বৃহৎ কাঁঠালচরিত্র ||মিলনকান্তি দত্ত

বৃহৎ কাঁঠালচরিত্র  ||মিলনকান্তি দত্ত 

১.
বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল
বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শালুক
বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল
বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল

কাঁঠাল জাতীয় ফল না-হলে সম্ভবত
নজরুল আরেকবার বিদ্রোহী হতেন! 

২.
কাঁঠাল কিলিয়ে পাকিয়ে 
পরের মাথায় ভেঙে খাওয়া
এতে যে আশ্চর্য সুখ আছে
             তা মানুষই জানে,
বোঝা গেল গাছে কাঁঠাল এলে
বাঙালির গোঁফে কেন এত
             তেলের আয়োজন। 

২.
মগডালে ঝুলছিল, বৃহৎ কাঁঠালচরিত্র। 
অধঃপতনের শ্রুতিফল 
কান ধরে টেনে তুললেন বৃদ্ধ কেরামসা। 
পাকিনি তো, তবে? ইঁচড়ের
আঠালো মুখড়া, পাকিনি তো,তবে? 

৩.
ফলদোকানের কোণে দুটো কাঁঠাল দেখে
বড়ো ভালো লাগল। 
যেন লন্ডনে দেখা হয়ে গেল দুই 
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সঙ্গে। 
নাশপাতি,লিচি, আপেলের পাশে
আমার সোয়াদিগাছের নাদা ফলটা। 
বন্ধু হস্‌পিটালাইজড্‌ জেনে
তবু ভাবতেই পারি না
ক্যারিব্যাগে ঝুলিয়ে নিয়ে যাচ্ছি
                           একটা রামকাঁঠাল! 

৪.
রামকৃষ্ণ বলেছিলেন, হাতে তেল মেখে
কাঁঠাল ভাঙতে হয়। তবু
আঠা চিরপদার্থ, পিরিতির উপমা হয়ে
লাগে কিন্তু ছাড়ে না, হাতের তেল
মাথায় থাকুক
কাঁঠাল শব্দটা তাই একটি চন্দ্রবিন্দুসমেত
           ঐশ্বরিক হয়ে আছে। 

৫.
কাঁচা কাঁঠাল
আদরার্থে 
গাছপাঁঠা,
মাংসের বিকল্প হিসেবে
       জুড়ি মেলা ভার,
ছাগলের কাঁঠালপাতা চিবোনোর
              এটাই রহস্য! 

৬.
চৈতন্যভাগবতে বৃন্দাবনদাস
চৈতন্যের অঙ্গকান্তিকে
পাকা পনসের সঙ্গে 
তুলনা করেছেন,
এ তুলনা অতুলনীয় জেনে
আজও কাঁঠাল ভেঙে দেখি,
সোনার গৌরাঙ্গ আমার
                 রসে গড়াগড়ি যান। 

৭.
কাঁঠাল ফলটা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ 
বেশ বিরক্তই ছিলেন। এক-একটা কোয়া নিয়ে
এক-একটা ফল হতে পারত, ঠাসাঠাসি করে,
গোদামার্কা ফলবস্তু তৈরি করে প্রকৃতি নাকি
হাতের কাজটাই মাটি করেছেন। সমস্যাটা
কাঁঠালের নয়, কবির ব্যক্তিগত
আসলে আঠা ও দাড়ির আল্‌টিমেটাম্‌
কবি জানতেন। 

৮.
গ্রামপথে মাঝেমাঝে দু'একজন বয়স্কার
                                           দেখা মেলে

এক দঙ্গল নেংটা পোলাপানের মাঝখানে
                                   মশগুল রমণী। 
কোনোটা ছেলের, কোনোটা মেয়ের, কোনোটা
বোনের,কোনোটা বোন-পো'র, কোনোটা
পড়শির বা উড়ে এসে জুড়ে বসা,
কাঁখে-কাঁখে-কোলে-পিঠে গোটা কচিসংসদ। 
মহামহিলা যেন হেলে পড়া কাঁঠালের গাছ,
গোড়া থেকে মাথা অব্দি থরে-থরে ধরে আছে
              পরম্পরার ফলন! 

৯.
কোথাও কাঁঠাল বিস্ফোরিত হচ্ছে। 
রাশি রাশি রসালো কোয়ায় ভরে গেছে
কোয়ান্টামফিল্ড। 
কিন্তু গেরস্তের বেড়া ভেঙে গরু ঢোকে
দু'একটা গরিবও ঢুকে পড়ে,
ফসলের প্রথম সোয়াদে নুলো সক্‌সক্‌
মাইক্রোফিনান্স! 

১০.
মানুষ গরু তাড়াচ্ছে, গরু মানুষ তাড়াচ্ছে
মাঝখানে রাজার খাজানা, অনবদ্য কাঁঠাল,
গ্রামচিত্রটি নেংটোবেলায় কতবার দেখেছি। 
ঔপনিবেশিকযুগের ব্রিটিশরা কাঁঠালকে
জ্যাকফ্রুট বা শেয়ালের খাদ্য বলেছে,
তা বলুক। গরিবের আপেলটার আজ
পেটেন্ট প্রয়োজন, বাজার-অর্থনীতি
                   ভুতির গন্ধ টের পেয়ে গেছে। 

*
মেহগনিকাঠের হরিণ
আগরতলা বইমেলা ২০১২,স্রোত প্রকাশনা,
কবিতার বই থেকে। 

...

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ