলে তিনজন শিক্ষক। একজন হলেন কৃপাময় পাল। ওই শিক্ষকের বাড়িতে গোলাপির মা রান্না করে। গোলাপি মাঝেমাঝে মায়ের সঙ্গে আসে। গোলাপি তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী। ওর পড়ার উৎসাহ দেখে মাস্টার বাবু বলেন-'মাসি, তুমার মাইয়ার পড়াশুনা বন্ধ কইরা দিওনা। গোলাপি লেখাপড়ায় খুব ভাল। ভাল কইরা পড়লে পাশ কইরা চাকরিও করতে পারব।'
সেই থেকে গোলাপির মা পড়াশুনায় মেয়েকে খুব উৎসাহ দেয়। গোলাপি মন দিয়ে পড়াশুনা করে। তার আশা বড় হয়ে চাকরি করে মায়ের দুঃখ দূর করবে। বড় হওয়া অবধি সে বাবাকে দেখেনি। মায়ের মুখে শুনেছে-তার জন্মের পর বাবা নাকি মেয়ে সন্তান হওয়ার অপরাধে মাকে ত্যাগ করেছে। মা চলে এলো দাদুর বাড়িতে। দাদুর বাড়িতেও দাদু ছাড়া আর কেউ নেই।
গোলাপির দাদু কালিপদ নমঃশূদ্র পাটের দড়ি বানিয়ে বিক্রি করে। দাম কম থাকার সময় পাট কিনে রাখে, প্রায় সারা বছরই দড়ি বুনে।
গোলাপির মা শোভারানি মাঝে মাঝে পাড়ার মহিলাদের সাথে পার্টির মিছিলে যায়, মিটিঙে যায়। পার্টি কি জিনিস ছোটরা বুঝেনা, গোলাপিও বুঝেনা। তবে সে মায়ের মুখে শুনেছে এই এলাকায় একটি বালোয়াড়ি স্কুল হবে। পার্টির সঙ্গে থাকলে শোভারানির একটা চাকরি হবে, ছোট ছেলেমেয়েদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্কুলে আনার চাকরি। সেই আশায় শোভারানি মিছিল মিটিংয়ে যায়।
সত্যি সত্যিই একদিন বালোয়াড়ি স্কুল ঘর তৈরি হল। এলাকার ধনী ব্যক্তি প্রাণজয় দেব্বর্মা এক কানি টিলাভূমি দান করলো বালোয়াড়ি ঘর নির্মানের জন্য। এলাকায় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আছে, কিন্তু শিক্ষার সুযোগ পায়না। এলাকার মুরুব্বিরা অনেক চেষ্টার পর স্কুল ঘরের জন্য অনুমোদন আদায় করল।
শোভারানির মতো আরো কয়েকজন আবেদন করল স্কুলে বাচ্চা আনা নেওয়ার কজের জন্য। মিটিং বসলো। এলাকার প্রধান বলল-'কাজটা সরকারি ঠিকই, কিন্তু কয়েক মাস বিনা বেতনে কাজ করতে লাগব। বেতনও সামান্য। যারা রাজি আছ দরখাস্ত দেও, তারপরে কমিটি সিদ্ধান্ত নিব কাজটা কারে দেওয়া যায়।'
শোভারানি বাদে অন্যরা ভাবলো-কয়েক মাস বিনা বেতনে, আবার বেতনও কম। পুষাইতনা কাজ কইরা।
অতএব শোভারানিকেই নিয়োগ করা হলো।
কিন্তু সমস্যা হলো এরপরেই, সকালের রান্নার কাজটা করবে কখন?
-' মাস্টর বাবু, বালুয়ারিত আমার চাকরি হইছে'। শোভারানি সংকোচের সঙ্গে বলে।
- 'বাঃ, খুব ভাল। খুব খুশি হইলাম। তুমার মাইয়ার পড়ার খরচের লাইগা আর চিন্তা করন লাগত না।'
- 'কিন্তু আপনের রান্না করমু কুন সময়?' আরো সংকোচের সঙ্গে বলে শোভারানি।
ওর এই সংকোচ ভাব দেখে কৃপাময় বাবু হা হা করে হাসে-'আমার রান্না করনের লাইগা চিন্তা করন লাগত না। তুমার সারা জীবনের একটা গতি হইল ইডাই বড় কথা। '
শোভারানি খুশি মনে তার কাজ করে। এখন গোলাপিও আরো ভালো করে পড়াশুনা করছে। আংক্রা মাঝে মধ্যে স্কুলে যায়। তৃতীয় শ্রেণীতেই আটকে আছে। চন্দ্রমালার ছোট দুইটা ভাইবোন, তাই অনিয়মিত স্কুলে যাওয়া। আংক্রা, চন্দ্রমালার মা বাবা সকাল সকাল ছেলেমেয়েদের
জন্য ভাত রান্না করে জঙ্গলে চলে যায়। আরো অনেক উপজাতি মহিলা পুরুষই জঙ্গলে যায়। কেউ বাঁশ কুরুল, কেউ ছন, কেউ বাঁশ ইত্যাদি সংগ্রহ করে বিকেলে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার জন্য। তাহলে এদের ছেলেমেয়েদের স্কুলে যাবার সুযোগ কোথায়? এখন বালোয়াড়ি হওয়ায় বেশ সুবিধে হয়েছে। বড়রা স্কুলে এবং ছোটরা বালোয়াড়িতে যায়। আংক্রা, চন্দ্রমালা এখন নিয়মিত স্কুলে যায়।
আংক্রার দুই দাদা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। হাইস্কুল অনেক দূরে, তাই পড়া বাদ। এখন জঙ্গল থেকে লাকড়ি এনে বাজারে বিক্রি করে। ওদের কিছু জমিজমা আছে। কিন্তু চাষবাসের কাজ করতে চায়না। ওদের বাবা পরাগ দেববর্মা চাষের কাজে ব্যস্ত থাকে। কিছুদিন যাবৎ লক্ষ্য করছে ছেলেরা প্রায় দিন জঙ্গল থেকে খালি হাতে ফেরে। চাষের কাজেও আসেনা। ছেলেদের মতিগতি দেখে মেজাজ ঠিক থাকেনা-'আরে দামড়ার দল, জমিত কাজ করতে তরার পরিশ্রম লাগে। আগে জঙ্গল থাইকা লাকড়ি আনতি, এখন দেখি খালি হাতে ফিরছ। জঙ্গলে গিয়া ঘুমাইয়া থাকছনি? সারা জীবন খাইবে কি কইরা?'
ছেলেরা গর্জায়-'তুমি থাক তুমার জমি লইয়া। আমরার খুজ করন লাগতনা। আমরা দেশের কাজ করতাছি।'
পরাগ আরো বেশি গর্জায়-' মূর্খ আর কারে কয়। জঙ্গলে গিয়া দেশের কাজ করতাছস? উল্টাপাল্টা চললে টাক্কল দিয়া দুই টুকরা করমু তরারে। '
কিছুদিন ধরেই চাপা উত্তেজনা পাহাড়ি বাঙালি অধ্যুষিত এই ছোট্ট গ্রামে। দুইটি জাতি এতোদিন অভিন্ন হৃদয় ছিল, একে অপরের সুখে দুঃখে ভাগ বসাতো। এখন অবিশ্বাসের কালো ছায়া বিরাজমান।
গ্রামের প্রবীনরা সারাদিন খাটা খাটুনির পর সান্ধ্য আড্ডায় মাততো। এখন এসব আড্ডা প্রায় বন্ধ।
প্রাণজয় দেববর্মাকে পাহাড়ি বাঙালি সবাই সমীহ করে। কেবল সম্পদশালী বলে নয়, বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্বে তার সমকক্ষ কেউ নেই। গ্রামে এই রকম একটা অস্থির অবস্থা চলছে, সেটা প্রাণজয়ের সহ্য হচ্ছে না। বাইরে কোথায় কি ঘটনা ঘটছে সবই কানে আসে, কিন্তু এই গ্রামে তা হতে দেওয়া যায়না। দেশের দুষমনরা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছে, নিরীহ যুবক সম্প্রদায়কে বিপথে চালিত করতে চাইছে। গ্রামের একজন শুভানুধ্যায়ী হয়ে চুপ করে বসে থাকা যায়না।
এক অপরাহ্নে প্রাণজয় দেববর্মার বাড়ির উঠোনে এলাকার জাতি উপজাতির গ্রাম্য সভা বসলো। প্রাণজয় সবাইকে অভ্যর্থনা করে বসালো। গ্রাম প্রধানও উপস্থিত। প্রাণজয় হাতজোড় করে সবাইকে নমস্কার জানিয়ে আহ্বান জানালো গ্রামের শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখার-'আমরা দুই জাত এই গ্রামে থাকি, আমরার ভাষা আলাদা, পোষাক আলাদা। কিন্তু ভালবাসা, মায়া দয়া সবাই সবাইয়ের উপর আছে। একজনের বিপদে আরেকজন আগাইয়া যাই। তাইলে আমরা কি কারণে এই গ্রামে অশান্তি ডাইকা আনতাম?---'
সবাই চুপ। প্রধান বাবুও একই বক্তব্য রাখলেন-'আমরা পাহাড়ি বাঙালি ভাই ভাই, ঠাই ঠাই। উগ্রতার স্হান নাই। '
যাদের মনে উগ্রতার প্রভাব পরেছিল, হয়তো তাদের মন এখন পরিবর্তিত হবে। শুভবুদ্ধির মানুষের মনে এই আশা।
শোভারানি এলাকাটা ঘুরে ছোট বাচ্চাদের স্কুলে আনে। কানে কতো রকম কথা আসে, কখনো জঙ্গল এলাকাতেও যেতে হয়। কোন ভয়কে সে আমল দেয়না।
আজ সকাল থেকেই বৃষ্টি। গোলাপির শরীরটা বেশি ভালো নেই, জ্বর ভাব। মাকে বলে-'মা, আজকে ছাত্র আনতে যাইওনা।'
- 'নারে, বন্ধ দেওয়া ঠিক হইতনা। নতুন কাজ। দূরে যাইতামনা আজকে, দিদিমনিরে কইয়া তাড়াতাড়ি ফিরমু।'
শোভারানি যাওয়ার আগে ভাত রান্না করে গেছে-'তর দাদু আর তুই সিদল ভর্তা দিয়া খাইয়া নিবে। আমার বার চাইছনা।'
গোলাপির উঠতেও ইচ্ছে করছেনা, খেতেও ইচ্ছে করছে না। কিছু দিন যাবৎ আংক্রা, চন্দ্রমালা ওদের বাড়িতে কম আসে।
মা ওকেও বারণ করেছে আংক্রা, চন্দ্রমালাদের বাড়িতে যেতে। গ্রামে নাকি গন্ডগোল শুরু হয়েছে। গোলাপি ভেবে পায়না ছোটরা কি দোষ করেছে। ওরা খেলতে খেলতে মাঝে মধ্যে ঝগড়া করলেও আবার মিটমাট হয়ে যায়। বড়দের বুদ্ধি শুদ্ধি বেশি, তাহলে ওরা কেন ঝগড়া করলে তা মিটিয়ে নেয়না? বড়রা ভারি বোকা।
গোলাপি উঁকি দিয়ে দেখল দাদু বারান্দায় বসে মুড়ি খাচ্ছে। একবার হাঁক দিল-'গোলাপিরে, উঠ উঠ।বেলা হইছে। আজকে ইস্কুলে যাওনের কাম নাই, মুখ ধুইয়া মুড়ি খা।'
দাদু মুড়ি খেতে খুব ভালবাসে। গোলাপির এখন কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। মুড়ি তো নয়ই। জানলা দিয়ে দেখতে পেলো আংক্রা একটা বড় কচু পাতা দিয়ে মাথা ঢেকে থপ থপ করে জল কাদা ডিঙিয়ে ওদের বাড়িতে আসছে।
-' কি করস রে গোলাপি? 'আংক্রা ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে। ওর ফ্রক নীচের দিকে ভিজে গেছে।
আংক্রাকে দেখে খুশি হলেও মুখে বলে - 'তুই এই বিষ্টির মধ্যে আইলি কেরে।'
আংক্রা মাটিতে একটা চটের বস্তায় হাঁটু গেড়ে বসে-'বাবার লগে দাদারা ঝগড়া করতাছে।
কি যে কঠিন কঠিন কথা কয় বুঝিনা। এর লাইগ্যা আইয়া পরছি।
ওর কোমড়ের গামছা খুলে একটা পুঁটলি বের করে - 'নে চালভাজা খা।'
গোলাপিও নীচে এসে বসে, হাত বাড়িয়ে চালভাজা খায়। নুন মরিচ মাখানো বেশ স্বাদ লাগছে। খাওয়া শেষ হলে আংক্রা বলে - 'চল্ সামনে ছড়াত গিয়া মাছ ধরমু। এর লাইগ্যা গামছা আনছি।'
গোলাপির আর বসে থাকতে ভালো লাগছেনা। বলে-'নারে, জলে ভিজতা মনা। আমার জ্বর জ্বর লাগতাছে।'
- ' দেখি দেখি' - আংক্রা গোলাপির কপালে হাত দিয়ে দেখে-'অ মা! তর কপাল অনেক গরম হইছেরে। খুব জ্বর। তুই বিছনাত উইঠ্যা ঘুমা। '
গোলাপি বিছানায় গিয়ে শোয়। আংক্রা কাঁথাটা ভালো করে ঢেকে দেয়। মাথায় হাত বোলায়। গোলাপির চোখ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পরে। মনে ভাবছে মা আর দাদু পাহাড়ি বাড়িতে যেতে বারণ করেছে। এই অসুস্থতার সময়ে পাহাড়ি মেয়ে আংক্রা এসে ওর মাথায় হাত বোলাচ্ছে, ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছে।
গোলাপির চোখে জল দেখে আংক্রা অভয় দেয় - 'কান্দস কেনে? আমি তর কাছে আছিত। মামি আইয়া পরব অখনই। তুই ঘুমা।'
দুটি সরলমতি বালিকা পরম মমতায় একে অপরের হাত ধরে রাখে।
0 মন্তব্যসমূহ